প্রেমের ফাঁদ : রুমীকে টাঙ্গাইল থেকে বিশ্বনাথে এনে ধর্ষণের পর হত্যা

প্রকাশিত : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের পাঠাকইন গ্রামের রাস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা কিশোরীর লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতের নাম রুমী আক্তার (১৬)। সে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার আউতপাড়া গ্রামের আতাউর রহমানের মেয়ে। এ ঘটনায় ঘাতক শফিক মিয়া (৩২) সহ ৪জনকে গ্রেফতার করেছে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ। শফিক বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের মৃত ওয়াব উল্লাহ’র পুত্র। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত শফিক মিয়া কিশোরী রুমী আক্তারকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরস্থ হাসপাতাল থেকে লুকিয়ে এনে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে সিলেট পুলিশ সুপার হল রুমে পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান পিপিএম ও বেলা ২টায় বিশ্বনাথ থানায় প্রেস কনফারেন্সে ওসি শামসুদ্দোহা পিপিএম এমন তথ্য জানান। শফিক নারী লিপ্সু ও লম্পট লোক। সে মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের ধর্ষণ ও পরে হত্যা করে। তার সর্বশেষ শিকার রুমী বলে জানায় পুলিশ। গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলেন, শফিক মিয়ার স্ত্রী সোনালী আক্তার হিরা (২৪), তার দুই ভাবী দিপা বেগম (৩২) ও লাভলী বেগম (২৫)।
পুলিশ ও খুন হওয়া কিশোরী রুমীর আত্মীয়-স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, ‘থেলাসেমিয়া রোগে’ আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানার কুমুদিনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল রুমী আক্তার। রুমীর পাশের বেডেই চিকিৎসাধীন ছিলেন ঘাতক শফিকের আরেক শাশুড়ী। গত ৪ সেপ্টেম্বর শাশুড়ীর চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিতে গিয়েই রুমী আক্তারের সাথে পরিচয় হয় শফিক মিয়ার। আর এই পরিচয় থেকেই শফিকের প্রেমের ফাঁদে পড়েন রুমী আক্তার। এরপর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫ টারদিকে কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে রুমীকে নিয়ে পালিয়ে যায় শফিক। পরেরদিন ভোরে রুমীকে নিয়ে নিজ বাড়িতে উঠেন শফিক মিয়া। বিশ্বনাথে আসার পর শফিকের অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে রুমী ছটফট করতে থাকে। এসময় শফিক রুমীর মুখ-হাত বেঁধে জোর পূর্বক একাধিক বার ধর্ষণ করে। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হাত-পা বাঁধা রুমীকে ঘরের পিছনের খালে চুবিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। অন্ধকার নামলে সন্ধ্যার পর রুমীর মরদেহটি স্থানীয় তবারক আলীর বাড়ির রাস্তায় রেখে শফিক পালিয়ে যায়। সে প্রথমে ছাতকে থাকা নিজের বোনের বাড়িতে যায়, এরপর সে পুনরায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিজ কর্মস্থল ‘নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরীতে চলে যায়। অপরদিকে, বোন হাসপাতাল থেকে হারিয়ে গেছে মর্মে ১০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় কিশোরী রুমী আক্তারের ভাই শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরী দায়ের করেন।
এদিকে, লাশ উদ্ধারের পর বিশ্বনাথ থানা পুলিশের তদন্ত চলাকালে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার কুমুদিনী হাসপাতাল হতে চিকিৎসাধীন একটি মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে জানতে পেরে পুলিশ রুমীর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে। যোগাযোগের এক পর্যায়ে পরিধেয় কাপড় চোপড় ও পেটের পুরাতন অপারেশন পর্যালোচনা করে লাশটি রুমীর বলে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ নিশ্চিত হয়।
অন্যদিকে, লাশ উদ্ধারের পর গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ১২টায় সিআইডি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আলামত সংগ্রহ শেষে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতের সময় লাশের শরীরে পুরাতন একটি বড় অপারেশনের চিহ্ন দেখতে পায়। এছাড়া সাদা গেঞ্জির চিকন টুকরা কাপড় দ্বারা লাশটির দুই হাত পিছন দিকে পিঠের উপরে বাধা ও উপুড় অবস্থায় লাশটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। লাশের গলায় পেঁচানো ওড়নার দুই পাশের দুই মাথায় পলিথিন দ্বারা মোড়ানো সাদা কাগজে লেখা একই নম্বরের মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়।
ঐ নাম্বারের সূত্রধরে তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে নাম্বারটি বিশ্বনাথেরই ইমরান আহমেদ রিয়াদ নামের এক ব্যক্তির। এর মধ্যেই একদিন অন্য একটি বাংলালিংক নাম্বার থেকে পুলিশকে ফোন দিয়ে বলা হয় উড়নায় প্রাপ্ত নাম্বারের লোককে গ্রেফতার করলেই মূল ঘটনা জানা যাবে। এরপর পুলিশ ইমরানকে আটক করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একই সাথে বাংলালিংক নাম্বরটি ট্রাকিং করে জানতে পারে এর সাথে রামচন্দ্রপুর গ্রামের শফিক মিয়ার যোগাযোগ রয়েছে। সে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করে এবং ওই ফ্যাক্টরী কর্মরত এক মহিলার সাথেও তার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। পুলিশ সেই মহিলার সাথে আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি করে শফিকের তথ্য নেয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শফিক মিয়াকে ১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৬ টায় নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরী থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে হত্যাকান্ডের ঘটনা স্বীকার করে এবং ব্যবহৃত তার মোবাইল ফোনের সন্ধান দেয়। এসময় শফিক জানায়,. পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে তাঁর স্ত্রী সোনালী আক্তার বাংলালিংক নম্বর থেকে বিশ্বনাথ থানার ওসিকে ফোন করেছিল। পরে সন্ধ্যা ৭টায় গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে সোনালী আক্তারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অন্যদিকে, জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে শফিক যখন রুমীকে ঘরের ভিতর পাশবিক নির্যাতন করে এবং পরে তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বাইরে নিয়ে খুন করছে দেখার পরও তার দুই ভাবী দিপা বেগম ও লাভলী বেগম কোন বাঁধা দেয়নি বরং কাউকে কিছু না বলেই বিষয়টি গোপন করে অন্য কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছিলেন। হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ শফিকের দুই ভাবীকেও গ্রেফতার করেছে।
প্রেস ব্রিফিং-এ ওসি আরো জানান, গ্রেফতারকৃত শফিক মিয়া একজন নারী পিপাসু ও লম্পট প্রকৃতির লোক। সে মোট ৮টি বিয়ে করেছে। বর্তমানে সে ৪ জন স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছে। একটি গণধর্ষণ মামলার পালাতক আসামী হয়ে সে দেশের বিভিন্ন স্থানে আতœগোপনে ছিল। সে সবার অগোচরে নিরীহ মেয়েদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ ও হত্যা করে। পরে নিরীহ লোকদের ফাঁসিয়ে নিজে আত্মরক্ষার অপচেষ্টা করে। তার সর্বশেষ শিকার হয় রুমী।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ২২ এপ্রিল একই স্থানে আনুমানিক ২৮ বছর বয়সী অজ্ঞাতনামা এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ওই নারীর বুকের কাপড়ের নিচে ভ্যানিটি ব্যাগের ভিতরে একইভাবে পলিথিন দ্বারা মোড়ানো দুই ব্যক্তির ছবি পাওয়া গিয়েছিল।
এদিকে, গতকাল বুধবার বিকেলে গ্রেফতারকৃত শফিক মিয়াকে নিয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় এলাকার শত শত জনতা ঘাতক শফিকের ফাঁসির দাবি জানান।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন