পুরনো মেগালিথিকের সন্ধান

,
প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১     আপডেট : ৪ সপ্তাহ আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আহমাদ সেলিম
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার আদিবাসী সংগ্রামপুঞ্জিতে ঐতিহাসিক মেগালিথিক নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে। পুঞ্জির মধ্যে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা পুরনো জুমের মধ্যে এই মেগাথিলিক পাথরগুলোর অবস্থান। সহস্রাধিক বছরের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত মেগালিথিক পাথরগুলো আজো অতীতের গৌরবগাঁথা প্রচার করছে। আর সেই মেগালিথিকের সন্ধান বের করেছেন সিলেটের বাসিন্দা তরুণ গবেষক আব্দুল হাই আল হাদী। তাঁর এই আবিষ্কারকে সিলেটের বিশিষ্টজনেরা ’সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তবে, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক বলছেন, ঐতিহাসিক এই মেগাথিলিক যাতে আরো সুন্দরভাবে সংরক্ষিত হয় সে ব্যাপারে তারা আন্তরিক।

গোয়াইনঘাটের ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী পল্লী হচ্ছে সংগ্রামপুঞ্জি। পান, সুপারি আর দুর্লভ প্রজাতির প্রাচীন গাছে আচ্ছাদিত সম্পূর্ণ পুঞ্জি। পুরো পুঞ্জিই সবুজে আচ্ছাদিত এক জুম। প্রতিদিন সে জুমে নারী-পুরুষ মিলে কাজ করেন। যাপিত জীবনের সু:খ-দু:খ আর আনন্দ-বেদনার একান্ত অনুষঙ্গ এ জুম। পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী এ পুঞ্জিতে শত শত বছর ধরে এভাবেই খাসিয়া আদিবাসীরা বসবাস করে আসছে। সেই আদিবাসী পল্লীতে পাওয়া গেলো বাংলাদেশের সংস্কৃতির এক অনুপম নিদর্শন মেগালিথিক পাথর।

সমাধি সৌধ বা স্মারক সৌধ হিসেবে প্রাচীন কালে মেগালিথিক নির্মাণ করা হতো। অর্থাৎ কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কবরকে চিহ্নিত করে রাখার জন্য অথবা কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মেগালিথিক সৌধগুলো নির্মাণ করা হতো।

মেগালিথ হচ্ছে এক প্রকার প্রাচীন পাথর। মেগালিথিক বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে, যেমন- মেনহির, ডলমেন, স্টোন সারকেল, মাল্টিপল হুডস্টোন ইত্যাদি। বাংলাদেশে মাত্র দুই ধরণের মেগালিথিক দেখা যায়- ডলমেন ও মেনহির। খাসিয়া পুঞ্জিতে পাওয়ার আগে একইভাবে মেগালিথিক পাথর পাওয়া গিয়েছিলো সিলেটের জৈন্তিয়া উপজেলার নিজপাট গ্রামে। যা বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। আর পৃথিবীর যে কয়েকটি বিশেষ স্থান মেগালেথিক সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত, তার মধ্যে সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট অন্যতম। যা অনেকেরই অজানা।

প্রাগৈতিহাসিক কালের কোন এক সময়ে সভ্য একদল মানুষের অমর কীর্তি হচ্ছে মেগালিথিক। জৈন্তাপুরের মেগালিথিকের কথা সবাই জানলেও সংগ্রামপুঞ্জির মেগালিথিকের অবস্থানের কথা এতদিন কারও জানা ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, সংগ্রামপুঞ্জির মেগালিথিকগুলো খাসিয়াদের ঐতিহাসিক মালনিয়াং বা মাধুর মাস্কুট রাজ্যটির সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত।

বিশিষ্ট গবেষক ও পরিবেশকর্মী আব্দুল হাই আল হাদী জানান, ‘ বাংলাদেশের মেগালিথিক সংস্কৃতির প্রথম নিদর্শন নিজপাট এবং দ্বিতীয়টি হবে এই সংগ্রামপুঞ্জি। তিনি বলেন, মেগালিথিক সংস্কৃতির উৎপত্তি, বিকাশ ও প্রাচীনতা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে রয়েছে মতানৈক্য ও বিভেদ। চালু আছে অনেক মিথ ও কিংবদন্তী। সেটি বিদ্যায়তনিক জগতের একটি স্বতন্ত্র্য আলোচনার বিষয়। আমরা সে বিতর্কে না জড়িয়ে সরাসরি সংগ্রামপুঞ্জির মেগালিথিকের বিস্তৃতি ও ভৌত দিক নিয়ে আলোচনার প্রয়াস পাব।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংগ্রামপুঞ্জির এ মেগালেথিকের অবস্থানের কথা কোথাও উল্লেখ নেই, সেজন্য এটি নিয়ে কোন গবেষক বা প্রত্নতাত্ত্বিকের কোন আলোচনাও কোথাও পাওয়া যায়নি।’

ভারত-বাংলাদেশ সীমানা ঘেঁেষ চলে যাওয়া পিয়াইন নদীর তীরে খাসিয়াদের প্রাচীন বসতিস্থান সংগ্রামপুঞ্জির অবস্থান। সে পুঞ্জিরই বাসিন্দা ডিং । প্রায় ৪/৫ একর বাড়ি আর জুমে পূর্বপুরুষের এ ভিটায় বসবাস করছেন তিনি। পুঞ্জির মধ্যে তাঁর বসতি ও অবস্থান ।
আব্দুল হাই আল হাদি বলেন, ‘দীর্ঘদিন অনুসন্ধানের পর খবর পেলাম- ডিং এর জুমের মধ্যেই ঐতিহাসিক সে মেগালেথিক স্থাপনার অবস্থান। বাংলায় অনব্যস্ত ডিংকে অনেক বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত সেখানে প্রত্নস্থলে পৌঁছা সম্ভব হল। ডিং এর বসতঘরের প্রায় ৪০০ মিটার দূরত্বে সুনসান নীরব পান-সুপারীর জুমের মধ্যে মেগালেথিক পাথরশ্রেণীর অবস্থান।’

গবেষক আব্দুল হাই আল হাদীর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সেই পল্লীতে মোট ৪টি ডলমেন ও ৩টি মেনহির রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ডলমেন অক্ষত আছে। সর্ব দক্ষিণের ডলমেনের সাথে ২টি মেনহির দাঁড়ানো আছে। এদের মধ্যে ১টি মেনহিরের উপর আরেকটি মেনহির হেলে আছে। সম্ভবত: হেলে অযত্ন-অবহেলা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১টি মেনহির হেলে গেছে। এটির উত্তর দিকে ২ টি ডলমেনের মধ্যে ১ টি ছোট মেনহির আছে। সম্ভবত: এটিও অনেক উচুঁ ছিল। কিন্তু ক্রমশ: ক্ষয়ের কারণে ছোট হয়ে গেছে। এগুলো থেকে প্রায় ১০মিটার পূর্বে আরেকটি ডলমেন দেখা যায়। সেটি অনেকটা ভাঙ্গা এবং এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। সম্ভবত: এটিও অনেক বড় ছিল এবং এর সাথেও মেনহির ছিল। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। পুরো মেগালেথিক এলাকা সুপারী আর পানের গাছ-গাছড়া ঘিরে আছে। জায়গার ভৌত অবস্থা আর পাথরখন্ড দেখে মনে হয়, এককালে এখানে রাজকীয় কোন কাজ কারবার চালু ছিল। নিজপাটে মেনহিরের মতো এখানকার মেনহিরের গায়ে কোন বিশেষ চিহ্ন দেখা যায়নি। প্রত্যেকাটি ডলমেন আবার ছোট ছোট পাথরের পায়ার উপর অবস্থিত। ডিংসহ জুমের শ্রমিকরা পাথরগুলোকে অত্যন্ত ভক্তি করেন এবং জুতা পায়ে কউকে উঠতে দেন না। ডিং এর মতে, এগুলো প্রাচীন রাজাদের বিচারের স্থান এবং পূর্বপুরুষ থেকে বংশ পরস্পরায় সবাই এটাই জেনে এসেছেন।

প্রাচীন মালনিয়াং রাজ্যের রাজবাড়ী জাফলং (বল্লাপুঞ্জি) থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই সংগ্রামপুঞ্জি’র অবস্থান। মালনিয়াং রাজ্যটি ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত অত্যন্ত দাপুটে এক রাজ্য ছিল। গবেষকদের মতে, মালনিয়াং রাজ্যের রাজাগণ জায়ন্তিয়া বা সিন্টেং বংশোদ্ভূত লোক ছিলেন। সিলেটের অধিকাংশ এলাকা প্রাচীনকালে এ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। মধ্যযুগ পর্যন্ত দু’টি স্থানে এ রাজাদের রাজধানী ছিল। একটি হলো খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের মাধুর-মাস্কুট নামক স্থানে এবং অন্যটি হচ্ছে-সিলেট জেলার জাফলং এর ’বল্লাপুঞ্জি’ নামক স্থানে।

