পাখিলৌকিক জোছনা : আলোকিত কবিতার ধ্যান

প্রকাশিত : ২০ মে, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

মামুন সুলতান:
কবিতার রসবোধে রসিক মন সর্বদা সঞ্চারিত হয়। আশ্চর্য আবেগে বইতে থাকে সারি সারি শব্দনৌকা। সবেগে উচ্চারিত হয় মাঝি মাল্লার আনন্দ বেদনার প্রবল জলোচ্ছ্বাস। মনে মনে গাঁথেন মনের ভাষা। সেই ভাষা সঞ্চারিত হয় জনে জনে। সেই ভাষা গীতল হলে, সুর-ব্যঞ্জনায় বিউগল হলে, সেই সম্পর্ক আরো গভীর হয়। কবি ও কবিতা, ভাব-ভাবনার মতো। কেউ ভাবে কেউ বিন্যস্ত হয় শব্দের মায়াজালে। কবির উচ্চারিত-প্রাণবন্ত-শব্দ সম্ভোগে কবিতার জন্ম। সব মানুষের আবেগ আছে। সব আবেগ কবিতা নয়। শিল্প-সক্সগত আবেগই কবিতা। শিল্প মানে সাধন-প্রবল চেতনা। কবি মানে-ই শিল্পী আর শিল্পী মানেই সাধক। সাধক কখনো যশ-খ্যাতির কাঙাল নন। আমৃত্যু তিনি শব্দ সাধনে, ভাব-সাধনে, যুগ-সাধনে এবং আত্ম-সাধনে বিমগ্ন থাকেন। কবির আত্ম-সাধনে, চিত্ত-বেদন এক আনন্দ-বোধের মাধ্যমে আত্মাকে বিকশিত করেন। আত্মার আশ্চর্য ভাবনা যখন শিল্প-সঙ্গত-রসবোধ-মুগ্ধতা নিয়ে কবিতা আত্ম বিকাশ করে যখন পাঠক কবিতা পাঠ করে ভাবনার জগতে বসে আনন্দ তৃপ্তি নিয়ে বোধের জগতে প্রবেশ করেনÑতখনই কোন ‘কবিতা’ শিল্প মাত্রায় প্রাসঙ্গিক হয়।
আশরাফ হাসান নব্বই দশকের একজন শক্তিমান কবি। কবিতার ধীমান জগতে তিনি একজন প্রদীপ্ত প্রতিভা। তাঁর কবিতার ভাব-ভাষা, বিষয়-আশয়, ছন্দ-গতি-প্রবহমানতা, রস-রহস্য; ছন্দ-অলংকার, ভাবচিত্র-কল্পচিত্র কিংবা চিত্রকল্প ইত্যাদি সংগত শিল্পগুলো সুষ্পষ্ট। কবিতার এই অনিবার্য উপকরণগুলো তিনি সচেতনভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন সব সময়। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমি তাঁর কবিতার অনুসন্ধিৎসু পাঠক। কবিতার ধারাপাত খুঁজতে ডুব দিতাম তাঁর কবিতায়। চিত্রকল্পের সুনিপুণ চিত্র নির্মাণে তিনি দক্ষ শিল্পী। মেঘের দেশের নাইওরী পালকি চড়ে বাপের বাড়ি যায়। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমি তাঁর মুগ্ধ পাঠক। কোন সাহিত্যাসরে সুরেলাকণ্ঠে তিনি যখন আবৃত্তি করতেন তাঁর কবিতার পংক্তিমালা-আমরা তখন মুগ্ধস্রোতা। কবিতার সাথে সাথে হারিয়ে যেতাম কোন কল্প জগতে। ঈর্ষা করতাম। এতো সুন্দর কবিতা কেমনে লিখেন! এতো মাধুর্য কোথায় পান খোঁজে? নির্মাণশিল্পী- তাঁর শিল্পকে নানা রঙ মিশ্রণ করে রঙিন- কারুকার্য চোখের সামনে নিয়ে আসলেই সেই শিল্পের চমৎকারিত্বে আমরা আশ্চর্য আনন্দ অনুভব করি। কবি আশরাফ হাসান সেই সৌন্দর্যের সানন্দ কারিগর।
কবি আশরাফ হাসান কবিতার সংসার বহু মানুষের সঙ্গ পেয়েছেন। বহুলোককে দিয়েছেন তাঁর মূল্যবান সময়। তিনি যেমন ভালো কবিতা লিখতেন- তেমনি কবিতার সমঝদার পাঠকও বটে। সেই সুবাদে অনেক অগ্রজ-অনুজ কবিদের কবিতা নিয়ে শ্রমসিদ্ধ সার্থক সমালোচনা লিখেছেন। স্থানীয়-জাতীয় পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। মনের মাধুরী মিশিয়ে সাহিত্য সমালোচনা করেছেন। তিনি বড়কে বড় বলার উদারতা দেখিয়েছেন। একচক্ষু মনোভাব নিয়ে কখনো সাহিত্য বিচরণ তাঁর ছিলো না। তিনি শাদাকে শাদা এবং কালোকে কালো বলার সাহস ছিলো। বড়দের সম্পর্কে তিনি কখনো বিরূপ মন্তব্য করেন না। ছোটদের লালন করেন ভাবিকালের সাহিত্যিক হিসেবে। তিনি একসময় অনেক কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। আজ সময় এসেছে কবি আশরাফ হাসান আলোচিত হবেন। সম্প্রতি কবি আশরাফ হাসানের বিয়াল্লিশটি কবিতার একটি পা-ুলিপি আমার হস্তগত হয়েছে। এ কবিতাগুলো আমার পাঠক মনকে তুষ্ট করতে পাঠে মনোযোগী হয়েছি। বরাবরের মতো তৃপ্ত হয়ে দুকলম আবেগ-উৎগীরণে নিযুক্ত হলাম। এই পা-ুলিপিটি ‘পাখিলৌকিক জোছনা’ হয়ে পাঠকের দরবারে আসছে। সেই সাথে কবিতার ভেতর বাড়ির আসবাবপত্র সাজানো-গোছানো-কেমন পরিপাটি হলো, দরজার নকশা, জানালার কাঁচ, রান্না-ঘরের তৈজসপত্র, ড্রয়িংরুমের কারুকাজ, কবিডোরে ঝুলন্ত-চেয়ারে ইত্যাদির খোঁজ-খবর দিতে সূত্রধর হিসেবে বলার চেষ্টা করবো।
তোমরা আমায় দোষ দিও না দোষ দিও না;
তিনি আমার হারিয়ে যাওয়া মেঘের ছায়া
মা শুধু নয়, মা শুধু নয়Ñভালোবাসা।
কবির মাথার উপর ছায়া নেই। রোদে পুড়ে গেলে গীতল আদরে খোকাকে স্নিগ্ধ-শীতল ছায়া দেবে না কেউ। দুঃখে কষ্টে মলিন হলে, দস্যু-দানবে আক্রান্ত হলে-মায়ার মাদুর হয়ে, প্রীতির সভায় প্রধান হয়ে, ঢালের মতো আঁচল দিয়ে মা’ই সন্তানের একমাত্র ছায়া হয়ে থাকেন। কবির সেই ছায়া সেই মা’কে স্মরণ করে লিখেছেনÑ
এখন আমার মাথার উপর সেই ছায়া নেই,
ঝলসে যদি বোশেখ রোদে ধূমকেতু হই
সকল ফাঁদে নির্বিবাদে অগিড়ব ঝরাই

কবির অস্তিত্ব নিয়ে কবি সন্দিহান। মানুষ আর মাটি। একক সত্তা-নাকি দ্বৈত সত্তা। ‘আমিহীন মাটি আর মাটিহীন আমি’-এই আমিত্ব আর মাটিত্ব – নিয়ে কবির প্রশ্ন ‘-একই সত্তার দুটো দাফন কী করে সম্ভব?’ মহাপ্রয়াণে কে যাবেন? – কবি যখন ‘মাটি’ হতে চান তখনই তিনি মাটিহীনদের পায়ে পায়ে পিষ্ট হন। আবার ‘মাটিহীন’ হতে চাইলেÑ
প্রতিবাদের ভাষাকে বানাই নির্মেদ প্রহরী
বিদ্রোহের বারুদে পোড়াই উৎপীড়ক দিন
মাটি আমাকে বিনত হতে বলে
মাটিহীন ‘ওরা’ নসিহত বাটেÑ
খুলে ফেলো তোমার অহমিকার দুর্বিনীত পোশাক
এখন ভেবেই পাচ্ছি না
মাটিহীন ‘আমি’ হবো
না আমিহীন ‘মাটি’!
কী সাংঘাতিক আধ্মাতিকতা। মাটির সাথেই ‘আমি’ -মিশে যাবে মানুষ। কেবল ‘আত্মা’- চিরঞ্জীব সত্য।
‘ঘড়ির কাঁটা ধরে নামে অমাবস্যা’ কবিতায় সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। দ্বান্দ্বিক কোলাহলে কবি যখন নিরন্নের মতো যখন লাইট পোস্টের নীচে দাঁড়ান- তখন থোকা থোকা জমা হয় ‘অশান্ত অন্ধকার’… চল্লিশ বছর ধরে যা সঞ্চয় করেছেন- তা কেবলই- ‘অগণিত শূন্যের বেসাতি।’ সংগ্রাম মুখর জীবনে রাজপথে উত্তাল মিছিল থেকে ফিরে আসেন শূন্য হাতে।
তারপর এভাবে তারাদের রাত যখন
জোছনার হাত থেকে ঝরে যায়,
শেষের অস্থির সন্তাপ গায়ে মেখে
চলে যেতে হয় আজন্ম রিক্ত হাতে
আর অভিষ্ট মানজিলের প্রস্তুতি
কেবল অগোছালোই থেকে যায়।
অথবা :
ঘাসের ওপারে মৃত্তিকা
উর্বর পলির দ্যাশ
স্বপ্নের মুক্তি যেখানে
‘কুলু নাফসিন জা-য়িক্বাতুল মাউত’
কবির পরকাল ভাবনা কবিকে আড়ষ্ট করে না। বরং কবির আত্মাকে সঁপে দিয়েছেন ‘সুদূর আলোকের উর্ধ্বালোকে।’ কবি ভীষণ উৎসুক নিয়ে ছুটে যান গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। স্বপ্নিল সব সফর শেষে কবি পেয়েছেন ‘অঢেল মুক্তির ইয়াকুত।
‘পরম তৃপ্তির সম্মোহন সংবাদ’ পেয়ে অকষ্মাৎ চেয়ে দেখেন ‘সফেদ পর্দার লাখো স্তবকে সাজানো আমার চারদিকে স্বপ্নিল ক্যানভাস।’ কবির কাছে আসে সেই সম্মোহন সংবাদ কী আশ্চর্য মোহনীয়। নূরে আ’লার মে’রাজ কামনা করেন তপ্ত অশ্রুজলে। কবি আশরাফ হাসানের সুপরিমিত মানস-কামনা ‘অনন্ত অনিঃশেষ’ কবিতায় ভেসে উঠেছে ‘-আমার নূরে আ’লার আল্লাহর অনন্ত সান্নিধ্যে অনিঃশেষ…। আল্লাহর কাছে যার আত্ম-সমর্পণ কবিতা তার কাছে আন্তরিক শব্দ-দ্যোতনায় বিগলিত হবে পরম মমতায়।
‘প্রতীক্ষার প্রহর’- কবিতায় কবি সেই মানস আরো প্রকটভাবে ধরা দিয়েছে।
কবির আহ্বান-
‘জায়নামাজের নরম মুসল্লায় একটি বার হাত রাখো-
জায়নামাজের নরম মুসালায়
একটিবার হাত রাখো,
দ্যাখো ঊষ্ণতার অনন্ত আলোয় কী ভীষণ উদ্ভাসিত
তোমার উ™£ান্ত অহমিকার নিকষিত নীল!
সান্নিধ্যের প্রার্থী তো সে হবেই,
এখানে স্রষ্টার ভালোবাসা নিরঞ্জন!’ -এখানে স্রষ্টার ভালোবাসা নিরঞ্জন’ আহ- কী মধুর- কী আকুল আকুতি! স্রষ্টার নৈকট্য লাভের একান্ত আগ্রহ নিয়ে কবির একান্ত আহ্বান-
দ্যাখো, চেয়ে দ্যাখো তোমার অস্তিত্বের
প্রতিটি অনুতে পরমাণুতে স্রষ্টার ভালোবাসা নিরঞ্জন!
যাও, প্রস্তরিত কবট বুকে
প্রশস্ত ঔদার্যের হাত ধরে যাও
এগিয়ে যাও ঘনিষ্ঠতার একনিষ্ট মহিমায়-
‘বসন্তবেলা’ কবিতায় কবি কী যেন বলতে চান। কার আসার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে আসছে না। তার জন্য কতো বিনিদ্র রজনী কেটেছে সবার। গণহত্যার ঝাঁঝালো রাত গেলো-বাবা জায়নামাজে সেজদারত, মা দোয়ায় অশ্রুসিক্ত, বোন খোঁজেন প্রভাতের মুখ তবু সেই প্রত্যাশা ফিরে আসে না, -সেই মুখ, সেই প্রত্যাশা কবির ভাষায় শোনা যাক :
অপেক্ষায় প্রতীক্ষার রেশ প্রলম্বিত বহুদূর
এখনো আত্মার স্পন্দন যেনো তোমার অভাবনীয় মুহূর্তের ভয়
মাটির প্রতিটি ধুলিকণায় জুড়ে বসে অপ্রেমিক দস্যুদের পার্ক
বিবর্ণ ডায়রির পুঁতে রাখা রক্তিম কবিতার শুরু হয়েছে প্রসব বেদনা…
তোমার আর আসা হলো কই?
অথচ, ‘সুবোধ সংলাপ’ – কবিতায় কবির হতাশা নিয়ে বলছেন-
‘কী বিশাল নীল খামের ভিতর ক্রমাগত ঢুকে যাচ্ছে
আমার গতিময় আলোর সাম্পান…’
‘নেই কিছু নেই মুক্তি চাই’ – কবিতায় সেই হতাশা আরো গভীর দুঃখ নিয়ে দেখা দিয়েছে-
হায়! এখন কার কাছে যাই
প্রতিদিন ফুটছে দুঃখের লাভা
তাকেও বলি ওগুলি ফেরত নাও
লাল শরম ঝেড়ে আশাহত করলো সে
ক্রেতাজন ধারেপাশে দেখছি না কেউ
নেই কিছু নেই, মুক্তি চাই।- মুক্তি চাই মুক্তির স্বাদে কবি যখন দেওয়ানা। তখন ‘ডানাভাঙা পাখি’ কবিতায় এ কী শোনাচ্ছেন কবি?
মৃত্যু ঘটেছে কবির কতকাল আগে
খোঁড়া শালিকের মতো নিশ্বাস হাঁটে
কার ধ্যানে চোখ দুটো শ্রাবণের ধারা
কষ্টপ্রহর বেয়ে দস্যুরা নামে;
হৃদয়ের তারে তারে রিদম মরে গেছে
রক্তিম কবিতার ভাষা ডানাভাঙা পাখি।
সেই ‘ডানাভাঙা পাখি’ ‘বিবর্ণ বেলায় এসে’ খানিকটা আলো নিয়ে উড়তে দেখা গেছে-
কে তুমি বলে যাও, বলে যাও
লৌকিকতায় অলৌকিক আলো
কিংবা মৃদু গতির এক স্বচ্ছন্দ পাখি
আমাকে বলে যাও আঁধার গহিনে
কে ওই সহসা জ্বলে বিজলি সম! – এখানে যে পাখিকে দেখা গেলো সেই পাখি ও সুরের পাখি। সেই পাখির তীক্ষè কণ্ঠে রবের তৃষ্ণা। বেলায়েতি ধ্যানে কবিও মগ্ন হন এই বিবর্ণ বেলায়।
কবি আশরাফ হাসানের কাব্যিক বুননে ছন্দের সেলাই সুনিপুণ। ছন্দপটু কবি হিসেবে তিনি গ্রহণযোগ্য শিল্পী। স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত এবং মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার করেছেন। আধুনিক কাব্যগাঁথুনির সাথে ছান্দিকতা তার কবিতাকে অপূর্ব রূপ-ব্যঞ্জনা দান করেছে। কথা বলেন অতি আড়াল থেকে কিন্তু শব্দের ছন্দ-প্রবহমানতা অত্যন্ত সাবলীল। স্বচ্ছন্দগতিতে ঋজু-তালে সামনে এগুতে থাকে।
‘হারিয়ে যাওয়া মেঘের ছায়ায়’ দেখা যায়-
চোখের তারায় কাঁদতো তাঁহার কত্তো রহম
প্রীতির সভায় প্রধান তিনি দৃপ্ত অটল
কিংবা ধরো দস্যু দানব হায়না যারা
খামচে দেবে শীর্ণ দেহ এই যে আমারÑ
আঁচলটাকে টানিয়ে দিতেন ঢালের মতো;
কী চমৎকার স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার করেছেন : অন্যদিকে ‘রুদ্র-সোনা-চান্দে’- কবিতায় স্বরবৃত্ত ছন্দের পাশাপাশি অন্ত্যমিলের কী অপূর্ব সমাহার :
সন্ত্রাসী মন কান্দে,
পাষাণ বুকে চোখ রাঙিয়ে
মুষ্টি হাতে লাজ ভাঙিয়ে
রুদ্র সোনা-চান্দেÑ
বজ্র-চেরা বাকভঙ্গিমায়
যুদ্ধ-দেহী রণ-রঙ্গিমায়
শান্তিটারে বান্ধে। কী অপূর্ব ছন্দ ও শব্দের খেলা।
‘লোবান গন্ধ’-কবিতায় অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার লক্ষণীয়।
ভরা বরষায় যেনো জ্যৈষ্ঠের দহন,
ঘুমিয়েই থাক্ স্বপ্নগুলো আজ
দীপের নিঃশেষে জাগা রূঢ় অন্ধকার
কোথায় হারালো যেনো মাঝি সিন্দাবাদ!
‘স্কাইলার্ক পাখির ঠোঁটে’ – কবিতায় চিত্রকল্পের যুৎসই ব্যবহার পাঠককে মুগ্ধ করবেই।
মূর্ছার মতো খেলে বয়েসি নিঃশ্বাস
প্রেম তো পলায়নোন্মুখ
নাইওরি মেঘ চলে গেলে
যেভাবে আকাশ হয় সুনীল
হৃদয়-উঠোন
এখন
স্বার্থলাভায় পোড়া ঘাস
মূর্ছার মতো খেলে বয়েসে নিঃশ্বাস, কিংবা নাইওরি মেঘ চলে গেলে, অথবা- গোলাপ-স্বপ্ন ভাঙে তারার আকাশে আকাশে, অথবা – খোঁড়া শালিকের মতো নিঃশ্বাস হাঁটে অথবা- ঘড়ির কাঁটা থেকে দিবস সরে গেলে, – এভাবে প্রায় প্রতিটি কবিতায় কবি চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন। ফলে কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে তরতাজা চিত্রের বাগান। শুয়ে থাকা বিকেলের রোদ, নদী কাহিনি, মরা নদী ও পরিশ্রান্ত নোনা, তিনি এলেন, রুহানী যাত্রা ইত্যাদি কবিতাগুলোর প্রতি মনোযোগ দিলে চিত্রকল্পের বিপুল ব্যবহার দৃষ্টিগোচর হবে।
পুষ্পসান্নিধ্যে ঝড় নেমে এলে
খসে পড়েজোড়াচোখ
কাজলের মতো পলেস্তারা।
প্রমত্তাপদ্মায় যেভাবে জাগে চর
অবশিষ্ট থাকে পাঁজরের হাড়
দাঁড়ের মতো খুঁটি
বিশীর্ণ চোয়াল থেকে নেমে আসা মরা নদীর মতো গ্রীবা। (মরা নদী ও পরিশ্রান্ত নোনাজল)
অথবা,
কাত হয়ে শুয়ে থাকা
বিকেলের নরোম রোদ;
অতএব দ্বিপ্রহরের খড়গ-রৌদ্র
তোমার চেহারাকে আহত করবে না!
(শুয়ে থাকা বিকেলের রোদ)
এভাবে চিত্রকল্পের বিস্তর উদাহরণ পেশ করা যাবে। কবি আশরাফ হাসানের এটাই স্বতন্ত্র্য কাব্যপ্রতিভা।
উপমা- অলংকার ব্যবহারেও কবি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কবিতা পাঠ করলে মনের মাঝে এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়। এই ভালো লাগার জন্য কবিতা পাঠ জরুরি। মন-খারাপের দিন যদি কবিতা পাঠে মন ভালো হয়ে যায় তাহলে এই কবিতা যাপন দিনই হোক যাপিত জীবনের সঙ্গী। কবিতার আসরে কবি আশরাফ হাসান কালের নকীব হয়ে পাঠকের মিনারে ধ্বনিত হবেন প্রতিদিন। ‘পাখিলৌকিক জোছনা’ কবিতার বইটি অনাগত পাঠকের হাতে নন্দিত হবে। পঠিত হবেন কবি আশরাফ হাসান। আলোকিত কবিতার ধ্যানে বিমোহিত হবেন কাব্যপাঠক। ভবিষ্যতের পড়ার টেবিলে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে হয়ে থাকবে ‘পাখিলৌকিক জোছনা’…। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সিলেটের সৃজনশীল প্রকাশনী সংস্থা পা-ুলিপি প্রকাশন। শুভেচ্ছা মূল্য রাখা হয়েছে ১২০ টাকা। চার রঙের সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন বায়েজীদ মাহমুদ ফয়লসল। আমরা গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন