পানির আর্সেনিকে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান

,
প্রকাশিত : ০৭ ডিসেম্বর, ২০২১     আপডেট : ১ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ :
এক সময় পানীয়জল বলতে জলাধারের জল অনিবার্য হয়ে উঠলেও প্রধান চাহিদা ছিলো বিশুদ্ধ জলের।তাই রোগমুক্তির অভিলাষে সে ই আশির দশক থেকে নলকূপ বা টিউবয়েলের স্মরনে আসে মানুষ।টিউবয়েল বা নলকূপ হলো,ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে পানি উত্তোলনের অনন্য কৌশল যন্ত্র।যে টি ৩.৯ ইঞ্চি থেকে ৩.৯ ইঞ্চি ব্যাসের সীমাহীন নল দিয়ে সৃষ্টি।আর বৈশিষ্ট্য হলো ভূগর্ভস্থ জলকে চাপে-চাপে উপরে নিয়ে আসা।পৃথিবীর নানা দেশে বোরহোল নামে চিনলেও আমরা তাকে টিওবয়েল বা নলকূপ নামেই চিনলাম।চিনলো উপমহাদেশের জনগন।গ্রহণ করে নিলাম।এবং ভরসায় নিরাপদ পানীয়জল ব্যবহারের জন্য জনসচেতনতা প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছে নিয়ে গেলাম।কিন্তু হঠাৎ করে দুঃসংবাদ হয়ে ধরায় ধরা দিলো আর্সেনিক।শুনে প্রথম দিকে বিশ্বাস করতে না চাইলেও দেশের প্রায় ৪৫ টি জেলায় নলকূপের পানি পরীক্ষায় ধরা দিলো আর্সেনিক নামক বিষাক্ত বিষ।সে ও ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের কথা।এরপর ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ব্যাপারটিকে আমলে নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ক্রণিক কেস হিসেবে শনাক্ত করে দিলো।কিন্তু ব্যাপারটি নতুন এবং অচেনা থাকায় বিশেষজ্ঞ পর্যায় প্রতিনিধিত্ব ছাড়া সচেতনতায় এক কদম ও এগুলো না। ফলে যা হবার হলো,আর্সেনিকের বিষ ছড়িয়ে গেলো গ্রাম,শহর,উপশহরে।আর আক্রান্তদের মধ্যে জরিপ চালনে দেখা গেলো-আর্সেনিক শুধু বাংলাদেশ নয়,আর্সেনিক দোষে দূষিত পানি পানে পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ান,চীন।দক্ষিণ আমেরিকার চিলি।আর্জেন্টিনা। ইউরোপের হাঙ্গেরি।জার্মানি।উত্তর আমেরিকার লোকজনও আর্সেনিক দূষণের শিকারে পরিনত।এটি১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ভারতেরপশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়ে।রাজ্যের মালদহ,মুর্শিদাবাদ,নদীয়া জেলাসহ প্রায় ৭টি জেলার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের বিপদজনক উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।সেখানকার সহকারি হিসাবে প্রায় ৮৬লাখ ১৬হাজার মানুষ আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলো।তবে,বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ২ কোটির উপরে। আমাদের দেশে সর্বপ্রথম আর্সেনিক ধরা পড়ে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে।এরপর ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ক্রণিক আর্সেনিক দূষণ কেস শনাক্ত করা হলেও ব্যাপারটি নজরে আনেনি কেউ।কিন্তু ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে যখন পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক আক্রান্তের খবর ছড়ালো তখন থেকেই টনক টান পড়ে।১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে ডিজাস্টার ফোরাম তাদের মুখপত্রের মাধ্যমে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতির কথা বেশ জোরেসুরে জানালো।তাদের গবেষণায় দেখালো,দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকাসহ প্রায় ৪৪টি জেলার মধ্যে ২৪ টি জেলায় আর্সেনিক আক্রান্তের সংখ্যা ১৫২৫ জনের মতো।এমন কি তখন সিলেটের বালাগঞ্জ,গোয়াইনঘাট,উপশহর, হাউজিংএস্টেট,টুকেরবাজার,এম.সি কলেজসহ বাংলাদেশের প্রায় ৫থেকে ৬কোটি লোক আক্রান্তের মধ্যে চলে আসে।তথ্যটি যখন সত্যে প্রতিভাত হয়েছিলো তখন,তৎকালীন সরকারেরও নজরে এলো আর্সেনিক।তাই বিগত ২৫ জুলাই ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে জেনেভায় অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সম্মেলনে বাংলাদেশের আর্সেনিক দূষণের কথা তুলে ধরে এ সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানালো।এরপর বিষয়টি নিয়ে নাক গলানো শুরু করে বিশ্বব্যাংক। ইউনিসেফ,ইউএনডিপি,প্রভৃতি সংস্থাগুলো।ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আওতায় বাংলাদেশ ২কোটি নলকূপ পরীক্ষার জন্য প্রজেক্ট নেয় হয়।২০০১খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে টিম বাংলাদেশের ৬১টি জেলার টিউবয়েলের পানি পরীক্ষার মাধ্যমে জানালো-৪২% টিউবয়েলের পানিতে বাংলাদেশ কে বেঁধে দেওয়া মানের চেয়ে বেশি মাত্রার আর্সেনিক পাওয়ার কথা।আবার ২২ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হয়ে গেলো,বাংলাদেশের ৫৪টি পরীক্ষিত জেলার মধ্যে ৪৭ টি জেলার ২৩৩ টি উপজেলার ২০০০ ইউনিয়নের ৩১,৪৯৭ টি গ্রাম এসে গেছে দূষণের কব্জায়।গত ৪ডিসেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়-সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারার সুরমা ইউনিয়নের গিরিশনগর গ্রামের মানুষ এখন আর্সেনিকের নাগপাশে।মিনারেল ওয়াটারের যুগে ব্যাপারটি অ মানানসীল হলেও উদ্বেগের উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ালো।তাই আর্সেনিক বিষয়টি নিয়ে জানার পরিধি বিশ্লেষণে ব্রতি হয়ে লেখার অবতারন। আর্সেনিক হলো স্বাদ ও গন্ধবিহীন বিষাক্ত খনিজ মৌলিক পদার্থ।এর পারমানবিক সংখ্যা ৩৩ ও পারমানবিক ভর ৭৪.৯।অর্ধ পরিবাহী ও শংকর ধাতু তৈরিতে ব্যবহৃত আর্সেনিক মৌলিক পদার্থ হিসেবে থাকলে পানিকে বিষাক্ত করে না।তবে বাতাসে জারিত হয়ে অক্সাইড গঠন করে নিতে পারলে বিষাক্ত রূপে আবির্ভূত হয়।এই বিষাক্ত স্ফটিকাকার ধরনের ধাতব মৌল যা ভঙ্গুর এবং ফিকে ধূসর বা টিনের মতো সাদা বর্ণের শুধু খনিজ উপাদান হিসেবে ই পাওয়া যায়।আপেক্ষিক গুরুত্ব ৫.৭৩ এবং গলনাংক ৮৭০°সেঃ।বিশেষজ্ঞদের মতে,খাবারের পানিতে প্রতি লিটারে ০.০১ মিলিগ্রামের অধিক আর্সেনিক থাকলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এবং ৭০থেকে ১৮০ মিলিগ্রাম আর্সেনিক অক্সাইড একজন মানুষের পক্ষে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।আর্সেনিক গবেষকদের মতে,ধাতবগুণাবলীসহ জৈব ও অজৈব দূষণে আর্সেনিকের উপস্থিতি লক্ষাবিষ্ট থাকে।