বৃটেন টু পাকিস্তান- সড়ক পথে গাড়ী ড্রাইভ করে দেশে আসা প্রথম বাঙালি- আমার মামা সৈয়দ আব্দুর রহমান

প্রকাশিত : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০     আপডেট : ৩ সপ্তাহ আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মিলু কাশেম :
আজ থেকে ৫৪ বছর আগে ১৯৬৬ সালে সড়ক পথে নিজের গাড়ী চালিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানে আসা প্রথম ব্যক্তি একজন গর্বিত বাঙালী এবং তিনি আমাদের সিলেটের কৃতি সন্তান আমাঙর মামা সৈয়দ আব্দুর রহমান।
তখনকার সময়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে হাজার হাজার মাইল অতিক্রম করে দূর্গম সড়ক পথে নিজে
গাড়ী চালিয়ে পাক ভারত উপমহাদেশে আসাটা ছিল
অবিশ্বাস্য কল্পনাতীত।তখন ইউরোপের শেষ সীমান্ত
তুরস্কের ইস্তাম্বুলের পরে না ছিল ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না ছিল রাস্তা ঘাট।পাহাড় জঙ্গল দূর্গম রাস্তা দিয়ে চলাচল করা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে প্রায় তিন মাসে পাকিস্তান
পৌছেছিলেন সৈয়দ আব্দুর রহমান।তিনি যেদিন
আফগানিস্তানের তুরখান সীমান্ত দিয়ে খাইবার পাস
হয়ে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন
তার পর দিন সেখানকার সংবাদপত্রে সচিত্র প্রতিবেদন
বের হয়েছিল প্রথম কোন পাকিস্তানির গাড়ী চালিয়ে
বৃটেন থেকে পাকিস্তান আসার বিষয়টি নিয়ে।কারন এর আগে কেউ পাক ভারতে এ ভাবে গাড়ী চালিয়ে আসেনি।সৈয়দ আব্দুর রহমান ছিলেন প্রথম ব্যক্তি প্রথম পাকিস্তনি বাঙালি।
এডভ্যাঞ্চার প্রিয় সাহসী এই মানুষটির জন্ম ১৯৩১ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমার জগন্নাথপুর থানার ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে।তার বাবার নাম সৈয়দ শমসেদ আলী।কিশোর বয়স থেকেই
তিনি দূরান্ত প্রকৃতির গান বাজনা খেলাধুলো হৈ চৈ করে তার সময় কাটতো।ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সাহসী এডভাঞ্চার প্রিয় মানুষ।তাই সাধারন বৈষয়িক কাজকর্মে তার মন বসতো না।যে কারনে
বাবা সহ পরিবারের লোকজনের নানা কথা শুনতে হতো।তার এই বাউলিপনার কারনে তার চাচাতো ভাই এবং ভগ্নিপতি সৈয়দ রাছ উদ্দিন আহমদ (আমার বাব)তাকে বিলেতে পাঠানোর উদ্যোগ নেন।অবশেষে
১৯৫৭ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি বিলেতের পথে ঢাকা ত্যাগ করেন।করাচি হয়ে দুই দিন পর লন্ডন পৌছেন। বিলেতে তিনি আবাস গড়েন বার্মিংহামের কাছাকাছি
কিডিরমিনিস্টার নামক একটি ছোট শহরে। সেখানে আগে থেকেই তার আত্মীয় স্বজন বসবাস করতেন। বিলেতে তার কর্মজীবন শুরু হয় স্টার ফোর্ড নামক একটি স্টিল ফ্যাক্টরিতে।তার উইলসন নামক আরেকটি স্টিল ফ্যাক্টরি তে।পরবর্তীতে ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলে এক চাচার সাথে শুরু করেন গাড়ীতে করে
ফিস এন্ড চিপস বিক্রির ব্যবসা।তার একদিন পত্রিকায়
বিজ্ঞাপন দেখে বৃটিশ রেলওয়েতে টিকেট কালেক্টর
পদে চাকুরীর জন্য দরখাস্ত করেন।তখন তিনি ভালো
ইংরেজী জানতেন না তবে তার স্মার্টনেস আর হ্যান্ডসাম চেহারার কারনে তার চাকুরী হয়ে যায়।প্রায় দুই বছর তিনি রেলওয়েতে চাকুরী করেন।
১৯৬০ সালে তিনি তার ছোট ভাই সৈয়দ আতাউর রহমানকে বিলেতে নিয়ে যান।তখন তার এক চাচা
ওস্তার আলীর পরামর্শে তার সাথে পার্টনারশিপে পোলট্রি ব্যবসা শুরু করেন।পরে চাচার পরামর্শে গাড়ী চালানো শেখা শুরু করেন।ড্রাইভিং শিখতে চলে আয়ারল্যান্ডে।
১৯৬৪ সালে বৃহৎ পরিসরে শুরু করেন পোলট্রি ব্যবসা।
সারা ব্রিটেনের বড় শহরে হোলসেল সাপ্লাই দিতেন জ্যান্ত মোরগ। এই ব্যবসায় তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা বৃটেন।এক সময় জীবিত মোরগ সাপ্লাইয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয় সাপ্লাই বন্ধে নোটিশ দেয় সরকার মামলা হয় তার উপরে।পরবর্তীতে আদালতে ক্ষমা চেয়ে হালাল ভাবে মোরগ জবাই করে সাপ্লাই দেয়ার অনুমতি চেয়ে আইনী লড়াই শুরু করে বিজয়ী হন। তিনিই বৃটেন প্রথম হালাল ভাবে জবাই করে মোরগ
ব্যবসা শুরু করেন। যা ইতোমধ্যে বিবিসি’র নির্মিত একটি তথ্যচিত্রে সেই কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।তার এই ব্যবসা ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।
ব্যবসার সাফল্যের পাশাপাশি এডভাঞ্চার প্রিয় এই
মানুষের সখ জাগে গাড়ী চালিয়ে দেশে যাওয়া যায়
কি না। এ ব্যাপারে তিনি খোজ খবর নিতে শুরু করেন।
এ ব্যাপারে তার কিছু পাঠান পাঞ্জাবি বন্ধু সহযোগিতা করেন।কাউকে না জানিয়ে তিনি প্রস্তুতি শুরু করেন
সেই উদ্দেশ্যে কিনেন একটি নতুন ল্যান্ড রোভার জীপ।
অবশেষে ১৯৬৬ সালের ২৬ নভেম্বর বিলেতের
বার্মিংহামের নিকটবর্তী কিডিরমিনিস্টার শহর থেকে
আরও তিন জন সহযাত্রী নিয়ে জন্মভূমি পাকিস্তানের
উদ্দেশ্যে সড়ক পথে গাড়ী যাত্রা শুরু করেন।তার সহযাত্রীরা ছিলেন পাকিস্তানের ইসলামাবাদের বাসিন্দা তার বন্ধু ইকবাল খান,তার মামা ওয়াসিল খান এবং তার গ্রামের বন্ধু শাহিদ আলী।
বার্মিংহাম থেকে রওয়ানা হয় ব্রিটের ডুবর বন্দর থেকে
ফেরী জাহাজে আসেন ফ্রান্সের কালিজ বন্দর।
তারপর সড়ক পথে বেলজিয়াম হয়ে প্রথমেই থামলেন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট। কয়েক দিন থাকলেন জার্মানিতে।
আবার শুরু হলো যাত্রা একে একে পাড়ি দিলেন অস্ট্রিয়া যুগেশ্লাভিয়া বুলগেরিয়া তুরস্ক। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে শেষ হয়ে গেল ইউরোপের সীমানা।তার পর ইরান আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান। ইরান থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত রাস্তা খুব খারাপ এবং দূর্গম ছিল।তাই
গাড়ী ড্রাইভ করা সহজ ছিল না।অনেক জায়গায় নিজেরা মাটি ফেলে রাস্তা ঠিক করতে হয়েছে। পাহাড়ী পথ জংগল পরিস্কার করে গাড়ী চলাচলের পথ করেছেন।কোন কোন জায়গায় তাবুতে কাটিয়েছে কয়েক দিন রাত।মোট ২৭ দিন ড্রাইভ করে পথে বিশ্রাম নিয়ে ঘুরাঘুরি করে আফগানিস্তানের তুরখান সীমান্ত
দিয়ে খাইবার পাস দিয়ে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে
পৌছেন।তার পর ইসলামাবাদে ১৮ দিন এবং করাচিতে কাটে ১৪ দিন।চেষ্টা করেছিলেন ভারত হয়ে গাড়ী চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসা।কিন্তু ১৯৬৫ সালে পাক
ভারত যুদ্ধের কারনে ভারত সরকার অনুমতি না দেয়ায়
করাচি বন্দর জাহাজে চড়ে গাড়ী নিয়ে ৭ দিনে পৌছেন
চট্রগ্রাম বন্দরে। তারপর ৩ দিন পরে গাড়ী খালাস হয়
পোর্ট থেকে।অবশেষে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসের জার্নি শেষে বিজয়ীর বেশে সৈয়দ আব্দুর রহমান এসে পৌছেন সিলেটে।তখন তার গ্রামের বাড়ী সৈয়দ পুরে যাবার তেমন কোন রাস্তা ছিল না।ধানের জমির
উপর দিয়ে শুকনো নদী খাল পেরিয়ে বহু কষ্টে তার
ল্যান্ড রোভার অবশেষে পৌছে তার গ্রাম সৈয়দ পুরে।
রাস্তায় বিভিন্ন গ্রামে শত শত মানুষ তাকে অভিনন্দন জানায়।অনেক মানুষ গাড়ীর পেছনে পেছনে আসে তাকে এক নজর দেখার জন্য।তা ছিল এক অভাবনীয় দৃশ্য।
কিংবদন্তি এই মানুষ সৈয়দ আব্দুর রহমান ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক।সে সময় বার্মিংহামে অন্যান্যদের সাথে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ার লক্ষে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন।তিনি সহ তারা কয়েক জন সেই সময়
বার্মিংহামের লকেল এম পি কে সাথে নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলার জন্য লন্ডন হাউস অব কমন্স গিয়েছিলেন।হাউস অব কমন্সে সেটাই ছিল
বাংলাদেশের পক্ষে গমনকারী প্রথম প্রতিনিধি দল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তিনি প্রবাসীদের নিয়ে
দেশের জন্য নানা ভাবে কাজ করেছেন।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী সৈয়দ আব্দুর রহমান এক জন সফল মানুষ। তিনি এখন সিলেট শহরের শাহী ঈদগাহ এলাকার তার নিজ বাস ভবন
সৈয়দপুর হাউসে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।
গত কয়েক বছর আগে বিবিসি টেলিভিশনের তথ্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল প্লেন কার” ভুটান টু বাংলা”তথ্যচিত্রে
সৈয়দ আব্দুর রহমানের বিলেতে প্রথম হালাল পোলট্রি
ব্যবসা প্রথম গাড়ী ড্রাইভ করে দেশে আসা সহ তার
জীবনের নানা কাহিনী তুলে ধরেছেন।
সিলেটের এই কৃতি মানুষটি এখন অনেকটা ভয়সের ভারে ন্যুব্জ। নানা শারিরিক সমস্যায় জর্জরিত। তার পরও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর মানুষটির স্মৃতিশক্তি এখনও প্রখর।বাংলা ইংরেজীতে অনর্গল বর্ণনা করে যেতে পারেন জীবনের নানা ঘটনা।আমরা তার সুস্থ
সবল দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।সবাই আমার মামা
সৈয়দ আব্দুর রহমানের জন্য দোয়া করবেন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

শ্রীমঙ্গলে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ডাকাতি মামলার আসামি নিহত

         মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় র‌্যাবের সঙ্গে...

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মমিনুর রশিদ সুজন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : সড়ক...

বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সিলেট জেলা বিএনপির দোয়া মাহফিল

         বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এর ৪০তম...

আমাদের পুলিশ বাহিনী

         মোহাম্মদ আব্দুল হক: বাংলাদেশের সরকারি...