ফ্ল্যাশব্যাক শহিদ সুলেমান এবং

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 হ্যামট্রামেক,মিশিগান,ইউএসএ থেকে হারান কান্তি সেন:
স্বাধীনতার এই মাসে সুদূর আমেরিকায় বসে ফেলে আসা দেশের কথা ভাবতে ভাবতেই আমার দিন যায়।বাসায় বসে অখন্ড অবসরে সবকিছু ভাবি -বিশেষ করে বাংলাদেশের কথা ভাবি।আজকে আপনাদের শোনাবো এক কাকতালীয় ঘটনার কথা যা আমার এক প্রিয় মানুষ আমেরিকা প্রবাসী অগ্রজপ্রতীম এড.জহিরুল আনাম খান মারুফ ভাই বড় দু’ বোন রীনা আপা ও হেনা আপা’র কথোপকথন থেকে শোনেন এবং তাঁর কাছ থেকে আমি।
মার্চ স্বাধীনতার মাস।বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ স্বাধীনতার ঘোষণা হয়।উত্তাল বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় কলেজ ছাত্র সুলেমান হোসেন বিশ্বনাথ উপজেলার ছোট দিঘলী(বর্তমান সুলেমান নগর)গ্রামের নিজ বাড়ি(বড় বাড়ি) হতে এক চাচাত ভাই (তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নায়েক)গোলাম মোস্তফা সহ চলে যান কুলাউড়া উপজেলার(মৌলবীবাজার জেলা)বরমচালে নানা বাড়ি ।ওখানে গিয়ে তারা দু’জন উদ্দীপ্ত মন নিয়ে সঙ্গোপনে (অবস্হানগত কারণে) এ গ্রাম ও গ্রাম চষে বেড়াতে থাকেন সমমনাদের খোঁজে।এক পর্যায়ে তারা যান বরমচালের সিঙ্গুর(খাদিমপাড়া)গ্রামে সিলেট শহরের আম্বরখানা কলোনী থেকে ভয়াবহ পরিস্হিতিতে পালিয়ে আসা (দিলাওয়ার খান-ইলিয়াস আলী’র বাড়ি) রীনা আপা,হেনা আপা,ফারুক( রোটা:নূরুল আনাম খান ফারুক)ভাইয়ের গ্রামের বাড়ি।ওই বাড়িতে বেশ কিছুক্ষণ অবস্হানকালে সুলেমান হোসেন রীনা আপা,হেনা আপা ও তাঁদের আম্মার কাছ থেকে প্রাণভয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে আসার সময় নানান পরিস্হিতির মুখোমুখি হওয়া ও দু:খ কস্টের কথা শোনেন।এক পর্যায়ে তারা লাক্কাতুরা-মালিনীছড়া চা বাগানের লেবার ও তাদেের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া,আগুনের কালো কুন্ডুলী আম্বরখানা কলোনীর সামনের রাস্তা (এয়ারপোর্ট রোড)দিয়ে দিন-রাত লেবার ও সাধারণ মানুষ দলে দলে অবর্ণনীয় দু:খ কষ্টের মাঝে এক কাপড়ে বাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার বর্ণনা দেন সুলেমান হোসেনের কাছে। এই বর্ননা শুনে কেমন কাতর হয়ে যান সুলেমান হোসেন।পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে তেজি হয়ে ওঠেন সুলেমান হোসেন।প্রতিশোধের নেশায় সুলেমান হোসেন মিসেস দিলাওয়ার খানকে বলেন-“ওগো তোমার ছেলে হারুন মামু( খায়রুল আনাম খান)কবে ঢাকা থেকে আসছেন?”উত্তরে রীনা আপা,হেনা আপা বলেন-“ভাইয়ার কোন খোঁজ খবর নাই।” এ কথা শুনে সুলেমান হোসেনের সহযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা নিরাশ হয়ে যান।বলেন-” চল,ওঠো আমরা যাই।”তখন বাড়ির মধ্য থেকে সবাই বলে ওঠেন-ভাত খেয়ে যান।এরপর সুলেমান হোসেন,গোলাম মোস্তফা সন্ধ্যা হওয়া অবধি ওই বাড়িতে থেকে যান।পরক্ষণে তারা বিভিন্ন আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন।
উল্লেখ্য,সুলেমান হোসেন মাঝে মাঝে স্কুল ম্যাগাজিনে ইংরেজিতে কিছু লিখতেন।তাঁর এমনি একটি লিখা মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরেও রীনাআপা,হেনা আপা’র কাছে সংরক্ষিত ছিল।সুলেমান হোসেনের ইংরেজি হাতের লিখাও নাকি খুব চমৎকার ছিল।
ওইদিন তারা দু’জন দুপুরের পর খাওয়া-দাওয়া করে ও বাড়িতে অনেকক্ষণ থেকে গল্পগুজব করেন।সন্ধ্যার পর তারা অজানা গন্তব্যের উদ্দশ্যে বেরিয়ে যান।যাবার সময় সুলেমান হোসেন অধিকন্তু তরুণ ফারুক ভাইয়ের(নূরুল আনাম খান ফারুক)দিকে তাকিয়ে বলেন-“চলো আমাদের সাথে-দেশের জন্য কিছু একটা করি”।সাথে সাথে ফারুক ভাইয়ের আম্মা(দিলাওয়ার খান সাহেবের স্ত্রী) বলে ওঠেন-“না রে বা ফারুকের আব্বার ডায়বেটিসের মাত্রা এমনিতেই অনেক বেড়ে আছে।ওর আব্বার ইনসুলিনও শেষ।মাঝে মাঝে সুগারের মাত্রা নীল হয়ে যায়-তখন ফারুক চিনির শরবত খাওয়ায়।ওর আব্বার আটা সংগ্রহ করতে পাশের বাড়ির জয়নালের সাথে ফারুককে চা বাগানেও যেতে হয় নিয়মিত।” এরপর যাবার সময় সুলেমান হোসেন বলেন-“ফারুকমামু,দেশের জন্য কাজ করে যাও”।এবার রীনা আপা’র আম্মা সুলেমান হোসেনের কাছে তাঁর বোন জাহানারা বেগম সহ তাদের সন্তানদের খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন এবং বলেন -” কমরু’র খবর কি?”কমরুসহ অনেকের কথা জানতে চেষ্ঠা করেন।বলেন -” ওরা নিরাপদ কি না?”
এভাবে এই ঘটনার শেষ নয়।বাংলাদেশ স্বাধীন হলো।মুক্তিযুদ্ধে বিরোচিত অবদান রেখে সুলেমান হোসেন শহিদ হন।আরো অনেকের মত শহিদ সুলেমানের সহযোদ্ধা দেশ স্বাধীন হবার পর বীর দর্পে নিজের বাড়ি ফিরে আসেন।তিনি গোলাম মোস্তফা তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরী করতেন।দশ বছর আগে তিনি আমেরিকার মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ওয়ারেন আসেন।
বাঙ্গালী জাতি আজ মহান স্বাধীনতা’র অর্ধ শতাব্দীর দোড় গোড়ায়।দিন যায় কথা থাকে।মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলেমান হোসেন সহযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা সহ এক দুপুরে ক্ষণিকের অতিথি হয়েছিলেন মরহুম দিলাওয়ার খানের বরমচালের(উপজেলা-কুলাউড়া,মৌলবাবাজার)গ্রামের বাড়িতে।তারা দু’জন মুক্তিযুদ্ধে নিতে অনেককে সংঘটিত করেছিলেন।পরবর্তীতে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে খায়রুল আনাম খান হারুনের কন্যা তাম্মি’র(মরহুম দিলাওয়ার খানের নাতনী)সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবব্ধ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা’র দ্বিতীয় পুত্র আব্দুল্লা মোহাম্মদ আদনান।
কি সুন্দর কাকতালীয় ব্যাপার-দুই পরিবার একটি বিবাহের মাধ্যমে যদি পুণরায় একত্র না হতো তাহলে বোধহয় আমি আপনাদের এ গল্প শোনাতে পারতাম না।তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা (বিশ্বনাথ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ভোটার ক্রমিক নং-১৭, গেজেট নং-১৪৪৮,মুক্তিবার্তা ক্রমিক নং ০৫০১০৯০০৮৮,ভারতীয় তালিকা নং ২৩৪১৫) যেহেতু আমার কাছেই( হ্যামট্রামেক ওয়ারেন দূরত্ব ১০ মাইল)থাকেন তখন গত ২১ শে মার্চ’১৮ সন্ধ্যায় আমি,ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আকলাকুল আম্বিয়া চৌধুরী ও আবু খায়ের চৌধুরী তাঁর ওয়ারেনের বাসায় যাই।ওখানে গিয়ে তাঁকে স্বাধিনতা দিবসের প্রাক্কালে একটি জাতীয় পতাকা উপহার দিই।কথা প্রসঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা’কে উপরের গল্পটি বললে তিনি ওই সময়কার(১৯৭১)অজানা আরো কিছু বিষয় আমাদের সামনে উপস্হাপন করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা ১৯৬৭ খ্রি:পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর পোস্টিং ছিল ইএমই কোর লাহোর।তিনি সেনাবাহিনীতে মিডল ওয়েট বক্সারও ছিলেন।১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১এর ২৮শে মার্চ পর্যন্ত তিনি ছুটি কাটাতে সিলেটে ছিলেন।এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে একই বাড়ির( বর্তমান সুলেমাননগর বড়বাড়ি)আপন তিন চাচাতভাই লোকমান হোসেন,সুলেমান হোসেন,গোলাম মোস্তফা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
বরমচালের ওই বাড়ি(দিলাওয়ার খান-ইলিয়াছ আলীর বাড়ি)থেকে বেরিয়ে তারা দু’জন ভারত সীমান্তের দিকে ছুটতে থাকেন রাতভর।সুলেমান হোসেনের মামা বাড়ি বরমচাল হওয়ায় তিনি ওই এলাকার পথঘাট চিনতেন আগ থেকেই যার ফলে তাঁদের চলতে অসুবিধা হয়নি।তবে কামালবাজার থেকে বেরিয়ে বরমচাল যাবার পথে মোগলাবাজার রেলস্টেশনের কাছে গিয়ে তারা গোড্স ট্রেন ভর্তি পাকসেনাদের সামনে পড়েন।পাকসেনারাও তখন তাঁদের খেয়াল করছিল। এমনি সময় দু’জনে বুদ্ধি খাটিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরে অন্য পথে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পান।
বরমচাল থেকে যাত্রা করে সুলেমান হোসেন,গোলাম মোস্তফা ভারতের করিমগঞ্জে ছয় দিন থাকার পর পুণরায় দেশে ফিরে আসেন। বাড়িতে তখন তারা দু’দিন থাকেন। ঘরে মন টেকে না-শুধুই যুদ্ধের হাতছানি।এরপর পুণরায় শেওলা-সুতারকান্দি হয়ে সুলেমান হোসেন,গোলাম মোস্তফা ও জনৈক মনু করিমগঞ্জ যান।এদিকে প্রথমবার যুদ্ধ যাত্রার আগে এপ্রিলের(১৯৭১)প্রথম দিকে সিলেট শহর থেকে সদর উদ্দিন চৌধুরী সুলেমান হোসেনের কাছে খবর পাঠান ভারতে গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে।এবার করিমগঞ্জ গিয়ে সুলেমান হোসেন টাউন হলে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পে যোগ দেন।এদিকে গোলাম মোস্তফা চলে যান ৪নং সেক্টরের বারোপুঞ্জি সাব সেক্টরে ক্যাপ্টেন রবের নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে।ওখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছেন এবং এদের নিয়ে যুদ্ধও করেছেন নিয়মিত।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ০৮ অক্টোবর চাচাত বড়ভাই দৃঢচেতা সুলেমান হোসেনের সাথে শেষ দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা’র।
১৯৭১-এর ১৪ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী প্যারাট্রুপারদের সাথে সিলেটের দুবড়ি হাওরে(বর্তমান শাহজালাল উপশহর)সম্মুখ সমরে নিজেদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে দলের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে অন্যত্র চলে যেতে সহযোগিতা করে বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলেমান হোসেন শহিদ হন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : ইতিহাসের কথা

আরও পড়ুন

সিলেটে মৃদু ভূ-কম্পন অনুভূত

         সিলেটে মৃদু ভূ-কম্পন অনুভূত হয়েছে।...

মণিপুরীদের সর্ববৃহৎ ক্রীড়াপ্রতিযোগিতার উদ্বোধন আজ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশের মণিপুরীদের...