বিয়ে

প্রকাশিত : ০৫ অক্টোবর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  
জিন্নিয়া সুলতানা:
আজ জুলির বিয়ে।
তেমন ঘটা করে অনুষ্ঠান করা না হলেও বাসায়ই মোটামুটি ভাবে অনুষ্ঠান হচ্ছে।
জুলিকে পার্লারে সাজানো হয়নি,সে নিজ হাতেই কনে সেজেছে।
এমনটা নয় যে সে বিয়ের খুশিতে আত্মহারা হয়ে নিজ হাতে সেজেছে;
সে মনে করে কোরবানীর গরুকে সুদৃশ্য করতে টাকা খরচ করতে হয় না,এক রকম করলেই হয়, আসল তো হচ্ছে ইচ্ছেটা।
জুলি পুতুলের মতো তার নিজের খাটে বসে আছে,মুখে এক ধরণের অদ্ভুত হাসি নিয়ে।
কে বলবে এই মেয়েটি ভেতরে ভেতরে এত ভাঙছে! কাঁচের গ্লাসকে হাত থেকে ছেড়ে দিলে যেমন ভাঙ্গে ঠিক তেমনি।
মা বলেছেন, “মেয়েদের সব মেনে নিতে হয়।
জনম জনম এভাবেই চলে এসেছে।”
তাই কোনো মতেই বুঝানো যাবেনা আসলে তোমারো কিছু চাওয়ার থাকতে পারে।
মা এখানে এসে মাঝে মাঝে দেখে যাচ্ছেন জুলিকে,আর ভাবীরা তো যে যা পারছে মুখে বলতে ছাড়ছেনা।
আরে জুলি!
কি মেয়েরে বাবা,আমাদেরকে সাজাতেই দিলো না,নিজ হাতে কনে সেজে বসে আছে!
আমাদের ননদের শখ আছে বটে।
জুলির হঠাৎ চোখ পড়লো জানলায়।
দূরে ডালিম গাছটা কেমন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।
এই গাছটায় একদিন একটা পাখি এসে বসতো। জুলি তাকে নাম দিয়েছিল বাবুই পাখি- যদিও পাখিটা বাবুই ছিলনা।
তার কেন জানি এ নামেই পাখিটাকে ডাকতে ইচ্ছে হতো।
ছোট্ট সে পাখি।
সকাল বিকেল তার কি যে ডাকাডাকি!
মনে হতো ঠিক জুলির জন্যেই তার জন্ম হয়েছে।
অথচ আজ আর নেই, কিছুই নেই।
এখানে ওখানে কিছুই নেই,সেই হাসি নেই, সেই স্বপ্ন নেই,সেই গান নেই,সেই অপেক্ষাও নেই।
জুলির বুক যেন হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো,গা গুলিয়ে বমি আসতে চাইলো।
না, তাকে ভেঙে পড়লে চলবেনা।
গ্লাসে রাখা পানিটা ঢুক ঢুক করে গিলে আবার সে বসে রইলো।
আজ তার বাবাকে খুব মনে পড়ছে ,বাবা থাকলেও আজ নিশ্চয়ই মায়ের মতন খুশি হতেন।
ছোট বেলা একদিন খুব জ্বর হয়েছিল জুলির।
বাবা সারা রাত জেগে বসে থাকলেন,
সকালে যখন বললেন “মা তোর জন্যে কি আনবো,কি খাবি তুই?”
জুলি চোখ খুলে বলেছিল-
“বাবা আমার একটা সাদা রঙের ঘোড়া চাই।”
বাবার সে কি হাসি, বললেন- “দেখো পাগল মেয়ের কি কথা!
তবে যাই বলিস রে মা,
একদিন আমি ঠিকই তোকে একটা সাদা রঙের ঘোড়া এনে দেবো, ঘোড়ার পিঠে থাকবে টগবগে তরুণ এক রাজকুমার।
আমি কি আমার রাজকন্যার কথা না রেখে পারি!”
দেয়ালে টানানো ছবিটায় বাবার মুখ আজও জীবন্ত।
এবার জুলির দুচোখ আর কোনো বাধা মানলো না, টপটপ করে নীরবেই অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
জুলি আনমনেই বলতে শুরু করলো,
আচ্ছা বাবা,তোমার সেই রাজকুমার কি আমায় বলতো সব ছেড়ে চলে যেতে?
যেখানে গুটি গুটি পায়ে আমি হাঁটতে শিখেছি,যেখানে আমার প্রথম কথা বলতে শেখা। কিশোরীর চঞ্চল পাগলামী, এটা ওটা কত রঙিন স্বপ্ন!
