নির্বাচনী ইশতেহার এবং ভোটারদের করণীয়

,
প্রকাশিত : ২৪ অক্টোবর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এম. আশরাফ আলী : দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্যাপক চিন্তা ভাবনায় রয়েছে। কী করে সহজে ভোটারদের মন জয় করা যায়। কী করে ক্ষমতায় যাওয়া যায়, কী করে ক্ষমতায় থাকা যায়-এসব কিছুর সহজ উপায় খুজে বের করতে মরিয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দল। আমার এক বাম রাজনৈতিক বন্ধুর কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তিনি প্রসঙ্গক্রমে একবার বলেছিলেন-ডানপন্থীরাতো ক্ষমতার রাজনীতি করে। কেউ ধর্ম ব্যবসায়ী, কেউ কর্ম ব্যবসায়ী কেউবা আবার রাজনীতি ব্যবসায়ী। রাজনীতি ব্যবসায়ী এজন্য বলছি যে, জনৈক এককালের ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী নেতা বলেছিলেন রাজনীতির কোন শেষ কথা নেই। অর্থাৎ আজ যা বলছি-কাল এ কথায় অটল থাকতে নাও পারি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বা আঙ্গিক পরিবর্তন বা ক্ষমতায় আরোহণ ইত্যাদি বিষয় উপস্থিত হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই রাজনীতির ব্যবসায়ীদের ও এই নির্বাচনী মাঠে নজরে আনা জরুরি।
একটু বিশদভাবে বিষয়টি চিন্তা করলে দাঁড়ায় বামপন্থীরা ক্ষমতার রাজনীতি করেন না। তবে তারা কিসের রাজনীতি করেন? মানুষের সার্বিক মুক্তির রাজনীতি? আমার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ৩১ বছরের মধ্যে যে জিনিসটি দেখছি তা হলো মানুষের মুক্তি আনতে গিয়ে নিজেরাই মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ জন সমর্থন আনতে গিয়ে দিন দিন পার্টি জন শূন্য হলে অবশেষে নেতৃবৃন্দ ক্ষমতার রাজনীতিই বেছে নিয়েছেন এবং কেউ কেউ ক্ষমতার স্বাদও ভোগ করছেন। প্রকৃতপক্ষে সবাইই ক্ষমতার রাজনীতি করে। ক্ষমতায় না গেলে কোন ইজম বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই দল ছোট হউক, বড় হউক, ডানপন্থী হউক কিংবা বামপন্থী আর মধ্যপন্থীই হউক-সবাইই ক্ষমতায় যেতে চায়।
এখন প্রশ্ন হলো ক্ষমতায় কীভাবে যাওয়া যায়? আমাদের দেশে স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৭ বছরে যে গণতান্ত্রিক ধারা প্রচলিত হয়েছে-তাতে ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নির্বাচন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনই পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার একমাত্র পথ। এই নির্বাচনে যারা জয়ী হবে তারাই পরবর্তী সরকার গঠন করবে। কাজেই এই নির্বাচন হেলাফেলার নয়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। একটা সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে জনগণের ক্ষমতায়নের মূল্য দিতে। যেন তেন নির্বাচনের মাধ্যমে তো আর জনগণের ভোটের মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
তাই বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের উচিত একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্লাটফরম তৈরি করা। অপরদিকে জনগণেরও কিছু নাগরিক দায়িত্ব রয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর প্রায় ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমাদের মৌলিক অধিকার এখনও নিশ্চিত হয়নি। অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান চাকরি কোন কিছুরই নিশ্চয়তা এখনও পায়নি জনগণ। আর জনগণ যদি নিজ অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার না হন তাহলে অধিকার নিশ্চিত করা খুবই কঠিন। গ্রাম্য একটি প্রবাদ আছে ‘চেনাইতে ছাগল না ধরলে দৌড়াইয়া কি ধরা যায়?’ প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনই হচ্ছে মানুষের দাবী দাওয়া আদায়ের চুড়ান্ত সময়। কারণ আমাদের দেশের প্রথা অনুযায়ী কেবল নির্বাচনের সময়ই নেতৃবৃন্দ জনগণের কাছাকাছি আসেন। উন্নয়ন, জাগরণ, সমর্পণ ইত্যাদি জনগণের কানে কানে পৌঁছান। সমর্পণ এ কারণে যে-নির্বাচনের প্রার্থীরা বলেন, আমরা আপনাদের সেবক হয়ে কাজ করতে চাই। কিন্তু আমার পঞ্চাশোর্ধ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি-বা আমার সাথে অন্যান্য নাগরিকবৃন্দও বোধ হয় একমত হবেন নির্বাচনে পাশ করার পর খুব কম সংখ্যক লোকই জনগণের সেবক হন। এম.পি, চেয়ারম্যান, মেম্বার হয়ে গেলে পরে আর কাছে পাওয়া খুবই কঠিন হয়। নিজের কোন কাজে ধর্ণা দিয়েও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। তবে দেশের জনগণ এবার আগের চেয়ে অনেক সচেতন। বার বার নির্বাচনী ইশতেহার-ওয়াদা যারা ভঙ্গ করেছেন তারা যদি আবারও ভোট চাইতে আসে তাহলে ব্যালটের মাধ্যমেই এর জবাব দিতে হবে।
তবে জাতীয় নির্বাচন স্থানীয় নির্বাচন থেকে ভিন্ন। জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক পার্টি সরাসরি নির্বাচন করে থাকে এবং একটা পার্টির আদর্শ-উদ্দেশ্য-লক্ষ্য থাকে। বিভিন্ন ইজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কাজ করে থাকে। কেউ মার্কসবাদী, কেউ লেনিনবাদী, কেউ জাতীয়তাবাদী, কেউ ইসলামবাদী ইত্যাদি মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে থাকেন। অবশ্য যার যার পার্টির অনুসারিরা যার যার লক্ষ্য উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের খেদমতে নিজেদের পেশ করেন। তবে একটা জিনিস এখানে লক্ষ্যণীয় তাহলো যারা কোন ইজম বা মতবাদে বিশ্বাস করেন না বা যারা কোন রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয় বা রাজনীতি করা হারাম মনে করেন তাদের জন্য ব্যাপারটা একটু জটিল আকার ধারণ করে। অর্থাৎ তাদের কোন নির্দিষ্ট কোন বাক্স নেই। তারা পড়েন বিপাকে। তবে তাদের মনে যে বিষয়টি কাজ করে তাহলো এই ভোট একটা একজনকে দিলেই হয়। আরও একটি বিষয় সেটি হলো ভোট কাজে লাগানো অর্থাৎ এগিয়ে থাকা প্রার্থীকে ভোট দেয়া। তিনি যে প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন সেই প্রার্থী যদি পাশ করে তবেই সে ভোটটা কাজে লাগলো। কিন্তু এই ভোটার যে নিজের পায়ে কুড়াল মারছে যে বিষয়টি সে নিজেই জানে না।
ভোট একটা আমানত স্বরূপ। এই আমানতটি আপনি দেখে শুনে প্রয়োগ করবেন। একজন মানুষ ভালো কি মন্দ, তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কি সেটা ভালো করে না জেনে অন্ধকারে ভোট দেয়া ঠিক নয়। ধরুন আপনি একজনকে ভোট দিলেন-লোকটি ভালো। সে ভালো ভালো কাজ করলো। এতে যে সাওয়াব হলো আপনিও তার ভাগিদার হলেন। কারণ আপনার ভোটের বদৌলতেই তিনি ভালো কাজ করার সুযোগ পেলেন। অন্যদিকে আপনার ভোট যদি কোন মন্দ লোকের বাক্সে পড়ে আর যদি সে ক্ষমতায় গিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সকল মন্দ কাজের হোতা বনে লোকেদের অনিষ্ট করতে থাকে তাহলে আপনিও সেই গোনাহর কাজে শরীক হলেন এবং সেই গোনাহের ভাগিদার আপনিও হলেন। কাজেই একটা ভোট যেই সেই ব্যাপার নয়-অনেক ভেবে চিন্তে সেটা প্রয়োগ করতে হবে।
এখন আসি যাদের বাক্স নেই অর্থাৎ কোন রাজনীতির সাথে যারা জড়িত নয় তাদের প্রসঙ্গে। রাজনীতি মানে কি? নিজের অধিকার সম্পর্কে বলা। একটা শিশু ভূমিষ্টের পরই কান্না শুরু করে অর্থাৎ রাজনীতি করে। শিশু কান্নাকাটি না করলে সে তার মায়ের কাছ থেকেও দুধ আদায় করতে পারে না। কাজেই নিজের অধিকার সম্পর্কে বলা হারাম হতে পারে না। যারা কুরআন হাদিছে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেও রাজনীতি বিমুখ তাদেরকে হুজুর (সাঃ) এর জীবনী আরও সচেতনভাবে পাঠ করা উচিত।
তিনি যদি ইসলামের কথা মানুষের কাছে না বলতেন তাহলে আজ আপনি কুরআন হাদীছ কোথা থেকে পেতেন? হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বাতিলদের সাথে যুদ্ধ করে ইসলাম কায়েম করে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, কুরআন ও হাদীসের আলোকে কিভাবে জীবন যাপন করা যায়। পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদীন এবং তৎপরবর্তী তাবেঈ বা তাবে তাবেয়ীনদের যুগ-অর্থাৎ প্রায় ২০০ বছর পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি দুনিয়ায় ইসলাম কায়েম ছিল। সেটা কি রাজনীতি ছিল না? একদিকে রাজনীতি করেন না অন্যদিকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট দেন এটা আবার আপনার পক্ষে গেলো না বিপক্ষে গেলো সেটাও খেয়াল করেন না। এ রকম অতীতে অনেকবার হয়েছে। কথায় আছে ‘কানা একবার লাঠি হারালে অন্যবার সেটা সামলে বসে।’
অতীতে অনেকবারই সাধারণ লোকের ভোটে ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতাসীনরা আপনাদেরই টার্গেট করে আপনাদের বৃহৎ ক্ষতি সংঘটিত করেছে। আজ হিসাব নিকাসের সময় এসেছে। বসন্তকালে কোকিল ডাকে। বসন্তকাল চলে গেলে কোকিলও চলে যায়। রাজনৈতিক কোকিলরা সময় সময় ভিন্ন ভিন্ন সুরে ডাকে-আবেগাপ্লুত করতে চায়। তবে অভিজ্ঞজন সেই ইনিয়ে বিনিয়ে ডাকা কোকিলের ডাকে সাড়া দেন না। যে ঠিকই ধরে নেয় কে বন্ধু আর কে শত্রু। কাজেই এখন সময় এসেছে চিন্তা ভাবনা করার। নিজের মূল্যবান ভোট সম্পর্কে সজাগ হোন। সস্তা প্রতিশ্রুতিতে কান দিবেন না। নিজের আমানত যাতে দেশ ও দশের প্রকৃত কাজে লাগে। ভালো মানুষ সংসদে যায়-সেই দিকেই নজর দেই। আগামী সংসদ যেনো আরো ভালো লোকের সংসদ হয়-এই চেষ্টাই যেনো আমরা করি।
লেখক : কলামিস্ট।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

ডা. হারিছ আলীর প্রয়াণদিবস আজ

         মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিবিদ, স্বনামধন্য...

সোনালী ব্যাংকের জালনোট প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মশালা।

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: জালনোট প্রতিরোধে...

ন্যায্যমূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করছে সিলেটের বিএইচডি

           দক্ষিন সুরমা মোমিনখলা বাইপাসস্থ...