পরবর্তী যুদ্ধের জন্য খাঁটি সৈনিকের বেঁচে থাকা

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন: আমার আমেরিকান সহকর্মী জর্জ । সাবেক সেনা সদস্য। আমেরিকার হয়ে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের রোমাঞ্চকর গল্প আর হালকা সব কথায় ভারী বার্তা দেয়ায় জর্জের জুড়ি নেই। অন্য সহকর্মীরা নিত্য বকবক করা জর্জকে এড়িয়ে চলে। জর্জ আমার খুব প্রিয়। যৌবনে ভিয়েতনামে ছিলেন। নিঃসন্তান জর্জ ষাট বছর বয়সে বিয়ে করেছেন এক রুশ সুন্দরীকে। আমি হালকা কথায় কথা পাড়ি। জর্জ, আগে বিয়ে করলে আজ তোমার নাতি পুতি থাকতো। জর্জের উত্তর, ‘নাতি পুতির জন্য বিয়ে করতে হয় না আমেরিকানদের। ভিয়েতনামে গিয়ে খুঁজ নাও!
দেশের জন্য যৌবন উৎসর্গ করার জন্য জর্জকে দ্রুত ধন্যবাদ দিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করি। নিজের গল্প বলতে শুরু করি। আমাদের সেনানায়ক ওসমানীর গল্প করি। বলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের হয়ে লড়েছেন। লড়েছেন ব্রিটিশ পরবর্তী পাকিস্তানের হয়ে ভারতের সাথে। এর পর নিজের জাতির জন্য স্বাধীনতার লড়াই করেছেন। এক সেনা কর্মকর্তার তিন যুদ্ধের গল্প শুনে জর্জের কথা থেমে যায়। জর্জকে বলি, স্বল্পদিনের জন্য হলেও এ মহান সেনা নায়কের স্নেহ পাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো আমার।
গল্প দ্রুত যুদ্ধ থেকে অন্য দিকে জড়ায়। বিশ্বের বহু হানাহানিতে আমেরিকার অহেতুক জড়িয়ে পড়া নিয়ে আমি কথা পাড়ি। আমেরিকা রাজনৈতিক আর সামরিক অবস্থান নিয়ে জর্জের অবস্থান সব সময় টনটনে থাকে। বলি, তোমরা আফগানিস্তান-ইরাক দখল করার গ্রহণযোগ্য যুক্তিতো আমেরিকানদের কাছেও নেই!
জর্জকে এবারে বেশ বিব্রতই মনে হয়। দ্রুত সামলে জর্জ বলেন, মনে রেখো আমরা কুয়েতকে সাদ্দামের আগ্রাসন থেকে উদ্ধারও করেছি। আমেরিকার সামরিক সব অভিযান জর্জের নখদর্পণে। জর্জই আমাকে স্মরণ করিয়ে দেন, নব্বই সালে আমেরিকার সাথে যৌথবাহিনীতে বাংলাদেশও ছিলো!
এবারে আমি অহংকারের সাথে বলি, সেই যৌথ বাহিনীর অধিনায়কত্বে আমার এক অগ্রজ ছিলেন। আমি ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকীর নাম বলি। জর্জ দ্রুত ইন্টারনেটে তথ্যটি যাচাই করে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। সেই সামরিক অভিযানে মার্কিন সেনাধিনায়ক কলিন পাওয়েলের গল্প শুরু করেন জর্জ। জেনারেল কলিন পাওয়েলের লেখা বই আমাকে দেবেন প্রতিশ্রুতি দেন।
আমি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী(অবঃ)’র আত্মজীবনীমুলক বই ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ নিয়ে তাঁর সাথে কথা বলি।
জুবায়ের সিদ্দিকী আমাদের সমর নায়ক। স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী একবারই দেশের বাইরে গিয়ে অন্য দেশের হয়ে যুদ্ধ করেছে। সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নিলে, দেশটি মুক্ত করতে আন্তর্জাতিক বাহিনীর সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যোগ দেয় যৌথ বাহিনীতে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমাদের সেনাবাহিনীর অধিনায়কদের একজন ছিলেন জুবায়ের সিদ্দিকী।
প্রথম গালফ ওয়ারের বিজয় নিয়ে আমেরিকা সদা উচ্চকণ্ঠ। জুবায়ের সিদ্দিকী আমেরিকা সফরে আসলে, টিভি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাঁর পরিচয় উপস্থাপন করেছিলাম। আমেরিকার নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর অন্যতম সামরিক অধিনায়ক আমাদের জুবায়ের সিদ্দিকী।
জুবায়ের সিদ্দিকী আমাদের ‘বড় ভাই’। আমার সঙ্গের নিত্য অনুষঙ্গ শামীম সিদ্দিকীর অগ্রজ হওয়ার কারনে তাঁর সাথে মেলামেশা। রাজনীতি, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে শামীমের ঈদগাহের বাসায় দিনরাত আসা যাওয়া। সেনা কর্মকর্তা জুবায়ের সিদ্দিকী সিলেট এলে দেখা হয়ে যেত। গল্পে-আড্ডায় অবলীলায় তিনি আমারও ‘বড় ভাই’ হয়ে উঠেন। একজন সৎ, দম্ভহীন, কোমল হৃদয়ের দেশপ্রেমিক মানুষটি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন পরিচয়ের শুরুতেই।
সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির আশেপাশে ছিলেন তিনি। কিন্তু কোনদিন ক্ষমতার প্রকাশ ে দেখিনি। চলনে, বলনে এক আপাদমস্তক বিনয়ী মানুষ জুবায়ের সিদ্দিকী। যতই দেখেছি, শ্রদ্ধা বেড়েছে। একাত্তরে পাকিস্তানের কারাগারে আটক সময়ের গল্প শুনেছি। তিনি লিখেছেনও তাঁর বইয়ে। ব্রিটিশদের বানানো দূর্গে কিভাবে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের আটক থাকতে হয়েছে। প্রতিদিন অনিশ্চয়তা নিয়ে ভোর আসতো। দূর্গ ভেদ করে পালিয়ে এসে দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে যোগ দেয়ার প্রচেষ্টা কিভাবে ব্যর্থ হলোÑতাঁর লোম হর্ষক বিবরণ আছে বইটিতে।
জুবায়ের সিদ্দিকী নিজেকে এক সাধারণ সৈনিক হিসেবেই পরিচয় দেন গর্বের সাথে। বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের পর ‘অবসরে’ দিন কাটাননি। আমেরিকায় আসলেন। অভিবাসনের সুবিধা তাঁর। আত্মীয় পরিজন এখানে। দেশের সন্তান দেশেই ফিরে গেলেন। কেন গেলেন ? কি করবেন ?Ñএ নিয়ে জিজ্ঞেস করি। দেরী হলেও উত্তরটা পেয়ে যাই।
সিলেটের শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য ভূমিকার জন্য অবসর জীবনে এক আইকন হয়ে উঠেছেন তিনি। আওয়ামীলীগের এমপি হাফিজ মজুমদার তাঁর ট্রাস্টের মাধ্যমে সিলেটের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘স্কলার্স হোম’ নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অগ্রসর জনপদ হিসেবে সিলেটের সুনাম থাকলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের পশ্চাদপদতা এক সময় পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছিলো। সাধারণ শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না সিলেটে। এক সময় জামেয়া টাইপ বা শেকড়হীন ইংরেজি মাধ্যমের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের দৌরাত্ম উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সে সময়টিতে প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে স্কলার্স হোম সিলেটে মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশাল অবদান রেখেছে। আর এ কাজটিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন অবসর জীবনের সৈনিক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) জুবায়ের সিদ্দিকী।
দেশে গেলেই স্বল্প সময় থাকলেও স্কলার্স হোমে ঢু মারি। ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাটা জানিয়ে আসি। দেশের খাঁটি সন্তান হিসেবে সক্রিয় জুবায়ের সিদ্দিকীকে দেখে গর্বিত হই। দূর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানান। নিজের যাপিত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন। জীবনের বেলাভূমে দাঁড়িয়ে মাটির সন্তান হিসেবে নিজের কাজটি করে যাচ্ছেন খুব যতেœ। বিদেশে থেকেও উত্তাপটা পাই। তাঁর অগুনতি শিক্ষার্থীর কাছে নায়ক তিনি। দেখে আপ্লুত হই।
আপত্য স্নেহ পেয়েছি। সময়ে অসময়ে অনেক জ্বালাতনও করেছি। আমেরিকা আসলে আমরা ঘুরে বেড়াই। কিছুদিন আগে আসলেন। সময় করে আমাদের অফিসে এসে সহকর্মিদের সাথে কথা বলে গেলেন। ২০১৮ সালের আমার কিছু খেয়ালী লেখা নিয়ে বই প্রকাশিত হলো। বইটিতে যে কয়েকজনকে নিয়ে লেখা আছে, তারমধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) জুবায়ের সিদ্দিকীর কথা লেখা আছে।
কাছে থেকে দেখেও আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি না। ভালো কিছু গ্রহণ করা খুব কঠিন। একান্তেই মাঝে মধ্যে মনে করি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) জুবায়ের সিদ্দিকী’র কাছ থেকে বিনয়ী হওয়ার শিক্ষাটাই যদি গ্রহণ করতে পারতাম !
নিউইয়র্কে আসলে তাঁকে নিয়ে ধ্বসে পড়া টুইন টাওয়ার দেখাতে নিয়ে যাই। আমাদের চলমান বিশ্ব বাস্তবতায় টুইন টাওয়ার গড়ে উঠেছে মাথা উঁচু করা এক প্রতীকী স্তম্ভ। ধ্বংসস্তূপে গড়ে উঠা আকাশচুম্বী ফ্রিডম টাওয়ারের পাশে দাঁড়ান সেনানায়ক জুবায়ের সিদ্দিকী। পৃথিবী বদলে দেয়ার এ স্মারক স্তম্ভের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। দূর দেশের এক ভিন্ন বাস্তবতায় ,আমি নীরবে স্যালুট জানাই আমার একান্ত স্বজন কর্মবীর জুবায়ের সিদ্দিকীকে !
মনে আছে, সেনাজীবন থেকে অবসর নেয়ার পর আমেরিকা আসলেন জুবায়ের সিদ্দিকী। হালকা সব কথা বার্তার মধ্যেই জিজ্ঞেস করেছিলাম , অবসর জীবনে এখন কি করবেন ?
জুবায়ের সিদ্দিকী বলছিলেন, কি আর করবো- সেনা জীবনে সব সময়তো আমরা হয় কারো নির্দেশ শুনেছি। না হয় কাউকে নির্দেশ দিয়েছি। সৈনিক জীবনের পর আর তেমন কিছু আমরা করতে পারি না।
কথাটির জবাব দিলেন আমার সহকর্মী জর্জ। পোলিশ এক জেনারেলের উক্তি শুনিয়ে দিলেন ভারী হয়ে উঠা গল্পের মাঝখানে, “ Òa soldier lives always for the next battle, because he knows that before it arrives impossible changes can occur in his favor
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) জুবায়ের সিদ্দিকী তাঁর কর্মে এক খাঁটি সৈনিকের পরিচয়ই আমাদের কাছে রেখে যাচ্ছেন – এ কথাটি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সাথে উচ্চারণ করতে চাই!
লেখকঃ আবাসিক সম্পাদক, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা সংস্করণ।

আরও পড়ুন