দিন শেষে যে মায়ের কোলে আমি পরম শান্তিতে ঘুমাতে যেতাম।
এই সব,সব কিছুই?
হঠাৎ মোবাইলের রিংটোন জুলিকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনলো।
রুপা কল দিয়েছে, কিন্তু কলটা রিসিভ করতে ইচ্ছে করছেনা তার।
আজ সবাই যেখানে ভাবছে রুপা জুলির এত কাছের বন্ধু হয়েও কেন বিয়েতে আসলো না; সেখানে জুলি ই জানে কেন রুপা আসেনি।
রুপা আসলে এই চিত্রনাট্যটা এখানে হতো না।
এই যে জুলি সকাল থেকে পুতুলবউ সেজে আছে। চোখে মুখে এত আনন্দ নিয়ে, দৃশ্যমান এত খুশি নিয়ে।এমনটা পারতো না।
পুরোনো কথাগুলো জুলির মনে পড়ছে খুব,
সেই ছোট বেলায় একদিন স্কুলে বসে একা একা কাদছিল জুলি।
হঠাৎ কাধে হাত রাখলো কেউ, চোখ ফিরিয়ে দেখতেই মেয়েটা বললো- “কি রে পিচ্চি কাদছিস কেন?”
জুলির ঠিক তখনই খুব হাসি পেলো,
কারণ ওই পরীর মতন দেখতে মেয়েটা আসলে জুলির চেয়েও আরো ছোট ছিল।
অথচ তার সে কি পাকা পাকা কথা!
হ্যাঁ, সেই মেয়েটাই রুপা।
একমাত্র মেয়ে যে আজও জুলির কাধে হাত রেখে বুঝে নিতে পারে তার ভেতরে কি ঝড় বয়,
আজও সে এই চোখে তাকিয়ে বলে দিতে পারে কখন খুব আনন্দে হাসি আসে,আর কখন স্বপ্ন ভাঙ্গার খুব যন্ত্রণায়।
কল রিসিভ না করাতে মোবাইলে একটা মেসেজ আসলো-
“জুলি, রুমের জানালা বন্ধ করে দে, বারবার ডালিম গাছে ফিরে তাকাবিনা, বাবুই পাখিটা আর আসবে না। ওটা তোর ভ্রম ছিল।”
কি অদ্ভুত দূরে থেকেও মেয়েটা বুঝতে পারছে আমি কি করছি! – জুলি ভাবছে।
তবে এই প্রথম মনে হয় রুপা কোনো ভুল কথা বললো।
ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন ভ্রম হতে পারে, তবে স্বজ্ঞানে দেখা স্বপ্ন কখনই ভ্রম হয়না, হতেই পারেনা।
বাইরে বেশ শোরগোল শোনা যাচ্ছে,
বর এসেছে, বর এসেছে!
হ্যাঁ, আজকের এই বর নাকি বলে দিয়েছে : বিয়ের পর কোনো আদিখ্যেতা দেখানো যাবেনা বাপের বাড়ির কারো সাথে।
কি সহজ ভাবেই বলে দিলো তাইনা!
অথচ সে কি একবারও ভেবে দেখেছে-
এতটা বছর এখানেই আমার সব ছিল, যত হাসি কান্না ব্যথা বেদনা স্বপন সব!
জুলির নিজেকে একটা খেলার পুতুলের মতন মনে হচ্ছে।
কিছুদিন এখানে কিছু দিন ওখানে যে যার খুশি মতন খেললো।
অথচ মানুষ হিসেবে তার বুকে কত স্বপ্ন ছিল!
জীবনটাকে ভেঙে গড়ে সাজানোর ইচ্ছে ছিল।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে,
জুলির মা ভাবি সহ
সবাই তাকে বিদায় বেলা এগিয়ে দিচ্ছে।
জুলি কেমন যেন একটা অবিশ্বাস্য কোনো জগতে পা রাখছে।
তাকে একা ফেলে রেখে পরিচিত সব কিছু পেছনে ফিরে  যাচ্ছে, সব।
এ যেন সাজানো গুছানো কোনো লাশের অনানুষ্ঠানিক শবযাত্রা।
পেছনে ফেলে যাচ্ছে সে – ২৫ বছরের পুরোনো ঠিকানা, চিরচেনা তার ঘর, সব কাছের মানুষ, জন্মের সেই ঋণ, এমন কি নিজের নাম পরিচয়টাও….

আরও পড়ুন