পথচলায় যিনি প্রদীপ্ত সূর্য

প্রকাশিত : ০৬ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে

মো. আব্দুল বাছিত:
১.
স্যারের সাথে প্রথম কবে, কোথায় দেখা স্মরণে আসছে না। যতদূর মনে পড়ে, ২০০৯ সালে হাফিজ আহমদ মজুমদার শিক্ষা ট্রাস্টের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে স্যারকে প্রথম দেখি। সাতবাঁক ইউনিয়নের মাঠে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আমার কৈশোরে যে কয়জন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলেন সিলেটের অন্যতম প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জুবায়ের সিদ্দিকী স্যার, আরেকজন হলেন সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. কবীর চৌধুরী স্যার। মূলত সেদিনকার বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে মঞ্চে অতিথি হিসেবে আলোর ঝলকানির মত পেয়ে যাই দুজনকেই। কানাইঘাটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ট্রাস্টের বৃত্তিপ্রাপ্ত একজন হিসেবে সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমার কৈশোরের চিন্তা-চেতনা আর মূল্যবোধকে সেদিন জাগিয়ে তুলে কবীর চৌধুরী স্যারের প্রাঞ্জল ভাষার বক্তব্য। সেদিন সম্মাননা পত্র, সার্টিফিকেট আমি জুবায়ের স্যারের হাত থেকে গ্রহণ করি, যতদূর মনে পড়ে। কিন্তু একজন আলোকিত ও গুণী ব্যক্তিত্বের হাত থেকে আমার পুরস্কার গ্রহণের কোনো স্মৃতি আমার কাছে অবশিষ্ট নেই। সেদিন জুবায়ের স্যারের বক্তব্যও ছিল অনুপ্রেরণার। আজ থেকে দশ বছর আগের দেখা জুবায়ের স্যার আর এখনকার স্যারের মধ্যে কোনো পার্থক্য আমি লক্ষ্য করিনি। মাঝে মাঝে ভাবি, স্যারের তারুণ্যের কাছে, তারুণ্য শব্দটিই বুঝি হার মেনেছে। কারণ, ২০০৯ সালে দেখা জুবায়ের স্যারের ব্যক্তিত্ব, আমাকে আজো কাছে টানে। ২০১৩ সালে সিলেট আসার পর, ২০১৬ সালে প্রথম যখন স্যারের সাথে পরিচিত হই, এরপর থেকে আজো স্যারের সাথে দেখা হওয়া মাত্রই মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। পরম মমতায় মাঝে মাঝে দাঁড়িতেও হাত বুলিয়ে দেন। অনেকসময় লজ্জা লাগলেও অনুভূত হয়, স্যারের মমতা আর ভালোবাসা।

২.
আমি স্যারের বর্ণাঢ্য জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করবো না। স্যারের সম্পর্কে জানেন না, সিলেটের বোদ্ধা মহলে এমন ব্যক্তিত্ব খুবই কম বিদমান। এজন্য আমার স্মৃতিময়তায় স্যারের সাথে সম্পর্ক এবং মননচেতনার যুৎসই মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করবো। স্যারকে যতটা না একজন লেখক, বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমি আবিষ্কার করেছি, তারচেয়ে বেশি আবিষ্কার করেছি একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে। একজন মননশীল লেখক হিসেবে তাঁর লেখাগুলো জাতীয় মূল্যবোধের দিকে ব্যক্তিসত্ত্বাকে প্রভাবিত করে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। হতাশা, দুঃখ-দুর্দশা, ব্যর্থতা, হীনমন্যতা যখন একটি জাতিকে আকড়ে ধরে, সেই জাতির মূল্যবোধ ও জাতীয় জীবনে নেমে আসে অবক্ষয়। জুবায়ের সিদ্দিকীর চিন্তা-চেতনা, সর্বোপরি তাঁর মননশীল ধ্যান-ধারণা জাতিকে উত্তরণের পথ দেখায়। হতাশা আর ব্যর্থতাকে কাটিয়ে, জীবনকে আলোকিত করতে তাঁর শাণিত, বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ গভীরভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। জুবায়ের সিদ্দিকীর স্মৃতির অলিন্দে, কালের কথামালা, আমার জীবন আমার যুদ্ধ গ্রন্থপাঠে সেই ধারণা আরো গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। সমাজ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাষ্ট্র তথা মানবজীবনের বৈচিত্র্যময় দিকগুলোর কথা অত্যন্ত নিপুন ও পারদর্শিতায় তিনি সেগুলোর উপস্থাপন করেন। একজন বিশ্লেষক, একজন শিক্ষাবিদ, একজন সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে তিনি লালন করেন দেশপ্রেমের আদর্শ। কারো কাছে মাথানত নয়, দৃঢ়চেতায় জুবায়ের সিদ্দিকী সর্বত্রই স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। এজন্য দেখা যায়, ন্যায়-নীতি এবং মূল্যবোধের ক্ষেত্রে জুবায়ের সিদ্দিকী স্যার অত্যন্ত কড়া। সেনাবাহিনীর একজন সাবেক সদস্য হিসেবে তাঁর অর্জিত শৃঙ্খলাকে তিনি লালন করেন অতি যতনে। স্কলার্সহোমে তাই আধুনিক, মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এখনো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং শৃঙ্খলাবোধকে প্রতিফলিত করে দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে তিনি অত্যন্ত বদ্ধ পরিকর।

৩.
জুবায়ের সিদ্দিকী স্যারের পরিচয় শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে তরুণদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা জাগাতে প্রতিনিয়ত সভা-সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। ‘ঊষর মরু ধূসর বুকে একটি যদি শহর গড়ো, একটি মানুষ মানুষ করা তাহার চেয়ে অনেক বড়ো’। এটা একটা মৌলিক জীবনদর্শন। সত্যিকার অর্থে পৃথিবীতে তারাই আজ শ্রেষ্ঠ, যারা মানুষকে সত্যের শিক্ষা দেয়, আদর্শের শিক্ষা দেয়। ইসলামের এই দৃষ্টিকোণ বিবেচনায়, শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, যদি সেখানে সত্যের আলোকচ্ছটা থাকে। জুবায়ের সিদ্দিকী স্যার তেমনি একজন সত্যের পতাকাবাহী মানুষ। শিক্ষকতাকে তিনি লালন করেন তাঁর রক্তে। রণাঙ্গনের একজন সৈনিক কেমন করে শিক্ষাঙ্গনের কর্ণধার হতে পারেন সেটা জুবায়ের স্যারের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। আলোকিত মানুষ গড়ার মিশন নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন অনবরত। তিনি যা সত্য, তাই প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায়, অকপটে। ন্যায় এবং সত্যের জন্য কারো সাথে আপোস নেই। একজন সত্যিকার সৈনিক হিসেবে জীবনের সাথে জীবনের যেখানে সংঘাত, মানবিক চিন্তা-চেতনা এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি জীবনের সাথে যোগসূত্র তৈরীতে মনোনিবেশ করেন। এখানেই তাঁর কৃতিত্ব, এখানেই ব্যক্তি জুবায়ের সিদ্দিকী সার্থক জীবনের অধিকারী। তাঁকে সম্মাননা জানানো মূলত বাঙালি তথা সিলেটের মানুষের দায়বোধকে পালন করার মত।

৪.
জুবায়ের স্যার চারটি বই লিখেছেন। ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ ‘কালের কথামালা’ ‘স্মৃতির অলিন্দে’—–। চারটি বই চারটি বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ এবং উজ্জ্বল। ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ মূলত তাঁর জীবনের স্মৃতিকথা। একজন মেধাবী ব্যক্তি হিসেবে তিনি তাঁর জীবনের চড়াই-উতরাই এবং সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন নির্দ্বিধায়। বইটিতে তাঁর সৈনিক হয়ে ওঠার গল্প পড়লে পাঠক রোমাঞ্চিত হবেন, চিন্তা-চেতনার নব দিগন্তের দ্বার খুলে যাবে। জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে, মানুষ যখন বারবার হোঁচট খায়, আমার দৃষ্টিতে জুবায়ের স্যারের ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ বইটি দিক-নিদের্শনা দেবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। আমরা কী বলতে পারি, জীবনকে আমরা হাতে নিয়ে ঘুরি? কিন্তু, সৈনিকদের সেই সাহস এবং মনোবল আছে, কারণ তারা জীবনকে দেখেন রণাঙ্গনে, জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তারা পথ চলে দেশের জন্য, মায়ের জন্য, মাটির জন্য। দেশের প্রতি তাঁদের এই ভালোবাসা অনেক কঠিন যুদ্ধকে থামিয়ে দেয়। ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ ‘কালের কথামালা’ ‘স্মৃতির অলিন্দে’ —–গ্রন্থগুলো পাঠে পাঠক একজন বুদ্ধিজীবীর দেশ ও জাতির কল্যাণকামী চিন্তা-চেতনার সাথে পরিচিত হবেন বলে আমার প্রত্যাশা। তাঁর এই গ্রন্থগুলো ছাড়াও অনেক লেখা বিক্ষিপ্ত আছে, যেগুলো মুক্তোর দানার মত চিকচিক করে জ্ঞানের আলোকচ্ছটা। একজন জুবায়ের সিদ্দিকীকে জানার মাধ্যমেই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার বিকাশ সাধন হতে পারে।

৫.
জুবায়ের স্যার ৯ই মার্চ তাঁর বর্ণিল জীবনের ৭০ বছর সমাপ্ত করে ৭১-এ পদার্পন করেছেন। এটা তাঁর জীবনের এক আনন্দঘন সফর। তাঁর জন্মদিনে তিনি সিলেটের অগণন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন আনুষ্ঠানিকভাবে। এটা তাঁর জীবনের জন্য পরম এক পাওয়া। তিনি যে মাটির টানে মাটিতেই রয়ে গেলেন, সেই মাটির মানুষের ভালোবাসায় তিনি নিজেকে ধন্য করবেন, তাঁর প্রাণ সিক্ত হবে এটা আমাদের জন্যও কম আনন্দের নয়। স্যারকে সম্মান জানাতে পারছি এবং এর মাধ্যমে সমাজ বুদ্ধিজীবী, গুণী মানুষদের পদস্পর্শে ধন্য হবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। দীপ্তিমান সূর্যের আলোর গতির দিকে তাকিয়ে মানুষ যদি মানুষের ভালোবাসায় ভালোবাসা দিতে না পারে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের কী আর হতে পারে? জুবায়ের সিদ্দিকী সিলেটের মানুষদের জন্য প্রদীপ্ত সূর্যের মত। তাঁর বর্ণিল জীবন আমাদেরকে আরো বেশি প্রাণিত করবে, মানবসভ্যতার বিকাশে যে শিক্ষা, সেই শিক্ষা প্রচারের এক অতন্দ্র প্রহরী জুবায়ের সিদ্দিকী আমাদের মননচেতনাকে আরো নাড়া দেবেন। মহান মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র সেই বিখ্যাত বাণী, ‘যে জাতি গুণীর কদর পারে না, সেই জাতির মধ্যে গুণীর জন্ম হয় না’ এই অভিশাপ আমাদের জীবনে বয়ে বেড়াতে হবে না। জুবায়ের স্যারের হাত ধরেই যে আমাদের পথচলা , তাঁর গুণী বৈদগ্ধের আলো আমাদের মাঝেও এসে পড়বে এই তীব্র আশা নিয়েই আমার ইতি ঘটালাম।

মো. আব্দুল বাছিত: সাংবাদিক, কবি, প্রাবন্ধিক

পরবর্তী খবর পড়ুন : অভিবাবক ও সহকর্মী

আরও পড়ুন

মাওলানা আমকুনীর ইন্তেকালে চরমোনাই পীরের শোক

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট নগরীর...

লেখক-গবেষক মো. ফয়জুর রহমানের মৃত্যুতে সিসিক মেয়রের শোক

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের...

সিকৃবির একাডেমিক কাউন্সিলের ৩১তম সভা

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট কৃষি...