বর্জ্য স্থান থেকে বিস্কুট এনে বাজারে বিক্রি!

,
প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর, ২০২১     আপডেট : ২ সপ্তাহ আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রত্যেক শহরেই নির্দিষ্ট একটি আবর্জনা ফেলার ডাম্পিং গ্রাউন্ড থাকে। যেমনটি আছে সিলেটে, নগরীর দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া পারাইরচকে। দিনের শেষে অন্যান্য পঁচা-বাসি খাবারের সাথে রেস্তোঁরা, ফ্যাক্টরির মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুটও সেখানে ফেলা হয়। কিন্তু সেই আবর্জনায় ফেলে দেওয়া বিভিন্ন ফ্যাক্টরির নোংরা, মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুট সুন্দর প্যাকেটজাত করে আবার বাজারে বিক্রির খবর পিলে চমকে যাবার মনে হলেও সেটি ঘটছে সিলেটে। যারা বিক্রির সাথে জড়িত তারা ঘটনাটি স্বীকারও করেছে। সাথে এও বলছে, সিটি কর্পোরেশন থেকে অনুমতি নিয়ে তারা বিস্কুটগুলো নিচ্ছে। আর সিটি কর্পোরেশন বলছে, লিজ নেয়ার সময় বিস্কুটগুলো মাছকে খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে।

দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া পারাইরচক ডাম্পিং গ্রাউন্ড এর নাম মনে হলে যে কোনো মানুষের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি ময়লার ভাগাড়ের ছবি। যেখানে ফেলা হয় গোটা শহরের প্রতিদিনের ময়লা আবর্জলা। আর সেই ফেলে দেয়ার কাজটি করছেন সিটি কর্পোরেশনের কিছু পরিচ্ছন্নকর্মী। পঁচা, দুর্গন্ধময় সেই স্তূপে প্রতিদিনের ময়লা আবর্জনার সাথে অনেক বিস্কুটও ফেলা হয়। শহরের খাদিমনগর, গোটাটিকর অথবা আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠা বিভিন্ন অভিজাত বিস্কুট কিংবা ব্রেড ফ্যাক্টরির মেয়াদোত্তীর্ণ অথবা নষ্ট হয়ে যাওয়া বিস্কুট সেখানে ফেলা হচ্ছে। সেই বিস্কুটগুলো বাজারে এনে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি করছে একটি চক্র। এ ঘটনায় গোটাটিকর, ষাটঘর, বান্দরঘাট ও পারাইরচক এলাকার বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে গত ১০ অক্টোবর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবরে একটি অভিযোগপত্র দেয়া হয়। সেই অভিযোগপত্রে তারা উল্লেখ করেন, এগুলো বর্জ্য। এখানে যা ফেলা হয় সেগুলো মানুষ এবং পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না করে এজন্য পুড়ানো হয়। কিন্তু বিস্কুট পুড়ানো হয় না। একটি চক্র সেগুলো ব্যাগে ভর্তি করে নিয়ে যায় বাজারে।

অভিযোগের ভিত্তিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছিটাগোটাটিকর এলাকার মৎস্যজীবী কানু বিশ্বাসের একটি মৎস্য খামার রয়েছে। ‘জোনাকি’ নামে সেই খামারের জন্য খাদ্য প্রয়োজন। তাই তিনি ময়লার ডাম্পিংয়ে ফেলে দেয়া বিস্কুটগুলো লিজ নেয়ার জন্য চলতি বছরের ২১ মে মেয়র বরাবরে একটি আবেদন করেন।

সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে এককালীন এবং প্রতিমাসে নির্দিষ্ট করে দেয়া টাকার শর্তে তাকে লিজ দেয়া হয়। লিজ নেয়ার পর তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটা সময়ে কয়েকজন শিশুকে ব্যবহার করে সেই বিস্কুটগুলো ময়লা থেকে পলিথিনের প্যাকেটের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তারই ভাতিজা নিশি। যদিও পরবর্তীতে মিলন ও সুমন নামে আরো দুইজন এ ব্যবসায় যুক্ত হন। তারা চারজন মিলে সেই বিস্কুট সংগ্রহের পর কালিঘাটের কিবরিয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. কিবরিয়ার কাছে বিক্রি করছেন। আর কিবরিয়া সেগুলো গরিব নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বিক্রি করছেন বলে দক্ষিণ সুরমার কয়েকটি গ্রামের মানুষ অভিযোগ করেছেন। মূল্য কম থাকায় অনেকেই এ বিস্কুটগুলো পরিবারের জন্য ক্রয় করছেন।

যোগাযোগ করা হলে কিবরিয়া স্টোরের কিবরিয়া বলেন, ‘এগুলো ফুলকলিসহ আরো কয়েকটি ফ্যাক্টরির বিস্কুট এবং বিস্কুটের গুঁড়া। আমার কাছে কানু বিশ্বাস বিক্রি করেন। তিনি বলেন, যাদের মাছের খামার আছে তারা এ বিস্কুটগুলো কিনে নেয়। মানুষ নিজেরা খাবারের জন্য যদি কিনে নেয় তাহলে আমি জানি না।’

কথা হলে কানু বিশ্বাস জানান, সিটি কর্পোরেশনের ফারুক ও হানিফ নামক দু’জন কর্মকর্তার মাধ্যমে সিসিকের ফান্ডে পঞ্চাশ হাজার টাকা জমা দিয়ে আমি লিজ নিয়েছি। এছাড়া প্রতিমাসে আরো পাঁচ হাজার করে টাকা দিচ্ছি। তিনি আরো বলেন, ‘এগুলো মাছের খাবার। এ বিস্কুট মানুষের কাছে আমরা বিক্রি করিনা। কালিঘাটে কিবরিয়া স্টোর সহ আরো কয়েকটি দোকানে বিক্রি করি। তারা এগুলো খামারীদের কাছে বিক্রি করছে না অন্যদের কাছে বিক্রি করছে তা আমরা জানিনা।’

গোটাটিকর ষাটঘর এলাকার বাসিন্দা হাজী দুলাল মিয়া জানান, এখানে যা কিছু ফেলা হয়, সেগুলো মানুষ কেন কোনো মাছের জন্যেও নিরাপদ নয়। ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানপাড়া খানবাড়ির বাসিন্দা মৃত এডভোকেট আসলাম খানের পুত্র নোমান খান জানান, ময়লার আবর্জনায় ফেলে দেয়া খাবার সিটি কর্পোরেশর লিজ দেয় কিভাবে? তিনি বলেন, এগুলো মানুষ কিংবা কোনো প্রাণীর খাবারের উপযোগী নয় বলেই তো ফেলা হচ্ছে, পুড়ানো হচ্ছে। সেগুলো লিজ হয় কিভাবে আমরা বুঝি না।’

এ প্রসঙ্গে কথা হলে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মোখলেছুর রহমান জানান, ‘এই খাবারগুলোতে ফাঙ্গাস তৈরি হয়ে যায়। সেই খাবার মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষ করে কোনো মানুষ নিয়মিত খেলে তার কিডনি এবং লিভারের সমস্যা হতে পারে।’

লিজ এবং বিস্কুটের প্রসঙ্গে কথা হলে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ‘আর কাউকে লিজ দেয়া হবে না। যাদের দেয়া হয়েছিলো সেই লিজও বাতিল করা হয়েছে।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন