প্রেম ও দ্রোহে সমান্তরাল : নজরুল

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২০     আপডেট : ২ মাস আগে

তারেক মুনাওয়ার
কাজী নজরুল ইসলাম- বাঙালি মন ও মননের এক তুঙ্গীয় চেতনা ও আদর্শের নাম। তাঁর সংগ্রামীজীবন ও কর্মে বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠায় বিদ্রোহী কবি বলা হয়। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে– নজরুল জীবনভর চেয়েছেন মানুষ ও মানুষের পৃথিবী। এ জন্য তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু হয়ে ওঠেছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ।
নজরুল যখন উচ্চারণ করলেন-
“আমি চিরদুর্দম, দূর্বিনীত, নৃশংস,
মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দূর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্নেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!

এ কবিতায় ফুটে উঠে তাঁর পরিচয়। রচিত হয়ে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় : নজরুল । ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ছিল বাঙালি জাগরণ মূলমন্ত্র।

এভাবে দু’শো বছরে ইংরেজশাসনের বিরুদ্ধে কবি বিদ্রোহী হয়ে পড়েছেন কবিতা ও প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মাধ্যমে। ১৯২০ সনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস যখন বৃটিশের হাতে গ্রেফতার হন ঠিক সেই সময়ে লিখলেন ‘ভাঙ্গার গান’ কবিতা।

“কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট
রক্ত জমাট
শিকল পূজার পাষাণ বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি’।

‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থে কবি যেন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সৈনিকদের সাহস যুগিয়েছেন-

“ওরে ভয় নাই আর দুলিয়া উঠেছে হিমালয় চাপা প্রাচী
গৌরি শিখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিয়ে সব্যসাচী।”

‘সর্বহারা’ কাব্যের ‘রাজা-প্রজা’ কবিতাটি তরুণদের মাঝে মন্ত্রের মত কাজ করেছে। ফলে সে সময়ের তরুণরা আনন্দের সাথে আবৃত্তি করত :

‘‘মোদেরী বেতন-ভোগী চাকরেরে সালাম কবির মোরা
ওরে পাবলিক সারভেন্টদের আয় দেখে যাবি তোরা।
কালের চাকা ঘোর,
দেড়শত কোটি মানুষের ঘাড়ে-চড়ে দেড়শত চোর।
এ আশা মোদের দুরাশাও নয়, সেদিন সুদূরও নয়
সমবেত রাজকণ্ঠে যেদিন শুনিব প্রজার জয়।”

‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় মানবতাবাদী নজরুল নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন স্বাধীনতার জন্য, বিজয়ের জন্য। কবি বলেন-

“পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাঁচি
যুগের হুযুগ কেটে গেলে
মাথার উপরে জ্বলিছে রবি
রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায়
তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায়
তাদের সর্বনাশ।”

‘সর্বহারার’ কিছু কবিতায় আগ্রাসী ইংরেজদের বিরুদ্ধে বজ্র হুঙ্কার তুলেছেন কবি। যেমন- কৃষাণের গান কবিতায়-

“(ও ভাই) আমার শহীদ, মাঠের মক্কায় কুরবানি দেই জান,

(আর) সেই খুনে যে ফলেছে ফসল হরছে তা শয়তান।”

‘ধীবরের গান’ কবিতায় কবি বলেন-

‘ঐ আঁশ-বটিতে মাছ কাটি ভাই
কাটব অসুর এলে!
এবারে উঠব রে সব ঠেলে।”

ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, জুলুম-নিপীড়ন যখন সীমাহীন গতিতে ধাবমান তখন কবিও আর সহ্য করতে পারলেন না। কবি বললেন-

“এ দেশ ছাড়বি কিনা বল
নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।
মোরা মারের চোটে ভূত ভাগাব
মন্ত্র দিয়ে নয়
মোরা জীবন ভর মার খেয়েছি
আর প্রাণে না সয়।”

এভাবেই স্বাধীনতার জন্য নজরুল কবিতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনের ঝড় তুলেছিলেন।

