বজ্রপাতের নিত্য উৎপাত

,
প্রকাশিত : ০৩ জুলাই, ২০২১     আপডেট : ৭ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ :
বিশ্বে মোট বজ্রপাতের ৭৮ শতাংশ সংঘটিত হয় ক্রান্তীয় অঞ্চলে। আর দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশ যেহেতু ক্রান্তীয় অঞ্চলের কাছাকাছি সেহেতু বাংলাদেশেও বজ্রপাত বেশি হয়ে থাকে। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের মতো আমেরিকায়ও ২৫ মিলিয়ন বজ্রপাত হয়ে গড়ে মারা যায় প্রায় ৫০ জন এবং আহত হয় প্রায় ১০০ জনের মতো মানুষ ডডখঘ এর গবেষণায় বলছে-‘২০০৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে সর্বাধিক বজ্রপাত ঘটে শ্রীলংকার দক্ষিণ-পশ্চিমে। যার ঘনত্ব ছিল প্রতি বছরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০টির বেশি। এবং পরের অবস্থানে ছিল মাদাগাস্কার ও পূর্ব-আফ্রিকার গ্রেটলেট যেখানে প্রতিবছর প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০-১২টি বজ্রপাত পরিলক্ষিত হয়।’ প্রতিবছর মার্চ মাস থেকেই বাংলাদেশে বজ্রপাত শুরু হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এর জন্য নানা কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ বায়ুমন্ডলের অস্থিরতা। অর্থাৎ শীত মৌসুমে দেশে প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত না হওয়া। তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বাতাসে সীসার পরিমাণ বৃদ্ধি। জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহারে আধিক্য। মোবাইল ফোন ব্যবহারের সাথে এর টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি। বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমে যাওয়া। জলাভূমি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়া, মোটর গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। কলকারখানা বৃদ্ধি পাওয়া। বৈদ্যুতিক টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ ও বায়ুর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। কৃষি কাজে ভারি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়াসহ সমুদ্রপৃষ্ঠে তাপমাত্রা বেড়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্দ্র ও উষ্ণবায়ু বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর দিক দিয়ে দেশের ভেতরে প্রবাহিত হচ্ছে এবং ঠিক একই সময়ে শুষ্ক ও ঠান্ডা বায়ু হিমালয় থেকে দক্ষিণে অর্থাৎ দেশের ভেতরে প্রবাহিত হচ্ছে বলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বজ্রঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। আর ঝড়ের মৌসুমে প্রতিবছর বাংলাদেশে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাত ঘটে যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের সম্পর্ক। আবহাওয়াবিদরা বলছেন-বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা আসার পূর্বে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বেশি হারে তাপমাত্রা বেড়ে বাতাসে জলীয়বাষ্পের আধিক্য দেখা দেয়। তাছাড়া দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্দ্র বায়ু আর উত্তরে আরব সাগর হয়ে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে সৃষ্টি হচ্ছে বজ্রঝড় যার ধাবমান ক্রিয়া দক্ষিণ-পূর্বদিকে। বজ্রপাতের ঋতুগত তারতম্য থেকে দেখা যায় প্রাক-মৌসুম সময়ে দেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। যেহেতু এ সময় সারাদেশের তাপমাত্রা অন্যান্য ঋতুর তুলনায় বেশি থাকে, সেহেতু ট্রপোস্ফিয়ারের তাপীয় গঠন তীব্র পরিচালনে সহায়ক বিধায় প্রাক-মৌসুমি সময়টা বজ্রপাত সংগঠনের জন্য খুবই উপযোগী। এর সঙ্গে যোগ হয় বাতাসের ধারাবাহিকতাহীনতা অথবা কেন্দ্রীয় ভারত থেকে দক্ষিণ উপদ্বীপ পর্যন্ত ঃৎড়ঁময এর সম্প্রসারণ। আর উপরিউক্ত কারণে প্রাক-মৌসুমে, বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাত বেশি হয়। এর সঙ্গে বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধি সম্ভবত একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে মৌসুমি ঋতুতে ভূমির উচ্চতা ঙৎড়মৎধঢ়যরপ ষরভঃরহম, উচ্চ ঈড়হাবপঃরাব ধাধরষধনষব ঢ়ড়ঃবহঃরধষ বহবৎমু (ঈঅচঊ) নিয়ামক সমূহ রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, রাজবাড়ী, সাতক্ষীরা, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বজ্রপাত সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। … পোস্ট-মৌসুমি সময়ে আন্তক্রান্তীয় অভিসৃতি জোনের (ওঞঈত) পশ্চাদপসরণ এবং বৃহদায়তন প্রচলন (খধৎমব ঝপধষব পরৎপঁষধঃরড়হ) সংশ্লিষ্ট বায়ুমন্ডলীয় পরিচলনের কারণে পার্বত্য জেলায়, বিশেষ করে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বেশি বজ্রপাত হয়ে থাকে। শীতকালে পশ্চিমা গোলযোগের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে তাজা আর্দ্রতার সরবরাহ এবং স্থানীয় বায়ুমন্ডলীর পরিচলনের প্রভাবে বাগেরহাট, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, সিলেট, খুলনা, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ জেলায় বজ্রপাত হয়।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম এ ফারুকের গবেষণা থেকে জানা যায়-বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। অধ্যাপক এম এ ফারুক বলেন-জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম ব্যবহার করে তিনি দেখতে পেরেছেন রংপুর বিভাগের মধ্যে ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। রাজশাহী বিভাগের মধ্যে চাপাইনবাবগঞ্জে। ময়মনসিংহ বিভাগে নেত্রকোণা। ঢাকা বিভাগে কিশোরগঞ্জে বজ্রপাতের আধিক্য বেশি। তিনি দেখতে পেরেছেন-সুনামগঞ্জ জেলায় বেশি বজ্রপাত হলেও মানুষ মারা যায় বেশি উত্তরাঞ্চলে। একটা জায়গায় বজ্রপাত বেশি হলেও মানুষ মারা যাচ্ছে কম, আবার অন্য জায়গায় বজ্রপাত কম হলেও মানুষ মারা যাচ্ছে বেশি। বাংলাদেশে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৯৪৮ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়-বাংলাদেশের সর্বাধিক ৫টি বজ্রপাতে আক্রান্ত এলাকা হচ্ছে-সিলেট, শ্রীমঙ্গল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর এবং সৈয়দপুর যেখানে প্রতিবছরে যথাক্রমে ৩২৪, ৩২৪, ২০৬, ১৯৫ এবং ১৭৯টি বজ্রপাত ঘটে থাকে। ‘বিগত ৬৬ বছরে শুধুমাত্র মে মাসের জন্য সিলেটে বজ্রপাত হয় এরূপ দিনের গড় সংখ্যা প্রতিবছরে ১০০টিরও বেশি।’ তাই বিজ্ঞানীরা বজ্রপাতের ঐকান্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করেন। তারা দেখান-‘১৯৯৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের এলাকায় মোট ৮৩ হাজার ৬৪১টি বজ্রফ্লাশ (বঙ্গোপসাগরে ১২ হাজার ১০৬টি আর ভূমিতে ৭১ হাজার ৫৩৫টি) রয়েছে। যার মধ্যে ১৮ দশমিক ৭০ শতাংশ হয়েছে স্থানীয় সময় রাত ১২টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে। সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টার মধ্যে হয়েছে ৪০ দশমিক শূন্য ৬ এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে সংঘটিত হয়েছে মোট ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় বেলা ১টায় (৬ দশমিক ৯২ শতাংশ) আর সবচেয়ে কম হয় রাত ১২টায় (শূন্য দশমিক ৬৬ শতাংশ)। … ১৬ বছরের মাসিক ফলাফলে দেখা যায় সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৮৪ শতাংশ বজ্রপাত হয়ে থাকে মে মাসে যা কিনা প্রাক-মৌসুম সময়বলে পরিচিত। এরপর রয়েছে এপ্রিলের অবস্থান (২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ) অন্যদিকে, ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ বজ্রপাত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময়ে হয়ে থাকে, আর বাকি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ সংঘটিত হয় বছরের অন্যান্য মাসে। গত ১৬ বছরে একমাত্র ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে মাত্র ৮টি বজ্রপাত সংঘটিত হয় আর জানুয়ারিতে হয়েছিল মোট ৯৬টি (শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ) … ঋতুগত তারতম্য বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান-৫৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ বজ্রপাত সংঘটিত হয় প্রাক-মৌসুমে (মার্চ-মে) ১২ দশমিক ৪১ শতাংশ ৪ মৌসুমি ঋতুতে (জুন-সেপ্টেম্বর) ১২ দশমিক ৮৮ শতাংশ পোস্ট-মৌসুমি সময়ে (অক্টোবর-নভেম্বর) এবং ১৬ দশমিক ২৭ শতাংশ হয় শীতকালে (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি) প্রতিবছর গড়ে ৫ হাজার ২৭৭টি বজ্রফ্ল্যাশ সারাদেশে হয়, তবে এর সবই যে প্রাণঘাতী তা নয়।’ এতো গেলো বজ্রপাতের ঐকাহিক ফলাফল বিশ্লেষণ। এবার চোখ ফেরানো যাক আরেকটি বিশ্লেষণে। এখানে আমরা দেখতে পাই-বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষ আক্রান্ত জেলা হচ্ছে ৫টি। তার মধ্যে সুনামগঞ্জে (গত ১৬ বছরে মোট বজ্রপাতের ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ) সিলেট (৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ) রাঙামাটিতে (দশমিক ৬০ শতাংশ) নেত্রকোণাতে দশমিক ৩৬ শতাংশ) এবং দিনাজপুর (২ দশমিক ৬৬ শতাংশ) আর সবচেয়ে কম আক্রান্ত পাঁচটি জেলা হচ্ছে-বরগুনা (শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ) মেহেরপুর (শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ) ঝালকাটি (শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ) জয়পুরহাট (শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ) ও চুয়াডাঙ্গা (শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ)’। আবার ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আরেক গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়-সারাদেশের মোট বজ্রপাতের ১৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগে। ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ সিলেটে। ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ রংপুর। ১৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ ঢাকা। ১১ দশমিক ১১ শতাংশ রাজশাহী। ১০ দশমিক ৫১ শতাংশ খুলনা এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ বজ্রপাত সংঘটিত হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর তড়িৎ ও ইলেকট্রিক্যাল কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম খান যতোই শোনানা না কেন-একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০০ মেগা ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে থাকে। যা একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য মাত্র ১০০ ভোল্টই যথেষ্ট। আমরা তাঁর কথা কানে তুলবো সচেতনতার জন্য। আবার প্রতিকার ব্যবস্থাকে সর্বাংশে সত্য জেনে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বজ্রপাত নিরোধে সচেষ্ট হয়ে ওঠবো।

বজ্রপাতের অতীত ইতিহাস ঘাটলেইতো আমরা দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে দুর্যোগের তালিকায় এক নম্বরে ছিলো কিন্তু বিংশ শতাব্দিতে একে জয় করে তারা প্রাণহানী ও সম্পদহানীকে কমিয়ে দিয়েছে শুধুমাত্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিজ জনসংখ্যাটি কমিয়ে আনার কারণে। বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম যখন বলেছেন,-বজ্রপাতের প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট আগে আগেই ভারতের কর্নাটকে সতর্কতামূলক এসএমএস দিচ্ছে। টাওয়ার স্থাপনের মাধ্যমে বজ্রপাত কমিয়ে আনছে ভিয়েতনাম। এছাড়া বিভিন্ন জরুরী পদক্ষেপ নিয়ে বজ্রের আধিক্যতা যেহেতু কমিয়ে আনতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র তবে আমরাও তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারি অনেক দূর। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ.এস.এম মাকসুদ কামাল বলছেন-আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ও লাইটেনিং অ্যারেস্টর স্থাপনের মাধ্যমে মানুষকে মৃত্যুর কাছ থেকে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেওয়া যায়। পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর আকাশে মেঘের গুড় গুড় গর্জন হলেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। অপরদিকে পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে বজ্রপাতে মৃত্যুর আশংখা কম থাকলেও সতর্ক থাকতে হয়। এছাড়া বাংলাদেশে বজ্রঝড় উৎপন্ন হওয়ার স্থান ও সময় কিংবা তার গতিপ্রকৃতি, বিস্তৃতি, জীবনকাল ইত্যাদি নিয়ে গভীর পর্যালোচনার জন্য ভূমিতে নির্মিত বজ্রপাত পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক এবং অপটিক্যাল ট্রান্সিয়েন্ট ডিটেক্টর (ঙঞউ) বা লাইটনিং ইমেজিং সেন্সর (খওঝ) এর মতো স্যাটেলাইট যন্ত্রের সমপ্রয়োজনের কথাও বিশেষজ্ঞরা বলছেন। বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলছেন-বজ্রপাতে মৃত্যুর জন্য প্রায় ৯৯ শতাংশই ঘটেছে বাইরে খোলা আকাশের নিচে। তাই মেঘলা আকাশ দেখলেই যথাসম্ভব খোলা আকাশের নিচ থেকে নিরাপদে চলে আসতে হবে। হাওরাঞ্চলে আর্দ্রতা ও উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকায় দুই অঞ্চলে বজ্রপাত বেশি হওয়ার কারণ থাকে বিধায় ভারত, ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যায়। ইতোমধ্যে বজ্রপাত নিরোধে তাল গাছ রোপণ করে অনেক সফলতা দেখিয়েছে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। তাই এই সহজ পদ্ধতিটিকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশও বেশ উদ্যোগী হয়েছে বলে জানা যায়। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ তাল গাছের চারা দেশব্যাপী রোপিত হয়েছে বাকি রোপণ প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষমান।
নারিকেল, সুপারি, খেজুর, সুপারি গাছের মতো তাল গাছ পামী পরিবারভুক্ত হলেও তাল গাছ একদল বীজপত্র দলীয় এবং গাছের শেকড়গুচ্ছ মূল বিশিষ্ট বলে এর শেকড় গভীরে পৌঁছে মাটিকে সমানভাবে ধরে রাখে। ৫০ থেকে ৮০ ফুট লম্বা হওয়া এ তালগাছে ৩৫ থেকে ৫০টির মতো পাতা থাকে আর পাতাগুলো বেশ সূঁচালো বলে বজ্রপাতকে আটকে দিয়ে প্রাণীকূলকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, যার আঙ্গিনায় বা যিনি তালগাছকে ভালোবেসে রোপণ করবেন গাছটিও তাকে নিরাশ করবেনা। কারণ পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এ গাছের ফল দেহে ভিটামিন ও মিনারেলের যোগান দিতে পারে। তাছাড়া ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও ক্যালরির উপস্থিতিও তালে আছে বেশি বেশি। রসতো থাকলোই। রসে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন। গুড়ে রয়েছে মিনারেল। ওষুধি গুণের মধ্যে রয়েছে আমাশয় নিরাময়, মুত্র প্রবাহ বৃদ্ধি, পেটের পীড়া, কোষ্ঠকাঠিন্য নিরসন। শরীরের ক্লান্তি দূর থেকে শক্তি বাড়ানো এবং অনিদ্রা দূর করতেও সহায়ক। কাঁচা পাকা তালের গাছ থেকে গ্রামীণ জনপদি মানুষের টিনের বা সেমিপাকা ঘরের যোগানদাতার কথাও ভুলতে পারে না মানুষ। গ্রামীণ জনপদের রাস্তায়, ধান ক্ষেতের আলে, বাড়ির সীমানায় তালগাছ শুধু সৌন্দর্যই ডেকে আনেনা দিকবিদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বাবুই পাখি অনুপম শিল্প সুষমায় বাড়ি নির্মাণ করে প্রকৃতির বংশকে টিকে থাকা নিশ্চিত করে। তাই হয়তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বসে থাকতে পারেন না-তিনিও কলম চালিয়ে দেন-তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে …’। নারিকেল গাছকেও বজ্রপাত নিরোধে প্রশ্রয় দেওয়া যায়। যেহেতু গাছটি তালগাছের মতো উঁচু না হলেও এই গাছটিও বজ্রনিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাছাড়া শরীরের শক্তি বাড়িয়ে কর্মোদ্দীপনায় সহায়তা করে। এতে থাকা ভিটামিন, মিনারেল ও এমিনো এ্যাসিড শোষণ করে ও ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ডায়াবেটিসজনিত কারণে শরীরের শক্তি রোধ করে। বজ্রপাত রোধে সুপারি গাছও প্রাধান্য বিস্তার করে গ্রামীণ সমাজ কিংবা আবহাওয়াবিদদের কাছে। কাজেই বজ্রনিরোধে একে প্রশ্রয় দেওয়া খুব জরুরী। যেমন করে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতায়Ñ
‘… নিশীথিনী যায় দূর বন-ছায়, তন্দ্রায় ঢুলুঢুল্,
ফিরে ফিরে চায়, দু’হাতে জড়ায় আঁধারের এলোচুল।
চমকিয়া জাগি, ললাটে আমার কাহার নিশাস লাগে?
কে করে বীজন তপ্ত ললাটে, কে মোর শিয়রে জাগে?
জেগে দেখি, মোর বাতায়ন-পাশে জাগিছে স্বপনচারী
নিশীথ রাতের বন্ধু আমার গুবাক-তরুর সারি! …’
তথ্য ঋণ : জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকা, জার্নাল ও অনলাইন পোর্টাল।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : ঘর থেকে বের হলে আটক, জরিমানা

আরও পড়ুন

বাবুইর হাসি

        শেখ এস. রেহমান (বিলাল): একদিন...

সিলেটে বিয়ারসহ দুজন গ্রেফতার

        সিলেট নগরীর খাসদবির এলাকা থেকে...

হেবরনে বঙ্গবন্ধুর নামে সড়ক হবে

        বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ...

সিলেট জেলা বিএনপির অনশন শনিবার

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :  বাংলাদেশ...