বাঙালির বৈশাখ ও রবীন্দ্র-নজরুল

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

মোহাম্মদ আব্দুল হক: আমরা চিরদিন বাঙালি। বহু শতাব্দীকাল ধরে চলছি বাংলার মৃত্তিকায় গড়াগড়ি করে। আমরা আজও হেঁটে চলেছি বাংলার মাটির পুষ্টিতে ভরা ফল, ফসল, জল, জলজ প্রাণ, মাটির লালিত তৃণভোজি হালাল পশু আর যতো পাখিদের কাছে ঋণের বোঝা নিয়ে। এই বাংলার যুগ যুগের কিছু মজার ব্যাপার আছে যা আমরা লালন করে পালন করে হয়ে আছি বাঙালি হয়ে বিশ্বের এক জাতি হয়ে। আমাদের এসব ব্যাপার আমাদের আনন্দ দেয়। আর এসব আনন্দের ব্যাপারকে আরো জীবন ঘনিষ্ঠ করে রেখে গিয়েছেন আমাদের বাঙালির ঘরের মনীষী অনেকে। আমাদের এতো সব মজার ব্যাপার গুলোই হলো আমাদের উৎসব। আমাদের বাঙালির আনন্দ উৎসব। এসবই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের লালিত ঐতিয্য। এমনি এক শিকড় ঘনিষ্ঠ আনন্দঘন প্রাণের উৎসব হলো বৈশাখি মেলা। এ মেলা একান্তই বাঙালির মেলা। যে কোনো মেলা সৃজনশীল ও মননশীল মানুষের যত্নে সাধারণ সকল মানুষের কাছে ধরা দেয় অতি আপনার হয়ে।এসব সৃজনশীলতা থাকে অনেকের, থাকে কবি সাহিত্যিকদের। আমরা এই বাঙলার মাটিতে অনেক গুণীজন পেয়েছি। এখানে যেহেতু বৈশাখি মেলা নিয়েই কথার শুরু তাই বৈশাখি মেলা বা বৈশাখ মাস ঘিরে আমাদের বৈশাখি উৎসবে যে দুজন কবির প্রভাব কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায়না, তাদের দুটি গানে বিশেষ মনোযোগ দিয়েই কিছু কথা লিখবো।

