বঙ্গবীর ওসমানী একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস

,
প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তাসলিমা খানম বীথি: পৃথিবীতে সব মানুষই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারে না। কিছু কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা মরে গিয়েও অমর হয়ে থাকেন। জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। যিনি নিজের কাজের মাধ্যমে জাতির হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করে আছেন।
বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতার এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী জাতির জন্যে অহংকার বয়ে আনেন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক বাঙালি এবং প্রচারবিমুখ নির্ভেজাল একজন দেশপ্রেমিক। জীবনদ্দশায় তিনি জাতির যে কোন দুর্যোগ মুহুর্তে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। জাতিকে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে হয়েছেন এই সর্বত্যাগী মহান পুরুষ।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিকনায়ক বঙ্গবীর এম.এ জি ওসমানী ১লা সেপ্টেম্বর ১৯১৮ সালে সুনামগঞ্জ শহরে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান এবং মাতা বেগম যোবেদা খাতুন। হযরত শাহজালাল (রঃ)’র সাথী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত নিজাম উদ্দিন ওসমানীর অধ:স্তন পুরুষ মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী। হযরত নিজাম উদ্দিন ওসমানী সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার দয়ামীর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। দয়ামীর গ্রামেই তার মাজার অবস্থিত। দয়ামীর গ্রামেই আতাউল গনি ওসমানীর পিতার বাড়ি। তার নানার বাড়ী বিশ^নাথ থানার রায়খাইল গ্রামে। পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান আসাম সিভিল সার্ভিসে কর্মরত ছিলেন। পুত্র আতাউল গনি ওসমানীর জন্মকালে তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমার এস.ডি ও এর দায়িত্বে ছিলেন।
পিতার চাকুরীর সুবাদে আতাউল গণি ওসমানিকে বিভিন্ন স্থানে লেখাপড়া করতে হয়। কিছুদিন গৌহাটিস্থ কটন স্কুল পরে সিলেট সরকারী হাইস্কুলে লেখাপড়া করেন। সিলেট সরকারী হাইস্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে মেট্টিক পাশ করেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রিটোরিয়া পুরষ্কার লাভ করেন। ম্যাট্রিক পাশ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিখ্যাত আলীগড় মুসলিম বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৩৮ সালে বি,এ পাশ করে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু এম. এ ফাইনাল পরীক্ষার পূর্বে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৩৯ সালে ২য় বিশ^যুদ্ধ চলাকালে তিনি দেরাদুন মিলিটারী কলেজে অফিসার ক্যাডেট কোর্সে যোগদান করেন।
১৯৪০ সালে তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কিংস কমিশন লাভ করেন ১৯৪১ সালে ক্যাপ্টেন, ১৯৪২ সালে অল্প বয়সে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর পদে পদোন্নতি লাভ করেন। পিতা সির্ভিল সার্ভিসের ছিলেন বিধায় পিতার ইচ্ছা ছিল ওসমানী ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (অর্থাৎ আই.সি.এস)-এ যোগদান করতে সক্রিয় হবেন কিন্তু নিজ ইচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল ২য় বিশ^যুদ্ধ চলাকালীন তিনি বার্মা যুদ্ধক্ষেত্রে জাপানিদের বিরুদ্ধে সক্রিয় অংশ গ্রহন করেন। ১৯৪৫ সালে বিশ^যুদ্ধ শেষ হলে তিনি পিতার ইচ্ছা পূরণের জন্য পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনকল্পে ১৯৪৬ সালে আই.সি.এস পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে সাফল্যের সাথে কৃতকার্য হন এবং ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগদানের জন্য মনোনীত হন। কিন্তু উক্ত চাকুরীতে যোগদান না করে স্বস্থানেই অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন। আলীগড় বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আলীগড়ের প্রভাব প্রতিফলিত হয় ওসমানীর জীবন চলার পথে। সুশৃঙ্খল দেশপ্রেমিক, মুসলিম সুনাগরিক সৃষ্টির লক্ষ্যে আলীগড় বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। আলীগড়ে অধ্যয়নকালে তিনি ইউ.টি.সি সদস্য ভুক্ত হন। তখন থেকেই ওসমানী সৈনিক জীবনের লক্ষ্য বেছে নেন। তাই হয়তো মর্যাদাশীল চাকুরী আই.সি.এস গ্রহণ না করে সৈনিক জীবন পছন্দ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করে ভারত বিভক্ত পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।
ভারত বিভাগের পূর্বেই তিনি ১৯৪৭ সালে লে: কর্ণেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। কিন্তু ওসমানী ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে লে: কর্ণেল পদে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সিনিয়র সেনা অফিসার হিসাবে বিভিন্নস্থানে বিভিন্ন রেজিমেন্টে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন হোক তা পাকিস্তানী সামরিক বেসামরিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা চাইতেন না। কিন্তু তিনি তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠার অন্যান্য কয়েক বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তাদের সাথে একাত্ম হয়ে অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। তাই ওসমানীকে বেঙ্গল রেজিমেন্টর জনক বলা হয়। ওসমানী সেনাবাহিনীতে বাঙ্গালীদের ন্যায্য দাবী আদায়ে সোচ্চার ছিলেন বিধায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কোনো পদোন্নতি হয়নি যদিও তার সমকক্ষ সমসাময়িক কর্মকর্তারা পদোন্নতি লাভ করে জেনারেল পর্যন্ত হয়েছিলেন। চাকুরী জীবনের শেষ পর্যায় তিনি রাওয়ালপিন্ডি সেনা সদরে বিভিন্ন স্টাফ কার্য পরিচালনা সিয়াটো সেন্টো জোটে দক্ষতার সাথে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি পাকিস্তান এয়ার ডিফেন্স কমিটির সদস্য ও পাকিস্তান সেনা স্পোর্টস কন্ট্রোল বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ওসমানী পাকিস্তান শাসক চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সেনাবাহিনীতে কুড়ি বৎসর চাকুরী করে লেঃ কর্ণেল থেকে কর্ণেল পদে পদোন্নতি লাভ করে ১৯৬৭ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহন করেন।
দীর্ঘ কুড়ি বৎসর পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নিয়োজিত থাকাকালে কর্ণেল ওসমানী স্বচক্ষে অবলোকন করলেন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর অবহেলা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের বাঙ্গালী জনগণ। ওসমানী বাঙ্গালীরা যে সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার সে বিষয়ে অনুধাবন করতেন এবং পাকিস্তানী শাসক চক্রের শোষণ থেকে মুক্তির চিন্তা করতেন। মধ্যে মধ্যে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর ওসমানী বাঙ্গালীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে পাকিস্তানে বিদ্যমান সবক’টি রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি ও মেনিফেস্টো পর্যালোচনা করতে লাগলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র মেনিফোস্টা পর্যালোচনা করে আওয়ামীলীগের গঠনতন্ত্র মেনিফোস্টো এবং ছয় দফার বাঙ্গালীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দিক নির্দেশনা তাঁর মন:পুত হয়। পরে কর্ণেল ওসমানী আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে এক দীর্ঘ আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনা ফলপ্রসু হলে তিনি ১৯৭০ সালে জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। কর্ণেল ওসমানী ১৯৭০ সালে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হয়ে সিলেট জেলার বালাগঞ্জ-গোলাপগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এম.এন.এ নির্বাচিত হন।
২৫শে মার্চ দিনগত শেষ রাতে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য দেশদ্রোহী অভিযোগ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার নিজ বাসভবন ৩২নং সড়ক ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার করে পাক সামরিক শাসকচক্র পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। শুরু হয় বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ। বাংলাদেশকে মুক্তির লক্ষ্যে আওয়ামীলীগসহ অন্যান্য রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ ছাত্র জনতা পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহন করে, মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে আতœনিয়োগ করেন।
মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী এম.এন.এ বাংলাদেশকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে ভারতে পাড়ি দিলেন। আত্মনিয়োগ করলেন মুক্তিবাহিনীকে সংগঠিত করতে। ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হলে কর্ণেল এম.এ. জি ওসমানী নিযুক্ত হলেন মুক্তিবাহিনীর তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। বিরাট দায়িত্ব কাঁধে নিলেন অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা কর্ণেল ওসমানী। বিশে^র অন্যতম অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংগঠিত, অস্ত্রবিহীন প্রশিক্ষণ বিহীন নবগঠিত ক্ষুদ্র মুক্তিবাহিনী দ্বারা মোকাবিলা যে কত বড় সাহসের কাজ তা কর্ণেল ওসমানী অনুধাবন করেই দায়িত্ব কাঁধে নিলেন। এছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না তাও তিনি জানতেন।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানী মুক্তি সেনাদের সংগঠিত করতে লাগলেন। তার প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিকাংশ সেনা সদস্য সেনা কর্মকর্তা সহ ভারতে চলে গিয়েছিলেন। তিনি সকল স্তরের সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে ১১ জনকে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। কোন কোন সময় সেক্টর কমান্ডার পরিবর্তন করা হয়েছে। যেহেতু পাকিস্তান সেনাবাহিনী সুসংগঠিত উচ্চ ট্রেনিংপ্রাপ্ত বিশে^র অন্যতম সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী তাই তিনি পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের পথ বেছে নিলেন। বিশাল রণাঙ্গেন একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত সফর করতে লাগলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ বোধ করতো। অক্লান্ত পরিশ্রম করে সাহসের সাথে সফলভাবে নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে (মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনা বাহিনী) যৌথ বাহিনীর কাছে বিশে^র অন্যতম সেরা পাকিস্তানী সেনা বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অবশেষে তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলদেশ স্বাধীন হয় ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। অপর্যাপ্ত অস্ত্র দ্বারা গেরিলা যুদ্ধ এবং সম্মুখ যুদ্ধে বিশাল পাক বাহিনীকে পরাস্ত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা মুক্তিবাহিনীর বিজয় এক বিরাট অর্জন। এ সফলতার কারণে বাংলার আপামর জনতা স্বত:স্ফূর্ত কর্ণেল ওসমানীকে স্বাধীনতার পর ‘বঙ্গবীর’ উপাধিতে ভূষিত করে। স্বাধীনতা লাভের পর কর্ণেল ওসমানীকে জেনারেল পদে পদোন্নতি প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।
১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে এম.এ.জি ওসমানী বালাগঞ্জ বিশ^নাথ নির্বাচনী এলাকা থেকে এমপি নির্বাচিত হন এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের নৌ-পরিবহন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত হলে তিনি প্রতিবাদ করে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বাকশাল গঠন আইনে পরিণত হলে জেনারেল ওসমানী সংসদ সদস্য পদ থেকেও ইস্তফা দেন।
বঙ্গবীর ওসমানী ছিলেন আজীবন গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সমর্থক। কোনো দিনই ডিক্টেটরশীপ বা স্বেচ্ছাচারিতাকে পছন্দ করতেন না। সৈনিক জীবনে ওসমানী এ সকল অবদান তাঁর গণতান্ত্রিক চরিত্রেরই পরিচয় বহন করে। ১৯৬৭ সালে বঙ্গবীর ওসমানী পাকিস্তানী সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহন করেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহনের পূর্বে আইয়ূব খান সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে কখনো বিদেশে রাষ্ট্রদূতের সরকারী উচ্চ পদ গ্রহনের, প্রস্তাব পাঠানো হয়, কখনো বা মন্ত্রীত্ব গ্রহনে আহবান জানানো হয়। কিন্তু তিনি প্রতিবারই এমন প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। ওসমানী গণতন্ত্রে বিশ^াসী ছিলেন বলেই সামরিক জান্তা ও ডিক্টেটর আইয়ূব খানের এমন অগণতান্ত্রিক প্রস্তাবে নারাজী জানান।
১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে দেশে একটি অভ্যুত্থান ঘটে। ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। ৭ই নভেম্বরের সফল বিপ্লবের পর বিপ্লবী বাহিনীর পক্ষ থেকে দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ববার গ্রহণের জন্যে ওসমানীর কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়। তখনকার রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ও ওসমানীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ওসমানী অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা গ্রহন করতে কিছুতেই রাজী হননি। বঙ্গবীর ওসমানী গণতন্ত্রেও মানসপুত্র ছিলেন বলেই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা গ্রহনের এমন সূবর্ণ সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
বঙ্গবীর ওসমানী ছিলেন আজীবন গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ^াসী। স্বজাতির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। গণতন্ত্র বিরোধী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা বিদ্র্যেহ করেছেন। অগণতান্ত্রীক পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহনের সুযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বারবার। ওসমানীর গণতান্ত্রিক আদর্শই তাঁকে করেছে স্মরনীয় ও বরণীয় এক আদর্শ পুরুষ।
ব্যক্তিগতভাবে ওসমানী ছিলেন অত্যন্ত নিরহংকারী, বিনয়ী ও শৃঙ্কলাবোধসম্পন্ন। একজন সিপাহি দেখা করতে এলেও সাদরে তাকে সোফায় বসাতেন। সহযোগী হিসাবে সম্মান দিতেন। সম্পত্তি ও বিলাসিতার প্রতি ছিল তাঁর অনীহা।
বঙ্গবীর ওসমানীর সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা ও অনাবিলতা। যশ বা অর্থের লোভে তিনি কোনদিনই কোন কাজে হাত দেননি। দেশের প্রতি অপরিসীম দরদের জন্য তিনি নানা সংকটপূর্ণ সৈন্য বিভাগের চাকরি গ্রহন করে ছিলেন এবং আজীবন কৌমার্য ব্রত পালন করে দেশের সেবা তিনি করে গেছেন।
ওসমানীর পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে সিলেট শহরের নাইওরপুল মহল্লায় জমি ক্রয় করে বাংলো টাইপের বাড়ি নির্মাণ করেন। ওসমানীর অনুরোধে বড়ভাই নুরুল গণি-এর নামে তাঁর পিতা শেষ বয়সে বাড়িটি দলিল করে দেন। পরে বড় ভাই ওসমানীর নামে এ বাড়িটি লিখে দেন। ভাইয়ে ভাইয়ে সুসম্পর্কেও এটি একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেহেতু ওসমানী ছিলেন চিরকুমার সেহেতু তিনি মৃত্যুর পূর্বে পিতামাতার নামে ‘দি জোবেদা খাতুন-খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্ট’ করে যান। ট্রাস্টের উদ্দেশ্য ছিল গরিব ও মেধাবী মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান।
১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধে ওসমানীর অবদান, আজীবন দেশপ্রেমের স্বীকৃতি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে নূর মঞ্জিলকে জাদুঘর হিসাবে প্রতিষ্ঠাকল্পে ট্রাস্টের সঙ্গে কিছু শর্তসাপেক্ষে দীর্ঘমেয়াদি লিজ গ্রহন করে। সেই থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ কিছু সংস্কার করে সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের অধীনে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রনাধীন ওসমানী জাদুঘর হিসাবে জনগনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
ওসমানী জাদুঘর পরিদর্শন করলে ওসমানী সম্পর্কে সবার ধারনা জন্মাবে যে, তিনি কত সহজসরল জীবনযাপন করতেন। তিনি ইচ্ছা করলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা গ্রহন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন সবসময় নিয়মতান্ত্রিক। তিনি নিজে কঠোরভাবে নিয়ম মানতেন এবং অন্যকে নিয়ম মানতে উৎসাহ দিতেন।
১৯৮৩ সালের মধ্যভাগে তিনি অসুস্থ হয়ে প্রথমে ঢাকাস্থ সম্মিলিত মিলিটারী হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে যান। লন্ডনে চিকিৎসারত অবস্থায় ১৯৮৪ সালে ১৬ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গবীর এম.এ.জি ওসমানী ইন্তেকাল করেন। তার লাশ ঢাকায় পৌছার পর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদে দক্ষিণ প্লাজায় কিছু সময় সংরক্ষণ করা হয়। সেখানে বঙ্গবীরকে শেষ শ্রদ্ধা প্রদর্শনে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। অত:পর হেলিকপ্টারযোগে লাশ সিলেটে নিয়ে আসা হয়। সিলেটে আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে স্মরণকালে সর্ববৃহৎ নামাজে জানাজা সম্পন্ন হলে জাতীয় বীরের মর্যাদা সামরিক কায়দায় গান স্যালুট প্রদান করা হয়। তার ইচ্ছা অনুযায়ী হযরত শাহজালালের দরগায় তার মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
ওসমানী আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠা পেলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। জেনারের ওসমানী আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবস্মিরণীয় অগ্নিপুরুষ- যাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় চির স্মরনীয় হয়ে আছে এবং থাকবে।
পৃথিবীতে শুধু দেওয়ার জন্য ক্ষণজন্মা কিছু লোকের আগমন ঘটে। কোন কিছু পাওয়ার সাধ তাদের প্রলুদ্ধ করতে পারে না। নিজেকে যারা সৃষ্টির কল্যানে তিলে তিলে বিলিয়ে দিতে এসেছেন তারা বসে থেকেই শুধু তৃপ্ত হননা, বরং নর্দমার নিগৃহিত কোনে আলোকচ্ছটার ছড়াছড়ি নিয়েই তাদের মরণপন সংগ্রাম। দেশ সমাজ ও জাতির কল্যানে পৃথিবীতে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের কখনো মৃত্যু হতে পারে না।
‘পরম করুণাময় আল্লাহ আমাকে পৃথিবীতে সর্বোৎকৃষ্ট জীব অর্থাৎ মানুষরূপে পাঠিয়েছেন, অথচ আমি যদি পরবর্তী বংশধরদের জন্যে কোনো আদর্শ রেখে যেতে না পারি তাহলে আমার জন্মের স্বার্থকতা কোথায়…বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী চেয়েছিলেন তার জন্ম সার্থক হোক- ‘বঙ্গবীর ওসমানী’ শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। বাঙালি জাতির সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধের অখন্ড ইতিহাস। তাই তো তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন আমাদের ইতিহাসে সিলেটের কৃতি সন্তান বঙ্গবীর এম.এ.জি ওসমানী। সবশেষে বঙ্গবীর ওসমানী কথা দিয়ে শেষ করছি ‘জীবনের সময় খুব কম। এই আছি এই নাই। অতএব, যখনকার যা কাজ তাড়াতাড়ি তা করে ফেলবেন…।
তথ্য সূত্র:
১.আলোকিত সন্তানদের স্মরণে-এম.এ.করিম চৌধুরী
২. ওসমানী ও একটি পতাকা- আলী ইসমাইল
৩.জেনারেল ওসমানী-এম. আতাউর রহমান পীর
৪.বঙ্গবীর ওসমানী- মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

গোয়াইনঘাটে ছাত্র মজলিসের বিক্ষোভ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : বাংলাদেশ...

চিকিৎসকের কক্ষে কিশোরী ধর্ষিত: হাসপাতালে তোলপাড়

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট ওসমানী...

বিশ্ব এখন মহাসংকটকাল অতিক্রম করছে-কর্নেল অলি

1        1Shareসিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক লিবারেল ডেমোক্রেটিক...