কিন্তু নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত প্রেমের কবি। যদিও তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পেয়েছেন বিদ্রোহী কবি হিসেবে, কিন্তু এর বাইরেও তিনি প্রেম ও প্রকৃতিরও কবি। প্রেম ও বিদ্রোহ বৈপরিত্যপূর্ণ, কিন্তু কবির কাছে বুঝি তা হার মেনেছে। তিনি এই দুটো জিনিস সন্তরালে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আর এ কারণেই বুঝি তাঁর কবিতা ও গানে আমরা একই সঙ্গে পাই প্রেমিক ও বিদ্রোহী সত্তাকে। বিদ্রোহী কবিতায় আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন–

‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণতূর্য’।

প্রেম ও বিদ্রোহ যে সমানতালে চলতে পারে তার প্রমাণ মিলতে এই একটি লাইনই বুঝি যথেষ্ট। এই দ্রোহ এবং প্রেমকে ধারণ করে এমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব।

আর যখন তিনি উচ্চারণ করেন-

“– ওগো ও চক্রবাকী
তোমারে খুঁজিয়া অন্ধ হল যে চক্রবাকের আঁখি!
কোথা কোন লোকে কোন নদী পারে রহিলে গো তারে ভুলে?
হেথা সাথি তব ডেকে ডেকে ফেরে ধরণির কূলে কূলে।”

তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে প্রেমের মৌ মৌ ঘ্রাণ। প্রেমিকারা হাত বাড়ায় প্রেমের।

একবার বিদেশযাত্রা উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে কবি তখন গেয়ে শোনান তার বিখ্যাত গানটি…

জাগিলে পারুল কিগো ‘সাত ভাই চম্পা’ ডাকে,
উদিলে চন্দ্র-লেখা বাদলের মেঘের ফাঁকে ॥
চলিলে সাগর ঘু’রে
অলকার মায়ার পুরে
ফোটে ফুল নিত্য যেথায়
জীবনের ফুল্ল-শাখে ॥
আঁধারের বাতায়নে চাহে আজ লক্ষ তারা,
জাগিছে বন্দিনীরা, টুট ঐ বন্ধ কারা।
থেকো না স্বর্গে ভুলে,
এ পারের মর্ত্য কূলে,
ভিড়ায়ো সোনার তরী
আবার এই নদীর বাঁকে ॥

এবং একই উপলক্ষে ‘বর্ষ বিদায়’ কবিতাও রচনা করেন। এটি তাঁর বিখ্যাত প্রেমের কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

শিল্পী আব্বাস উদ্দীন তার এক লেখায় লিখেছেন, ‘গ্রামোফোন কোম্পানিতে বসে কবি ও তার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে গল্প করছিলেন, এমন সময় কথাচ্ছলে প্রশ্ন উঠলো যদি কেউ লটারিতে এক লাখ টাকা পেয়ে যায় তবে কে কার প্রিয়াকে কেমনভাবে সাজাবেন। কেউ কমলালয় স্টোর্সে যেতে চাইলেন, কেউবা সুইজারল্যান্ড, কিন্তু কবি খাতা কলম নিয়ে সাজাতে বসে গেলেন তার প্রিয়াকে… এর পরের গল্প তো ইতিহাস। তিনি তাঁর প্রিয়াকে সাজালেন সেই বিখ্যাত গানে…

মোর প্রিয়া হবে এসো রানী
দেবো খোঁপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথি
চৈতি চাঁদের দুল ॥

এমনইভাবে বিভিন্ন সময় ও পরিবেশে কবি আমাদের জন্য রেখে গেছেন মিষ্টি যত প্রেমের গান। যা আজও প্রেমিক হৃদয়ে দোল দিয়ে যায়।

এমনই এক বাঁধনহারা স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার মানুষ ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি সুন্দরের পূজা করেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। যে হাতে বাঁশি সুর তুলেছে সে হাতেই রণতূর্য বেজেছে। যা অন্য কারও মধ্যে দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন