নিজেকে পাল্টান, দেশ পাল্টাবে

প্রকাশিত : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

এফ এইচ ফারহান:

শিশু সন্তান পৃথিবীর অালোতে অাসার অাগেই রঙিন দুনিয়ার মায়ার সাজে সুশোভিত হয় গৃহ প্রকৃতি। সেই সাথে ডিজিটালাইজড সমাজ ব্যবস্থার প্রচলিত একটি নিয়ম- অামার সন্তান বড় হয়ে চিকিৎসক হবে নাকি প্রকৌশলী ….!

সকল অাশা অাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে বাস্তবিক জগতে নবজাতকের সুভাগমন যেন অলঙ্কৃত করে সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদের। অাদর-ভালোবাসায় সিক্ত নতুন শিশুর মুখে “মা-বাবা” ডাক শোনার জন্য অপেক্ষা করেন জন্মদাত্রী ও জন্মদাতা। একসময় শিশু হাঁটতে এবং অস্পষ্ট থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলার দক্ষতা অর্জন করে।

শুরু হয় বর্ণের খেলা- কেউ পড়ান “অ,অা,…..”, কেউ “এ, বি, সি, ডি,…..।”
খাবার হোক অথবা পড়া, গলাধঃকরণ করতেই হবে।

-গলাধঃকরণই শক্তি,
গলাধঃকরণই বল।
পেট ভরেছে তো কি হয়েছে?
তুই অারো পড়।

অাসা যাক বিজ্ঞানের কথায়-শিশুর মস্তিষ্ককে সঠিক এবং সুন্দর একটি গাঠনিক রূপ দেয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে শিশুর শৈশবকাল। শৈশবকালে শিশুর গ্রহণ এবং ধারণ করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশী থাকে বিধায় শিশু তার স্বীয় দুনিয়ায় নিজেকে অঙ্কন করতে চায় নতুন রূপে, নতুন গুণে। বাস্তবতার অাড়ালে সে জন্ম দেয়, নতুন এক বিশ্বের। কাল্পনিক জগতে নিজের মতো করে সে ছন্দ রচনা করে, বর্ণ লিখে, নতুন রঙে রঞ্জিত করে সে নিজেকে। শিশু সৃষ্ট সৃজনশীল জগতে সে রাজা, অার বাকি সব প্রজা- যে জগতের অাড়ালে লুকায়িত থাকে ছোট্ট শিশুর সুপ্ত প্রতিভা।

অাসুন, এবার পরিচিত হই বহিঃবিশ্বের সাথে- সম্প্রতি বাংলাদেশী বংশদ্ভূত পাঁচ বছর বয়সী শিশু সন্তান সুবর্ণ অাইজ্যাক বারী অান্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে ভবিষ্যৎ অাইনস্টাইন হিসেবে।সে অামন্ত্রণ পেয়েছে অামেরিকার হোয়াইট হাউজে, প্রশংসিত হয়েছে জাতীয় এবং অান্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল কর্তৃক ; স্বভাবতই পশ্ন অাসে- কিভাবে সম্ভব?

সুবর্ণ বারীর পিতা অামেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশিদুল বারীর সাথে কথা হয় অামার বছরখানেক অাগে। সুবর্ণ দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা করতে পারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ক্যালকুলাসে বিশেষ দক্ষতা সহ দেশ বরেণ্য শিক্ষকদের সামনে বসে সে সমাধান করতে পারে পিএইচডি লেভেলের গাণিতিক সমস্যা। রসায়নের প্রতি তার অালাদা অাকর্ষণ- পর্যায় সারণীর ব্যাখ্যা সহ জানে সে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদির নাম এবং সংকেত।পদার্থবিজ্ঞানেও প্রায় সমান প্রতিভা বাংলাদেশী বংশদ্ভূত ছোট্ট শিশু সুবর্ণের।

শিশুর মস্তিষ্ক অনেকটা কম্পিউটার প্রোগ্রামের মতো। সেখানে অামরা ইনপুট হিসেবে যা প্রদান করি, অাউটপুট তার পরিপ্রেক্ষিতেই বেরিয়ে অাসে। তবে চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে শিশুর কাল্পনিক জগতের সাথে ইনপুটটাকে খাপ খাওয়ানোর, যে দায়িত্ব সাধারণত অামদের অভিভাবক এবং শিক্ষকরাই গ্রহণ করে থাকেন। পাশাপাশি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে -শিশুর কাল্পনিক জগৎ সেই পরিবেশ দ্বারাই প্রভাবিত হয়, যে পরিবেশ অামরা তার জন্য প্রস্তুত করি। এক্ষেত্রে সব শিশুর ধারণ ক্ষমতা সমান না হলেও প্রচেষ্টার অারেক নামই তো সফলতা….।

কিন্তু অামাদের অবস্থান থেকে সফতার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অাধুনিকতার মোহে অামরা নিজেদের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে গ্রহণ করলেও পশ্চিমাগোষ্ঠীর সাথে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার যোগ্যতা অামরা অর্জন করতে পারিনি। অাজ অামরা যেখানে অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি, অামেরিকা সেখানে একশো বছর পরবর্তী সময় নিয়ে গবেষণা করছে।
পশ্চিমাগোষ্ঠীর পড়াশোনা যখন নিজেকে জানার জন্য, অামাদের পড়াশোনা তখন সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য। তারা যখন সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ সুযোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে, অামরা তখন মুখস্ত বিদ্যার গুদাম খুঁজি। অনুকরণপ্রিয় বাঙালি জাতি যখন রোবট, পশ্চিমা সম্প্রদায় তখন রোবট মেকার।

অামরা ভুলে যাই, শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাই যদি একজন মানুষের মেধার পরিচায়ক হতো তাহলে নজরুলকে জাতীয় কবি অথবা রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি হিসেবে মেনে নেয়াটাও অামাদের সুশীল সমাজের পক্ষে সম্ভব হতো না। এমনকি তাদের থিউরি অনুসরণ করে অাজকের পিএইচডি ডিগ্রীও অাসতো না।

অামরা বাঙালি এমন এক জাতি, যারা মেধা অন্বেষণ তো দূর ; এখন অবধি ‘মেধা ‘ শব্দটির সাথেও অামরা পরিচিত হতে পারি নাই। সঠিক-ভুল বিচার না করে অন্যদের অন্ধের ন্যায় অনুসরণ করতে গিয়ে অামরা নিজেদের ভুলে যাই, হারিয়ে যায় অামাদের সৃজনশীলতার অস্তিত্ব। অামরা সেটাই বিশ্বাস করি, যা অামাদের টিভির পর্দায় দেখানো হয়। নিজেদের সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করার ক্ষমতাকে বিদায় দিয়ে অামরা ধারণ করি পঙ্গুত্বকে এবং অবশেষে ফলাফল শূন্য।

কুশিক্ষাকে দূরে ঠেলে সুশিক্ষা নিয়ে অালোচনায় অাসা যাক। অার্থিকভাবে লাভজনক নয় এমন সবকিছুকেই এদেশে অনর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যথার্থ শিক্ষিত হতে হলে দরকার মনের প্রসার। অাবার শিক্ষার অাসল কাজ জ্ঞানদান নয়, মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং জ্ঞান মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায় মাত্র।

প্রমথ চৌধুরীর “বইপড়া “কিংবা মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ” শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব ” প্রবন্ধের সারকথাগুলো প্রায় এমনই ছিলো। কিন্তু অাজকের বাস্তবতার সাথে উপরের নীতিবাক্যগুলোর মিল কতটুকু তা হয়তো প্রমথ চৌধুরী কিংবা মোতাহের হোসেন চৌধুরীই ভালো জানতেন।

যাহোক শিশুর বয়স যখন তিন বছর, তখন থেকেই বিশেষ পরিকল্পনা শুরু।কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে শুরু হয় বাচ্চাদের পরিচর্যা। অামাদের শিক্ষা ব্যবস্থানুযায়ী স্বভাবতই শিশুর নিজের ওজনের চেয়ে স্কুল ব্যাগের ওজন বেশী হওয়ায় অভিভাবকরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী সচেতন থাকেন। স্কুলে শিক্ষকরা পড়া দেন, শিশুরা বাসায় এসে পড়া শেখে। বাসায় প্রাইভেট টিউটর প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন মুখস্ত করান। ক্লাসে স্যার-ম্যাডামদের প্রেমালাপ (সাময়িক ক্ষেত্রে) বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে দেয় অাধুনিকতার সঙ্গে, সেইসাথে মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় খবর অাসে শিক্ষকের হাতে পাঁচ বছরের শিক্ষার্থী লাঞ্চিত, ধর্ষিত…. ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিকারাও পিছিয়ে থাকতে পছন্দ করেন না। প্রতিদিন পড়া দেয়া হয় এবং নেয়া হয়, এর বাইরে পাঠক্রম বহির্ভূত বেশ কিছু কর্মকান্ড রয়েছে। তবে সেগুলো শিশুর সুপ্ত প্রতিভার খোঁজ কিংবা মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর তা সম্পর্কে হয়তো স্কুল কর্তৃপক্ষই ভালো জানেন( সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়)।

শিশু পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট একটি সিলেবাস থাকে, যেটির গলাধঃকরণ শেষ হওয়া মাত্রই শুরু হয় হজম শক্তি নির্ণয়ের প্রতিযোগিতা। উল্লেখ্য- যাদের বাসায় প্রাইভেট টিউটর হিসেবে স্কুল শিক্ষকরা থাকেন, তাদের হজমশক্তি স্বভাবতই একটু বেশী হয় এবং ফলাফলের ক্ষেত্রেও সেসব শিশুরা কম-বেশ পারদর্শী হয়। ক্ষেত্রবিশেষে স্কুলগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থা এতটাই নাজেহাল যে শিক্ষার্থীদের নাক মুখে পানি ঢেলে যুদ্ধের ময়দানে অবতরণ করতে হয়। অার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ- সেটি নাহয় বাকিই থাক!

স্কুল বেসরকারি হোক অথবা সরকারি, মাস শেষে বিভিন্ন পন্থায় টাকা অাদায়ের হিসাবটা যথাযথই হয়। প্রাইভেট স্কুলগুলোতে স্কুল প্রশাসনের বাইরে প্রভাব খাটান স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদরা। অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চাদের পড়াশোনা তো দূর, প্রতিষ্ঠানগুলোতে নোংরামির মাত্রা এতটাই বেশী যে তাদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়েও ওঠে প্রশ্ন।
পড়াশোনার ব্যাপারে বাচ্চাদের অভিভাবকদের দৃষ্টভঙ্গির বিষয়টি অালোকপাত না করলেই নয়।মুখস্তবিদ্যানির্ভর প্রতিযোগিতায় কে প্রথম, কে দ্বিতীয়- সেটি নিয়েও নানা তর্ক বিতর্ক।
এমতাবস্থায় একটি শিশুর সু্প্ত প্রতিভার খোঁজ, মেধার বিকাশ কিংবা সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণতা লাভে এমন স্কুল অথবা অভিভাবক কতটুকু অবদান রাখেন?
এখানে এককভাবে কাউকে দোষারোপ করা উচিত হবে না। কারণ যার পেট ব্যাথা – সে যদি না বুঝে যে, সে অসুস্থ ; এক্ষেত্রে ডাক্তারের মাথাব্যাথা থাকাটা স্বাভাবিক। প্রাথমিক অবস্থায় একটি শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই যেখানে তার পরিবার, সেখানেই যদি মূল্যবোধ সচেতনতার অভাব দেখা দেয় – সেক্ষেত্রে সরকারের কি করার অাছে?

তারপর অাবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, যেটি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। মুখস্তবিদ্যার জোয়ার-ভাটার সাথে যুদ্ধ করে যারা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাদের মানসিক বিকাশ তো দূর বরং বাচ্চাদের নার্ভ এতটাই দূর্বল হয় যে- বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের ওপর ভরশা হারিয়ে ফেলে এবং অন্যের ওপর নির্ভর হয়। ফলে পরনির্ভরশীলতার জড়তা কাটিয়ে অাত্মনির্ভরশীলতায় মন বসানো তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

মাধ্যমিক পর্যায় থেকে শুরু হয় পিছুটান। বেশীরভাগ শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ান কম, বাসায় বেশী। স্কুল শিক্ষকরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের তাদের বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়ার অামন্ত্রণ জানান। পড়লে ভালো ;না পড়লে স্কুল পরীক্ষায় তার ফল ভোগ করতে হয় এবং সেটা অাকার ইঙ্গিত হোক অথবা সরাসরি, খুব সূক্ষ্মভাবেই শিক্ষার্থীদের ইনফর্ম করা হয়। জমে ওঠে স্কুল শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসা। ক্লাসে মোট একশো জন ছাত্রছাত্রী থাকলে নিজের অভিভাবক সচেতনতা অথবা প্রাইভেট টিউটরের জোরে প্রথম সারিতে সর্বোচ্চ দশ শতাংশ শিক্ষার্থী টিকে থাকে এবং এই দশজনকেই মেধাবী হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। বাকিদের ক্ষেত্রে ক্রমানুসারে মানসিক চাপ বাড়তেই থাকে। পাশাপাশি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিছনে পড়ে থাকা শিক্ষার্থীকে অবহেলিতরূপে গণ্য করা হয়।
অাফসোস!
অামরা বাঙালিরা শিক্ষিত হই ঠিকই (স্বশিক্ষিত নয়) , কিন্তু সেটা মেধা কিংবা সৃজনশীলতার জোরে নয় বরং সার্টিফিকেটের জোরে। পাশাপাশি কতিপয় ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে অনেক মূল্যবান ডিগ্রীও ক্রয়-বিক্রয় করা যায়।
মেধা কি শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
তার মানে এই না যে, সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিতরা মেধাবী নয়। তবে তাদের সফলতাটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের পরিশ্রমনির্ভর। কেননা যে সিস্টেম মেধা অন্বেষণে কার্যকরী নয়, সে সিস্টেম কখনোই মেধার বিচারে যোগ্যতা বয়ে অানতে পারে না।

অাসা যাক, পরীক্ষা এবং প্রশ্ন কাঠামোতে…..।
বর্তমান সরকারের একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হচ্ছে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি। প্রাথমিক অবস্থায় সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বেশ ইতিবাচক মনে হলেও বর্তমানে তা নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথমত, সবাই সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করার ব্যাপারে পর্যাপ্ত দক্ষ না এবং সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির ব্যাপারে প্রায় সর্বত্রই প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি বা তার উত্তর দিতে হলে যে বিষয়গুলোতে দক্ষতা অর্জন করতে হয় এবং মুখস্তবিদ্যার সীমারেখা থেকে বের হয়ে শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ককে যেভাবে সাজাতে হয়, পাশাপাশি যে পদ্ধতি অনুসরণ করে পাঠ্যপুস্তক উপস্থাপন ও সঠিক পন্থায় তা অায়ত্ত্ব করতে হয় – সেই বিষয়গুলোর সাথে অামাদের শিক্ষার্থী সহ কতিপয় ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও সঠিকভাবে পরিচিত নয়।

অারেক মহা অসুখের নাম হচ্ছে প্রশ্ন ফাঁস। বর্তমান সময়ে প্রেক্ষাপটে যা অাসলে শুরু হয় কিন্ডারগার্টেন লেভেল থেকেই। প্রকৃত অর্থে প্রশ্ন ফাঁস রোগটি নতুন কোনো রোগ নয়, পুরাতন রোগেরই একটি লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে মাত্র। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে- প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, চাকুরীর নিয়োগ পরীক্ষা সহ এমন কোনো বিভাগ নাই যা প্রশ্নফাঁস দ্বারা রোগাক্রান্ত হয় নাই। প্রাথমিক পর্যায় থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে উপরের পর্যায়ে অতি সহজেই শিক্ষার্থীরা এই বিষয়টির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে এবং প্রশ্ন ফাঁসকেই কেন্দ্র করে বিভিন্ন পরীক্ষায় শিক্ষাব্যবসায়ীদের কপাল খুলে। জেগে ওঠে কোটি টাকার বাণিজ্য -যেখান থেকে ভাগ পান বড় অঙ্কের বিনিয়োগকারী , রাজনীতিবিদ, উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকতা এবং প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সংশ্লিষ্ট দালাল চক্র। বাস্তবিক ক্ষেত্রে প্রশ্নফাঁস যদি কোনো রোগ হয়, তবে অামরা সেই রোগের বাহক। প্রশ্নফাঁস রোধে ব্যর্থ হওয়ায় অনেকেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন, কিন্তু এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রী এককভাবে কি ভূমিকা পালন করতে পারেন -সে বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা কেউ উপস্থাপন করেননি।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষায় এমসিকিউ পদ্ধতি তুলে দিবেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের হাতে কয়েক সেট প্রশ্ন তুলে দিয়ে পরীক্ষা নেয়ার জন্য অথবা ডিজিটাল প্রশ্নপদ্ধতির অালোকে পরীক্ষা নেয়ার জন্য, কোচিং বাণিজ্য বন্ধকরণ সহ….অারো বিভিন্ন সমাধান। এমতাবস্থায় অামার মতো একজন সাধারণ ছাত্রের প্রস্তাবিত সমাধান যদি ইতিবাচকও হয় তবুও সিস্টেম কর্তৃক তা বর্জিত হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশী।
গোড়ায় পচন ধরলে শাখা পরিষ্কার করে কোনো লাভ নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা জেএসসিকে শিক্ষার্থীদের মেধা অন্বেষণে একটি বিশাল নির্ণায়করূপে গণ্য করা হয়, যদিও তা শিক্ষার্থীর মেধা অন্বেষণে কেমন ভূমিকা পালন করে- সেই বিষয়ে সম্ভবত স্কুল কর্তৃপক্ষই ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। দীর্ঘ অাট বছর যাবৎ যে শিক্ষকরা একটি শিক্ষার্থীকে পর্যবেক্ষণ করেন, তারা শিক্ষার্থীর মেধার স্কেল পরিমাপের জন্য সাদা কাগজ-কলমের ওপর ভরশা করেন। এক্ষেত্রে পরীক্ষাটি যেমন নানা রোগে অাক্রান্ত তেমনি পরীক্ষা পদ্ধতি এবং প্রশ্নপত্রের মান নিয়েও বিভিন্ন সময়ে ওঠেছে নানা প্রশ্ন।

যে শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হয় ; বাংলা, ধর্ম শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা কিংবা সমাজবিজ্ঞানের কারণে জিপিএ-৫ না পাওয়ায় অথবা দুই-এক দিনের অসুস্থতার জন্য তাকে নবম শ্রেণি থেকে বিজ্ঞান কক্ষের বাহিরে রাখা হয়। বলা হয় – সে বিজ্ঞান পড়ার যোগ্য না। এরপর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েও তথাকথিত মেধাবীরা যখন বিজয় দিবসকে স্বাধীনতা দিবস বানায়, তখন মনে কি প্রশ্ন জাগে?

সেইসাথে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রথম সারি ব্যতীত বাকিদের পড়ে থাকতে হয় অবহেলিত অবস্থায়। কেন, তাদের কি মেধা নেই?

এমতাবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক কিংবা অভিভাবকরা কতটুকু দায়িত্ববান ? ওনারা কি শুধু নামমাত্রই দায়িত্ব পালন করেন?

মেধা অন্বেষণ এবং তার মূল্যায়নে বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে কিভাবে ভূমিকা পালন করে ? কিছু ক্ষেত্রে পাঠক্রম বহির্ভূত কর্মকান্ড থাকলেও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত এবং এসব ফিল্ডে শিক্ষা অফিসার সহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও অালোচনা ওঠেছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু উপরিউক্ত বিষয়ে কিংবা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দূর্বলতারর জন্য এককভাবে সরকারকে দোষারোপ করা উচিত নয়।

কেননা যে জাতি নিজেদের কল্যাণ সম্পর্কে সচেতন নয়, সে জাতি অাবর্জনায় পড়ে থাকাটাই প্রত্যাশা করে। অামরা জেনেশুনেই নিজের সন্তানের জন্য ভুল ব্যবস্থা গ্রহণ করি। অসুখ সরকারের নয়, অসুখ অামাদের। অামরা মনে করি যারা ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী অথবা উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা – শুধুমাত্র তারাই মেধাবী, বাকিরা ঘাস কাটার জন্য। সত্যিকার অর্থে মেধা শব্দটির সাথে অামরা এখন অবধি পরিচিত হতে পারি নাই। মূর্খতার একটা সীমা থাকা উচিত। তবে ইহার একটি কারণ হিসেবে অাখ্যায়িত করা যায় শ্রমের মূল্যায়ন সম্পর্কিত অামাদের দৃষ্টভঙ্গিকে।

অামাদের হিসাবে শুধুমাত্র ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডিগ্রীধারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই সম্মানের ভাগিদার। বাকিদের মূল্যায়ন দিতে সুশীল সমাজের বড় কষ্টই হয়। অথচ কৃষকরা যদি খাদ্য উৎপাদন না করে ডিগ্রীধারীরা কি ডিগ্রী ভিজিয়ে পানি খাবেন?

নাপিত যদি চুল কাটা বন্ধ করে দেয়, তাহলে ডিগ্রীধারীদের সুন্দর চেহারার কি হবে?

\অামরা প্রত্যেকেই একে অপরের ওপর কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু মূল্যায়ন পান শুধুমাত্র ডিগ্রীধারীরা, বাকিরা সমাজের চোখে নিচু সম্প্রদায়। কোন বাবা-মা চান, তাদের সন্তান বড় হয়ে একজন সৎ কর্মজীবী মানুষ হোক, সে তার ইচ্ছানুযায়ী একটা নতুন কিছু করুক, সন্তান সেটিই করুক যেটিতে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে?

প্রত্যেক সন্তানকেই অামরা কোনো এক পন্থায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখি, যাতে তার মধ্যে সুপ্ত স্বীয় প্রতিভার উন্মোচনের সুযোগ না থাকে। তারপরও যদি কেউ নিজের চিন্তাগুলোকে সৃজনশীলতার অালো দিয়ে নতুনরূপে সাজাতে চায়, তখন না সে পরিবার থেকে সাপোর্ট পায়, না অামাদের সামাজিক ব্যবস্থা থেকে। কতিপয় শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজেদের হেয়ার স্টাইল পরিবর্তন করে বা পোশাকে সাজসজ্জা এনে নিজেদের উন্নত শ্রেণির সম্প্রদায়ভুক্ত করতে চায়, কিন্তু তারা ভুলে যায় প্রকৃত স্মার্টনেস মানুষের সাজসজ্জায় নয়, মানুষের চিন্তাধারায় প্রকৃত স্মার্টনেস লুকায়িত থাকে।

শ্রমজীবীদের অবমূল্যায়ন অামাদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম একটি কারণ এবং ইহার জন্যই অামাদের জনশক্তি জনসম্পদে রূপ নিচ্ছে না, অামাদেরকে এখনো পরনির্ভরশীল হয়ে থাকতে হচ্ছে। উচ্চতর ডিগ্রী ধারণ করেও কর্মক্ষেত্রের অভাবে অামাদের যুবকদের প্রবাসে গিয়ে ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে হয়। বিদেশ গিয়ে অন্যের গোলাম হলেও সমস্যা নেই, কিন্তু নিজের দেশে পা মাটিতে রাখলেই ইজ্জত চলে যায়। এছাড়াও সামগ্রিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি এবং রাজনীতির নোংরা প্রভাব তো রয়েছেই।

প্রস্তুতি অথবা প্রশ্নপত্রের মান যেমনই হোক না কেন, নির্ধারিত সময়েই শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করতে হয় এসএসসি পরীক্ষায়। শিক্ষার্থী বললে অাসলে ভুল হবে, কেননা শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন এবং অামাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য সার্টিফিকেট অর্জন।

সাম্প্রতিক সময়ে সার্টিফিকেট নির্ভর জিপিএ-৫ প্রাপ্ত জ্ঞানীরা স্বাধীনতা দিবসকে বিজয় দিবস বানিয়ে নিজেদের কতটুকু অালোকিত করেছেন, সেটা জাতি দেখেছে। অবশ্য এখানে তাদেরকে দোষারোপ করে তেমন কোনো লাভ নেই। কারণ তাদেরকে জিপিএ-৫ সমৃদ্ধ জ্ঞান অামাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই দিয়েছে, তাদেরকে মেধাবী হিসেবে অামাদের এসএসসি পরীক্ষাই মূল্যায়ন করেছে।

ফলাফল যাই হোক, বর্তমান সরকার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের কলেজে ভর্তির ব্যাপারে গ্রেডভিত্তিক পদ্ধতি চালু করায় শিক্ষা ব্যবসায়ীদের পকেট ভরার কারবার একটু হলে কমেছে।এসএসসি হোক অথবা এইচএসসি, উভয় পরীক্ষা নামেমাত্র সৃজনশীলতার ভার বহন করলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দুটো পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কাঠামোই মুখস্তবিদ্যানির্ভর।

অনেকে কলেজ /বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে গ্রেডভিত্তিক নিয়মকে অগ্রহণযোগ্য বলেন। যদি এমনই হয়, তাহলে নিশ্চয় এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা মেধার যাচাই এবং তার মূল্যায়নে কার্যকরী নয়। তাহলে এসএসসি অথবা এইচএসসি পরীক্ষা রাখার প্রয়োজন কি, সরাসরি ভর্তি পরীক্ষা রাখলেই হয়। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার পক্ষপাতী কর্তৃপক্ষ মেধা যাচাইয়ের পরিচায়ক হিসেবে না পারেন নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে, না এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করতে… । এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন এবং পরীক্ষাপদ্ধতির মান ঠিক রেখে যদি এই দুটি পরীক্ষা বহাল রাখা হয়, তাহলে ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করা জরুরী কি?

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষাব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়ার অন্যতম একটি হাতিয়ার। প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। এতে অামাদের শিক্ষা ব্যবসায়ীরা লাভমান হলেও শিক্ষার্থীরা ব্যাপক অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামগ্রিক বিষয় চিন্তা করলে এক্ষেত্রে সমগ্র বাঙালি জাতিই ক্ষতির শিকার হয়। পাশাপাশি প্রাইভেট স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় তো রয়েছেই- যেখানে সুনামধন্য শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ সহ প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ অর্থ বিনিয়োগ করে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। সকল ক্ষেত্রেই বলির শিকার জ্ঞানার্জনে অাগ্রহী শিক্ষার্থীরা। চাকুরীক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস সহ প্রভাবশালীদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা থাকায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মেধাবীদের বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। মেধা পাচার অামাদের জাতীয় উন্নতির অন্তরায়রূপে এক্ষেত্রে ভালোই ভূমিকা রাখে। যেসব মেধাবীদের দেশ ত্যাগ করার সৌভাগ্য হয় না তাদের অনেকে অাবার সৌভাগ্যক্রমেই মূল্যায়ন পান, অার বাকিরা বেঁচে থাকা জমিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সময় এবং সম্পদের হিসাবে অাজ অামাদের যে অবস্থানে থাকার কথা, অামরা সেখানে উন্নত বিশ্বের চেয়ে শতভাগ পিছিয়ে। একটিই কারণ- মেধা এবং শ্রমের অবমূল্যায়ন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক মান স্কেলে ভাগ করে অামরা অামাদের প্রায় ষাট শতাংশ শিক্ষার্থীদের মনোবলকে ভেঙ্গে দেই। কেননা অাসনের সীমাবদ্ধতা, প্রশ্নফাঁস,প্রভাবশালীদের অবৈধ হস্তক্ষেপ,দুর্নীতি সহ অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় মিলিয়ে দেশখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশীরভাগ শিক্ষার্থীদেরই জায়গা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে অল্পসংখ্যক যাদের জায়গা হয় তাদের বেশীরভাগই অধিক পরিশ্রম অথবা সৌভাগ্যক্রমে অাসন পেলেও কাঙ্ক্ষিত সাবজেক্ট পায় না। ফলে তথাকথিত সার্টিফিকেট নির্ভর ডিগ্রীধারীদের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র তারাই মেধাবী হয় যারা দেশখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করে।তবে মেধা যাচাইয়ের মানদন্ডরূপে ওনারা কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, সেটি সম্পর্কে হয়তো শুধুমাত্র ওনারাই তথ্যাভিজ্ঞ।

ক্ষেত্রবিশেষে চাকুরী পেতে গেলেও এমনকিছু ডিগ্রীধারীদের সম্মুখীন হতে হয়। যুগ যুগ ধরে চলে অাসা এই রীতির প্রভাব বেশ প্রবল। অামরাও মনে করি অামাদের সন্তান সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পড়লেই সে মেধাবী, তা নাহলে সে মূর্খ। সেক্ষেত্রে অামরাও মেধার নির্ণায়করূপে কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি, সে সম্পর্কে অামরা নিজেরাই অবগত নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠতে পারে – না বুঝে কেন অামরা ভুল পথে হাঁটছি?

-বাঙালির পুরাতন স্বভাব। চিলে কান নিয়ে গেছে শুনলে কানে হাত না দিয়েই অামরা চিলের পিছনে দৌড়ানো শুরু করি এবং ইহাই বাস্তব সত্য, যার সুযোগ নিয়ে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা স্বার্থকতার চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

পাশাপাশি উপরোক্ত উপায়ে শিক্ষার মানকে ভ্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক স্কেলে বিভক্ত করায় বেশীরভাগ শিক্ষার্থীই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যারা তাদের মধ্যে লুকায়িত সুপ্ত প্রতিভাকে কাজে লাগানোর কোনো সুযোগ পায় না। অাত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায় এবং একসময় সুযোগ বুঝে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী অবহেলিত সেসব শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে মেধাবী নির্বাচন সহ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন বেঅাইনী কাজে তাদেরকে ব্যবহার করে। মূল্যায়ন হতে বঞ্চিত হওয়ায় অনেকেই বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে গিয়ে নিজেদের সম্পৃক্ত করে অসামাজিক কাজের সাথে, মানসিকভাবে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় অনেক শিক্ষার্থীরাই হয় মাদকদ্রব্যের শিকার। যারা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, তারা যদি দেশের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়- তাহলে সেই দায়ভার কার?

-অামাদের অসচেতনতাই অামাদের ধ্বংসের কারণ। সরকার পাল্টাচ্ছে, মানুষ পাল্টাচ্ছে ; কিন্তু ভ্রান্ত চিন্তা চেতনার কোনো পরিবর্তন নেই। যেকোনো দল দেশ পরিচালনায় গেলে শাসন অামলের অর্ধেক কালই কেটে যায় অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করে; অতীত থেকে জ্ঞান নিয়ে সেটাকে ভবিষ্যতে কাজে লাগানো জায়েজ, কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ অাদায়ের উদ্দেশ্যে অতীতে পড়ে থাকাটা নিঃসন্দেহে বোকামির অন্তর্ভুক্ত। কেননা দশজনের ভবিষ্যৎ অাপনার অাসন কর্তৃক নির্ধারিত হয়। অতীতে প্রবেশ করে বর্তমানকে ভুলে গেলে ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার হবেই।

অাওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামলে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় এক ইতিহাস, বিএনপির শাসনামলে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় অারেক ইতিহাস । এভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে অামাদের ইতিহাস পাল্টায়, জ্ঞান পাল্টায়, শিক্ষা ব্যবস্থাও পাল্টায় ; কিন্তু অামাদের অবস্থা পাল্টায় না। কেননা অামরা নিজেরাই নিজেদের কল্যাণ সম্পর্কে অবগত নয়, অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। সাময়িক সুখের কথা চিন্তা করে যারা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করেন,তারা নিজেদের অজান্তে নিজেদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। যে জাতির ভিত্তি যত মজবুত, সে জাতির ভবিষ্যৎ ততই শক্তিশালী।

কিন্তু অামাদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের অভিমুখ ঠিক যেন তার উল্টো। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অাবরণ দিয়ে নিজেদের ঢেকে অামরা নিজেদের অাধুনিক মনে করলেও প্রকৃত অর্থে অামরা সেই অন্ধকার যুগেই পড়ে অাছি। শত বছরের মুক্তি সংগ্রামের পর অামরা স্বাধীন মানচিত্র পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু ইতিবাচক চিন্তাধারার স্বাধীনতা অর্জনে অামরা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ । ব্যক্তিস্বার্থের অাগে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজেদের ইতিবাচক চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ করতে পারলে অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব। অন্যদিকে জেনেবুঝে অামাদের সন্তানদের একটি ভুল সিস্টেমের মধ্যে ঠেলে দিয়ে কতিপয় ক্ষেত্রে সাময়িক সুখ লাভ করলেও তা স্থায়ী হয় না।

অামরা তখনই সচেতন হই যখন অামরা নিজেরা রোগাক্রান্ত হই, কিন্ত অামাদেরকে ঘিরে যে ব্যবস্থা- সেই ব্যবস্থাকে যদি রোগমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে তবে অামাদের নিজেদের রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুলাংশে হ্রাস পায়। শুধুমাত্র সরকারের সচেতনতা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সবার অাগে নিজেকে পাল্টান, দেশ পাল্টাবে।

লেখক : ফয়েজুল হাসান ফারহান- সাংবাদিক, কলামিস্ট।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

মঙ্গলবার সিলেট ওসমানীর ল্যাবে ৫০ জনের করোনা শনাক্ত

         সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের পিসিআর...

সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশ পূজা...