বেঁচে যাওয়া উজ্জ্বলের মুখে হত্যাকান্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা এক মাসেও মূল ঘাতকরা ধরা পড়েনি

প্রকাশিত : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাউসার চৌধুরী সিলেট ল’ কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা ফয়জুল হক রাজু হত্যাকান্ডের এক মাসেও মূল ঘাতকরা ধরা পড়েনি। ৩ আসামীকে ১১ দিন রিমান্ডে নিয়েও তেমন কোন তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। আসামীদের কেউ কেউ নগরীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার এসআই ফায়াজ উদ্দিন জানিয়েছেন, আসামীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে ৩ জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এদিকে, নিহত ফয়জুল হক রাজুর সাথে থাকা গুরুতর আহত জাকির হোসেন উজ্জ্বল এই হত্যাকান্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। প্রাণে বেঁচে গেলেও সন্ত্রাসীদের গুলিতে টগবগে যুবক উজ্জ্বলের পিটও ঝাঝরা হয়ে গেছে।
মূল আসামীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে
পুলিশ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফয়জুল হক রাজু হত্যাকান্ডের ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে নিহতের চাচা যুবলীগ নেতা মোঃ দবির আলী বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ২৩ (৮) ২০১৮)। মামলায় আলোচিত ছাত্রদল ক্যাডার আব্দুর রকিব চৌধুরী, দিলোয়ার হোসেন দিনার ওরফে হাজী দিনার, এনামুল হক, একরামুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, শেখ নয়ন, সলিড, ফরহাদ, সাদ্দাম, মুহিবুর রহমান খান রাসেল, রাসেল ওরফে কালা রাসেল, আরাফাত, মোফাজ্জল চৌধুরী মুর্শেদ, আলফু মিয়া, শাহীন, সুফিয়ান, নজরুল ইসলাম জুনিয়র নজরুল, তোহা, আফজল, সাহেদ, রুবেল মিয়া, মামুন ও জুমেলের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ১৫ জনকে আসামী করা হয়। সূত্র জানায়, মামলার এজাহারে ঘটনার মূল হোতা হিসেবে আব্দুর রকিব, দিনারসহ ৮ জনকে উল্লেখ করা হলেও এদের কারো হদিস পায়নি আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। আসামীদের সকলেই ছাত্রদলের সাথে সম্পৃক্ত। অনেকের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগও আছে। উপশহর তেররতন এলাকায় এদের কেউ ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেলেও এরা রয়ে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এক আসামীকে উপশহরে অবাধে ঘুরতে দেখা গেছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শী একটি সূত্র জানিয়েছে। একাধিক সূত্র বলেছে, লন্ডনে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছে আব্দুর রকিব। আবার একটি সূত্র বলেছে, ইতোমধ্যে সে লন্ডনে পালিয়ে গেছে। অবশ্য তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো সূত্রই নিশ্চিত তথ্য জানাতে পারেনি।
৩ আসামীকে ১১ দিন জিজ্ঞাসাবাদ
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার পর এজাহারভুক্ত আসামীদের মধ্যে নগরী থেকে আলফু ও রুবেলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে দু’জনকে ৪ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলা থেকে এজাহারভুক্ত আরেক আসামী সাদ্দামকে গ্রেফতার করে সিলেটে নিয়ে আসা হয়। পরে সাদ্দামকে নেয়া হয় ৩ দিনের রিমান্ডে। ৩ আসামীকে ১১ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই ফায়াজ উদ্দিন জানান, জিজ্ঞাসাবাদে শুধুমাত্র সাদ্দাম হত্যাকান্ডে ছিল বলে স্বীকার করলেও সে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়নি। তাকে আবারো রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করবো।
প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন রাজু
ফয়জুল হক রাজু হত্যাকান্ডের সময় ব্যবসায়ী জাকির হোসেন উজ্জ্বল ছিলেন রাজুর সাথে। আপন খালাতো ভাই হিসেবে রাজুর সাথে তার সখ্যতা ছিল সেই ছোট বেলা থেকেই। ছোট্ট বেলার খেলার সাথীকে চোখের সামনেই কুপানোর দৃশ্যই কেবল দেখেননি তাকে রক্ষায় নিজেও মরার পথে চলে যান। সম্প্রতি তিনি এই হত্যাকান্ডের বর্ণনা দেন। উজ্জ্বল বলেন, আমরা মেয়রের বাসা থেকে বের হয়ে যখন নিজেদের বাসার দিকে যাচ্ছিলাম; ঠিক তখনই আমাদের মোটর সাইকেলকে লক্ষ্য করে ৩০-৩৫ জন হামলা করে। রাজুকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপ দেয়। আমাকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়ে গুলি। কোপ খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাজু। রাজু তখন তাদের নিকট প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল। রকিব তখন বলছিল, ‘শেষ করে দে- শেষ করে দে।’ রক্তে লাল হয়ে যায় রাস্তা। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন উজ্জ্বল। নিজের গেঞ্জি দিয়ে রাজুর মাথার রক্ত পড়া বন্ধ করার চেষ্টা করেও পারেননি বলে জানান তিনি। হাসপাতালের বেডে ছিলেন প্রায় ২ সপ্তাহ। পরে বাসায় ফিরেন। বাসায় ফিরে জানতে পারেন, প্রিয় বন্ধু প্রিয় ভাই রাজু খুন হয়েছে। চলে গেছে না ফেরার দেশে।
ঝাঝরা হয়ে গেছে উজ্জ্বলের পিট
হত্যাকান্ডের সময় রাজুকে রক্ষায় এগিয়ে যাওয়া উজ্জ্বলের অবস্থা এখনো করুন। সন্ত্রাসীদের ছোরা গুলিতে উজ্জ্বলের পিট ঝাঝরা হয়ে গেছে। পিটে গুলির পরিমাণ এতোই বেশি যা গুণেও শেষ করার মতো নয়। শতাধিক স্পিøন্টার রয়েছে পিটে। কেবল পিটই নয়; মাথায় রয়েছে একাধিক আঘাত। ডান হাতেও স্পিøন্টারের একাধিক স্থানে রামদার আঘাত রয়েছে। বিশেষ করে পিটে গুলির স্পিøন্টারের ফলে ব্যথায় নিদ্রাহীন রাত কাটাতে হয় উজ্জ্বলের।
রাজুর শরীরে ৪৪ আঘাত
নিহত রাজুর সুরতহাল প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কতটা নির্দয় ও নির্মমভাবে ঘাতকরা তাকে হত্যা করেছিল। কোতোয়ালী থানার এস আই আকবর হোসেন ভূঁইয়া সুরতহাল প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেন। এতে বলা হয়, মাথার উপরে ২টা, পেছনে ও ডান পার্শ্বের পেছনে ৭টা, কপালের ডানপার্শ্বে ১টা, থুথনিতে ২ টা আঘাত রয়েছে। ডান কানের লতি কাটা। বুকের ডান পাশে ১টি ছিদ্র, বুকের মাঝখানে ১টি, ডানপাশে ১টি, বাম কাঁধে ১টি, ডান হাতের বাহু হতে কবজি পর্যন্ত ১২টি, বুক ও পেটের ডানপার্শ্বে ১০টি, পিটের উপরে ও ডান পায়ের হাঁটুতে আঘাত রয়েছে। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলীসহ ৪ টি আঙ্গুল কাটা। শরীরে মোট ৪৪ টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় বলে সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রাজনীতি থেকে সরে যাওয়াটাই কাল
মামলার এজাহারে বলা হয়, ফয়জুল হক রাজু তার চাচা দবির আলীর উপশহরের বাসায় থেকে সিলেট ল’ কলেজে পড়ালেখা করতেন। সে ল’ প্রথম বর্ষের পরীক্ষায়ও অংশ নেয়। রাজু মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ প্রচার সম্পাদক। সম্প্রতি পড়ালেখায় মনোনিবেশ করায় ছাত্র রাজনীতি থেকে সরে আসে। এর ফলে আসামীদের কয়েকজনের সাথে রাজুর মনোমালিন্য শুরু হয়। এর জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে রাজুকে খুন করা হয় বলে নিহতের পরিবার জানিয়েছেন। তবে, ছাত্রদলের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে চলমান বিরোধের জেরেই প্রতিপক্ষ গ্রুপের হাতে খুন হন রাজু ছাত্রদলের একাধিক সূত্র এমন তথ্য জানিয়েছে।
সি.সি. ক্যামেরা রহস্য
নিহতের পরিবার ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী একটি বাসায় সি.সি. ক্যামেরা থাকায় হত্যাকান্ডের পুরো দৃশ্যটি এতে রেকর্ড হয়। সি. সি. ক্যামেরার রেকর্ড হওয়া ফুটেজে কোপানোর দৃশ্য স্পষ্ট রেকর্ড হয় বলে সূত্রটি জানায়। আইন শৃংখলা বাহিনীর একটি সংস্থার কয়েক সদস্য সি. সি. ক্যামেরার এই ফুটেজটি নিয়ে যান বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে ফুটেজটি দেখিয়ে কয়েক আসামীর ব্যাপারে ঐ সংস্থার সদস্যরা তাদের ব্যাপারে নিশ্চিত হন। তবে পুলিশ বলেছে, সি.সি ক্যামেরার বিষয়টি নিয়ে তাদের কাছে কোন তথ্য নেই।
আহাজারী এখনো চলছে
মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার শাহাপুর গ্রামের ফজর আলীর পুত্র ফয়জুল হক রাজু। পিতার ৩ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তানের মধ্যে রাজু ছিল সবার বড়। ফজর আলীর সন্তানদের মধ্যে রাজু সিলেটে পড়ালেখার পাশাপাশি বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের দেখাশুনাও করতেন। একমাত্র মেয়ে জার্মানে। ২য় পুত্র বিদেশে ও কনিষ্ঠ পুত্র স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। এক সময় চাচা দবির আলী প্যারালাইজড এ আক্রান্ত হলে চাচার পুরো চিকিৎসা করান রাজু। এমনকি সাভারের সিআরপিতে টানা ৬ মাস অবস্থান করে ফিজিওথেরাপী দেয়ানো হয় দবিরকে। এভাবে পরিবারের সকলের কাজে লাগতেন রাজু। রাজুকে হারিয়ে এখনো পরিবারটিতে শোকের মাতম চলছে। তাদের আহাজারী এখনো থামেনি।
যে কোন মূল্যেই হোক বিচার চাই
রাজু হত্যা মামলার বাদী, নিহতের চাচা ও যুবলীগ নেতা মোঃ দবির আলী বলেন, যে কোন মূল্যেই হোক আমরা রাজুর খুনীদের বিচার চাই। এভাবে যেন আর কারো ছেলে খুন না হয় এজন্যে ঘাতকদের ফাঁসি চাই। তিনি বলেন, রকিবসহ ঘাতকদের যেন দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা যায় এজন্যে তিনি প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, খুনীদের বিচারের জন্যে লড়ে যাবো।
পুলিশের বক্তব্য
যোগাযোগ করা হলে রাজু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার এস আই ফায়াজ উদ্দিন বলেন, এ পর্যন্ত ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের সকলেই এজাহারভুক্ত আসামী। অন্য আসামীদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আশা করি, কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো খবর পাওয়া যাবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

নবীগঞ্জে টয়লেটের ময়লার দুর্গন্ধে অতিষ্ট এলাকার মানুষ

         নবীগঞ্জ প্রতিনিধি নবীগঞ্জ পৌর শহরের...

সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির মানববন্ধন

         সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি...

সিলেট সুরমা ক্লাবের শিক্ষা উপকরণ ও খাদ্য বিতরণ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: মহান স্বাধীনতা...

সাহিত্য চর্চা ব্যক্তিসত্ত্বাকে আলোকিত করে

         অহী অালম রেজা: কবি বদরুজ্জামান...