নৈতিকতা বলে বলীয়ান একজন মানুষ

,
প্রকাশিত : ২০ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুকতাবিস-উন-নূর: জুবায়ের সিদ্দিকী একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা। একটি কলেজের প্রিন্সিপাল, একজন সুলেখক, সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন ভালো সমঝদার, সর্বোপরী নৈতিকতা বলে বলীয়ান একজন মানুষ।
তাঁর ডাকনাম সাথী। তাঁর আমার সরাসরি পরিচয় নব্বই এর দশকে। তবে তাঁর পিতা মরহুম তজম্মুল আলী সিদ্দিকীকে চিনতাম সেই ৬৯ সাল থেকে। আমি তখন রাজা জিসি হাইস্কুলের ছাত্র। রাস্তা পেরুলেই দূর্গকুমার পাঠশালা। যেখানে মাঝেমধ্যে যেতাম। ওই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন তজমুল আলী সিদ্দিকী। খুব কড়া মেজাজের লোক ছিলেন। একদিন স্কুলের আঙিনায় আমার প্রতি তাঁর নজর পড়লো। পরিচয় জানতে চাইলেন। কেন গিয়েছি, বাসা কোথায় ইত্যাদি। জেরার এক পর্যায়ে বাবার পরিচয় শুনে তাঁর মেজাজ নরম হয়ে এল। বাবার কুশলাদী জানতে চাইলেন। তারপর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন, স্কুলের বাইরে বেশি ঘুরাফেরা না করতে। প্রায় ৫০ বছর আগের সেই ঘটনা আমার স্মৃতিúটে এখনো জাগরুক।
জাতীয় পার্টির এমপি এম.এ মুকিত খান আমার তালতো ভাই (বড় ভাইর শ্যালক), সংসদ হোস্টেলে তাঁর ফ্লাটে বহুদিন থেকেছি। কর্ণেল জুবায়ের সিদ্দিকীর কথা মুকিত ভাইর মুখে অনেক শুনেছি। এরপর তাঁর আত্মীয় স্বজন সকলের খোঁজ খবর পেয়েছি। তাঁদের পরিবারের সাথে আত্মীয়তার যোগসূত্রও পেয়েছি।
১৯৮৯ সালে। তখন তিনি দুর্দন্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের প্রেসিডেন্ট সিক্যুরিটি ফোর্সের ডেপুটি কমান্ডার। এরশাদ সাহেব রাগ করে সিলেট আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাচ্ছেন। নানা উন্নয়ন কর্মকা-ে অঢেল অর্থ দিচ্ছেন। কিন্তু সিলেটের মানুষ তাঁকে মর্যাদা দেয়নি। তাই তিনি সিলেটের উপর ক্ষুদ্ধ। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাহেব তখনও প্রেসিডেন্ট এরশাদের উপদেষ্টা। তাঁর ইচ্ছা অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সাথে সিলেটেরও উন্নয়ন হোক, কর্নেল জুবায়ের সিদ্দিকীও চান সিলেট যেন উন্নয়ন বঞ্চিত না হয়। এরশাদ সাহেবের রাগ অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী একটা গ্রুপ ডাকালেন। এর অগ্রভাগে এমপি মুকিত খান, পৌর চেয়ারম্যান আ.ফ.ম. কামাল, প্রেসক্লাব সভাপতি হারুনুরজ্জামান চৌধুরী, সিলেট প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি বোরহান উদ্দিন খান, বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা ফজলুর রহমান, শিক্ষক আবু হেনা চৌধুরী, জাসদ নেতা আব্দুন নূর মাস্টার প্রমূখ।
আমি তখন প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি। বোরহান উদ্দিন খান সাহেব গো ধরলেন আমাকে ছাড়া যাবেন না। আমিও সাফ জানিয়ে দিলাম আমি প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাতে যাব না। আমি তাঁকে পছন্দ করি না। বোরহান উদ্দিন খান সাহেবের পীড়াপিড়িতে ঢাকা পর্যন্ত যেতে বাধ্য হলাম। কিন্তু আমি সাক্ষাতে থাকবো না। যথাসময়ে প্রেসিডেন্টের অফিসে যাওয়া হলো। খানিক পরে ডাক এল খাস কামরায় যাওয়ার। সবাই উঠে দাঁড়ালেন। আমি যথারীতি বসে আছি। মুকিত ভাই, খান সাহেব, হারুন ভাই টানলেন ভেতরে যাওয়ার জন্য, আমি আমার আগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিলাম। খান সাহেব বললেন, এতদূর কষ্ট করে আসলেন কেন? বললাম, আপনার মন রক্ষার জন্য এসেছি। কর্ণেল জুবায়ের সিদ্দিকীর সাথে আমার আগের পরিচয় নেই। তিনি কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে আমাকে দেখলেন। পরিচয় জেনে হাত মেলালেন। বললেন, এতদূর যখন এসেছেন, চলেন না ভেতরে। আমি আমার অবস্থানে শক্ত দেখে অবশেষে তাঁরা ভেতরে চলে গেছেন। আমি ওয়েটিং রুমে বসে রইলাম। তবে চা বিস্কিট পেলাম, সম্ভবত জুবায়ের সিদ্দিকী সাহেবের কল্যাণে।
প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ শেষে প্রতিনিধি দল ফেরার পর জানলাম, এরশাদ সাহেবের রাগ প্রশমিত হয়েছে। তিনি সিলেট আসবেন। অতঃপর সবাই সিলেট ফিরে এলেন। পরদিন সিলেট জেলা আওয়ামীলীগ প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎকারীদের ‘গণদুশমন’ আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দিলো। এই তালিকায় ১ নাম্বারে নাম ছিলো হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর। যদিও কয়েক বছরের মাথায়ই তিনি আওয়ামী তালিকার ১ নম্বার গণ দুষমন সিলেট-১ আসনে আওয়ামীলীগের এমপি পদপ্রার্থী হয়েছিলেন।
রিটায়ার করে আসার আগ পর্যন্ত জুবায়ের সিদ্দিকীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়নি। সিলেট আসার পর তাঁর সাথে অন্তরঙ্গতা বাড়তে থাকলো। নানা বিষয়ে আমরা সহমত পোষণ করি। তাঁর আত্মীয় স্বজন অনেকেই আমার সুপরিচিত। তিনি ডাক নামেই আমার কাছে ঘনিষ্ট, আমার প্রিয় সাথী ভাই। সিলেটের বিভিন্ন অরাজনৈতিক যৌক্তিক আন্দোলনে কর্মকা-ে যখনি তাঁকে ডেকেছি, হাজির হয়েছেন। সহযোগিতা সমর্থন দিয়েছেন। সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ লক্ষ করলাম। যা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে সাধারণত কম থাকে। সব মিলিয়ে নিজের গুণে তিনি সিলেটের সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের অপরিহার্য ব্যক্তি হয়ে উঠলেন। প্রতিষ্ঠা হলো স্কলার্স হোম। এখানেও তিনি মরহুম পিতার মতো কড়া মেজাজের প্রিন্সিপাল। অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি স্কলার্সহোমকে একটি সফল প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন।
সেনা কর্মকর্তা হিসেবে অবসরের পর এখন আরো বেশি ব্যস্ত তিনি। স্কুল চালানো, লেখালেখি, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি তাঁকে ‘অবসর’ থেকে দূরে রেখেছে।
সাথী ভাই’র সাথে সময় পেলে দেখা করিÑনানা বিষয়ে কথা বলি, তিনি আমার আত্মার আত্মীয়। তাঁর কাছ থেকে জাতীয় জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আলাপকালে জেনেছি। যেগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাঁর বইয়ে যেগুলো তিনি এড়িয়ে গেছেন।
আমি বারবার তাঁকে বলেছি বিষয়গুলো লিখে রাখতে, কিন্তু তিনি মনে করেন এতে নানা সমস্যা হতে পারে। অনেক অপ্রিয় সত্য থাকে যেগুলো প্রকাশ পেলে অনেকের সম্মানহানী ঘটতে পারে। মামলা মোকদ্দমা এমনকি বইও বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
আমি বলি, সাথীভাই অন্তত পান্ডুলিপিটা তৈরী করে যান। যাতে এক সময় ঐতিহাসিক প্রয়োজনে সেটা কাজে লাগানো যায়। অবশেষে মাত্র গতকাল (১২.০৩.১৯) সাথী ভাই রাজী হয়েছেন। তাঁর জানা দেখা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর পা-ুলিপি তৈরী করতে। আশাকরি তিনি নির্ভিকভাবে সততা ও সতর্কতার সাথে তা তৈরী করবেন।
আল্লাহপাক তাঁকে নৈতিক ও ঈমানী শক্তি আরো বাড়িয়ে দিন, তাঁকে দিয়ে সমাজের অধিকতর খেদমত করার তৌফিক দান করুন।
লেখক: সিলেট প্রেসক্লাবের দীর্ঘকালীন সভাপতি, দৈনিক জালালাবাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

নবীগঞ্জে একাধিক মামলার আসামি তিন ডাকাত গ্রেফতার

1        1Shareনবীগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতি কালে রামদা,...

সিলেটে করোনায় মৃত্যুবরণকারী নার্সকে মানিকপীর কবরস্থানে দাফন

         করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী সিলেট...

“সিলেট ট্যুরিস্ট ক্লাবের কমিটি গঠন”

           সিলেট ট্যুরিস্ট ক্লাবের ২০১৮-১৯...