এবং জৈব ও অজৈব মিলে চার ধরনের আর্সেনিক পানিতে পাওয়া যেতে পারে বলে অভিমতকে আমলে নেন।তা হলো [১]আর্সেনাইট (ত্রিযোজনী[২]আর্সেনেট(পঞ্চযোজনী)[৩]একক মিথাইল আর্সেনিক এসিড ও [৪]দ্বৈত মিথাইল আর্সেনিক এসিড।যা প্রকৃতিতে নানা মৌল,যৌগ বা খনিজ দ্রব্যের সাথে যুক্ত সালফাইড অথবা অক্সাইড রূপেও থাকতে পারে।এ পর্যন্ত প্রকৃতিতে পাওয়া সর্বাধিক আর্সেনিকের উৎসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আর্সেনিক হলো আর্সেনো পাইরাইট ও রেগলার অরপিমেন্ট।পৃথিবীতে বিভিন্ন খনিজ শিলা অথবা মাটিতে সাধারণত ১.৫ মিলিগ্রাম থেকে ২মিলিগ্রাম হারে আর্সেনিকের উপস্থিতি থাকে।কিন্তু আর্সেনিক আক্রান্ত মাটিতে এর পরিমাণ ৫৫০ মিলিগ্রাম হিসেবেও থাকতে পারে বলে জানা যায়।এ জন্যেই হয়তো প্রকৃতিতে পাওয়া বিভিন্ন দ্রব্যের মধ্যে ২০তম স্থানটি দখলে নেয় আর্সেনিক।
আর দখলে যাওয়া আর্সেনিকের ক্ষতিকর প্রভাবের দিক বিবেচনায় উপরোক্ত জৈব আর্সেনিকের চেয়ে অজৈব আর্সেনিক বেশি ক্ষতিকারক বলে জানা যায়।যা প্রধানত আর্সিনেট রূপে ভূগর্ভস্থ পানির মধ্যে মিশ্রিত থাকে।প্রকৃতিতে আর্সেনিক সাধারণত পানির মাধ্যমে স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং মাটিতে তলানি রূপে,উদ্ভিদে,প্রাণীদেহে,সাগর ও মহাসাগরে বিভিন্ন জৈবিক কার্যকলাপের মাধ্যমে রূপান্তরিত হচ্ছে।আর্সেনিক বায়োমিথাইলেশান এবং বায়োরিডাকশনের মাধ্যমেই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রূপে রূপান্তরিত হয়ে বায়ু বা পানির সাহায্যে একস্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।আর্সেনিক যৌগ সাধারণত কৃষিক্ষেত্রে,কীটনাশক তৈরিতে,বনজ শিল্পে,কাঠ সংরক্ষণে, কাঁচ ও চিনামাটি শিল্পে এবং ওষুধে ব্যবহৃত হয়।আর্সেনিক ট্রাই ক্লোরাইড- মৃৎশিল্পে,আর্সেনিক ট্রাই অক্সাইড-টেক্সিডার্মিতে,চামড়া এবং বিশেষ করে কাঠের ইলেকট্রিক খুঁটি সংরক্ষণে কাজে লাগে।সোডিয়াম আর্সেনেট-চামড়া এবং চামড়াজাত দ্রব্যের ট্যানিং ও কিউপ্রিক অটো আসিনেট-ক্যালিকো প্রিন্টিং এ বিভিন্ন রংয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।এমন কি যীশুখ্রিস্টের জন্মের পাঁচশতাধিক বছর পূর্বে চিকিৎসাক্ষেত্রেও আর্সেনিকের প্রচলন ছিলো বলে জানা যায়।চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটস্ ও ফোঁড়ার চিকিৎসায় আর্সেনিক ব্যবহারের অনুমোদন করেছিলেন বলেও আমরা জানতে পারি।তাছাড়া একসময় চর্মরোগ, হাঁপানি,সিফিলিস ইত্যাদি চিকিৎসায় আর্সেনিকের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশে জনসংখ্যার অধিক চাপ ও আবাসযোগ্য স্থানের ক্ষয়সাধনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার বেড়ে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচের দিকে নেমে যায়।ফলে মাটির কণা মধ্যস্থ স্থানকে শূন্য করে বাতাস ঢুকে অক্সিজেনের আগমন ঘটে এবং অক্সিজেনের সঙ্গে লৌহ ও আর্সেনিক যৌগের বিক্রিয়ার মাধ্যমে আর্সেনিক মুক্ত হয়ে যায়।আর মুক্ত হয়ে যাওয়া এই আর্সেনিক ই পানির সাথে মিশে নলকূপের বা টিউবয়েলের মাধ্যমে বেরিয়ে এসে আক্রান্ত করে ফেলে মানুষকে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ি প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক পাওয়া গেলেই তা দূষিত পানি বলে গন্য হয়।গবেষণায় দেখা গেছে,গভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও ১০০ থেকে ২০০ মিটার গভীরতায় আর্সেনিকের উপস্থিতি কম।মাটির নিচের বিশেষ স্তর থেকে আর্সেনিক পানির মাধ্যমে ওঠে এলেও তাতে বিভিন্ন উপাদান ও কার্যকলাপের উৎপাত ছিলো না।কিন্তু ইদানিং জৈবসার,কেঁচোসার ইত্যাদি ব্যতিরেকে হঠাৎ করে রাসায়নিক সার বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় বৃষ্টির পানির সাথে মিশে গিয়ে দূষিত হচ্ছে-খাল,বিল,নদী -নালা সমুদ্রের পানি দূষিত হচ্ছে জলজ প্রাণী,ক্ষয়ে যাচ্ছে প্রাণীর প্রজনন।এমনকি,পানির প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থের অধিক পানি ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষণিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়ে বায়ু ও অক্সিজেন মিশ্রিত পানির সাথে মিশে যাচ্ছে আর্সেনিক।সৃষ্টি হচ্ছে দূষণ।এবং দূষনের মাত্রা বৃদ্ধিতে খাবার,শ্বাস-প্রশ্বাস এবং আদ্রত্বকে সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে খুব সহজেই আর্সেনিকের ধারে কাছে চলে আসছে মানুষ।আর এই আর্সেনিক এমন এক মারাত্মক বিষ যা প্রাচীনকালে আত্মহত্যার জন্যও ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়।এমনকি মানুষ মরে গিয়ে পঁচে গেলে তার হাড্ডিতে পর্যন্ত আর্সেনিকের অস্তিত্ব পাওয়া যায় বলে গবেষকরা বলে থাকেন।আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় মানবদেহের শ্বাসতন্ত্র,পরিপাকতন্ত্র, রক্তসংবহনতন্ত্র এমনকি স্নায়ুতন্ত্রকেও।প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে দেখা গেছে-রোগির পায়ের মাঝে কালো ছোপ ছোপ দাগের সৃষ্টি হওয়া।চামড়ার রঙ কালো হয়ে যাওয়া।হাত ও পায়ের চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া।শরীরে ছোট ছোট গুটি দেখা দিয়ে কালো হয়ে যাওয়া। ও শরীরের চামড়া মোটা খসখসে হয়ে যাওয়া।দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষণে দেখা দেয়-চামড়ার বিভিন্ন স্থান সাদা লাল বা কালো দাগ।হাত ও পা ফুলে ওঠা।হাত পায়ের তালু ফেটে রক্ত বেরোনো।হাত ও পায়ে গুটি ওঠা।পাতলা পায়খানা।খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি।রক্ত আমাশয় ।মুখে ঘা।শেষের দিকে ফুসফুস,লিভার,কিডনি বড় হয়ে যায়।টিউমার দেখা দেয়।হাত-পায়ে ঘা ও পচন ধরতে শুরু করে।মূত্রথলি,চামড়া ও ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।কিডনি ও লিভারকে অকেজো করে তোলে।বমি বমি ভাবের সাথে কখনও কখনও পিত্তরস সহ বমি হয়।জিহবা চকচকে সাদা,মাড়ি লাল,ফোলা ও ব্যথাযুক্ত থাকে।এমনকি আর্সেনিক আক্রান্ত রোগির ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর থাকতে পারে।এছাড়া জন্ডিসে আক্রান্ত করে দেওয়া আর্সেনিকের নিয়মিত কাজের মধ্যে প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়।সাম্প্রতিক সময়ে “বিএসএমএমইউ পরিচালিত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়-আর্সেনিকোসিসে দেখা দেয়-রক্ত শূন্যতা ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ,শারিরীক দূর্বলতা ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা ৭দশমিক ৬ শতাংশ।শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ৬ দশমিক ২ শতাংশ।পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।হৃদরোগজনিত সমস্যা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ রোগি আর্সেনিকের কারণে জবুতবু।শুধু তা ই নয়,আর্সেনিকোসিস আক্রান্ত রোগিদের মাঝে বন্ধ্যাত্ব বিদ্যমান থাকে।দেখা গেছে মহিলা ও শিশুদের মধ্যে আর্সেনিক আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।কারণ আমাদের দেশে এরাই বেশি পুষ্টিহীনতার শিকার।গবেষণায় দেখা যায়,আর্সেনিকযুক্ত পানি অথবা ওষুধের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে ত্বকের ক্যান্সারকেও ত্বরান্বিত করে।ত্রিযোজি অজৈব আর্সেনিক পঞ্চযোজি আর্সেনিকের তুলনায় বেশি বিষাক্ত। আবার দ্রবীভূত আর্সেনিক অ দ্রবীভূত আর্সেনিকের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।ত্রিযোজি আর্সেনিক দীর্ঘস্থায়ি বা ক্রণিক বিষক্রিয়া সৃষ্টি করার ফলে মানবশরীরে বিভিন্ন অন্ত্রিয় অসুবিধা,শরীর ম্যাজ-ম্যাজ,চুলকানো,অস্থিসন্ধির অসাড়তা,অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়া,ব্যথা করা,হাত বা পায়ে ব্যথা,অনবরত পাতলা পায়খানা, কখনও কোষ্ঠকাঠিন্য,সর্দি,কাশি,গলা শুকানো, স্বর বিকৃতি বা গলা বসে যাওয়া,চোখের পাতায় পানির ভর নেওয়া,শরীর শুকিয়ে যাওয়া, ক্রমাগত ওজন কমে যাওয়া।গলা,বুক,পেট ও পিঠের মধ্যে পরিস্ফুট হয়ে ওঠা।
এছাড়াও ত্বকে এ্যাকজিমা,চুল পড়া,হাত ও পায়ের তালুর চামড়া পুরু হয়ে যাওয়া,যকৃতের কার্যক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে এর আকার বৃদ্ধি ঘটানো।এবং নিঃশ্বাসের সাথে গৃহীত আর্সেনিক নাকের পর্দায় ছিদ্রের সৃষ্টি করে।তাছাড়া শারীরিক দূর্বলতা, ত্বকের অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে।এরপরও ক্রমাগত পানির সাথে আর্সেনিক গ্রহনের ফলে ত্বকে সাদা-কালো মিশ্র ফোঁটা-ফোঁটা বর্ণের সৃষ্টি বা ড্রপ এ্যাপিয়ারেন্স হতে পারে। এ পর্যন্ত রোগীর সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি অজানা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন- আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে গেলে ভয় পেতে নেই।কারণ ছোঁয়াচে নয়।তবুও কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে পড়েন-তবে,ডাক্তারের পরামর্শে চলতে হবে।আর্সেনিকযুক্ত গভীর ও অগভীর নলকূপ বা টিউবওয়েলের পানি পান বন্ধ করে দিতে হবে।নদী ও জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত সময় নিয়ে ফুটিয়ে পানি পান করতে হবে।আমাদের ষড়ঋতুর দেশে বর্ষাকালে পানিতে থৈ থৈ বৃষ্টির পানিকে কাজে জমিয়ে ব্যবহার করা যায়।আমাদের দেশেতো সৃষ্টির সেরা দান গড়ে প্রায় ২০০০ মিলিলিটার পানি।যা অবাদে দান করে দেয় প্রকৃতি।ইচ্ছে করলে এ পানি জমিয়ে সারা বছরই পান করা যায়।যেমন করে পারিবারিক সংরক্ষনাগারে জমিয়ে প্রায় ১০ মাস পর্যন্ত সময় নিয়ে পান করে থাইল্যান্ড।তবে প্রকৃয়াটি হলো,এ পানি জমিয়ে ৫ মিনিট পর পান করতে হবে।কারন পানি পুরোটাই নিরাপদ,স্বচ্ছ ও পানের উপযোগি।এছাড়া জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আর্সেনিকের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।পরীক্ষায় আর্সেনিকের মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে পানি পানে বিরত থাকতে হবে।আর্সেনিকে আক্রান্তের পর খাওয়াতে বিধিবিধানের নিষেধ না থাকায় শাকসবজি, পুষ্টিকর খাবার বেশি করে খেতে হবে।টিউবওয়েল বা নলকূপ বসানোর পূর্বে সঞ্চিত পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। টিউবয়েল বসানোর আগে আশপাশে থাকা টিউবলের পানি পরীক্ষা করতে হবে।ব্যবহৃত টিউবওয়েল বা নলকূপ ৬ মাস পরপর পরীক্ষার মধ্যে রাখতে হবে।কোন এলাকায় আর্সেনিকযুক্ত পানি পাওয়া গেলে তা পরিহার করতে হবে।নদী বা জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহ করতে হবে।এবং সংগৃহিত ২০ লিটার পানিতে প্রায় ১০ মিলিগ্রাম বা অর্ধ চামচ ফিটকিরি মেশাতে হবে।তারপর দুই থেকে তিন ঘণ্টা রেখে দিতে হবে।পানি থিতিয়ে গেলে ব্যবহারের উপযোগি করতে হবে। আর্সেনিকযুক্ত পানীয়জলের জন্য বিশুদ্ধ পানির প্লান্ট স্থাপন করতে হবে।স্থাপন করতে হবে গভীর নলকূপ।যদি কোন এলাকায় আর্সেনিকযুক্ত টিউবওয়েল বা নলকূপ পাওয়া যায়- তবে সাথে সাথে সিলগালা করে কলের মুখ লাল রং করে দিতে হবে।আর আর্সেনিকমুক্ত হলে সবুজ রং করে দিতে হবে।মনে রাখতে হবে,কোন অবস্থায় আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার করা যাবে না।পর্যাপ্ততার বিচারে আর্সেনিকের উল্লেখযোগ্য ওষুধের আলোমুখিন না হলেও খুব সচেতনভাবে বিধিনিষেধ বিধানে নিলে আর্সেনিক দূষণের ছোট ক্যান্সারও অস্ত্রোপচারে ভালো হয়ে যায়।তবে,খাবারের বেলায় সুষম ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত।প্রতিদিন না পারা যাক,অন্তত সপ্তাহে একদিন মাছ,ডিম, দুধ,অঙ্কুরিত ছোলা,বাদাম,সয়াবিন,বিভিন্ন প্রকারের ডাল,গাজর,শাকসবজি এবং প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন যুক্ত খাবার খেতে হবে।সাথে সাথে আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি পান।শিমের বিচি,কাঁঠালের বিচি,মটরশুঁটি,বরবটি,ডাল ইত্যাদি বেশি করে খেতে হবে।সঙ্গে ভিটামিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ি চললে ধীরে ধীরে কমে আসে আর্সেনিকের লক্ষ্মণ। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন-আর্সেনিক দূষিত নলকূপের পানি পানে বিরত থাকা। নদী বা জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহ করতে করে ব্যবহার করা।এবং সংগৃহিত ২০ লিটার পানিতে প্রায় ১০ মিলিগ্রাম বা অর্ধ চামচ ফিটকিরি মিশিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা রেখে দিতে হবে।এবং পানি থিতিয়ে গেলে ব্যবহারের উপযোগি করতে হবে।গোবর আর্সেনিক শোষনে সহায়ক থাকায় পানির তলানি গোবরের মধ্যে ফেলে দিতে হবে।হেকিমি,হোমিওপ্যাথিক,ওষুধে অল্পমাত্রায় আর্সেনিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে বলে এসব গ্রহনে দূরে থাকা।সত্বর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পানি পরীক্ষা করিয়ে আনা।ও আর্সেনিকমুক্ত ফিল্টার ব্যবহার করা। সর্বত্র বিশ্লেষণ করে প্রমান দাঁড় করানো যায়- আপাত সময় টিউবয়েলকে বিষফোঁড়া ভেবে নিলেও বিশুদ্ধতার বিচারে এখনও প্রতিদ্বন্দ্বি সময় কে ধারন করে সেরা অবস্থানে তার এগিয়ে থাকা বিদ্যমান।তবুও আর্সেনিক মুক্তির ব্যাপারে কেমন জানি মনে হয় আমরা কি পূর্বের সেই সনাতনে যাবো,না কি আগাবো।আর আগাতে তো হবেই।আমাদের আর পেছনে থাকার সময় নেই।যদিও আমাদের দেশে ষাটের দশক থেকে টিউবওয়েল ও নলকূপের আমদানি ও স্থাপন শুরু হয়। আমরা ছিঁটকে পড়ি সনাতন পদ্ধতি থেকে।অন্যদিকে চর দখলের মতো বিদেশি কূপ এসে দখল নিতে থাকে আমাদের জমিন।
ভরাট হতে থাকে-কূয়ো,পাতকূয়ো,ইদারা,পুকুর,নদী, জলাশয়।অথচ প্রিয় বিমুখ কথায় বলা যায়-যেসব বিদেশি মানুষ বা সংগঠন টিউবওয়েল ব্যবহারে উৎসাহ জুগিয়ে ছিলো তাঁরা টিউবয়েল পূ্ঁতে না।তাঁরা ভূ সীমানার তেল তুলেনা।পানি তুলে না।খোদ আমেরিকায় মাটি তলানির পা নি তুলতে ওয়াশিংটন থেকে ফেডারেল গভর্ণমেন্টের অনুমতি নেয়।র্তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলে তেল কিনে।গাড়ি বানায়।গাড়ি চড়ে।তাঁদের পানির নাম সারফেজ ওয়াটার।আমাদের নেই মিনারেল হাই দামের পানি না হলেও তাঁরা সস্তায় কাজ সেরে নেয়।কারন তাঁরা মোড়ল।তাঁরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সমস্যার সৃষ্টি করে,আবার সমাধানের জন্য অর্থ ঢালে।আর এই ঢালাঢালির নামই রাজনীতি।তবুও বিশুদ্ধ পানি নিতে এ জাতীয় রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে আমাদের মধ্যে সচেতনতা আসবে।দেশপ্রেম আসবে।আর্সেনিকে মুক্তি আসবে।ওষুধ আসবে।জীবানুমুক্ত পানি আসবে।সেটিই আগামি দিনের জন্য কাম্য হবে। এটি ই হবে দেশের জন্যে ভাবা। সূত্র ঋণঃ যোগাযোগ-নভেম্বর ১৯৯৫ সংখ্যা। প্রজন্ম-ডিসেম্বর ১৯৯৬ সংখ্যা। দৈনিক মুক্তকন্ঠ- ৬ নভেম্বর ১৯৯৭ সংখ্যা। Durjug Niviran-October-1997.A Publication of Disaster preparedness forum. দৈনিক কালের কন্ঠ দৈনিক মানবকন্ঠ অনলাইন ও বিভিন্ন জার্নাল। আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ ইমেল:anwarhmisbah1970@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

মোহাম্মদ ছাদ উদ্দিন রোটারী ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে যোগদান

        রোটারী ক্লাব অব সিলেট প্রিমিয়ারের...

গোলশূণ্য সমতায় নেপাল ও ফিলিস্তিন

        সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ...

দাউদপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের কমিটি গঠন

        বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দক্ষিণ সুরমা উপজেলার...