পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত করা হচ্ছে উপজেলা হাসপাতালসমূহ করোনা ॥ সিলেটে বেড পেতে স্বজনদের নিবন্ধন

Alternative Text
,
প্রকাশিত : ২৮ জুলাই, ২০২১     আপডেট : ৬ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম  খালি হলে সিট পাওয়ার আশায়-সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে নিবন্ধন করাচ্ছেন কোভিড রোগীর স্বজনরা। শনাক্তের হার বেড়ে যাওয়ায় সিলেটে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ফ্লোরেও (মেঝে) কোভিড রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। আইসিইউ সিট না পেয়ে অনেকে মারা যাচ্ছেন রাস্তায়-অ্যাম্বুলেন্সে। রয়েছে অক্সিজেনের সংকটও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালসমূহকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ, সিলেট-এর সহকারী পরিচালক ডা: নুরে আলম শামীম জানিয়েছেন, সিলেটে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। বিভাগের করোনা ডেডিকেটেড ৭টি হাসপাতালেরই রোগী ভর্তির কোটা পূরণ হয়ে গেছে। এসব হাসপাতালে ১৬টি আইসিইউসহ ৪৫২টি বেড রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসমূহকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত সিলেটের করোনা পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিলেটে সৃষ্ট অক্সিজেন সংকট নিরসনেরও প্রচেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, করোনা ডেডিকেটেড শহীদ ডা: শামসুদ্দিন হাসপাতাল এবং সিলেট বিভাগের সবচাইতে বড় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বেড দিতে না পেরে অনেকটাই অসহায় বোধ করছেন তারা। অবিশ^াস্য হলেও সত্য, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন পুরাতন রোগী সুস্থ হওয়া বা মারা যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন নতুন রোগীরা। বেডের অভাবে এ্যাম্বুলেন্সেই মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক ও কোভিড নিয়ন্ত্রণ টিমের প্রধান এম কাজী এমদাদুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালগুলোতে সিট বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিবারসহ সিলেটের ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
রোগীরা নিবন্ধন করাচ্ছেন- বেড পাওয়ার আশায়
স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, সিলেটে সরকারি বেসরকারি প্রায় ৮শ’টি কোভিড বেড রয়েছে। সবমিলিয়ে আইসিইউ বেড রয়েছে ১২৭টি। এর মধ্যে সরকারিভাবে ডা. শামসুদ্দিন হাসপাতালে ১৬টি, ওসমানী হাসপাতালে ৮টি এবং মৌলভীবাজার হাসপাতালে ৬টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এছাড়া, বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড বেড রয়েছে-৯৭টি। কিন্তু কোথাও বেড খালি নেই।
শহীদ ডা: শামসুদ্দিন হাসপাতালে আইসিইউ ইনচার্জ ডা: হোসেন আহমদ রুবেল জানান, ভর্তি হতে না পেরে কেউ কেউ হাসপাতালগুলোতে নাম নিবন্ধন করাচ্ছেন-সিট খালি হলে বেড পাওয়ার আশায়। এছাড়া, একই পরিবারের আক্রান্তদের একই কেবিনে ভর্তি করা হচ্ছে।
মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ আরো কয়েকটি হাসপাতালে আইসিইউ বেডের জন্য রোগীদের নিবন্ধন করা হচ্ছে। সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের কোভিড ইউনিটের সাথে সম্পৃক্ত একজন সিনিয়র চিকিৎসক জানান, তাদের হাসপাতালে আইসিইউ’র জন্য প্রচন্ড চাপ। ১টি আইসিইউ বেডের বিপরীতে চাহিদা তিনটি। এ প্রসঙ্গে ওই চিকিৎসক আরো বলেন, এ রকম পরিস্থিতি তিনি আগে কখনো দেখেননি।

সিলেটের বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের সাথে সম্পৃক্ত ডা: আখলাক আহমদ জানান, পরিস্থিতি এমন যে, আইসিইউ সিট খালি না পেয়ে অনেক রোগীকে ফিরে যেতে হচ্ছে।
সিলেট বেসরকারি হাসপাতাল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. নাসিম আহমদ সংবাদ মাধ্যমকে জানান, সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেরই একই অবস্থা। বর্তমানে কোথাও সিট খালি নেই। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য তার।
সিলেটে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা: শাহেদ আহমদ জানান, সিলেটে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর অনেক রোগী নমুনা পরীক্ষা করান না। আর এসব রোগীর ক্ষেত্রে আইসিইউ সাপোর্ট বেশি লাগছে বলে জানান তিনি।
ওসমানী হাসপাতালে অন্যান্য ওয়ার্ডেও কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবুল কালাম আজাদ এ প্রতিবেদককে জানান, ওসমানী হাসপাতালে কোভিড ও কোভিড উপসর্গের রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিন ওয়ার্ডে প্রায় ২৫০টি বেড রয়েছে। এর বিপরীতে গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন প্রায় ৩৬৪ জন। কিছু রোগী ডিসচার্জ (ছাড়পত্র) হওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার ভর্তি ছিলেন প্রায় ৩শ’ রোগী। এছাড়া, ৮টি বেড যুক্ত আইসিইউর একটি ইউনিট কোভিড চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, কোভিড ওয়ার্ডের সকল বেড পূর্ণ থাকায় নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়াও অন্যান্য ওয়ার্ডেও কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে । তিনি জানান, ওসমানীর আইসিইউ কন্টিনিউয়াস (সবসময়) ফিলাপ থাকে। হাসপাতালের পক্ষে আইসিইউ’র পক্ষ থেকে রোগীদের সিরিয়াল সংরক্ষণ করা হয়। একটি খালি হলে শুরু হয় প্রতিযোগিতা-কে ভর্তি হবে এই সিটে। ওসমানী হাসপাতালে রোগীদের ভয়াবহ চাপ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অবস্থায় ওয়ার্ড বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে কোন বিকল্প নেই।
ডা. শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (ইনচার্জ) ডা: সৈয়দ নাফি মাহদি জানান, হাসপাতালে কোনো সিট খালি না থাকায় এখানে ভর্তি হতে আসা রোগীদের তারা ওসমানীতে রেফার্ড করছেন। তিনি বলেন, কেউ সুস্থ হলে বা মারা গেলে অন্য কারো আইসিইউতে ভর্তির সুযোগ মিলছে। তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় শামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনায় ৩ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া, মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে দুই জনের।
৬ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আইসিইউ বেড লাভ এবং…
সিলেট নগরীর শেখঘাট এলাকার বাসিন্দা শিরিনা বেগম (৫৫)-এর দুদিন ধরে শ্বাসকষ্ট। এ অবস্থায় তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হয়। গত সোমবার দুপুরের দিকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ অবস্থায় চিকিৎসকরা আইসিইউ সাপোর্টের পরামর্শ দেন। কিন্তু, কোথাও খালি নেই আইসিইউ। ৬ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) সিলেট চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি ডা: শাকিল আহমদের প্রচেষ্টায় বেসরকারি নর্থ ইস্ট হাসপাতালে মিলে একটি আইসিইউ বেড। রোগীর স্বজন মোমিনুল হক ফাহিম এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, রাত ৯টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাকে নেয়া হয় ওই হাসপাতালে। হাসপাতালের নবম তলায় আইসিইউ। লিফটে ৭ তলা উঠার পর মারা যান ওই মহিলা। ফাহিম জানান, সময়ের অভাবে নমুনা পরীক্ষা না করালেও করোনা উপসর্গ ছিল তার এই স্বজনের। এছাড়া, সিলেটের করোনা ডেডিকেটেড শহীদ ডা: শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের সামনে গত শনিবার মুহিবুর রহমান নামের হবিগঞ্জের এক রোগী অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান। এর আগে ওই রোগীকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে কোথাও আইসিইউ বেড পাননি তার স্বজনরা।
সিলেট নগরীর ফ্রান্স প্রবাসী জাকারিয়া আহমদ জানান, মাস দেড়েক আগে তিনি ফ্রান্সে গিয়েছিলেন। মায়ের কোভিড আক্রান্ত হবার খবর শুনে ঈদের আগের দিন দেশে এসেছেন। জানালেন, কোভিড আক্রান্ত তার মায়ের অক্সিজেন সাপোর্ট না লাগলেও বেসরকারি হাসপাতালে তার মায়ের জন্য একটি সিট মেলাতে তাকে গলদঘর্ম হতে হয়েছে। তাকে সবমিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ টাকা হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। জানালেন, প্রবাসী হিসেবে তিনি হয়তো হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে পেরেছেন। কিন্তু, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের লোকজন কিভাবে বেসরকারি হাসপাতালের এমন বিল পরিশোধ করবেন।
প্রতি আড়াইজনে একজনের করোনা শনাক্ত
সিলেটে প্রতি আড়াইজনে একজনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৭০৮ জনের। একই সময়ে ১৭৯১ জনের নমুনা পরীক্ষায় উল্লিখিতদের পজিটিভ শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার শতকরা ৩৯.৫৩ ভাগ। একই সময়ে এ বিভাগে করোনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন। এর আগের দিন সোমবার এ বিভাগে করোনায় মৃত্যু হয় ১৪ জনের। এদিন শনাক্তের হার ৪১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : আমি করোনা ওয়ার্ড থেকে বলছি

আরও পড়ুন

দক্ষিণ সুনামগঞ্জে জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা

        সালেহ আহমদ হৃদয়, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ...

পেইন্ট মার্চেন্ট এসোসিয়েশন সিলেটের কমিটি গঠন

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক পেইন্ট মার্চেন্ট...

সি আর দত্তের মহাপ্রয়াণে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রার্থনা

        মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার,স্বাধীন বাংলাদেশের...