বাদাঘাট ও চেঙ্গেরখাল নদী ফিরে পাচ্ছে তার সৌরভ ও সুখ্যাতি

প্রকাশিত : ০১ নভেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

সাঈদ চৌধুরী: সিলেট সদর উপজেলার বাদাঘাট চেঙ্গেরখাল নদীর তীরে ৩০ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার। ১০ একর ভূমিতে নির্মিত হচ্ছে মেরিন একাডেমি। সিলেট শহর থেকে নবনিমির্ত কারাগারে যাবার পূর্বে আম্বরখানা-বাদাঘাট সড়কের পাশে গড়ে উঠছে একটি অত্যাধুনিক আবাসিক প্রকল্প। সাথে থাকছে আধুনিক বিপনী বিতান, কমিউনিটি সেন্টার ও আন্তর্জাতিক মানের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। রয়েছে বাদাঘাট মডেল কলেজ। সড়কপথ, নদীপথ, বিমান বন্দর ও আইসিটি পার্ক সংযুক্ত হয়ে বাদাঘাট ও চেঙ্গেরখাল নদী ফিরে পাচ্ছে তার হাজার বছর আগের সৌরভ ও সুখ্যাতি।

সিলেট একটি প্রাচিন জনপদ। বাংলাদেশের বিশাল অংশ যখন সাগরের গর্বে বিলীন, সিলেটে তখনো ছিল সভ্য সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থল। খৃষ্টপূর্ব চার হাজার অব্দেও সিলেটে উন্নত সমাজ ছিল। ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে হযরত শাহজালাল (র:) আগমনের পর এ ভূখন্ড শিলহট, জালালাবাদ বা সিলেট নামে পরিচিত হয়ে উঠে।

হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে আরব পর্যটক সোলায়মান ছয়রাফী পারস্য সাগর ও ভারত সাগর অতিক্রম করে সিলেট আসেন। তার বর্ণনায় সিলহট বন্দর ও বাদাঘাটের কথা উল্লেখ আছে। আরবী ইতিহাসেও সিলহট বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়। মরক্কোর অধিবাসী শেখ আব্দুল্লাহ্ মোহাম্মদ ইবনে বতুতা হযরত শাহজালাল (র:) সাথে মোলাকাতের জন্য ১৩৪৬ খৃ: সিলেট আসেন। তিনি নহরে আজরক দিয়ে জলপথে সিলেট আসেন। নিজের যাত্রা পথের বর্ণনা দিয়ে তিনি সিলেটকে কামরুপের অন্তর্গত বলে চিহ্নিত করেছেন।

কামরূপ রাজত্ব মূলত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং তৎসংলগ্ন এলাকার সমন্বয়ে গঠিত বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্য এবং বাংলাদেশের সিলেট অংশ ছিল। ১৮২৬ সালে আসাম ভারত বর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত শাসিত হয় বাংলা প্রদেশের একটি অংশরূপে। একই সময়ে সিলেট, কাছাড়, গোয়ালপাড়া জেলা ও গারো হিলস জেলার উত্তর অংশকে আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পার্বত্য জেলা খাসিয়া ও জৈন্তিয়া, সিলেট ও কাছাড় জেলার সমম্বয়ে গঠিত সুরমা উপত্যকা এবং বাংলার গারো পাহাড় ও গোয়ালপাড়া জেলা সমন্বয়ে সাদিয়া থেকে গোয়ালপাড়া পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল এ সময় আসাম নামে পরিচিতি লাভ করে।

তখন ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের সাথে সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য জমজমাট ছিল। এ্ই বাণিজ্যিক পণ্য সামগ্রী নদী পথে সরবরাহ হত। নদী তীরে বিভিন্ন স্থানে নৌকা ও স্টিমার এসে নোঙ্গর করতো এবং সেখান থেকে সিলেট শহর ও বিভিন্ন হাট বাজারে এসব মালামাল নিয়ে যাওয়া হত। চেংগের খাল নদীতে হাটখোলা, মোগলগাঁও এবং কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সংযোগ স্থলে এসব পণ্যবাহী নৌযান বেঁধে রাখা হত বলে এর নাম হয় বাদাঘাট। এখানেই সাম্প্রতিক কালে নির্মিত হয়েছে উত্তর সিলেটের সর্ব বৃহৎ বাদাঘাট ব্রিজ।

উল্লেখ্য, মেঘালয় মালভূমি থেকে নেমে আসা নদী ও স্রোতধারা গোয়াইন গাঙ, পিয়াইন, বোগাপানি, জাদুকাটা ইত্যাদি নাম ধারণ করে চেঙ্গের খাল নদী হিসেবে পূর্ণতা লাভ করেছে। কোম্পানীগঞ্জের পাড়ুয়া গ্রামের দক্ষিণে ভারতের একটি পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতধারাকে চেংগের খাল নদীর উৎপত্তি হিসেবে ধরা হয়। এটি উত্তর সিলেটে সুরমা আর দক্ষিণে কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে। পরে সুরমা ও কুশিয়ারার মিলিত প্রবাহ কালনী নামে দক্ষিণে কিছুদূর প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। ভৈরব বাজারে পুরাতন বহ্মপুত্রের সঙ্গে এবং চাঁদপুরের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নদী বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে।

বাদাঘাট চেঙ্গেরখাল নদীর তীরে নব নির্মিত অত্যাধুনিক এই কারাগারে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ১০০ শয্যার পাঁচ তলা বিশিষ্ট হাসপাতাল, স্কুল ও লাইব্রেরি ভবন ছাড়াও কর্মকর্তাদের জন্য ১৩০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রায় ২ হাজার বন্দির ধারণ ক্ষমতার এই কারাগারে পুরুষ বন্দিদের জন্য ৬তলা বিশিষ্ট ৪টি ভবন এবং নারী বন্দিদের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট দুইটি ও ৪তলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। রান্নার কাজের জন্য পৃথক ভবন রয়েছে। স্টোর রুম বা খাবার মজুত রাখার জন্যও আলাদা ভবন রয়েছে। কারাগারে একটি দ্বিতল বিশিষ্ট রেস্ট হাউসও করা হয়েছে। এছাড়া চার তলা বিশিষ্ট ডে কেয়ার সেন্টার, মসজিদ, স্কুল ও লাইব্রেরি রয়েছে। কর্মচারীদের আবাসন, ক্যান্টিন, বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতকার কক্ষ এবং প্রশাসনিক কার্যালয় রয়েছে নবনির্মিত এ কারাগারে।

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের অনতিদূরে আম্বরখানা-বাদাঘাট সড়কের পাশে গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক আবাসিক প্রকল্প। বলা যায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের পাশে আরেকটি নতুন সিটি। এটি কমাবে সিলেট মহানগরির জনসংখ্যার চাপ। যেখানে থাকবে আধুনিক বিপনী বিতান, কমিউনিটি সেন্টার ও আন্তর্জাতিক মানের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। কাছেই রয়েছে বাদাঘাট মডেল কলেজ ও ঈদগাহ।

মুক্ত আকাশ, উন্মুক্ত বাতাস আর বিনোদনের নান্দনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এই সিটির ভেতরে প্রশস্ত রাস্তার দু’পাশে থাকবে সবুজে মোড়া গাছ-গাছালি। অনিন্দ সুন্দর লেক ও মাছের খামার। থাকবে সবুজ ছায়া ঘেরা পরিবেশ বান্ধব নগর জীবনের সকল সুযোগ-সুবিধা। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবারহের ব্যবস্থা সহ পূণ্যভূমি সিলেটে তৈরী হবে আরেকটি হলি সিটি। সত্যিকারের একটি গ্রিন সিটি। একটি ক্লিন সিটি। নতুন প্রজন্মের প্রিয় পছন্দের একটি হেলদি সিটি।

আরও পড়ুন



সিলেটী একজনসহ ৩১ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে...

কেমুসাস’র শোকসভা আ.ন.ম শফিকুল হক ছিলেন একজন আপাদমস্তক সৎ মানুষ

দেশের প্রাচীনতম সাহিত্য প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয়...

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে যেভাবে দাফন করা হবে

শুধু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি নন,...