প্রসঙ্গ –একই দিনে রোজা এবং একই দিনে ঈদ

প্রকাশিত : ১৮ মে, ২০২০     আপডেট : ১ সপ্তাহ আগে  
  

মুহিউল ইসলাম মাহিম চৌধুরী :

চাঁদের অাবর্তণ এবং অবস্থান নির্ণয় করে মহাকাশ গবেষকরা বলেছেন, পৃথিবীর উত্তর মেরু এবং দক্ষিন মেরুতে অবস্থানরত সবাইকে একই তারিখে একিভুত করা সম্ভব নয়। কারণ তাতে শা’বান মাস কোথাও হয়ে যাবে ২৮ দিনে অার কোথাও হয়ে যাবে ৩১ দিনে । কিন্তু চান্দ্র মাস কখনও এরকম হয়না ।। অারবী চান্দ্র মাস হয় ২৯ অথবা ৩০ দিনে ।।
রাসুল (স) একবার বললেন ”অামরা উম্মী জাতি, অামরা না লিখে রাখি অার না কোন পুঞ্জিকা মেনটেইন করি । মাস হবে ২৯ অথবা ৩০ । অর্থাৎ, অামরা দিন গণনা করি চাঁদের অবস্থান দেখে” ।
অাল্লাহর রাসুল (স) অারও বললেন,”তোমরা রোজা রাখ সবাই যখন রোজা রাখে,তোমরা রোজা ভাঙ্গ,সবাই যখন রোজা ভাঙ্গে ”। অালহামদুলিল্লাহ,অামরা তাই করছি ।
সুতরাং অামি একথা বলতেই পারি, যারা সারা বিশ্বে একই সাথে রোজা এবং একই সাথে ঈদ করার যুক্তি তোলে ধরেন সেটা হয়তো যুক্তিবিদ্যার কিছুটা খোরাক হতে পারে তথাপি তা কোরঅান সুন্নাহ এবং বৈজ্ঞানীক ভিত্তির উপরে মোটেও প্রতিষ্টিত নয় ।

অাসুন বিষয়টি নিয়ে একটি পর্যালোচনা করি।

শরিয়তে মাস গণনার জন্য চাঁদ দেখার যে নির্দেশনা এসেছে, তা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনসমষ্টির জন্য প্রযোজ্য, যাদের ওপর চাঁদ উদিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান মাস পায়, সে যেন রোজা রাখে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)। এখানে কোরঅানের অায়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী সুস্পষ্টভাবে যা বোধগম্য হয় তা হলো, ‘যারা এ মাস পাবে’, অর্থাৎ সবাই নয়, বরং তারাই রোজা রাখবে, যারা চাঁদ দেখতে পাবে।
তার মানে হল সবাই একই সাথে চাঁদ দেখতে পাবেনা । সুতরাং রমজানের চাঁদ দেখা শর্ত। বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে এসেছে হাদিস শরিফে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো। তবে যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে মাসের হিসাব ৩০ দিনে পূর্ণ করে নাও।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮১০) এ হাদিসে বর্ণিত নির্দেশনা বিশ্ববাসীর জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট ভুখণ্ডের জন্য প্রযোজ্য হবে ।

একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনের ‘প্রমাণ’ হিসেবে যে হাদিস গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়, তা অনেকে ভুল উপলব্ধিতে অাক্রান্ত । ওই হাদিসে এসেছে, ‘রাসুল (সা.) মধ্যাহ্নের পর কয়েকজন মরুবাসী বেদুইনের কাছে শাওয়ালের চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়ামাত্র সাহাবিদের রোজা ভঙ্গ করতে বলেন ও পরদিন ঈদের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১১৫৭) কিন্তু এ হাদিস সারা বিশ্বে একদিনে রোজা ও ঈদ পালনের বৈধতা কোনোভাবেই প্রমাণ করে না। কেননা রাসুল (সা.) যাঁদের কাছে চাঁদ দেখার সংবাদ পেয়েছিলেন, তাঁরা দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে আগমন করেননি। তাঁরা মদিনার পার্শ্ববর্তী কোনো স্থান থেকেই এসেছিলেন। আর কাছাকাছি এলাকায় এক জায়গার চাঁদ দেখা অন্য জায়গার জন্য গ্রহণযোগ্য।

সুতরাং এই হাদিসের বাস্তবতা হলো, মদিনার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা চাঁদ দেখতে পাননি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী মরুভূমির মানুষ আকাশ পরিষ্কার থাকায় তা দেখতে পেয়েছিল। তাই তাদের সংবাদ রাসুল (সা.) আমলে নিয়ে রোজা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কাজেই বোঝা গেল, আলোচ্য হাদিস নিকটবর্তী এলাকার চাঁদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। দূরবর্তী এলাকার চাঁদের ব্যাপারে নয়। এ বিষয়ে ইবনে কুদামা (রহ.) লিখেছেন, ‘যদি দুই শহরের মধ্যে দূরত্ব কম থাকে, তখন চাঁদের উদয়স্থলও অভিন্ন হবে। যেমন—বাগদাদ ও বসরা শহরের দূরত্ব কম থাকায় এক শহরে চাঁদ দেখা অন্য শহরের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু হেজাজ, ইরাক ও দামেস্কের মতো এক দেশ থেকে অন্য দেশের দূরত্ব বেশি হলে প্রতিটি দেশের চাঁদের বিধান হবে ভিন্ন ভিন্ন। এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য নয়।’ (শরহে কাবির : ৩/৭)

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ হলো, কোনো অঞ্চলের উদিত চাঁদ তার আশপাশের ৫৬০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে দেখা সম্ভব। এমন দূরত্বের অধিবাসীরা ওই চাঁদের হিসাব অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, সূর্যাস্তের পর একটি নতুন চাঁদ তার উদয়স্থলে দৃশ্যমান থাকে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। সুতরাং পার্শ্ববর্তী কোনো এলাকার সময়ের পার্থক্য যদি ৩০ মিনিট হয়, তাহলে সেখানে এক দিন পরও চাঁদ দেখা যেতে পারে।

সাহাবায়ে কেরামের যুগে দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদের খবর পাওয়ার কথা চিন্তাই করা যেত না। কিন্তু সাহাবাদের যুগেই ঘটনাচক্রে সংঘটিত হয়েছে এমন একটি ঘটনার মাধ্যমে এ বিষয়টির সুরাহা সম্ভব। বিশিষ্ট তাবেয়ি কুরাইব (রহ.) গিয়েছিলেন দামেস্কে। দামেস্ক মদিনা থেকে প্রায় এক হাজার ৯২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে শুক্রবার রাতে রমজানের চাঁদ দেখা যায়। শুক্রবার থেকে রোজা শুরু হয়। কুরাইব (রহ.) রমজান মাসের শেষের দিকে মদিনায় পৌঁছলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে অব্বাস (রা.) কুরাইব (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কবে চাঁদ দেখেছ?’ কুরাইব (রহ.) বললেন, ‘শুক্রবার রাতে।’ ইবনে আব্বাস (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি নিজেই দেখেছ?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও দেখেছি, অন্যরাও দেখেছে। সবাই রোজা রেখেছে। আমিরুল মুমিনিন মুয়াবিয়া (রা.)ও রোজা রেখেছেন।’ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘কিন্তু আমরা তো শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি। সুতরাং আমরা আমাদের হিসাবমতো ৩০ রোজা পুরা করব, তবে যদি ২৯ তারিখ দিবাগত রাতে চাঁদ দেখি, সেটা ভিন্ন বিষয়।’ কুরাইব (রহ.) জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি মুয়াবিয়া (রা.)-এর চাঁদ দেখা ও রোজা রাখাকে যথেষ্ট মনে করেন না?’ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘না, রাসুল (সা.) আমাদের এমন আদেশই করেছেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৮৭)

এখানে লক্ষণীয় যে স্থান পরিবর্তন হওয়ার কারণে কুরাইব (রহ.)-এর মতো একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সাক্ষ্য থাকার পরও সিরিয়ায় দেখা চাঁদের ওপর ইবনে আব্বাস (রা.) আমল করেননি। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের এ আদেশই করেছেন।’ আর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ ছিল, ‘স্থানীয়ভাবে চাঁদ না দেখে রোজা ও ইফতার নয়’—এই মূলনীতির অনুসরণ করা। সুতরাং ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মাজহাব হলো, রোজা ও ঈদ পালনের জন্য নিজ নিজ এলাকায় উদিত চাঁদের ওপর নির্ভর করা। এ বিষয়ে অন্যকোন সাহাবীর দ্বিমত পরিলক্ষত হয়নি।

একজন বিশেষজ্ঞ তাঁর লিখিত একটি কলামে লিখেছেন-যদি পৃথিবীতে চাঁদের দেখা মিললেই রোজা ও ঈদ শুরু করতে হয়, তাহলে চাঁদের সর্বপশ্চিমের উদয়স্থল আমেরিকার আলাস্কা অঙ্গরাজ্যকে মানদণ্ড ধরে রোজা ও ঈদ পালন করা উচিত। কারণ সেখানেই চাঁদ প্রথম দৃশ্যমান হয়। ইসলামী শরিয়তে এমন কোনো ইঙ্গিত কি আছে যে সৌদি আরবের চাঁদই সারা বিশ্বের জন্য মানদণ্ড হবে? পাশাপাশি এটি বিজ্ঞানসম্মত নয়। কেননা প্রথম দৃশ্যমান চাঁদ অনুযায়ী সর্বত্র রোজা ও ঈদ পালন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যেমন—আমেরিকায় চাঁদ উঠেছে কি না, তা জানতে বাংলাদেশের মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ১২ ঘণ্টা। অর্থাৎ পরদিন ভোর ৬টায় জানা যাবে চাঁদের খবর। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আমেরিকার আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের সময়ের পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তাহলে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর নিউজিল্যান্ডবাসী জানতে পারবে পরদিন রাতে। তাহলে তাদের ওই দিনের রোজার উপায় কী!

আসলে যতটুকু অঞ্চলজুড়ে একই দিনে চাঁদ দেখা সম্ভব, ঠিক ততটুকু অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই চাঁদ দেখার বিধান সীমাবদ্ধ থাকবে—এটিই শরিয়তের বিধান। ।

১৪৬১ সালে সৌদি আরবে পৃথিবীর বিদগ্ধ অালেমগণ বসেছিলেন এ বিষয়টি নিয়ে। তাঁরা এ মর্মে একমত হয়েছেন যে,একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন সম্ভব নয় ।

এরপরেও বলবো সারা দুনিয়ার মুসলিমরা যদি একই নেতার নেতৃত্বে থাকতো তাহলে একইদিনে রোজা এবং একই দিনে ঈদ পালনের সুযোগ ছিল ।
তাছাড়া অাজও যদি সকল রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তা পুরোপুরি সম্ভব ।

কারণ,রোজা ও ঈদ একটি সামাজিক ইবাদত । তা বিচ্ছিন্নভাবে পালন করা মূলত মুসলমানদেরকে বিভক্তির মধ্যে ফেলে দেওয়া ছাড়া কিছুই নয় ।

আরও পড়ুন