ফুল ঝরে যায়, সুবাস তো রয়ে যায়

প্রকাশিত : ০১ জুন, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

মো. আখতার হোসেন আজাদ

পৃথিবীর সৃষ্টির পর থেকে মানুষ জন্মগ্রহণ করে আবার পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে কজনইবা নিজেদের নাম সোনালী অক্ষরে লিখে যেতে সক্ষম হন? যারা নিজেদের কর্মে, চিন্তাশক্তিতে, বুদ্ধিবৃত্তিতে মানবতার কল্যানের জন্য কাজ করেন, দেশ ও দেশের মানুষের জন্য নিজের স্বার্থকে বিলীন করে ত্যাগ স্বীকার করেন তাঁদের ইতিহাস চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তেমনই একজন ব্যক্তি মানিক মিয়া। পুরো নাম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তিনি যেন ছিলেন ফুল বাগানের মধ্যে অসংখ্য ফুলের মধ্যে সবচেয়ে সৌন্দর্যময় ও অতলস্পর্শী সুবাস প্রদানকারী একটি পুষ্প। মানিক মিয়ার মতো ফুল নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে যান, কিন্তু চিরঞ্জীব সুঘ্রাণ রেখে যান। রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও প্রগাঢ় ব্যক্তিত্ববোধ গুণসম্পন্ন মানব ছিলেন মানিক মিয়া, যা আজকের এই ঘুণে ধরা সমাজের মানুষের জন্য দিক নির্দেশক।
বর্তমান কলুষিত রাজনীতির জন্য পথপ্রদর্শক মানিক মিয়া। রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটি বৃহৎ প্ল্যাটফরম, তা যে পদে উপবিষ্ট হয়ে কর্তৃত্ব চালানোর জন্য নয় তিনি তা নজীর হিসেবে সৃষ্টি করে গেছেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও দলীয় কোন পদে আসীন হননি মানবতাবাদী মানিক মিয়া। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার পর তাঁকে মন্ত্রীত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা নাকচ করে দেন। বিপরীতে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে কেউ একদিন মিছিলে গেলেই তাকে কমপক্ষে ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা ইউপি মেম্বার হবার স্বপ্নে বিভোর হতে। পিরোজপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী শৈশবে মা হারানো মানিক মিয়া ছিলেন এমন স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর জন্য এক আলোকবর্তিকা।
সাংবাদিকতার জন্যও মানিক মিয়া ছিলেন আদর্শ মডেলস্বরূপ। শাসক গোষ্ঠীর চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে তিনি কলম চালিয়েছেন সাধারণ মানুষের পক্ষে। অবিরতভাবে লিখেছেন শোষণ, নিপীড়নের মুলোৎপাটন করার জন্যে। পত্রিকায় তুলে ধরেছেন মানুষের মনের চাওয়া, তাদের মতামত, তাদের জ্ঞানপিপাসার কথা। শুধু তাই নয়। নিজের পেশাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য তিনি কখনও দলীয় কোন পদ পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে একটি সম্মেলনে বলেছিলেন, সাংবাদিকতার প্রতি সুবিচার করতে হলে আমাদের মতো সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধির লোকদের একই সময় সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা চলে না। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ক্ষুরধার এই কলমসৈনিক দেখিয়েছেন আদর্শিক সাংবাদিকতা কাকে বলে ও কিভাবে করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে সিংহভাগ পত্রিকা দেখলেই বোঝা যায় এটি সরকারদলীয় পত্রিকা, এটি বিরোধীদল সমর্থনকারী পত্রিকা। অথচ মানিক মিয়া আমাদের শিখিয়ে গেছেন কিভাবে গণমানুষের কথা পত্রিকায় লিখতে হয়, কিভাবে তাদের আকাক্সক্ষার কথা পত্রিকায় তুলে ধরতে হয়।
মানিক মিয়া সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলেও তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্নর আইয়্যুব খান বিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীজ ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের পক্ষে কলমযুদ্ধের সম্মুখ সেনাপতির ভূমিকা রেখেছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, মানিক মিয়া এভিনিউয়ের নাম যে কখনো ঢাকা আসেনি সেও শুনেছে, কিন্তু মানিক মিয়ার বর্নাঢ্য জীবনের গৌরবগাঁথা ইতিহাস সম্পর্কে তরুণ সমাজ অবচেতন। এমনকি সাহসী ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ এই ব্যক্তির জীবনী দেশের উচ্চশিক্ষায় সাংবাদিকতা বিভাগেও গভীরভাবে আলোকপাত করা হয় না। অথচ উচ্চ শিক্ষায় সাংবাদিকতা বিভাগ প্রতিষ্ঠায় মানিক মিয়া ছিলেন অগ্রপথিক। নির্ভীক-নির্লোভ এই দেশপ্রেমিকের জীবনী পাঠ্য বইতে যুক্ত করা সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে। মানিক মিয়ার জীবনী নিয়ে গবেষণা করতে হবে। তবেই নতুন প্রজন্ম মানিক মিয়ার জীবনী পড়ে মুক্তিযুদ্ধের উজ্জীবিত হয়ে চেতনায় সৎ, আদর্শবান ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং মানিক মিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে সৃষ্টি হবে।

মো. আখতার হোসেন আজাদ
শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ ও
সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
মোবাইল: ০১৭৯২৩৮৭৪৩৮

আরও পড়ুন