প্রত্যেকের জীবনেই সুন্দর কিছু স্বপ্ন আছে

প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল :

আপনিতো অন্যের ততটুকু দেখেই একটা ধারণা করে বসেন, যতটুকু দু’চোখে দেখতে পান। আচ্ছা, কারো জীবনের কতটুকু আপনি জানতেন বা বুঝতে পারেন? আপনি কি জানেন না, অদেখার একটা জগত আছে? সেখানে আছে জ্বিন, ফেরেশতা আর আল্লাহর আরো অজানা অজস্র সৃষ্টি। সেই জগতটা এই জগতের চেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর, মোহনীয়–তা জানেন? সে জগতটার অস্তিত্ব তো এই জগতের সমান্তরালেই। আপনি কি আপনার ক্ষুদ্রতা অনুভব করতে পারেন? আপনি ভাবতে পারেন আপনার বিছানার কাঠের ঘুণপোকাটাও রিযিক পেয়ে বেচে আছে। আটলান্টিকের তলে একটা শেওলাও এই মূহুর্তে রিযিক পাচ্ছে আপনার আল্লাহর। আপনি কি বুঝতে পারছেন এই সূর্যের যে আলো আপনার জানালার ফুটো হয়ে ফিনকি দিয়ে আলো ছড়াচ্ছে, ততটুকু আলোও কিন্তু আপনার জন্য বরাদ্দকৃত। সেটাও নিখুঁত করে আপনার আল্লাহর আদেশ।আপনি কি ভেবে দেখেছন আপনি কতটা ক্ষুদ্র। আবার একই সাথে কতটা অসামান্য বিশেষ ভালোবাসা আপনার জন্য আপনার রবের পক্ষ থেকে? এই অদ্ভুত ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও মূল্যায়িত হবার অনুভূতি নিয়েও কি অন্তরে আপনি ঘৃণা, অহংকার, পরনিন্দা, হিংসার চাষ করতে পারেন?আপনি হৃদয়টা খুলে দিয়ে ওই আকাশের মতন করে দিতে পারো না? চেষ্টা করেই দেখেন না, প্লিজ? আপনার জীবনটা হলো আপনার পছন্দগুলোর ফলে বেছে নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমষ্টি। আপনার যদি জীবনটাকে এখন সহ্য না হয়, বুঝে নিন আপনি এমন কিছু নিয়ে পড়ে আছেন যা আপনার ভুল পছন্দ। শীঘ্রই নিজের জন্য বেছে নিন ভালো কিছু।

নাটক-সিনেমায় সবকিছু বেশি বেশি হয়। যখন প্রেম হয়, তখন বেশি বেশি। নায়ক নায়িকা কলেজে ব্যাগ ছাড়া বই বহনকালে ঠুয়া খেয়েই প্রেমে পড়ে যায়। আবার তাদের ট্র্যাজেডিটাও বেশি বেশি। রাস্তার রিকসাওয়ালা কোটিপতি চৌধুরী সাহেবের মেয়ের সাথে প্রেম করে। রোমিও আর জুলিয়েটের পরিবারের শত দ্বন্দ্বের পরেও তাদের পেরেম চলতেই থাকে। একটা বেকুব মরে দেখে অপরজনেও আত্মহত্যা করে। এইরকম ‘এক্সট্রিম’ (Extreme) বিষয় মানব জীবনের জন্য স্বাভাবিক না। আসলে, বাস্তবতা আর নাটক-উপন্যাসের কোন তুলনাই চলে না।

বাস্তব জীবন অনেক অন্যরকম। এখানকার ট্র্যাজেডিতে এইরকম প্রেম কাহিনী থাকে না। এই ট্র্যাজেডিতে আত্মসম্মানবোধ রাখতে, সামাজিক মর্যাদা অটুট রাখতে যে কষ্ট হয়, তার মাঝে সব পেরেম-টেরেম হারিয়ে যায়, পালিয়ে যায়। বাস্তব জীবনে রাস্তার পাশের খুপরিতে বড় হওয়া পিচ্চিটার কাছে ডাবগাছের শাখাটা নিয়ে আনন্দের খেলাধূলার অংশ থাকে। চৌধুরী সাহেবদের কাছে চাঁদাবাজের আতঙ্ক, মেয়ের বেয়াড়া হয়ে যাওয়া, শাশুড়ির ক্যান্সার ধরা পড়ায় কেমোথেরাপির শিডিউল সামলানোর মতন কষ্ট থাকে। সব চৌধুরী সাহেবরা এখন নাইট ড্রেস পরে ডুপ্লেক্সে ঘুমাতে পারে না।

বাস্তব জীবনটা সুন্দর, তবে ভাষায় অপ্রকাশ্য। প্রতিটি মানুষের জীবনই একেকটা গল্পের চেয়েও বেশি। প্রত্যেকের জীবনেই সুন্দর কিছু গল্প আছে, কিছু প্রাপ্তি আছে, কিছু তীব্র বেদনা আছে। সব মিলিয়েই, সবাই মানুষ। এই সকল অপ্রাপ্তি-বঞ্চনা-গঞ্জনার বিপরীতে উত্তম প্রতিদান মিলিয়ে দিবেন আল্লাহ। বেঁচে থাকার সুখ আর দুঃখ সবই আল্লাহর জন্যই। সবাই আমরা তারই, তার কাছেই তো ফিরে যাবো। দুনিয়াতে এসে এই ফিরে যাওয়া অবধি কাহিনীগুলো হোক অনন্যসুন্দর এক ভালোবাসার মহাকাব্য…।
মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত। যখন আপনি এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্য পাবেন যারা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, যারা এই চলমান অন্যায়-অস্থিরতা-হত্যা-খুনের পৃথিবীর মাঝেও অদম্য আশাবাদের সুতোয় মালা গাঁথে–তখন আপনিও আশাবাদী হবেন আপনার জীবন নিয়ে। তখন নিজ জীবনকেও সম্ভাবনার আধার মনে হবে, মনে হবে একদিন চারপাশকে নিয়ে আপনি সুখ আনতে পারবেন। টের পাবেন আপনি বিশ্বাস করছেন যে চলমান কষ্টের সময়টা কেটে গেলেই আপনি আবার সুন্দর সময় খুঁজে পাবেন। এই আশাবাদের তরী বেয়ে চলেই এসেছে মানবজাতি এতটা পথ। নতুবা প্রতিটি মানুষের জীবনেই যে ভীষণ ধাক্কা আসে জীবনের একেকটি ক্ষেত্রে, মানুষকে পরাজিত হয়ে পদদলিত হতে থাকতে হত। কিন্তু সম্ভাবনাকে আঁকড়েই মানুষ এগিয়ে যায়।

আপনি যখন অসার ও নিরর্থক কথাবার্তা বলা, কুচিন্তা করা মানুষদের সাথে চলতে থাকবেন। দেখবেন আপনি একজন মানুষকে দেখলে তাকে সন্দেহভাজন মনে করবেন। অতিরিক্ত পাপ নিয়ে আলোচনা করতে করতে হয়ত আপনার কাউকে দেখলেই তার পাপ নিয়ে ধারণা করতে শুরু করবেন। অথচ অধিকাংশ মানুষের মাঝেই সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকে। আপনি কেন কাউকে দেখলে অযথা সন্দেহ করতে থাকবেন? অকারণে কাউকে নিয়ে সন্দেহ করা ও ধারণা পোষণ করা তো আমাদের মনগুলোকে বিষিয়ে দেয়, তিক্ত করে দেয়–আমাদেরকে বন্দী করে এক অজানা কারাগারে।

ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন সিরাজউদ্দৌলাকে সরিয়ে এই বাংলার স্বাধীনতাকে উপনিবেশিকতায় বানিয়ে দিলো, মানুষ যখন ব্রিটিশদের খেলার বস্তু, দাসে পরিণত হলো–তখন কিছু মানুষ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। ফকির ও আলেমগণ করেছিলেন বিদ্রোহ। ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীরের আন্দোলন, ফকির বিদ্রোহ এবং সিপাহী বিদ্রোহে মুক্তিপাগল অসম্ভবকে কল্পনাকারী প্রতিপক্ষ সমগ্র পৃথিবীতে আধিপত্যবাদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। তাদের লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের থেকে মুক্তি পায় এই বাংলা। আধিপত্যবাদ কি থেমে থেকেছে? হয়ত মুক্তিপাগল প্রাণ, আশাবাদী প্রাণ কমে গেছে।

অথচ সবকিছু বদলে দিতে লাগে কেবল ইচ্ছা। আশাবাদী প্রাণগুলোই বদলে দেয় কদর্যতা ও কঠিন সময়। তারা গড়ে নেয় অসম্ভবকে সম্ভব করে। যারা মনের বাঁধা, নেগেটিভ চিন্তার বলয় পেরিয়ে স্বপ্ন দেখে সুন্দর ভবিষ্যতের, কেবল তারাই গড়ে তোলে সুন্দর পৃথিবী। অলসতা যাদের থাকে, যাদের থাকে ‘হবে না’, পারা যাবে না’ টাইপের চিন্তাভাবনা– তারা কেবল পদদলিত হয়। ধ্বংস করে নিজ জীবন এবং চারপাশকে। তাই, “আমি পারবোই” একথা বলে যারা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারাই নিয়ে আসে অন্ধকার রাতের পরে একটি সুন্দর দিনের সূর্যোদয়।

তবে যেকোন পরিবর্তনের শুরুতেই প্রয়োজন হয় ভালোবাসা। নিজ জীবনের, পরিবারের, সমাজের সকল পরিবর্তনের শুরু হয় ভালোবাসার স্ফূলিঙ্গ থেকে। ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারা একটি অমূল্য গুণ। পৃথিবীতে ভালোবাসার বড্ড আকাল। কুৎসা, নোংরামি, পরনিন্দা, কুধারণা, কূটনামিতে ভরে গেছে নাগরিক মনগুলো। আমরা চাইলেই বদলে দিতে পারি আমাদের উজাড় করা ভালবাসা দিয়ে। একদিনে কিছু বদলে যায় না, কিন্তু এরকম প্রতিদিনের একেকটি প্রত্যয় আমাদের বদলে দেবে অনেকখানি, অ-নে-ক বেশি! হয়ত সেদিন আপনার নিজেকেই আপনি চিনতে পারবেন না!

সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে সবখানে! তাকে কুড়িয়ে নিয়ে রাখুন আপন মনের মাঝারে…। খেয়াল রাখুন যেন নিজের চারপাশের শেকলগুলো আপনাকে বেঁধে না রাখে, যেন অতীতের মতন গ্লানিময় না হয় আগামীর দিনগুলো। হাসুন মন খুলে, বৃষ্টিকে উপভোগ করুন আনন্দে। আপনার মতন জীবন তো পৃথিবীতে কোটি-কোটি মানুষ এখনো উপভোগ করছে– সাগ্রহে কিংবা বাধ্য হয়ে। আপনি যা পাচ্ছেন, সে তো আল্লাহর একান্ত দান। তিনি যা দিচ্ছেন, তা আপনার জন্যই নির্ধারিত। তিনি যা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করছেন, তা আপনি কিছুতেই পেতেন না। এই বর্তমানের মূহুর্তটুকু উপভোগ করুন। প্রাণের, অনুভূতির, উপলব্ধির এই মহামূল্যবান সময়ের জন্য কৃতজ্ঞতা অনুভব করুন।আল্লাহ সবসময় আমাদের সবচেয়ে বড় অভিভাবক, আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু। তিনি জানিয়েছেন তার রাহমাত থেকে নিরাশ না হতে, নিশ্চয়তা দিয়েছেন তাঁকে ডাকলে তিনি সাড়া দিবেন। আল্লাহ আমাদের সমস্ত দু’আ শোনেন; আমাদের কোন দু’আ বিফলে যায় না। আল্লাহর জন্য করা আমাদের কোন কষ্টই পুরষ্কারবিহীন রবে না। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এই পৃথিবীর অন্যায়-অত্যাচার-অশ্লীলতা-নৈরাজ্যের ভীড়ে আমরা যেন সত্য ও সুন্দরের আশা থেকে ছিটকে না যাই, যেন আখিরাতের অনন্তকালের পরম আরাধ্য সুখকে মরীচীকা মনে করে আশাহত হয়ে না যাই।

আরও পড়ুন



অভাগা স্বাধীনতা

আব্দুল আজিজ “স্বাধীনতা”নিয়ে পদ্য লিখে...

আম পাড়তে গিয়ে…

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে...

আজ পবিত্র শবে বরাত

আজ মঙ্গলবার পবিত্র শবে বরাত।...