বিবাহ বিচ্ছেদ ও ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’

প্রকাশিত : ০১ জুলাই, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

মোহাম্মদ আব্দুল হক: ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।’ এ হলো বাঙালির চিরন্তনতা। আমাদের সমাজে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। তাই বলে আমরা বাঙালি সেটা ভুলবো কেনো? বৃটিশরা প্রায় দুইশত বছর এখানে ছিলো। কে বলতে পারেন, তারা তাদের সংস্কৃতি ও প্রথা ঝেড়ে ফেলেছে। অথচ এখন এই আমাদের জন্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ও পরিবারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফাটল এক ভয়াবয় চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে।
‘বিবাহ বিচ্ছেদ’ এই শব্দ দুটির সাথে অত্যন্ত নির্দয় দুটি শব্দ লেখাপড়া জানা মানুষের মাঝে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশেছে, তা হলো ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’। এই ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’ ইংলিশ শব্দদ্বয় বাংলা ভাষার মানুষের কাছে আরো অনেক বিদেশি শব্দের মতোই একটু আগেই অর্থ বোধগম্য হয় এবং এভাবেই এর গুরুত্ব ফুটে উঠে। একটি মেয়ে ও একটি ছেলেতে নানান স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে নতুন এক জীবন শুরু হয় বৈবাহিক চুক্তিতে। ওই চুক্তি আদালতকক্ষে হোক কিংবা কাজীকক্ষে। বিয়েতো হলো। তবে পরবর্তী জীবনে আদালত বা কাজী সাহেবদের বিশেষ কাজ আর থাকে না। নর-নারী মিলে দাম্পত্য জীবন চলে। যুগল জীবনে পরিবারের আরাধনার ধন সন্তান আসে মা-বাবার কোলজুড়ে। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা, ফুফু মামা, খালাদের মনে আনন্দের জোয়ার বয়। জীবন চলতে থাকে। নতুন মানুষকে নিয়ে মা-বাবা স্বপ্নময় রঙিন জাল বুনন করে। এখানে কাজী বা আদালত আড়ালেই থাকে। হ্যাঁ, বৈবাহিক যে চুক্তির দ্বারা দুটি নর-নারী যুগলবন্ধী হয়ে জীবন শুরু করলো, যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কিত জীবন মধুর মিলনের বদলে বিষাক্ত হয়ে ওঠে তবে আদালতে এই যুগলবন্ধী দশা কাটাকাটি হয় চূড়ান্তভাবে আইনি সকল পদক্ষেপের মাধ্যমে। এই হলো বিবাহ বিচ্ছেদ। আর বিবাহের দ্বারা শুরু করা নতুন পরিবারটি গেলো ভেঙে। আশাকরি ব্রোকেন ফ্যামিলির মোটামুটি একটা কনসেপ্ট আমরা পেয়েছি। এই নর আর নারী মিলে যে পরিবার, সেটির সেতুবন্ধন হলো বিবাহ বিচ্ছেদ পূর্ব সময়কালীন দুজনার ভালোবাসাবাসি আর তাদের সন্তান। বিচ্ছেদ হলো অর্থাৎ পরিবারটি ভেঙে গেলো। এখন আর ওই নর-নারী একসাথে নেই। এটিই ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’ যা আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে আছে।

শুধুমাত্র লেখার স্বার্থে শব্দের পরে শব্দ আর বাক্যের পরে বাক্য জুড়ে দিয়ে দীর্ঘ এক নিবন্ধ দাঁড় করিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি আলোচ্য বিষয়ের কলামের সাথে বেমানান হবে। আমরা জানি পরিবারের সংজ্ঞা। খুব ছোটোবেলা শিখেছি এবং দেখেছি বাবা-মা ছাড়াও পরিবারে দাদা-দাদি, চাচা-চাচী এবং অতি আদরণীয় ফুফুদের প্রানোচ্ছল জীবনাচার। তাই মা ও বাবার মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হলে সেখানে অতি ঘনিষ্ট স্বজন হিসাবে পরিবারের যে কেউ এগিয়ে এসে জ্ঞান নির্ভর মেধা খাটিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে পেরেছেন পরিস্থিতি খুব খারাপ হওয়ার আগেই। এমনকি মা – বাবার রাগের শিকার ছেলে-মেয়েরা তাৎক্ষণিক পরম মমতার কোল খুঁজে পেতো দাদা, দাদি ও ফুফুদের মাঝে। এখনকার পরিবারে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। আমরা দেখি, বিয়ে নামক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার পর এখনকার দম্পতিরা নিজেদের স্বার্থচিন্তায় এতোটাই মশগুল থাকেন, বউ আর শ্বশুরকুলের কাউকে নিয়ে একত্র থাকতে চান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্ত্রীর ইচ্ছায় এক বাসায় শ্বশুর – শাশুড়ি দূরের কথা ননদ, দেবর বা তাদের সন্তানেরা প্রাণ খুলে ঢুকতে পারে না। ফল যা হবার তাই হয়। মানুষ মাত্রেই স্বামী – স্ত্রীতে মাঝে মাঝে ভুল বুঝাবুঝি হয় এবং তা বাড়তে থাকে। এটা চলতে থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর। এক সময় ছাড়াছাড়ি। এই হলো ব্রোকেন এক ফ্যামিলি। এর প্রভাবে সন্তানরা অনেক দামি খেলনা, দামি পোশাক, রেফ্রিজারেটরে ঠাশা দামি খাবার বেস্টিত হয়ে ঘরে থাকলেও দিনে দিনে মা-বাবার নিষ্ঠুর আচরণ দেখতে দেখতে ও আদর বঞ্চিত হয়ে মানসিক চাপ নিয়ে অনেকটা নিষ্ঠুর গড়নে বেড়ে ওঠে। কারণ, মা-বাবার নিষ্ঠুর খেলা চলতে থাকে এবং শিশুরা বিকল্প আদরের কোল দাদি বা ফুফুকে পায় না। ফুফু বা চাচা বা খালা বাসায় ভিড়তে না পেরে বাচ্চাদের সাথেও তাদের দূরত্ব বাড়ে। এমতাবস্থায় আদরের ভাতিজা বা ভাতিজি চাচা বা ফুফুদের কাছেও মনের কথা বলতে পারছে না। তারা আর কাউকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না। দিনে দিনে ওইসব সন্তানের কাছে জীবন এক নিষ্ঠুর খেলা মনে হয়। ওদের মধ্যে মায়া মরে যায়।

মূল কথা বলা হয়েছে। এখন আমাদেরকে ভাবতে হবে। ঘর কি, পরিবার কি একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে জানতে হবে। প্রকৃতির মায়ায় গড়ে ওঠা আর পরিবার ও সমাজকে আপন করে নেয়া সুনামগঞ্জের শ্রদ্ধাভাজন কবি মুনমুন চৌধুরী বলেন, “ঘর মানে কি? /
দামী আসবাব আর দেয়ালে /
রং দিয়ে আকাঁআকিঁ, /
ঘর হলো- /
সবাইকে নিয়ে /
এক সাথে থাকাথাকি।” আমি দেখেছি অনেকে ঘর ভেঙে গেলে পরে যখন সাবেক স্বামী কিংবা স্ত্রীর কেউ একজন নিশ্চয় হুঁশে ফিরেন এবং তখন যদি পুনরায় মিলতে চায়, আত্মীয় স্বজন অনেকেই সেটা মেনে নিতে চান না। তারা আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে রেখে প্রতিশোধ নিতে চান, যা কখনও উচিত নয়। বরং একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার যখন ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয় তখন অন্যান্য আত্মীয়রা দুষ্ট চিন্তা না করে ওদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়াই মানবিকতা। মনে থাকে যেনো রাগের পর্বে ঘটে যাওয়া অঘটন শয়তানি প্রভাবের দ্বারা। আর স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গড়ার কাজে সহযোগিতা না করে ভাঙার গানে ব্যান্ড বাজানো ‘মানুষ শয়তান’ এর কাজ। আসুন সতর্ক হই। ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে মেয়েরা একটু বেশি মাত্রায় হতাশাগ্রস্থ হয় এবং এদের সাথে দাম্পত্য জীবন বেশি মাত্রায় অশান্তির হয়। ব্যতিক্রমতো আছেই। কাজেই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে মা-বাবাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একা থাকা নয়; বরং সবাইকে নিয়ে থাকি। বিবাহ বিচ্ছেদ বা ব্রোকেন ফ্যামিলি নয় ; বরং সয়ে সয়ে সাজাই আর থাকি সংসারে।।
লেখক কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণ হওয়ায় কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : সিলেটের ঐতিহ্যবাহী...

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

ডাঃ মোঃ নিজাম উদ্দিন আস্সালামু...

ঈদ ও শ্রেণী বৈষম্য

মো. নাসির উদ্দিন শাওয়াল মাসের...