পানি নিয়ে ভাবনা

প্রকাশিত : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯     আপডেট : ১১ মাস আগে

আফতাব চৌধুরী আমাদের এখনও তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। কারণ এখনও পানীয় জল হোক বা সাধারণ কাজকর্ম সারার পানির অভাব ঘটেনি। ঘটেনি কারণ আমাদের পানি জোগান দেয় যে ¯্রােতস্বিনী, তিনি এখনও বহমান এবং তার বুকের ঘোলা পনি এখনও নিয়ম করে বান ডাকে, জোয়ার-ভাটা খেলে। সেই পানি শোধনাগার হয়ে শহরবাসীর ঘরে ঘরে পানীয় হিসাবে একেবারে নিয়ম করে প্রতিদিন পৌঁছে যাচ্ছে। মাটির নিচের পানি সরবরাহকারী পাইপে কোথাও গড়বড় না-করলে শহরবাসীর পানি নিয়ে চিন্তার কোনো অবকাশই তাই ঘটে না। পরন্ত যদি বা কালেভদ্রে সারাই মেরামতির জন্য এই সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয় তাতেও বিশেষ অসুবিধা হয় না তার কারণ পানি বন্ধের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই সংবাদপত্র ও অন্যান্য মিডিয়াতে প্রচার করেন এবং অনেক সময় পানি সরবরাহ বন্ধ করার আগে অতিরিক্ত সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়ে থাকে।
ফলে মানুষ প্রয়োজনীয় পানি যথাসম্ভব মজুত করে নিতে পারেন এবং কয়েক ঘন্টা পানি সরবরাহ বন্ধ থাকলেও তখন সমস্যা হয় না। স্বাভাবিকভাবেই আপাতত পনি নিয়ে বাড়তি চিন্তার প্রয়োজন আপাতদৃষ্টিতে নেই। বরং পানি যখন অঢেল তখন ফেলে ছড়িয়ে গড়িয়ে ঢেলে আরাম আয়াসে খাও পিও জিও, কল খোলা থাকল কি বন্ধ, পানি অনর্থক নষ্ট হচ্ছে কি হচ্ছে না, কলের মুখে চাবি আছে কি নেই , গাড়ি ঘরদোয়ার ধোয়ায় কি ঘন্টার পর ঘন্টা ¯œানে গ্যালন গ্যালন পানি অনর্থক খরচ হচ্ছে কি হচ্ছে না, দরকার কী সেসব নিয়ে আলোচনার। ব্যতিকগ্রস্ত কিছু লোক আছে চিরকালই ছিল। ওরা পানি নিয়ে লাফাচ্ছে পানির অপচয় রুখতে হাঁকপাক করছে করুক করতে দাও। পনি সাপ্লাই তো ঠিক আছে। দশ-বিশ বছর পর কী হবে তা ভেবে এখন বুক শুকানোর মানে হয়? পানি পাওয়া যাবে না তাই কখনো হয়? পানি পাব না মানে! ট্যাক্স দিচ্ছি, পানি দেবে না! হয় নাকি? পানি কি কারও পৈতৃক সম্পত্তি যে দেবে না! সব হিসাব করে চলা যায় কিন্তু পানি এত হিসাব করে খরচ করতে পারব না বাবা, যে যাই বলুক আর যত ভয়ই দেখাক। হ্যা, আমাদের একটা বড় অংশের ভাবনাটা মোটের উপর এ রকমই। অন্তত, এই কিছুদিন আগে অবধিও এই রকমই ছিল। কিন্তু, এবার গরম পড়ার পর থেকে যখন গ্রীষ্মদিনের তাপমাত্রা দেশের নানাপ্রান্তে ৪২/৪৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেল, শীতপ্রধান ইউরোপ থেকে খবর এল যে সেখানেও তাপমাত্রা ৪৫ ছুঁইছুঁই এবং স্পেনে সেটা ৫০ পার হয়ে কেড়ে নিয়েছে একাধিক মানুষের প্রাণ। শোনা যাচ্ছে এমন চলতে থাকলে আগামী পাঁচ-দশ বছরের মধ্যে কেবল বাংলাদেশে নয়, গোটা পৃথিবীর একটা বড় অংশ খরতাপে পুড়ে ছাই হবে এবং মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে পানীয় জলের অভাব তখন আমাদের বুঝি কিছু একটু হলেও টনক নড়েছে। নড়ারই কথা। কারণ সম্প্রতি খবরের কাগজপত্রে পানি আর খামখেয়ালি প্রকৃতির কান্ডকারখানা নিয়ে লেখালেখির বহু বেড়ে গেছে, টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও এ বিষয় চলছে জোর আলোচনা, বিতর্ক, উঠে আসছে নিকট ভবিষ্যতের আতঙ্ক জাগানো সব পরিসংখ্যান টনক তো নড়বেই।
এই তো ক’দিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা গেল মেরুপ্রদেশের হিমবাহে বিশাল ধস নেমেছে। শতশত বছরের পুরনো বরফ চাঁই হয়ে খসে পড়ছে। বহুদিন যাবৎই অবশ্য মেরুঅঞ্চলে বরফ সা¤্রাজ্যে ফাটলের সূচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানীরা তা নিয়ে সতর্ক করে চলেছেন মানবসমাজকে, বলছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা যেভাবে নিঃশব্দে বছর বছর বেড়ে চলেছে- তাতে মেরুপ্রদেশের বরফ গলন অদূরভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে, সেখানকার জীব-বৈচিত্র্য তছনছ হবে এবং সেই বরফগলা পানি পৃথিবীর সমুদ্রগুলোর পানিস্তর বাড়বে এবং সেই বাড়তি পানির বিশাল তোড়ে তলিয়ে যাবে উপকূলবর্তী বহু নগর, মহানগর। আমাদের দেশের সুন্দরবন, এমনকি ঢাকা অবধিও নেমে আসতে পারে এই অভিশাপ! শুধু তাই নয়, দুই মেরুর বরফ মাত্রা কমে গেলে পৃথিবীর তাপ আরও দ্রুত বাড়বে এবং তা সরাসরি আঘাত করবে মানুষের জীবনযাত্রায়। পানীয় জলের জন্য হাহাকার উঠবে গোটা পৃথিবী জুড়ে আর সেই পানির অভাবেই চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে মানুষ। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এমন চলতে থাকলে কেবল পানীয়জলের অভাবেই এই শতাব্দীতেই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
এই বিপর্যয়ের মোকাবিলায় ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে গেছে বৈঠক আলাপ-আলোচনা, ব্যাপক বনসৃজন, এসি মেশিন, ডিজেল-পেট্রোল গাড়ি, বাস ও অন্য যানবাহন ইত্যাদি দূষণ সৃষ্টিকারী যন্ত্রের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মেপে পানি খরচের ঐকান্তিক চেষ্টা। তার চেয়েও বড় কথা এই প্রয়াসে পরিবেশকর্মী, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে শামিল হয়েছেন সাধারণ মানুষ। ইউরোপ আমেরিকা থেকে শুরু করে আমাদের পাশের ভুটান, সর্বত্রই আজ পরিবেশবান্ধব হয়ে ওঠার এই চেষ্টা দৃশ্যমান। কিন্তু আমরা? পরিবেশের দুর্দশা, আগামী সম্পর্কে ওইসব ভয় জাগানো বার্তা কি পানির জন্য হাহাকার, আমাদের কি একটুও ভাবাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের উন্নত শহরে কুড়ি টাকার এক বোতল পানি চারশো টাকায় বিকিয়েছে শুনে কি আমাদের এক বারের জন্যও বুক কেঁপেছে? মিডিয়ায় কাগজে ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপে এসব নিয়ে অনেক কথা, ছবি ঘুরছে ঠিকই কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে কি তার কোনো প্রভাব পড়ছে? পড়লে কতটুকু? কত কলের সারাদিন পানি পড়ে যায় সামান্য একটা স্টপ-ককের অভাবে। এখনও এমন বাড়ি আছে যেখানে দু’জনের জন্য দিনে আড়াই তিন হাজার লিটারেরও বেশি পানি লাগে! রোজ কেবল ঘর ধোয়াতেই তারা নাকি হাজার দেড় হাজার লিটার পানি ঢেলে নষ্ট করে! বাদবাকি লাগে গোসল আর কাচাকাচিতে! এমন বাড়ি নানা প্রান্তে একটা নয় অজ¯্র আছে এখনও। তার চেয়েও বড় কথা, পানির এই ব্যাপক অপচয় বন্ধে সাহায্য চেয়ে, কিছুদিন আগে সংশিষ্টø কাউন্সিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এবং মহামতি কাউন্সিলারের উত্তর শুনে কার্যত অনেকে বাকরুদ্ধ হয়েছিলেন। পুরপিতা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, কে কতটা পানি খরচ করবে সেটা তার ব্যাপার। এটা নিয়ন্ত্রণের কোনো আইন তো নেই। তাই তিনি এক্ষেত্রে কিছুই করতে পারেন না! তাজ্জব কান্ড বটে। এমনকি, যানবাহন ব্যস্ত এলাকার ফুটের দোকান রাস্তার উপর তিন/চার ফুট নেমে এসেছে জানানোয় নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তা বলেছিলেন, গরিব মানুষ একটু করে খাচ্ছে, আপত্তি করা যায়। বাসযাত্রী স্থানীয় প্রৌঢ় নাকি এমনটাই বলছিলেন। অতএব, বোঝাই যাচ্ছে আমাদের সচেতনতার লেভেলটা কোন পর্যায়ে। কিন্তু, তাই বলে তো আর গা-ছাড়া দিয়ে থাকলে চলবে না।
পৃথিবী জুড়ে আজ যে বিপদ ঘনিয়ে উঠছে চোখ বন্ধ করে থাকলেও তা আমাদের তো ছেড়ে কথা বলবে না। এর মধ্যেই বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশকর্মী সংগঠন কাজে নেমেছে। তবে,তাতে সাধারণ মানুষ যতক্ষণ না শামিল হচ্ছে কাজ কতটা এগোবে বলা মুশকিল। আসলে, একটা ব্যাপার বুঝে নিতে হবে, হয়তো আপাতত পানি দিয়ে চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু বাদবাকি অঞ্চল যেখানে মাটির নীচের পানির ভরসা সেখানে কিন্তু সংকট ঘোরালো হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের সর্বস্তর পানিস্তর নেমে এসেছে। বৃষ্টির অভাবে মাটির নীচের পানির ভাঁড়ারের দশা আরও খারাপ হচ্ছে। মাটির নীচের পানি যত কমছে তাতে বিপজ্জনক ক্ষেত্রবিশেষে আর্সেনিকের বিষ তত বাড়ছে। কী হবে তাহলে? উপায় একটাই, পানি ব্যবহারে সচেতনতা আর সবুজ বাড়ানোর উদ্যোগে আন্তরিকতা। দুটোর কোনোটাই যে আজও আমাদের মধ্যে বিশেষ সাড়া জাগায়নি সেটা বোঝাই যায়। না হলে এখনও বিশাল বিশাল গাছ কাটা চলে? পানির অমন অপচয় চলে! পুকুর বুজিয়ে বাড়ি তোলা বা পথের ধারের নয়ানজুলি বুজিয়ে হাইরাইজ রাস্তা বানানোতে হয়তো মানুষের আবাসন ও যাতায়াতের সমস্যা কিছু মিটেছে, কিন্তু সেই মানুষের ভবিষ্যতের বিপদ যে কতটা চেপে ধরেছে তা আজ হাড়ে হাড়ে অনুভূত হচ্ছে। ভরা বর্ষায় বৃষ্টি নেই। ইলিশ নেই দেশীয় মাছ নেই। বর্ষার আকাশে শরৎকালের মত সাদা মেঘ। কদাচিৎ যদি বা কালো বর্ষার মেঘ দেখা দিচ্ছে, বর্ষণের আশা জাগাচ্ছে দ্-ুএক পশলাতেই সাফ হয়ে যাচ্ছে তা। তাতে পথঘাট বাড়িঘর ভিজে থাকে বটে কিন্তু মন ভরে না। কারণ পশলা শেষেই জাঁকিয়ে উঠছে চড়া রোদ, প্রবল তাপ আর ঘেমো অস্বস্তি। অথচ, মুম্বাইতে এমন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে যে, বন্যা হয় হয়। বৃষ্টির পানির তোড়ে পাঁচিল ধসে কতকগুলো প্রাণও চলে গেল! আমাদের বাংলাদেশ বিশেষত উত্তরবঙ্গ এখনও প্রায় বৃষ্টিশূন্য। কিন্তু কালবৈশাখীর কালে দফায় দফায় ঝড়-বৃষ্টির সে কী দাপট! কিন্তু, এমন সবুজ নিধন, পুকুর ভরাট আর পানির অপচয় চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে যে আরও মারাত্মক কিছু দেখতে হবে-এমন অশনিবার্তাই কিন্ত পরিবেশবিদেরা প্রায় সকলেই দিচ্ছেন। দিয়েই চলেছেন। তাই আমাদের এখন এ মূহুর্ত থেকেই সতর্ক হতে হবে- বেশি করে যেখানেই সম্ভব গাছ লাগাতে হবে-গাছ না থাকলে বৃষ্টি হবেনা, বৃষ্টি না হলে পানি পাবেন না- এটা বৈজ্ঞানিকরা, বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেই যাচ্ছেন।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

আরও পড়ুন