বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের অন্যতম উপাদান হচ্ছে সুন্দর করে কথা বলা

প্রকাশিত : ১৪ জুলাই, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: মানুষের প্রকাশ করার প্রবনতা সবচেয়ে বেশি। নিজেকে প্রকাশ করতে কে না চায়।সবাই চায় নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে। বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের একটি অন্যতম উপাদান হচ্ছে সুন্দর করে কথা বলা, ভাব প্রকাশে সৌন্দর্য্য। এই কাজ খুব কঠিন কিছু নয়। সুন্দর কথা বলার জন্য নিজের চেষ্টা আর সামান্য কিছু গাইডলাইনই যথেষ্ট। অনেকেই আছেন খুব সুন্দর মনের মানুষ, দেখতেও অনেক সুন্দর কিন্তু তিনি ভাল কথা বললেও যিনি শুনছেন তাঁর রাগ উঠে যায়। নিজেকে নিজে তিনি বোঝাতে পারেন না যে কী করবেন! তাই তাঁর সব কিছুতেই অস্থির লাগে। মন ভাল হলেও তিনি ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিতি পান না। কিংবা সমাজে তার নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে হয়। বন্ধু মহলে কেউ তাকে জায়গা দেন না। শুধুমাত্র কিভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয় সেটা না জানার জন্যে।

প্রখ্যাত দার্শনিক এ্যরিস্টটল বলেছিলেন ঘুষের চেয়ে সুন্দর মুখের কদর অনেক বেশি। কিন্তু সেই সুন্দর মুখের বুলি যদি হয় তিক্ত তাহলে জয়ের পরিবর্তে বিপর্যয়ই নেমে আসবে।ভাবতে পারেন, কথা বলা—এ আর এমন কী! কিন্তু জেনে রাখুন, শুধু সুন্দর করে কথা বলার গুণ আপনার ক্যারিয়ারকে নিয়ে যেতে পারে অনন্য উচ্চতায়। শিক্ষকের সঙ্গে, ব্যবসায়িক বা কোনো উদ্ভাবনী ভাবনা উপস্থাপনের সময়, এমনকি করপোরেট দুনিয়ায় বুদ্ধিদীপ্ত কথা আপনার লক্ষ্য অর্জন অনেক সহজ করে দিতে পারে। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের তথ্যমতে, যাঁরা পেশাজীবনে প্রাঞ্জলভাবে কথা বলেন, তাঁদের সাফল্য আসে দ্রুত। আবার কথা বলা কিন্তু একটি শিল্পও বটে। সাবলীল কথা বলার গুণ চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করা যায়। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা শুধু সুন্দর কথার মাধ্যমেই অনেক সমস্যার সমাধান নিমিষেই করে ফেলেন।
সুন্দর করে কথা বলা সত্যিই একটা আর্ট। স্মার্টনেস এর প্রথম শর্ত। অনেকেই অনেক ভাবে ট্রাই করে সুন্দর কথা বলার চেষ্টা করেছেন কিন্তু সেই চেষ্টাকে সবাই হাসির খোরাক বানিয়ে ফেলেছেন। তিনি সুন্দর কথা বলতে চেষ্টা করায়ও সমাজে বাঁকা চোখের শিকার। আসুন দেখি খুব স্বাভাবিক কিছু নিয়মে সুন্দর কথা বলার চর্চা করি।

নিজেকে নিয়ে কিছু এনালাইসিস করুন। আপনি কেমন কথা বলছেন? কিভাবে শুরু করছেন? কাকে কী বলছেন ইত্যাদি। এর সাথে আপনার শারীরিক স্ট্রাকচার কতটা বোল্ড নাকি নরমাল নাকি আরো খারাপ? কন্ঠটা কি বেশি উৎকট নাকি নরমাল নাকি খুবই মিষ্টি? আপনার নলেজ কেমন? এসব এনালাইসিস একটা কাগজে লিখে রাখলেই ভাল। চর্চা করার সময় কাজে আসবে। তবে আপনার স্মৃতিশক্তি ভাল হলে মনে রাখতে পারেন। সুন্দর করে কথা বলার ক্ষেত্রে এই বিষয় মাথায় রাখা জরুরী।

আপনার যা সামর্থ্য আছে তাতেই শুরু করুন। এনালাইসিস করার পর দেখা গেছে আপনার খুবই খারাপ অবস্থা! কিন্তু তাতে কি? আপনি কি শুরু করবেন না? অবশ্যই করবেন। মনে রাখবেন সুন্দর করে কথা বলা পুরটাই চর্চার উপর নির্ভরশীল।চর্চা শুরুর পর নিচের বিষয়গুলিতে জোর দিন। মনে রাখবেন এর কোনটাই মিস করা যাবে না।

আগে শুনুনঃ কোন একটা আলোচনায় যোগ দিলে আগে শুনুন কে কী বলছে। এটা সব সময় সম্ভব নয়, কারন আপনি যদি সঞ্চালক হন তবে আপনাকেই আগে কিছু বলতে হবে। সেক্ষেত্রে মুল টপিক টি বলে সবার সবিনয় দৃষ্টি আকর্ষন করে শুনতে থাকুন। কিছু লিখে রাখুন। যা লিখবেন তাতে রেফারেন্স সহ লিখবেন- যেমন কে বলেছেন, কিজন্যে বলেছেন ইত্যাদি। কে কিভাবে কথা বলছেন সেটাও খেয়াল করুন। যিনি সুন্দর করে কথা বলছেন তাকে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তিনি হয়ত আপনার থেকে অনেক জানেন, তাতে কি। আপনিও একসময় জানবেন। ফলো করুন আর মনে মনে ভাবুন কিভাবে নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন করবেন।

সুস্পষ্ট মতামত প্রয়োগঃ যথাসময়ে একটি স্পষ্ট মত প্রয়োগ করুন। এমন ভাবে বলবেন না যেন কেউ আপনার কথায় বিব্রত হয়। অন্যের কথার মাঝে কথা বলবেন না। যদি বলতে হয় তবে ভদ্রভাবে বলুন-মাফ করবেন অথবা এক্সকিউজ মী। তারপরে বলুন যে উনার কথাটায় আপনি কি যুক্ত করতে চাচ্ছেন।

আত্মবিশ্বাসের সাথে বলুনঃ যা বলবেন আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলুন। দ্বিধা নিয়ে কিছু বলা উচিত নয়। কেউ যদি প্রশ্ন করে যে কেন আপনি এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছেন, সাথে সাথে সুন্দর ব্যাখ্যা দিন। এবং তাকে এই জন্য একটা ধন্যবাদ জানান।

পরিবেশ পরিস্থিতির দিকে খেয়াল করে বলুনঃ একটা আলোচনায় অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট পরিবেশ পরিস্থিতি থাকে না। চেঞ্জ হয়। কখনো হাসির সময় আসে কখনো খুব সিরিয়াস সময় আসে। অনেক সময় গম্ভীর একটা সিচুয়েশন দেখা যায়। সব সিচুয়েশনে সব কথা মানাবে না। নির্দিষ্ট সময়ে সময়োপযোগী কমেন্ট করুন।

টপিকের দিকে খেয়াল রাখুনঃ অনেকেই আছেন কথা বলা শুরু করেছেন, মাঝে একটা উদাহরন দিতে গেলেন, উদাহরনের মাঝে সুন্দর একটা গল্প কৌতুক শুরু করে দিলেন। আর আসল টপিক ভুলে গেলেন। গল্প শেষে নির্লজ্জের মতো হাসি দিয়ে বললেন- আমি কোথায় যেন ছিলাম? এসব মানুষের কথায় উপস্থিত সকলের কঠিন বিরক্তি হয়। রাগ হয়। পরের বার আর শুনতে চান না কেউই। সবাই নিশ্চয় তাদের মুল্যবান সময় সেই ব্যাক্তির গল্প শুনতে নষ্ট করবেন না?তাই টপিকের দিকে মনোযোগ দিন। যদি এমন হয় তবে লিখে রাখুন। কাগজে লিখে তবেই গল্প উদাহরন যা দেবার দিন। এতে আপনার মনে থাকবে আপনি সত্যিই কোথায় ছিলেন। অফ টপিক সব সময় বলা যায় না। সিচুয়েশন দেখে বলুন।

কথার মাঝে দাঁড়ি কমা সেমিকোলনের সময় নিনঃ কথা শুধু রেলগাড়ির মত বলে যাবেন না। আবার ষ্টেশনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার মত বিশ্রামও নিবেন না। দাঁড়ি কমা কিংবা বিরাম এর সময় নিন। যাতে বুঝতে সুবিধা হয়।

চলিত ভাষায় বলুনঃ যে ভাষা সবাই বুঝে সে ভাষায় বলুন। আঞ্চলিক ভাষা পরিহার করুন। ইংরেজী কথায় কথায় না বলাই ভাল। যাঁরা ইংরেজী বলে পন্ডিত সাজতে চান তারা হাসির খোরাক হন। কোন উদ্ধৃতি ইংরেজীতেই যদি হয় সেটা বলা যেতে পারে। তবে ইন্টারন্যাশনাল কনভার্সেশনে তো পুরাটাই ইংরেজীতে বলবেন। সেখানে ভুলেও নিজের ভাষায় বলবেন না। এতে লোকাল লোকজন খুশি হলেও আন্তর্জাতিক সদস্যরা খুব মনে কষ্ট পান। তাই এদিকে খেয়াল রাখবেন। লোকাল ভাষায় কেউ কিছু জানতে চাইলেও ইংরেজীতেই উত্তর দিন। ভাষা যদি চেঞ্জ করতেই হয় তবে অনুমতি নিয়ে নিবেন।

উচ্চারন শুদ্ধ করুনঃ সঠিক উচ্চারন আবশ্যিক। এর জন্য প্রয়োজন অনুশীলন। সঠিক বাংলা উচ্চারনে কথা বলে আপনি তাক লাগিয়ে দিতে পারেন। আপনার কথা সবাই শুনতেই চাইবে শুধু শুনতেই চাইবে। এর জন্য কিছু কোর্স করাও যেতে পারে।

অংগভংগীর ব্যাবহারঃ কথা বলার সময় সংশ্লিষ্ট অংগভংগী গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। অনেকেই এক হাত নাড়িয়ে কথা বলেন। অনেকেই দু’হাত নাড়িয়ে কথা বলেন। আবার অনেকে হাত না নাড়িয়েই কথা বলেন। সত্যি বলতে কী আমাদের কোন কারিকুলামে কথা বলার উপর কোন পাঠ নেই। এটা ব্যর্থ শিক্ষা নীতি। কিন্তু আপনি কিছু অনুশীলনের মাধ্যমে এর যথেষ্ট প্রয়োগ করতে পারেন। যখন যা বলবেন তা বুঝাতে যেভাবে অংগ সঞ্চালন দরকার সেটাই করা উচিত। বড় কিছু বুঝাতে দু’হাতে বড় ইঙ্গিত করাই সঠিক। সুন্দর করে কথা বলার ক্ষেত্রে এটাও আবশ্যিক।

কিছু সোর্স অনুসরন করুনঃ টিভি, রেডিও, মুভি ইত্যাদি থেকে ভাল কিছু পেলে নোট রাখুন। কাজে দেবে। অনুশীলন করুন।
সর্বদা পরিস্থিতি বুঝে কথা বলুন।কথা বলার সময় মৃদু ও নম্রস্বরে এবং যতটা সম্ভব স্পষ্টভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন।এমনভাবে কথা বলবেন যেন শ্রোতা আপনার কথা বুঝতে পারে।যে বিষয় সম্পর্কে আপনি জানেন সে বিষয় নিয়ে কথা বলুন। অন্যথায় চুপ করে থাকুন।কথার মাঝখানে কথা বলে অন্যের মুড নষ্ট করবেন না।শুধু নিজে কথা না বলে অন্যকেও কথা বলতে সুযোগ দিন।কখনও একনাগাড়ে কথা বলে যাবেন না, অন্যের কথাও মনোযোগ দিয়ে শুনার চেষ্টা করুন। অন্যজন কী বলতে চায়, কী বোঝাতে চায়-তা বুঝতে চেষ্টা করুন, না বুঝলে তাকে আবার সেই কথাটি পূনরায় বলতে বলুন, তবে যেন আবার বারবার এমনটা না হতে থাকে সেদিকে সতর্ক থাকবেন।কোনো কথার বিরপীতে কথা বলতে চাইলে শান্তভাবে কথা বলুন।
উত্তেজিতভাবে চেঁচামেচি করে কথা বলা উচিত নয়, আর এটা শোভনীয়ও নয়।কখনও গাড়ি থেকে কাউকে চেঁচিয়ে ডাকবেন না। এতে অন্যদের মাঝে বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। অসুস্থ্য লোক গাড়িতে থাকলে তার কষ্ট হতে পারে আপনার উচ্চস্বরের কারণে।কারো সাথে কথা বলার সময় অবাঞ্ছিত কোনো শব্দ করবেন না বা অসৌজন্যমূলক আচরণও করবেন না। এতে করে আপনার প্রতি শ্রোতার সম্মানবোধ কমে যেতে পারে।
কথা বলতে বলতে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়বেন না কিংবা অযথা বা অপ্রয়োজনীয় তর্কে মেতে উঠবেন না। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিলে কথা না বাড়িয়ে সে জায়গা থেকে সরে যাওয়াই হবে উত্তম কাজ।
রাস্তাঘাটেও যথা সম্ভব মার্জিতস্বরে কথা বলার চেষ্টা করুন। কারণ পথে ঘাটে চিৎকার করে কথা বললে অন্য মানুষরা আপনাকে সন্দেহের চোখে দেখতে পারে বা বিরূপ মন্তব্য করতে পারে।অল্প পরিচিত কোনো নারী বা পুরুষের সাথে নিজের সমস্যার কথা বলবেন না। খুব ঘনিষ্ঠ না হলে ব্যক্তিগত কথা বলা উচিত হবে না কারণ এতে করে আপনারই সমস্যা হতে পারে।
অধিক কথা বলে কোনো অনুষ্ঠানকে ঘোলাটে করবেন না।কারো অন্যায় সমালোচনা করা উচিত নয়। কোনো অন্যায় করে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করুন-কারণ ক্ষমা প্রার্থনা মহৎ গুণ।সুচিন্তিতভাবে আপনার কথা বলুন- এলোমেলো, অগোছালো বা আজেবাজে অর্থহীন কথা বলা পরিহার করুন।
মনে রাখবেন সঠিক সময় সঠিক ভাবে কথা বলতে না পারলে অনেক সময় অনেক ছোট সমস্যাও বড় আকার ধারন করে আবার এই কথার ভিক্তিতেই অনেক বড় সমস্যার সমাধানও হয়ে যায় খুব সহজেই। জীবনের সাথে সমস্যা অতঃপ্রত ভাবে জড়িত তাই সুন্দর করে কথা বলার মধ্য দিয়েই সমস্যা সমাধান করে ভালো থাকুন।

আরও পড়ুন