তবে, বেশিরভাগ গবেষকই মাধুর-মাস্কুট মালনিয়াং রাজ্যের অপর নাম বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ রাজ্যের সীইমদের সীম না ডেকে রাজা বলেই ডাকা হতো এবং তাদের রাজ্যকে ’মধুর মাস্কুট’ নামে ডাকা হতো । কিংবদন্তী মতে, এ রাজ্যের পূর্বদিকে মণিপুর রাজ্য, উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদী, পশ্চিমে ময়মনসিংহ এবং দক্ষিণে ঢাকা-ত্রিপুরা অবস্থিত ছিল। জৈন্তিয়াসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য বা সীয়েমসমূহ এ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।

মেগালিথিকের জন্য বিখ্যাত নর্থিয়াং জৈন্তাপুর নিজপাট থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত। সেখানেও মেগালিথিকের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। নর্থিয়াং একসময় জৈন্তারাজ্যের রাজধানী ছিল। সুতরাং দু’টি স্থানের মেগালিথিকের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছে জৈন্তা বা সিন্টেংদের দ্বারা। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিককালের কোন এক অজানা সময়ে তার প্রসার ঘটেছিল-তা আজও সবার কাছে রহস্য হয়ে আছে। নর্থিয়াং ও নিজপাটের মেগালিথিক নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও সংগ্রামপুঞ্জির মেগালিথিক নিয়ে কোন আলোচনা কোথাও হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। নিজপাটের মেগালিথেকের মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, মেনহিরের গায়ে বিশেষ চিহ্ন বা প্রতীকের ব্যবহার যা নর্থিয়াংয়ের মেগালিকে আছে বলে আমাদের জানা নেই। সম্ভবত: হিন্দু ধর্মের প্রভাব এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে। তাছাড়া মেগালিথিকের উৎপত্তির ক্ষেত্রে যে সেব তত্ত্ব ও অভিমত রয়েছে, সেসবের বাইরে নিজপাটের ক্ষেত্রে যেটি চালু আছে, তা হচ্ছে- এসব মেগালিথিক রাজার দরবারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিজপাটের মেগালিথিককে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করেছে। একইভাবে সংগ্রামপুঞ্জির মেগালিথিকের ’সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন সিলেটের বিশিষ্টজনেরা। ’সিলেটের প্রত্নসম্পদ’ বইতে গবেষক আব্দুল হাই ’সংগ্রামপুঞ্জির মেগালিথিক’ শীর্ষক অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যোগাযোগ করা হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক এ. কে. এম সাইফুর রহমান জানান, মেগালিথ হচ্ছে একপ্রকার প্রাচীন পাথর। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত রয়েছি। সিলেটে অতীতে অনেক প্রত্নসম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, করোনার মহামারিতে ইচ্ছে থাকলেও অনেক কিছু হয়ে উঠেনি। তবে শিগগিরই আমরা স্থানটি দেখে কি করণীয়, তার ব্যবস্থা নেবো। একই সাথে এই মহামূল্যবাদ সম্পদ রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবার।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত না হলেও আমি খোঁজ নেব এবং আমার পক্ষ থেকে যতটুকু করার তার ব্যবস্থা নেবো। বাংলাদেশের মেগালিথিক সংস্কৃতির প্রথম নিদর্শন নিজপাট এবং দ্বিতীয়টি হবে এই সংগ্রামপুঞ্জি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

চৌধুরী ফ্যামেলি এসোসিয়েশনের আলোচনা সভা ও কমিটি গঠন

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: শুক্রবার সন্ধ্যা...

লন্ডনে বিক্রি হচ্ছে বরিশালের ঝালমুড়ি

        ‘হ্যালো, ব্রাদার-সিস্টার। প্লিজ কাম হিয়ার।...

রায়হানের শরীরে ১১১ আঘাতের চিহ্ন

        সিলেটএক্সপ্রেস সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে...