বেঁচে থাকুক সম্পর্কগুলো

,
প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর, ২০২১     আপডেট : ২ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইছমত হানিফা চৌধুরী
শোন হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। এই কথাটি বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি চন্ডিদাসের। কবির মর্মস্পর্শী এ বাণীটি আমাদের রক্তে শত শত বছর থেকে প্রবাহিত, আমাদের অতিথি পরায়নতা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পারষ্পরিক আস্থা ও বিশ^াস, পারষ্পরিক সহযোগীতা ও সহনশীলতার ইতিহাস হাজার বছরের। প্রতিটি ধর্মের মানুষ সম মর্যাদা ও নির্ভরতায় এই বাংলায় যুগের পর যুগ বসবাস করে আসছে। একটা মানুষ কিছু সম্পর্ক নিয়ে পৃথিবীতে আসে।

শিশু ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রথমে মা-বাবার সাথে সম্পর্কে, নিরাপদ নিঃস্বার্থ এক আশ্রয় পায়। শুরু হয় শিশুকাল। এখন আগের মতো সব জায়গায় একান্নবর্তী পরিবার বেশি দেখা যায় না, তাই সব শিশুর ক্ষেত্রে দাদা, দাদি, ফুফু চাচার সান্নিধ্য খুব একটা প্রকাশ হয় না। একক কিংবা যৌথ যে ভাবে হউক এর পর সম্পর্কের জায়গা হচ্ছে, স্কুলের বন্ধু শিক্ষক। এই শুরু হল সম্পর্ক, মানুষ সামাজিক জীব চলতে গেলে, সম্পর্কে জড়াতে হবে, বারবার। আর এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে- ডি এইচ লরেন্ত, বলেছেন- ‘জগতে কোন সম্পর্কই স্বার্থহীন নয়, তার মানে বাস্তবতা তাই বলে’ আর এখনকার সময় যেন স্বার্থের ঘড়ি ধরে চলে। নিঃস্বার্থ দান দেখলে আমরা চিন্তায় পড়ি, হয়তো লোকটি সামনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। এই নিয়ে নানান গল্প রচনা করি। মূলত এখনো সমাজে যে কিছু নিঃস্বার্থ সম্পর্ক রচিত হচ্ছে, উপকারের প্ররোচনায়, মানুষে মানুষে সু-সম্পর্ক হবে এটা স্বাভাবিক। এখান থেকে জন্ম নিবে মানবতা, প্রত্যেক ধর্ম বলে, সবার আগে মানুষকে ভালবাস, ভালবাসা এবং শ্রদ্ধার সেতু হচ্ছে একে অন্যে সু-সম্পর্ক।
মানুষ মাত্রই একে অপরের কাছে মানবিক ভ্রতৃত্বের বন্ধনে বাধাঁ। তাই যে কোন দুর্যোগে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অপর প্রান্তের দুঃখী দরিদ্র, নির্যাতিত, নিপীড়িত অসহায়, যন্ত্রণাকাতর শোষিত মুমূর্ষু মানুষের জন্য মনে কষ্ট পায়, বেদনা বোধ হয়, হাহুতাশ করে, সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে একে অপরের প্রতি বিশেষভাবে জানতে সৃষ্টি কূটনৈতিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কই মূলত এক দেশের সাথে অন্য দেশের যোগাযোগ রক্ষা করে। যোগাযোগ করা এবং রক্ষা করার মাধ্যম হল সম্পর্ক। ইদানিং মানুষ ধীরে ধীরে খুব বেশি ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে। এখন ফেসবুকের ফ্রেন্ড কার কত বেশি, অনেক সময় এ নিয়ে চলে প্রতিযোগীতা। পারিবারিক সম্পর্কের বাইরের সব সম্পর্কই বন্ধুত্বে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে পরিবার প্রথা রয়েছে, সেখানে অনেকগুলো সম্পর্ক যুগ যুগ থেকে বিদ্যমান। আর এই রকম পরিবেশে হঠাৎ হউক অথবা ধীরে এখনকার সময় বড় বেমানান। আবার আগে যে যৌথ পরিবার ছিল এখন তা কমে এসেছে।
একক পরিবারে বেড়ে উঠা, শিশু কিশোর, কিংবা যুবক যুবতি, অথবা বয়োজেষ্ঠ্যরা একাকিত্বে ভোগে, ফলে জীবন চলার পথে সাথি খুজঁতে নানান সম্পর্কে জড়ায়। এই ব্যাপার বেশি পরিলক্ষিত হয়, শহর, নগর, মফস্বলে। যেখানে জীবন জীবিকার তাগিদে নিজের পরিচিত গন্ডি ছেড়ে মানুষ অন্যত্র পাড়ি দেয়। তখন সে অন্য জায়গার অন্য পরিবেশে সম্পর্কে জড়ায়, কথা হচ্ছে, সামাজিক জীব হিসেবে সবই ঠিক আছে, বিবেকের ভারসাম্য অনেক সময় হয়তো অনেকে ঠিক রাখতে পারেন না। তখন এই মানুষগুলো পরকীয়া প্রেমের মতো, ঘৃণ্য কাজে চলে যায়, আসে অশান্তি ঘটে অনাকাংকিত ঘটনা। আবার ছোটদের ক্ষেত্রে যেহেতু অপরিচিত পরিবেশ তাই খেলাধূলা করতে গিয়ে কিংবা স্কুলে অনেক খারাপ সঙ্গে পড়ে ঘটে মাদক, ইভটিজিং সহ-নানান দুর্ঘটনা। তবে প্রশ্ন আসতেই পারে তাহলে কি আমরা আমাদের বৃত্ত থেকে বের হব না। গ্লোবাল পৃথিবীতে সারা পৃথিবী নিজের। কিন্তু নিজের মন মানসিকতা কতটুকু প্রস্তুত সবার সাথে মিশতে সেটা আগে ভাবতে হবে। সুস্থ সুন্দর মন মানসিকতা গড়ে তোলার দায়িত্ব নিজ পরিবারের। পরিবারের একে অন্যকে সময় দিতে হবে, মনে রাখতে হবে দূরত্ব সকল সম্পর্ককে ফিকে করে দেয়। এক্ষেত্রে একটা চীনা প্রবাদ আছে, একটি পরিবারকে তুমি এমন ভাবে পরিচালিত করো যেন তুমি খুব সাবধানে একটি ছোট মাছ রান্না করছো।
পারিবারিক শিক্ষায় যদি কেউ শিক্ষিত হতে পারে তবে সে পূর্ণাঙ্গ মানুষ। সঠিক পারিবারিক শিক্ষা বলে দেয় যে কোন সম্পর্কের গন্ডি কতটুকু। যখন একজন ব্যক্তি প্রয়োজন অপ্রয়োজনে কারো সাথে মিশতে যায় বন্ধুত্বে জড়ায়, তখন সে যদি তার এই সম্পর্কের সীমারেখা জানিয়ে আগে থেকে তৈরী রাখে মন। তাই যে, কোন সম্পর্কে জড়িয়ে, যত আপন, হওয়া যায় না কেন, কখনো নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করা হয় না। যেমন, কাউকে মায়ের মতো, খালার মতো মনে হচ্ছে, আবার কাউকে মেয়ে বা বোনের মতো মনে হচ্ছে । মন থেকে বোন, মা, খালা মেনে নিলেও রক্তের বন্ধন সেখানে দৃঢ় নয়। সেখানে এই সম্পর্কেও আদান প্রদান রক্তের বন্ধনের মতো হবেনা। আবার একজন ভাইয়ের মতো ভালোবাসে, তাই বলে তার কাছ থেকে আপন ভাইয়ের মতো ভালোবাসা চাওয়া ভুল। এটাই বাস্তব এটাই চিরসত্য। তেমনি খুব কাছের বন্ধু কিংবা প্রেমিক, প্রেমিকা সব আপন হয় না। তাই কথার যাদুকরি স্পর্শ থেকে সম্পূর্ণ টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যক্তির চারপাশে এক অদৃশ্য দেওয়াল থাকতে হবে, যেখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পর্কের গভীরতা। এই চিন্তা মাথায় রেখে চলার পথে যথ সম্পর্কেই মানুষ জড়াই না কেনো তা ব্যক্তি জীবনে কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
প্রযুক্তি আমাদের অনেক দূর নিয়ে এসেছে। এখন বলা যায় ঘরে ঘরে স্মার্ট ফোন। আর সেই ফোন সেটে ফেসবুক একাউন্ট। এখন উন্নত বিশ^ কিংবা আমাদের দেশের যারা স্বপ্নবাজ, কিছু করতে আগ্রহী, তারা এই ফেসবুক ব্যবহার করে নিজের পরিবারের দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্তিত করছে। সর্বোপরি মনে হয় না বেশির ভাগ ইউটিউব বা ফেসবুক ব্যবহারি সাথে তাদের তুলনা হয়। আমার মনে হয় এ নিছক বিনোদন, আর সময় নষ্ট হওয়ার এক কৌশলী পদ্ধতি। হ্যাঁ এটা সত্য এবং জোর দিয়ে বলবো এই ফেসবুক ব্যবহার করে অনেকের জীবনে সাফল্য এসেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে ফেসবুক। এই মাধ্যম ব্যবহার করে অনেক সফল হচ্ছেন, অনেকে বন্ধু খুজছেন, অনেকে আবার পুরনো বন্ধুদের খুজে পেয়েছেন এর কল্যাণে। আবার অনেকে নতুন বন্ধু পেয়ে নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এক্ষেত্রেও কেউ বন্ধু থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে, বেশ কয়েকটা নিউজ পেপারে দেখলাম বিদেশী মেয়ের সাথে ফেসবুক পরিচয় অতঃপর মেয়ে ছুটে এসেছে এই দেশে, বিয়ে হচ্ছে, এটা এক ধরনের আশা। আবার ফেসবুকে বন্ধু কিংবা প্রেমের সম্পর্ক শেষে প্রতারণা, রূপ নিয়ে ঘটে নানান অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা।
মূলকথা যখনই কোন সম্পর্কে জড়াবে, এর আগে নিজের একে অপরের বিশদ বিষয় জেনে ভেবে সেই ভাবে প্রস্তুত করা, আবেগ আর বাস্তবতা একে অপরের শত্রু। আবেগতাড়িত হয়ে আমরা অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই। আবার কোন ক্ষেত্রে আবেগের বশে, একের প্রতি অপরের চাহিদা পূরণ না হলে বাড়ে কষ্ট আমরা সবার সাথে মিশবো, কথা বলবো। বন্ধুত্ব হবে নতুন সম্পর্কে, কিন্তু তা ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক বন্ধনকে পিছনে ফেলে নয়। চাওয়া, পাওয়ার হিসেব মিলিয়ে সম্পর্কে জড়ালে, সেই সম্পর্ক বেশিদিন টিকে। একজন যতটুকু কাছে আসার সে ততোটুকু কাছে আসবে, হতে পারে ব্যবসায়ীক সম্পর্ক কিংবা চাকুরিরত অফিস কলিগ সব সম্পর্কে একটা দেয়াল লাগে নিজস্ব দেয়াল। কোন আবেগে যা কখনো ভাঙ্গবে না। আবার আপন মনে সেই দেওয়াল ঘেরা বৃত্তে মাঝে মাঝে নিজেকে চক্কর দিয়ে জানতে হয় সব ঠিক আছে তো। সবার সাথে সবার সুন্দর সম্পর্ক বজায় থাকুক, সম্প্রীতি সুসম্পর্কের সমাজ আরও দৃঢ় হউক এই কামনা।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

খাদিমপাড়ার এ হাসপাতালটি করোনা হাসপাতাল নয় : সচিব

        সিলেট এক্সপ্রেস সিলেটের খাদিমপাড়া ৩১...

বালাগঞ্জে প্রবাসীর খড়ের ঘরে আগুন, ‘পূর্ব শত্রুতার জের’

        মো. জিল্লুর রহমান জিলু, বালাগঞ্জ...

সজীব ওয়াজেদ জয় এর জন্মদিনে মহানগর আওয়ামী লীগের শুভেচ্ছা

        ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা,জাতির জনকের দৌহিত্র,সফল...