বাংলার গৌরবোজ্জ্বল অতীতের পুনরাবৃত্তি হতে পারে ভবিষ্যতে

,
প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২০     আপডেট : ৫ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ মো আব্দুর রশিদ    খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দ অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় দুই হাজার তিনশত পঞ্চাশ বছর আগের কথা।  সম্রাট আলেকজান্ডার যাকে অনেক ইতিহাসবিদ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বলে সম্বোধন করেন।  আলেকজান্ডার ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ও তার চতুর্থ স্ত্রী অলিম্পাসের সন্তান।  তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবীব্যাপী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে।  তাঁর শিক্ষাগুরু এরিস্টটল তাকে জানিয়েছিলেন পৃথিবীর শেষ প্রান্ত হচ্ছে ভারত।  সারা পৃথিবী জয়ের নেশায় প্রচণ্ড বেগে পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে যুদ্ধ যাত্রা শুরু করেছেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার।  ইউরোপ আর এশিয়া মহাদেশের একের পর এক রাজ্য জয় করেন।  বিখ্যাত ইরান সম্রাট দারায়ুস থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিম ভারতের পরাক্রমশালী রাজা পুরু পর্যন্ত আলেকজান্ডারের বাহিনীর কাছে দাড়াতে পারে নাই।  আলেকজান্ডারের সামনে একটাই বাধা।  পরাক্রমশালী রাজ্য গঙ্গারিডাই ( প্রাচীন গ্রীক পণ্ডিত টলেমির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনকার বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছিল গঙ্গারিডাইয়ের অবস্থান।  এক গ্রিক নাবিকের লেখা বই ‘পেরিপ্লাস মারি ইরত্রি’তে বলা আছে, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে গঙ্গা নদী সংলগ্ন রাজ্য হল গঙ্গারিডাই অর্থাৎ এখকার বঙ্গভূমিই ছিল তখনকার গঙ্গারিডাই)।  আলেকজান্ডার তাঁর সৈন্যদের নিয়ে গঙ্গারিডাই আক্রমনের জন্য পরিকল্পনা করতে বসেছিলেন।  বাংলার পূর্বপুরুষ এই গঙ্গারিডাইদের চারহাজার হস্তী-বাহিনীর সাথে লড়াই করতে হবে জেনে আলেকজান্ডারের কোন সেনাপতিই ভয়ে যুদ্ধ করতে রাজি হলেন না।  অগত্যা আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ত্যাগ করে নিজ দেশে ফিরে যান।

এই বাংলার মানুষই বিশৃংখলা দমনের জন্য তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখিয়ে গণ-নির্বাচনের আয়োজন করে।  যে গণ-নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের সমর্থন নিয়ে রাজা গোপাল রাজ্য ক্ষমতায় আসেন।  যা ইতিহাসের প্রথম গণতন্ত্র বলে অভিহিত।  গোপালের রাজত্বকাল ছিল ৭৫০ থেকে ৭৭০ খ্রিস্টাব্দ।  ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে কুতুব উদ্দিন আইবেক যখন দিল্লির সুলতান, তখন তার সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী বাংলা জয় করেন।  তখন হতে বাংলাতে শুরু হয় মুসলিম শাসন।  এই সময় হতে বাংলা দিল্লির সুবা বা প্রদেশ হিসেবে শাসিত হয়।  মোঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে তিনজন নওয়াব স্বাধীনভাবে বাংলার শাসন পরিচালনা করেন।  তাঁরা হলেন নবাব সরফরাজ খান, নবাব আলীবর্দী খান ও নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা।  তখনকার বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ।  নবাব আলীবর্দী খাঁর কোন পুত্র সন্তান ছিল না।  তার ছিল তিন কন্যা।  ঘষেটি বেগম, আমেনা বেগম ও জেবুন্নেসা।  তিনি তিন কন্যাকে বিবাহ দেন।

তিন কন্যার জামাতারা মৃত্যুবরণ করলে আলীবর্দী খাঁ তাই তিন কন্যাকে মুর্শিদাবাদ প্রাসাদে তার নিজের সাথে রাখেন।  ঘষেটি বেগমের গর্ভে কোন সন্তান জন্মগ্রহন করেনি।  জেবুন্নেসার ছেলের নাম শওকত জঙ আর আমেনা বেগমের ছেলের নাম সিরাজ-উ-দ্দৌলা।  আলীবর্দী খাঁ সিরাজ-উ-দ্দৌলাকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব হিসাবে দায়িত্ব অর্পন করেন।

সেই প্রাচীনকাল থেকেই এই বাংলা ছিল অফুরন্ত ধন-সম্পদের দেশ।  ধন সম্পদের লোভে আকৃষ্ট হয়ে ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায় এদেশে আসতে শুরু করে।  প্রথমে পর্তুগাল, তারপর নেদারল্যান্ড বা হ্ল্যান্ড থেকে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডেনমার্ক থেকে ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফ্রান্স থেকে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইত্যাদি।  কোম্পানি গঠন ছাড়াই পর্তুগিজ বণিকগণ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসে এবং ১৬২৮ সালে পর্তুগিজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়।

বাংলার সুবেদার শাহজাদা সুজা ইংরেজ চিকিৎসক জিব্রাইল ব্রাইটনের চিকিৎসায় সন্তুষ্ট হয়ে মাত্র তিন হাজার টাকা করের বিনিময়ে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার প্রদান করেন। ১৬৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলিকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ স্থাপন করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিকিৎসক সার্জেন্ট উইলিয়াম হ্যামিল্টন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত সম্রাট ফররুখ শিয়রকে সুস্থ করে তুললে সম্রাট এতে সন্তুষ্ট হয়ে ১৭১৭ সালে এক ফরমান জারি করে ভারতবর্ষে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করা সহ অনেক সুযোগ-সুবিধা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রদান করেন।

 

একটা দেশ বা জাতিকে দাস বা গোলাম করে রাখতে প্রথম যে পদক্ষেপ তা হল, তার অতীত সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা বা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা। ১৯৭২ সালে আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন বাংলাদেশ হচ্ছে তলাবিহীন ঝুড়ি। এখন আর তাদের বলতে হয় না, এদেশের মানুষ নিজেরাই বলে এদেশে কিছু হবে না।  বর্তমান পরিস্থিতির উপর ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে অনেকে এদেশকে এমনভাবে গালি দেন যে, বাংলার অতীত বর্তমান সব এক করে ফেলেন। অথচ লর্ড ম্যাকেলের ২ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫ সালের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বক্তব্যে কি বলেছিলেন? বলেছিলেন, “আমি ভারতবর্ষের পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং উত্তর থেকে দক্ষিনে ভ্রমন করেছি কিন্তু কোন ব্যক্তি আমি দেখিনি যে কিনা একজন ভিক্ষুক বা চোর, এমন সম্পদ আমি এ দেশে দেখেছি, এমন নৈতিক মূল্যবোধ, এমন ধীশক্তিসম্পন্ন মানুষ (চারিত্রিক মূল্যবোধ), আমি মনে করিনা এইদেশকে আমরা পুরোপুরি নতিস্বীকার করাতে পারব যদি না আমরা তাদের এই মূল্যবোধের মেরুদণ্ড ভেঙে দেই, যা হল এই দেশের সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, তাই আমি প্রস্তাব করছি আমরা তাদের পুরোনো এবং প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থা বদলে ফেলার, তাদের সংস্কৃতি যদি এমন হয় যা কিছু বিদেশী যা কিছু ইংরেজি ভাষার তা তাদের যা আছে তা থেকে ভাল তাহলে তারা তাদের আত্মসম্মানবোধ হারাবে এবং তাদের সংস্কৃতির প্রতি হিনমন্য হয়ে পড়বে। তখন আমরা তাদেরকে যেরকম চাই সেরকম হয়ে পড়বে একটি পূর্ণাঙ্গ গোলাম জাতি”।

 

উপরোক্ত বক্তব্য জানা থাকলে হয়তো দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা থেকে বেরিয়ে আসা যেত।

 

১৭৫৬ সালের ১৩ ই এপ্রিল বাংলা-বিহার- উড়িষ্যার মসনদে আরোহন করেন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা।  তাঁর নবাবী কুসুমাস্তীর্ন ছিল না এবং ঘষেটি বেগম চেয়েছিলেন বাংলার শাসনভার নিজ হাতে গ্রহণ করবেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ষড়যন্ত্র করে সিরাজ-উ-দ্দৌলাকে বন্দী করবেন এবগ শাসনভার গ্রহণ করে সিংহাসনে বসবেন। খালা ঘষেটি বেগমের ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহ সিরাজ-উ-দ্দৌলা দৃঢ়হস্তে দমন করে কারারুদ্ধ করেন। অপরদিকে পূর্নিয়ায় খালাতো ভাই শওকত জঙ বিদ্রোহ করেন।  সিরাজ শওকত জঙ কে দমন করতে গিয়ে ঘোরতর যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে শওকত জঙ নিহত হলেন। ঘষেটি বেগম ও শওকত জঙের বিদ্রোহ দমন করলেও নবাবের সিপাহসালার মীরজাফর নবাব হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।  নবাবের নিকটাত্মীয় মীরজাফর আলী খান ও অন্যান্য সভাসদদেরকে নবাবের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তোলার জন্য ক্লাইভ গোপনে উমিচাঁদকে দালাল নিয়োগ করেন। উমিচাঁদের উদ্যোগে মীরজাফর আলী খান, রাজা রায়দুর্লভ, রাজা রাজ বল্লব, মহারাজা কৃঞ্চচন্দ্র এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্ট ওয়াটসন প্রমুখ জগৎশেটের বাড়িতে গোপনে  মিলিত হন।  এই গোপন বৈঠকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহযোগিতায় নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার এবং মীরজাফরকে নবাবী মসনদে বসানোর সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।  ১৭৫৭ সালের ২২ জুন রবার্ট ক্লাইভ তার বাহিনী নিয়ে পলাশী মৌজার লক্ষণবাগ নামের ২ বর্গমাইলব্যাপী আম্রকাননে এসে তাঁবু গাড়েন। ক্লাইভের ছিল ১০০০ ইউরোপীয় সৈন্য, ২১০০ ভারতীয় সিপাহি, ১০০ বন্দুকবাজ।  নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার ছিল ৩৫০০০ পদাতিক সৈন্য ও ১৫০০০ হাজার অশ্বারোহী সহ ৬৫০০০ সৈন্য।  ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ শুরু হলে মোহনলাল, মীরমদন ও সিনফ্রের আক্রমনে ক্লাইভের সৈন্যরা পিছু হঠতে বাধ্য হয়।  এ সময় ইংরেজ সেনাদের নিক্ষিপ্ত গুলিতে মীরমদন নিহত হলে মীরজাফর সেদিনের মত নবাবকে যুদ্ধ স্থগিত রাখার পরামর্শ দেন। মোহনলাল ও সিনফ্রে নবাবকে যুদ্ধ বিরতি না করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পরামর্শ দেন, কেননা ক্লাইভের সৈন্যগন পশ্চাৎপদ হয়ে আম্রকুঞ্জের আড়ালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু নবাব তাদের পরামর্শ আমলে না নিয়ে সেদিনের মত যুদ্ধ বিরতির আদেশ করেন।  বিজয়ের মুখে যুদ্ধ বন্ধ করার এই আদেশে নবাব সৈন্যদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।  আর এই সুযোগে মীরজাফরের ইঙ্গিতে আম্রকুঞ্জে লুকিয়ে থাকা ক্লাইভ বাহিনী নবাবের বিশৃঙ্খল বাহিনীর উপর আক্রমন চালায়। এদিকে নবাব বাহিনীর ৫০০০ সৈন্য যুদ্ধ করলেও বাকি ৪৫০০০ সৈন্য বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর আলী খান, ইয়ার লতিফ খান, খাদিম হোসেন, রাজা রায়দুর্লভ ও রাজা রাজবল্লভের নির্দেশে তাঁদের নেতৃত্বধীন সৈন্যগন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এবং অনেকে ক্লাইভের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে।  ফলে পলাশীর প্রান্তরে অনেকটা বিনা যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভ জয়লাভ করেন।  পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা আশঙ্খা করেছিল যে, বাংলার জনগণ এই ষড়যন্ত্র এবং সরাসরি বিদেশী শাসনকে মেনে নেবে না। সুতরাং তারা ১৭৫৭ সাল থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত ‘নবাব’ নামধারী মীর জাফরের বংশধর

 


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

আল্লাহর দয়া না থাকলে যতই বাঁধ নির্মাণ করেন কাজে আসবে না

         পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন,...

বাঁচতে চায় বিয়ানীবাজারের নুরুল ইসলাম

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: অর্থের অভাবে...

সিলেট মহানগর বিএনপির জরুরী সভা শুক্রবার

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: বিএনপির কেন্দ্রীয়...