বৈশাখ মাসকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম গান লিখেছেন সুর করেছেন এবং তা গীত হয় বিশেষ আবেগ নিয়ে বৈশাখ মাসের প্রাক্কালে ও সারা বৈশাখ মাস জুড়ে। দুই কবির গান দুটিতে কি আছে তা ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে হলে গানের কথায় যেতে হবে এবং শুনতে হবে। আসুন গানের কথায়। এখানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গান _
” এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।/
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥/
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,/
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥/
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।/
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,/
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।/
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥” গানের কথা এখানে পরিষ্কার। পড়ে বুঝা যায়, কবি বৈশাখ মাস ও এ মাসের চরিত্র সম্পর্কে খুবই সচেতন। তিনি বৈশাখ মাসকে যথা সময়ে আসার আহবান জানাচ্ছেন এবং তিনি জানেন বৈশাখ এসে পুরনো বছরের আবর্জনা সাফ করে দিবে। হ্যাঁ আমাদের বাংলায় বৈশাখ মাস তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে আর প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হয়। বাতাসের ঝাপটায় গাছ, দুর্বল বাড়ি সহ রাস্তায় জমে থাকা যতো জঞ্জাল সব উড়িয়ে নিয়ে যায়, ময়লা ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলে। এই কথাগুলোই আমরা গানে শুনি। তখনই কথামালার যথার্থতা আমাদের কাছে ধরা দেয়। তবে এ গানের সুর এতোটাই নরম স্বভাবের যা তর্জনগর্জন রূপি বৈশাখি আকাশের সাথে যথেষ্ট দূরত্বে থাকে। এই দূরত্বটুকু আমার কাছে এমনি এমনি ধরা দিতো কি না জানা নেই। তবে কাজী নজরুল ইসলাম যে গান আমাদের উপহার দিয়েছেন, তা শুনেই যে আমি ভাবতে পারছি তা সত্য। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানের কথায় বৈশাখি দর্শন যেভাবে তুলে ধরেছেন, প্রকৃত অর্থে গানের সুরে সেই চেতনা জেগে উঠেনি। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমসাময়িক আমাদের বাংলাসাহিত্যের আরেক প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব বিদ্রোহীকবি খ্যাত কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন _
“তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/
ঐনূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!/
আস্ল এবার অনাগত প্রলয়–নেশায় নৃত্য–পাগল,/
সিন্ধু–পারের সিংহ–দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!/
মৃত্যু–গহন অন্ধকুপে, মহাকালের চন্ড–রূপে ধূম্র–ধূপে/
বজ্র–শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!/
ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর!/
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!/
দ্বাদশ রবির বহ্নি–জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন–কটায়,/
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!/
বিন্দু তাহার নয়ন –জলে/
সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে/
কপোল–তলে!/
বিশ্ব –মায়ের আসন তারই বিপুল বাহুর ‘পর –/
হাঁকে ঐ “জয় প্রলয়ংকর!”/
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!/
মাভৈঃ, ওরে মাভৈঃ, মাভৈঃ, মাভৈঃ জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে/
জরায়–মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ–লুকানো ঐ বিনাশে।/
এবার মহা–নিশার শেষে/
আসবে ঊষা অরুণ হেসে/
করুণ্ বেশে!/
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু–চাঁদের কর!/
আলো তার ভরবে এবার ঘর!/
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!” আমরা জানি এই গানটিও খুব জনপ্রিয়। বিশেষ করে চৈত্র মাসের শেষদিকে যখন আকাশ ভয়ংকর রূপ ধারণ করে তখন মনে জাগে আকাশ কি আজ বিদ্রোহ করবে? মানুষের মনে ভয় এবং আশার সঞ্চার হয়। বৈশাখি আকাশের এলোকেশ চেহারা আর মেঘের গর্জনে বাঙালি পরিচিত। তাই ঘর-বাড়ি আগেই সংস্কার করে শক্ত করে নেয়। এরই পাশাপাশি মানুষের মনে জাগে আশা, বৈশাখ মাসে যে বৃষ্টি বর্ষণ হয় তাতে নিষ্প্রাণ মাটি প্রাণ ফিরে পায়। গাছে গাছে নতুন করে নানান রকম ফল ফলে। মরা খাল, শুকিয়ে যাওয়া পুকুর ও ব্যাঙ, মাছ ইত্যাদি জলজ প্রাণে জয়োল্লাস লক্ষ্য করা যায়। তাই কবি কালবোশেখির ঝড়ে নতুন করে জেগে ওঠার আহবান জানিয়ে, পুরাতন জঞ্জাল সরিয়ে নতুন পতাকা ওড়াতে বলেন। আসলে গানটি যেভাবে সুর করা হয়েছে এবং গাওয়া হয় তাতে বৈশাখ মাসের চরিত্র যেন একেবারেই ফুটেছে। আমি শুধু দুটি গানে আমাদের বৈশাখ যেভাবে এসেছে এবং আমার কাছে ধরা পড়েছে তা ই এখানে পরিস্ফুট করেছি।

প্রিয় পাঠক, এখানে কেউ আমাদের কবিদের সম্পর্কে তুলনামূলক কোনো নেতিবাচক কিছু খোঁজার চেষ্টা করে পক্ষপাত দুষ্টে দোষি না হওয়াই ভালো। দুজনের গানের আবেদন প্রায় একই এবং বৈশাখি বৈশষ্ট্য আছে। শুধু গান দুটি আলাদা করে শুনলেই দুটি গান যে ভিন্ন রকম শিহরণ জাগায় সেটি ই আমি খুঁজে পেয়েছি। আমাদের ষড় ঋতুর এই বাংলাদেশে বারোটি মাস। প্রতিটি মাস তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য গুণে আমাদের কাছে পরিচিত। ফাল্গুন যেমন তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বমহিমায় উজ্জল তেমনি জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, চৈত্র প্রতিটি মাসের আলাদা ধরনের দর্শন আছে। আমাদের বৈশাখ মাসের নিজস্ব দর্শন আছে যা আমার কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি সহজ ভাষায় _
“।। বৈশাখী দর্শন ।।
পাখিরা নিরব কেন/
কিসের শংকায় যেনো আজ/
সবাই চুপ চুপ /
সাড়া নেই রোজকার মতো।/
কে যেনো এলো /
আজ এ কেমন কড়া নাড়া/
এ কোন অস্থিরতা/
বড়ই বেপরোয়া আচরণ।/
একি , কেউ নেইতো /
আকাশ ভয়ংকর কালো /
মেঘে মেঘে যুদ্ধ রূপ/
দরজায় বাতাসের ঝাপটা।/
বিস্ময়কর পরিবর্তন এক/
চারিদিকে হাঁক ডাক /
জীর্ণতা ঘুছে যাক/
স্বাগত বাংলার বৈশাখ।/
ঝড় তুফানের খেলা /
ভয় জাগানো বাজ/
কাঁপে ঘাস মহীরুহ/
নর নারী উত্তাল তরঙ্গিনী।/
মৃত্তিকায় নতুন বিস্ফোরণ/
আকাশে মেঘের গর্জন/
বর্ষণে নতুন ফলন /
এইতো বৈশাখী দর্শন ।।”

শেষ করছি আমার কথা। ছোটো বিষয় নিয়ে এর চেয়ে দীর্ঘ আলোচনা আমার পক্ষে যাচ্ছে না। আমার উপস্থাপনার মূলে আছে আমাদের বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ এবং আমাদের বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে কবিতা গল্প নাটক ও গানে সমৃদ্ধ করেছেন যে দুই জন সাহিত্যিক তাঁদের নিয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা। আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখের যে দর্শন ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের দুটি গানে তার উপর। এ পর্যায়ে এসে আমাকে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আর অপেক্ষা করতে হচ্ছেনা। আমার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় দুটি গানের আবেদন এক রকম হলেও সমান ঘনিষ্ঠতা পায়না। আমাদের বাংলাসাহিত্যের দুই ঝলমল তারকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। বৈশাখ নিয়ে এই দুই মনীষীর অত্যন্ত জনপ্রিয় দুটি গান আছে। ১) ” এসো হে বৈশাখ এসো এসো “, ২) ” তোরা সব জয়ধ্বনি কর / ঐ নুতনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখীর ঝড়।” আমার মনে হচ্ছে বৈশাখের চরিত্রের সাথে কাজী নজরুল ইসলামের গানটি বেশ মানিয়ে যায়। কারণ বৈশাখ এমনি ঝড়ের বেগ যা নজরুলের গানেই মিলে। রবীন্দ্রনাথ অনেকটাই শান্ত আহবান জানাচ্ছেন যা বৈশাখি চরিত্রের সাথে পুরোপুরি যায়না।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ থাকেন বাঙালির মননে’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ আমি লিখেছি আমার ‘চেতনায় সারাবেলা’ নামক গদ্যগ্রন্থে। আর কাজী নজরুল ইসলাম নিয়ে ‘বিদ্রোহী-প্রেমিক কাজী নজরুল ইসলাম’ শিরোনামে প্রবন্ধ ছাপা আছে আমার ‘এসো কান পেতে শুনি’ নামক গদ্যগ্রন্থে। তাই বলে রাখি, নজরুল – রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গবেষণা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বৈশাখ মাস এলে সকল বাঙালির মতো আমিও এই বিখ্যাত কবির দুই বিখ্যাত গান শুনি এবং দুই চরণ গাইতে চেষ্টা করি। এ থেকেই চিন্তা আর নিজের মনে যেভাবে ধরা দিলো তা তুলে ধরার ইচ্ছা হলো।।

কলামিস্ট কবি ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন



আজ হাসিনা-মোদি উদ্বোধন করবেন কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন প্রকল্প

কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথের সংস্কার কাজ আজ...

মুসলিম সমাজ : পয়লা বৈশাখ সংস্কৃতি

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: প্রতি বছর...

সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের বর্ধিত সভা

বক্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে...