বাবার সাথে উবেদের মিল ছিল অনেক…

প্রকাশিত : ১১ জুন, ২০২০     আপডেট : ৪ মাস আগে
  • 52
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    52
    Shares

জাবেদ আহমদঃ আমার বাবার সাথে ছোট ভাই উবেদের অনেকদিকে মিল রয়েছে। বাবা মরহুম ফৈয়াজ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন আমাদের দাদা মরহুম আব্দুল খালিক চৌধুরীর ৮ ছেলে মেয়ের মধ্যে তৃতীয় মতান্তরে চতুর্থ সন্তান । আমাদের ভাই উবেদ ও ছিল আমাদের ৫ ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় মতান্তরে চতুর্থ সন্তান। আমার বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান (আমার বড় ভাই) অল্প বয়সে মারা গিয়েছিল।
দাদার বড় ভাই আব্দুল করিম চৌধুরীর অকাল মৃত্যুতে তিনি ভাইয়ের অল্পবয়সী বিধবা স্ত্রী মমজিদা খানম চৌধুরীকে বিয়ে করে ভাতিজা গৌছ উদ্দিন চৌধুরীকে পুত্রের মর্যাদায় লালন পালন করেন। দাদা ছিলেন সে যুগের মধ্যম শিক্ষিত, জায়গা জমির হিসেব নিকেশে পারদর্শী। কর্মরত ছিলেন গোলাপগঞ্জের আমুড়ার বিখ্যাত জমিদার বাড়ির প্রধান নায়েব (প্রশাসনিক প্রধান)। শুনেছি প্রায় ৮ মাইল দূরে বাড়িতে আসতেন হাতির উপর চড়ে জমিদারী সুবিধায়। দাদা ও দাদীর সন্তান সন্ততিরা হলেন গৌছ উদ্দিন চৌধুরী (মুশি মিয়া), কমরুন্নেছা চৌধুরী (করফুল), লেখক অধ্যাপক মোঃ বদরুজ্জামান চৌধুরীএডভোকেট ডাবল এম,এ,(বদই মিয়া), ফৈয়াজ উদ্দিন চৌধুরী (ফজই মিয়া), আলহাজ্জ্ব জহীর উদ্দিন চৌধুরী (জরা মিয়া), শাহাব উদ্দিন চৌধুরী (লেচু মিয়া), কবি বেগম শামসুন্নাহার(নেওয়া), এ,কে,এম, শামসুদ্দিন চৌধুরী (মলাই মিয়া)। আমার বাবা ফৈয়াজ উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা আলহাজ্জ্ব তাহেরা চৌধুরী (তয়জুন) এর সন্তানরা হলেন মোঃ সুহেদ আহমদ, … (শিশুকালে মৃত), জাবেদ আহমদ, মোহাম্মদ উবেদ আহমদ চৌধুরী, মোঃ জুবেদ আহমদ।
দাদার বড় ছেলে গৌছ উদ্দিন চৌধুরী কিশোর বয়সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আসাম চলে যান। বিভিন্ন পেশায় কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করেন। দ্বিতীয় চাচা বাবার কর্মক্ষেত্র আমুড়ার জমিদারবাড়িতে থেকে পাঠশালা পর্ব শুরু করেন। হাইস্কুল পড়েন বড়বোনের ফেঞ্চুগঞ্জের বাড়িতে থেকে। ছেলেদের মধ্যে আমার বাবা বাদে অন্য তিন চাচা কুচাই এলাকার বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে জায়গীর থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান। তখনকার সমাজব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক ছিল। স্কুলের ছিল বড্ড অভাব। অতীব আগ্রহী ছাড়া বেশীরভাগ শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত হতো। বাবার মন টিকে না লেখাপড়ার ধরাবাঁধা নিয়মে। তাঁকে নিয়ে ছিল তাঁর মায়ের যতসব চিন্তা। কিশোর বয়সে তিনি মনপ্রাণ উজাড় করে বেপরোয়া হয়ে ধর্মীয় কাজে শুরু করেন। তারজন্য ফজরের সময়ে বাড়ির সবার ঘুম হারাম হয়ে গেলো। সবার ঘরে জোরে আওয়াজ দিয়ে “ঘুম হতে নামাজ উত্তম” মোয়াজ্জিনের আহবানের তাগাদা দিতেন। অতীষ্ঠ হয়ে বাড়ির সকলে বিচারপ্রার্থী হলে দাদা বাবাকে নিয়ে সম্ভবত তহীপুরে এক বিখ্যাত কামেল মাওলানার কাছে নিয়ে যান। মাওলানা বলেন আপনারা ভূল করতেছেন তাঁকে নিবৃত করে, সে সঠিক পথেই আছে। দাদার অনুরোধে মাওলানা সাহেব তদবির করে বাবার মোহ কিছুটা পরিবর্তন করতে সক্ষম হলেও আক্ষেপ করে বলেছিলেন আপনারা একটু সহ্য করতে পারলেন, বিরাট অর্জন হারালেন। পরবর্তীতে বাবা বাড়ির লোকজনদের অতিষ্ট না করলেও দুনিয়াদারির প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র মোহ ছিল না। দাদা, চাচারা বাড়ির বড় বড় গাছ বিক্রি করে অর্থ দিয়ে অনেক ব্যবসা দিলেও এসবে তাঁর মন বসেনি কখনো। নামাজের সময় মালমাল রেখে মসজিদে চলে যেতেন, প্রায়ই খোয়া যেতো মালামাল। একসময় সব ব্যবসা বন্ধ করে বছরের বেশিরভাগ সময় তাবলীগ জামাতে দ্বীন প্রচারের কাজেই দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন। ভাই উবেদেরও মন বসতো না পাঠ্যবইয়ে । পড়ার জন্য আমরা বড় দুই ভাই প্রাইমারী থেকে শিশু বয়সেই বাড়ি ছাড়া। বড়ভাই সুহেদ আহমদ ফেঞ্চুগঞ্জ আর আমি সিলেট শহরের চাষনীপীরে এবং পরে আম্বরখানা কলোনিতে। উবেদ ১৯৯০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় টেনেটুনে পাস করে, পাশের জন্য তার চেয়ে বেশি কৃতিত্ব বড় ভাইয়ের। তিনি তাকে পরীক্ষা শুরুর আগ পর্যন্ত সেন্টারে বসে পাখির মতো পড়িয়েছেন। ১৯৯২ সালে একই ধারায় ইন্টারও পাশ দেয়। আমরা তিন ভাই সরকারি চাকুরি পেলেও সে আর পায়নি। ১৯৯৩-৯৪ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা চাকুরি আমাদের সিবিএর প্রভাবে ও সে সময়ের জি,এম এম,এ, মান্নানের মাধ্যমে হয় হয় করেও সরকারি নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে শেষতক আর হলো না। বাবার মতো উবেদের বেকার জীবন সে নিজে আমোদে থাকলেও মায়ের ছিল কী দুশ্চিন্তা। কোর্টের মুহুরি, মামার ফার্মেসিতে বসা, ওসমানী মেডিকেলের প্রথম গেটে মামাতো ভাই লিটনের সাথে দুই বছরের চুক্তিতে ফার্মেসি ব্যবসা, ১৯৯৯-২০১৮ রিকাবীবাজারে জমজম মিট এন্ড পোল্ট্রি ব্যবসা পরিচালনা, পার্টনারশীপে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, সি ফুড ব্যবসা কত কী না করেছে। জমজম ছাড়া সব জায়গায় লস করেছে। জমজমে আমার নজরদারি থাকায় এখানে বিফল না হলেও শেষদিকে সে পথে হাটা শুরু করায় ব্র্যান্ড দোকানটি ভাড়ায় দিয়ে দিতে হয়। যেখান থেকে শুরু সেখানেই গিয়েই তার নানা বৈচিত্র্যময় পেশার ইতি ঘটে আবারও ফার্মেসি ব্যবসা দিয়ে। ২০১৮ হতে মৃত্যু অবধি ভাতিজা সবুজের সাথে আল আজিজ মেডিকো ব্যবসা পরিচালনা করছিল। সে ছিল দিলখোলা ঠিক বাবার মতো। মানুষকে মন খোলে বিশ্বাস করতো। বাকী দিয়ে টাকা না পেয়ে শেষবেলায় এজন্য মূল্য দিতে হয়েছে তাকে। না বুঝে শেয়ারবাজারে আগ্রাসী বিনিয়োগ করে পূজি হারিয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও মানুষের কাজের জন্য দোকান কর্মচারীদের হাতে রেখে চলে যেতো। ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পাগল ছিল। ২০১২ সালে মহানবী (সা.) কে কটুক্তির প্রতিবাদে মিছিলে গিয়ে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে আল্লাহর রহমতে বেঁচেছিল। বিশ্বকাপ আসলে ব্রাজিলের পতাকা দিয়ে দোকান ঢেকে ফেলতো, টিভি আসতো দোকানে। ২০১৬ সালে ওমরাহ পালন শেষে ধর্মীয় লাইনে অনেক অগ্রসর হয়ে যায়। শুনেছি কোথায় নিয়মিত সাপ্তাহিক জিকিরে যেত। শেষ রমজানে রাত জেগে ইবাদত বন্দেগী করছে প্রচুর। মধুশহীদ মসজিদের মোতওয়াল্লী হাজী মল্লিক চৌধুরী ফোন করে বললেন তাদের মাসজিদের একনিষ্ট মুসল্লী ছিল সে। তারা দোয়া করেছেন।
আমার বাবা দারিদ্রতাকে ভালবেসে সন্তুষ্টির সাথে জীবন পার করেছেন। বড় ছোট ভাইবোন আত্মীয়স্বজনের বকাঝনা বিরক্তি আমলে নেন নি। কখনও মুখ কালো করেন নি। তিনি তাঁর দ্বীনের দাওয়াতি কাজে থাকতেন অটল। নিজে পরিবার নিয়ে অভাবের মধ্যে নিত্য গড়াগড়ি করলেও তারচেয়ে গরীব তাবলীগ সাথীদের অন্যের কাছ থেকে নিয়ে বা নিজের বাঁশ গাছ বিক্রি করে সহায়তা করতেন। জীবনে কখনও টিভি দেখেননি, ছবি তোলেন নি। দুই ছেলে সরকারি চাকুরিতে বছর দুয়েক হলো ঢুকেছে, স্বচ্ছলতা না আসলেও অভাব বিদায় হতে লাগছে ঠিক এসময়েই ২ জুলাই ১৯৯১ মাত্র ৫৫ বছর বয়সে ভাই বোনদের মধ্যে সবার আগে মারা যান বাবা। উবেদ কাজে উদাসীনতা ঢিলেমীর জন্য মায়ের বকুনির পাশাপাশি বড়ছোট ভাইদের বকাঝকা খেলেও মুখে কিছু বলতো না। সে তার কাজে অটল থাকতো। কর্মচারীদের ভালবাসতো। তার হাত ধরে কর্মচারী হতে আলী হোসেন, জজ মিয়ারা আজ দোকান মালিক। দেড়যুগ লাভজনক ব্যবসা করে যে অর্থকড়ির মালিক হওয়ার কথা একাধিক ব্যবসায় লসের কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। এতে তার মধ্যে কোন উদ্বিগ্নতা বা হতাশা চোখে পড়েনি। বরং দেখেছি সন্তুষ্টির ছাপ। সবসময় হাসিখুশি থাকতো। বিশাল স্বচ্ছলতা না থাকলেও কোন অভাব ছিলো না। অনেকে তার কাছে টাকা আমানত রাখতো। শুনেছি এক রিকশাওয়ালা ভাই তার কাছে সামান্য করে বেশ কয়েক হাজার টাকা জমিয়েছেন। উবেদের বউ জানালো সব টাকা একটা ব্যাগে সুরক্ষিত রয়েছে। করোনাকালে রমজানের ঈদের পরদিন রাতে ফার্মেসি হতে আসতে বৃষ্টিতে ভেজে জ্বর আসে। শ্বাসকষ্ট আগেই ছিল। উপসর্গ থাকায় নমুনা জমা দেয় ৩ জুন। শ্বাসকষ্ট বাড়লেও করোনা হাসপাতালে ভর্তি হতে ভীত ছিল। বাসায় থেকে অনলাইনে চিকিৎসা নিয়ে ক্রমেই তার শরীরের অবনতি ঘটতে থাকে। স্ত্রী মারজানা সার্বক্ষণিক পাশে থেকে সেবা দেয়ার পাশাপাশি আমাদের অবহিত করতো। আমরা হাসপাতালে ভর্তির জন্য চাপ দিলে সে বলতো শ্বাসকস্ট কমে গেছে। শেষতক অবস্থা বেগতিক হলে ছোট ভাই জুবেদ গিয়ে তাকে শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে ৫ জুন ভর্তি করে। ৬ জুন রাতে অবস্থার চরম অবনতির সংবাদ পেয়ে আমি ও জুবেদ হাসপাতালে দ্রুত গিয়ে আইসিইউ তে নিয়ে যেতে সহায়তা করি। এসময় জীবন মৃত্যুর সন্নিকটে থেকেও সে আমার কাছে চিরচেনা বিনীত স্বরে ভূলত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে। আমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম তোমাকে আইসিইউ নিয়ে যাচ্ছি ইনশাআল্লাহ তুমি বাঁচবে। জীবন মৃত্যু সব মহান আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও দয়া। তিনি তাঁর প্রিয় নিঃসন্তান বান্দাকে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে কাছে টেনে নেন। ৪ ভাইয়ের মধ্যে ৩ হয়ে নশ্বর পৃথিবীতে এসে চিরকালের ঠিকানায় প্রস্থান হতে ফাস্ট হয়ে গেলো। মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আরজ আমাদের বাবা ও ছোট ভাইটাকে মাফ করে দেন। জান্নাতের সু উচ্চ মোকামে তাঁদের অধিষ্ঠিত করুন।


  • 52
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    52
    Shares

আরও পড়ুন

সাংবাদিক ইকবাল মনসুরের কুলখানি শুক্রবার

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : দৈনিক...

ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত মালিহার পাশে দাঁড়ান

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: ব্লাড ক্যান্সারে...

কারাবন্দী ও আহত নেতাকর্মীদের সাথে মিজানুর রহমান চৌধুরীর সাক্ষাৎ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক...