নির্মম! অমানবিক !

প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর, ২০১৯     আপডেট : ৬ মাস আগে  
  

নূর আহমদ  শেফালি বেগম (ছদ্ম নাম)। বয়স হবে ১৩ /১৪। চুরির অপবাদে সে এখন থানা হাজতে বন্দি। শুধু হতভাগা ওই মেয়েটি নয় সাথে দুই ভাইকেও আটক করে নিয়ে আসা হয়েছে থানায়। থানার কাস্টডিতে পা ফেলতে পারছে না মেয়েটি। এখনো শেষ হয়নি, চোখের সামনে মেয়েটিকে না পেটানোর আকুতি জানালে মাকেও পিটিয়েছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে গেছে মায়ের। উরুতে অনেকটা ক্ষত হয়ে গেছে। পুলিশ কর্তৃক শিশু ও মা নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটেছে হোমিও চিকিৎসক ডা: সাবিহা সুলতানা ও ডাঃ মুসলিম আলীর নামের দম্পতির ফ্ল্যাটে। গতকাল রোববার দুপুরে নগরীর সুবিদবাজার এক্সেল টাওয়ারের ৯ম তলায় (ফ্ল্যাট নম্বর-এ) এই ঘটনা ঘটে। নির্যাতিত মেয়ে ও মায়ের পরিবারের এই অভিযোগ সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কতোয়ালী থানার এস আই জুবায়েদ খানের বিরুদ্ধে।
শেফালি বেগমের মা পরিবারের আরো ৪ সদস্যকে নিয়ে গতকাল রোববার রাত সিলেটের ডাক-এর বার্তা কক্ষে হাজির হন। এ সময় সাংবাদিকদের শরীরের আঘাত দেখিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি অভিযোগ করেন, শিশু মেয়েটিকে পিটিয়ে শান্ত হননি কতোয়ালী থানার এসআই জুবায়েদ খান। শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, মেয়েকে ছুটাতে গিয়ে পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি নিজেও। দুই ছেলেকেও ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মেয়ে ও ছেলেকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে থানার কর্তাদের কাছে ধর্ণা দিয়েছেন। বুঝাতে পারেননি তার সন্তানেরা ‘নির্দোষ’। প্রতিকার না পেয়ে পত্রিকা অফিসে ছুটে আসেন। তিনি মেয়ে ও পুত্রদের নির্যাতন করে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দেন। এ সময় বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ওই মা।
শেফালি বেগমের (ছদ্ম নাম) মা জানান, তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিভিন্ন বাসা বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে পরিবার চালান। পুরুষ সদস্যরা বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। তেমনি ৬ মাস আগে ডাঃ সাবিহা সুলতানার বাসায় কাজ করতে পাঠান মেয়েকে। শেফালির মা গতকাল রোববার দুপুরে খবর পান তার মেয়েকে নির্যাতন করছেন ডাক্তার সাবিহা ও তার স্বামী। খবর পেয়ে প্রথমে তিনি নিজে না এসে তার এক আত্মীয় মহিলাকে পাঠান ঐ বাসায়। তার ঐ আত্মীয় ভিক্ষাবৃত্তি করে চলেন। ততক্ষণে ‘৯৯৯’-এ ফোন দিয়ে কতোয়ালী থানার পুলিশ ডেকে নিয়ে আসেন ডাক্তার সাবিহা। পুলিশ আসার খবর পেয়ে মেয়েটির মা নিজে চলে আসেন। সাথে পরিবারের অন্য সদস্যরাও। এ সময় পরিবারের সদস্যদের সামনে ‘বাসার স্বর্ণ চুরি’র অজুহাতে শেফালিকে পেটাতে থাকেন কতোয়ালী থানার এসআই জুবায়েদ খান। তখন শেফালি আকুতি করছিলো তাকে নির্যাতন না করার জন্য। বার বার বলছিলো সে চুরি করেনি। তারপরও পেটাতে থাকেন এসআই জুবায়েদ। শেফালির মা আরো অভিযোগ করেন, পুলিশ আসার আগেও ডাঃ সাবিহা ও তার স্বামী মুসলিম আলীও নির্যাতন করেন শেফালিকে। তবে পুলিশের এসআই তার চোখের সামনে মেয়েকে পেটান।

শেফালির মা আরো অভিযোগ করেন, শিশু শেফালির ওপর যখন নির্যাতন করা হচ্ছিলো তখন এসআই জুবায়েদ এর কাছে অনুরোধ করেন ওকে থানায় নিয়ে যান । তবুও আর মারবেন না। একপর্যায়ে পাঁয়ে ধরতে গেলে তাকে পেটানো শুরু করেন। পুলিশের লাঠির আঘাতে শেফালির মায়ের উরুতে দগদগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থান ফুলে গেছে।

অন্যদিকে শেফালিকে নিয়ে যাওয়ার সময় তার দুই ভাইকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তাদেরও বেধড়ক মারধর করেন ঐ পুলিশ সদস্য। শেফালির মা অভিযোগ করেন, তার মেয়েকে বাসার মালিক ডাঃ মুসলিম আলী গত কয়দিন থেকে আকার ইঙ্গিতে কু প্রস্তাব দিচ্ছিলেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সে ঐ বাসায় কাজ করতো। এছাড়া, গত ৬ মাসের বেতনও আটকা ছিলো তাদের কাছে। বড় হলে বিয়ে দিতে কাজে লাগবে বলে তারা বেতন দিচ্ছিলেন না। গতকাল সকালে সে আর ঐ বাসায় কাজ করবে না জানিয়ে বেতন চাইলে এবং গৃহকর্তার কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে তারা ঐ চুরির নাটক সাজায় বলে অভিযোগ ভিকটিমের।
কতোয়ালী থানার এসআই জুবায়েদ খান জানান, ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। ডাঃ সাবিহা দম্পতি জানান, ঐ মেয়েটি তাদের বাসায় কাজ করতো এবং স্বর্ণের চেইন চুরি করেছে। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে উল্টাপাল্টা কথা বলে। এতে সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। এছাড়া একজন ভিক্ষুক মহিলাকে মা বানিয়ে সে ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ধরা পরে ঐ মহিলা তার মা নয়। মেয়ে শিশুটিকে মারধরের কথা অস্বীকার করেন এসআই জুবায়েদ। তিনি দাবি করেন, পুলিশ পৌঁছার আগে কেউ মারধর করলে তার জানা নেই। মেয়েটির সাথে দুই ভাইকে কেন ধরে নিয়ে এলেন এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই জুবায়েদ বলেন, অভিযোগকারীরা হুমকি মনে করছে, তাদের তিন সন্তান রয়েছে। দুই ভাই তাদের ক্ষতি করতে পারে বলে আশংকা করছে। এর জন্য তাদের আটক করা হয়েছে।

গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১১টায় কতোয়ালী থানা হাজতে কথা হয় ভিকটিম শেফালির সাথে। এ প্রতিবেদকের সাথে পুলিশের এসআই জুবায়েদ খানের সামনেই কথা হয় মেয়েটির। হাজতে কাথা মুড়িয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটিকে ডাক দিলে সে কোন রকমে খুঁড়ে খুঁড়ে হেঁটে এসে প্রতিবেদকের সামনে হাজির হয়। সে তখন ফুলে যাওয়া হাতের কবজি ও পা দেখায় এ প্রতিবেদককে। কিভাবে এমন হলো জানতে চাইলে এসআই জুবায়েদ খানকে দেখিয়ে বলে তিনি (এস আই জুবায়েদ) লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এমন অবস্থা করেছেন। সেখানে দেখা যায়, হাজতখানার পাশাপাশি কক্ষে একটিতে দুই ভাই ও অপরটিতে মেয়েটিকে আটক করে রাখা হয়েছে।
দৈনিক সিলেটের ডাক থেকে কথা বলতে গেলে প্রথমে ডাঃ সাবিহা শিশু নির্যাতনের বিষয়ে কিছু বলতে যাননি। এরপর তিনি জানান, তার বাসায় মেয়েটি চুরি করেছে। এরজন্য ৯৯৯ কল করে পুলিশ ডেকে নিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। শিশুটিকে নির্যাতন করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার স্বামী বা তাদের কেউ নির্যাতন করেননি। মেয়ের শরীরে হাতে এবং পায়ে আঘাতের একাধিক চিহ্ন এলো কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা পুলিশ বলতে পারবে। আমরা কেবল পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। পরিবারের অভিযোগ কাজের মেয়েকে কুপ্রস্তাব বা হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে ডাঃ সাবিহা বলেন, ‘আমার স্বামী এমন মানুষ না, আমরা একে অন্যকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। থানায় ক’জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন জানতে চাইলে রাত পৌনে ১২টায় এ প্রতিবেদককে জানান, তারা কেবল মেয়েটিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন, পরে শুনেছি ওর দুই ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। মামলার ব্যাপারে তার জানা নেই বলে জানান।

নির্যাতিত মেয়ের বাবা জানান, তাদের অভাবী সংসার। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের বাসা বাড়িতে কাজ কর্ম করেন। ঐ পুলিশ কর্মকর্তার ধারণা নির্যাতিত মেয়েকে নিয়ে আমরা বিভিন্নজনের কাছে বিচার চাইতে যাব। হয়তো এই কথা ভেবে মেয়ের সাথে আমার দুই পুত্রকেও ধরে নিয়ে গেছেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পুলিশ মেয়ের সাথে মাকে পিটিয়েছে। দেশের কোথাও এমন নজির আছে বলে জানা নেই। তার স্ত্রীকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।’
কতোয়ালী থানার ওসি সেলিম মিঞা থানা হাজতে আটক মেয়েটিকে শিশু বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ওই মেয়ের বয়স ১৯। পরে জানান, মেয়েটির কথিত মাকে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। মেয়েকে আটকের সাথে তার মায়ের উপর নির্যাতনের বিষয়টি তার জানা সুত্র

আরও পড়ুন



গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে গণফোরামের লিফলেট বিতরণ

গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে গণফোরামের...

মৌলভীবাজরের ৪টি রেল ষ্টেশন বন্ধ: যাত্রী দূর্ভোগ চরমে

বিশ্বজিৎ রায়, কমলগঞ্জ(মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: লোকবল...

সমৃদ্ধ গাজিপুর গড়ে তুলতে নৌকা মার্কায় ভোট দিন : কামরান

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক:   বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের...