নারীশিক্ষা বিস্তারে যিনি ছিলেন দুঃসাহসিক

প্রকাশিত : ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯     আপডেট : ৬ মাস আগে  
  

তাসলিমা খানম বীথি:
১ আমি চাকরি করি আব্বা কখনো চাননি। যেদিন শুনলেন চাকরি করবো, সেদিন খুব রেগেছিলেন। অনেক বুঝানোর পর শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিলেন। তবে আম্মার কাছে শুনেছি। আমার দাদা ছিলেন খুব পরজেগার ব্যক্তি। গ্রামে কোন অনুষ্ঠান হলে আব্বার বাবা চাচারা না গেলে সেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতো না। গ্রামে মানুষেরা দাদার বাড়িকে সাহেব বাড়ি বলে ডাকতো। তাই সবার কাছে সাহেব বাড়ি মানুষেরা ছিলো খুবই প্রিয়। ২০০৩ সালে গ্রামে বাড়িতে গিয়েছিলাম বেড়াতে। তখন দেখেছি গ্রামের মানুষেরা আব্বাকে কতটা ভালোবাসেন, ¯েœহ করেন, সম্মান করেন। আমি চাকরি করি এ কথা শুনে কে কি বলবে। হয়তো সেই জন্য আব্বা কখনো চাননি তার আদরের মেয়েরা চাকরি করুক। যাই হোক, এখন আর আব্বা আগের মত রাগ করেন না। বরং টেনশন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন মেয়েরা আর চার দেয়ালে বন্দি নেই। এখন শুধু আমি একা চাকরি করি না, আমার ছোট বোনও চাকরি করে। আমাদের একটু দেরি হলেই মেইন রোডে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন আব্বা।

২.সেদিন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাহিত্য আসর উপস্থাপনা শেষ করে হেঁটে যাচ্ছি আম্বরখানার দিকে। পিছন থেকে ডাক দেয় মুয়াজ। তারপর আমি আর মুয়াজ হাঁটছি আর কথা বলছি। আম্বরখানা পয়েন্টে সিএনজি আর রিকশার জটলা সবসময় লেগেই থাকে। সর্তকভাবে রাস্তা পার হতে হয়। আমাকে যেন কোন গাড়ি এসে ধাক্কা না দেয়, সেই জন্য মুয়াজ এক হাত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে খুব কেয়ার করে রাস্তা পার করে।
রাস্তা পার হয়েই মুয়াজ রাগ করে বলে-আপা আপনি মহিলা মানুষ। কখনোই দ্রুত হাঁটবেন না, রাস্তাও পার হবেন না। মুয়াজ আমাকে মহিলা বলতেই, কিছুটা রাগ হয়। তখন তাকে বলি নারীদেরকে কখনো মহিলা বলবে না। কারন নারী শুধু নারী নয়, প্রথমে সে একজন মানুষ, তারপর সে নারী। একজন নারীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে সে মানুষ। তবে আমার প্রতি তার সম্মান আর কেয়ারিং দেখে মুগ্ধ হই। গাড়ীতে ওঠে তরুণ ছড়াকার মুয়াজ বিন এনামকে ধন্যবাদ দেবার আগেই সিএনজি চালক গাড়ি ছেড়ে দেয়।
৩. বেগম রোকেয়া বইটি যতই পড়ছিলাম ততই অনুপ্রাণিত হচ্ছিলাম। ত্যাগী হবার প্রেরণা পাচ্ছিলাম। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকের কথা বলছি। আজকের মত মুসলিম নারীরা তখন ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারত না। এমন কি সূর্য্যও তাদের স্পর্শ করতে পারতো না। পর্দার কড়াকড়ি তো ছিলই ধর্মীয় অনুশাসনও ছিল প্রচন্ড। মুসলিম সমাজে নারী জাতির শিক্ষা ছিল তখন কেবলমাত্র আমপারা, ছিপারা, কোরান শরীফ পাঠ পর্যন্তই সীমাবন্ধ। বাংলা অথবা ইংরেজী শিক্ষা ছিল তাদের জন্যে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। যদিও সামর্থবান পুরুষের বেলায় বাংলা-ইংরেজী শিক্ষা কিছুটা বৈধ ছিল। তাই সে যুগে নারী শিক্ষা বলতে কিছুই ছিল না। নারী জাতি ছিল জ্ঞানঅর্জন থেকে অনেক দূরে, অন্ধকার মনিকোঠায়।

৪. বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামের জমিদার জহিরুদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী সাবেরও এই সংস্কার থেকে মুক্ত ছিলেন না। তিনিও এই অনুশাসন নিজের মেনে চলতেন, প্রজাদেরকেও মানতে নির্দেশ দিতেন। বাংলার মুসলিম সমাজ, নারী জাতি যেখানে কট্টর শাসনে শাসিত, নারীর স্থান অন্দর মহলে। অন্দর মহলই ছিল নারীদেরই একমাত্র পৃথিবী। ঠিক সেই সময় ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহন করেন জহিরুদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী সাবের ও মোসাম্মৎ রাহাতুন্নেছা সাবেরা চৌধুরানী দ্বিতীয় কন্যা বেগম রোকেয়া। দুই ভাই ও তিন বোন মধ্যে বেগম রোকেয়া ছিলেন দ্বিতীয়। দুই ভাই লেখাপড়া করলেও বোনদের কোন সুযোগ ছিল না। ভাইয়েরা যখন পড়ার ঘরে পড়তে যেতেন, তখন অন্দর মহলে তাদের বড় বোন করিমুন্নেছার অধীর আগ্রহে ভাইদের ফিরে আসার প্রতিক্ষা করতেন। করিমুন্নেছার ইচ্ছা হয়, তিনি যদি ভাইদের সঙ্গে বসে ইংরেজী-বাংলা পড়তে পারতেন, তাহলে কতই না ভালো হতো। তার এই ইচ্ছার কথা বড় ভাই ইব্রাহীম সাবেরকে জানালেন। শিক্ষার প্রতি বোনের আগ্রহ দেখে তিনি আর না করতে পারলেন না। তাই জমিদার বাবা ঘুমানো পর বড় বোন করিমুন্নেছা বড় ভাই আবুল আসাদ ইব্রাহীম সাবের কাছে পড়তে বসতো। বাবা যখন জেনে গেলেন তার পড়ালেখার কথা তখন করিমুন্নেছা পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। তখন বেগম রোকেয়া ছোট ছিলেন। তিনি ছোট হলেও বুঝতে পেরেছিলেন বড় বোনের পড়শোনা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছেন। বড় বোনের কান্না দেখে আধো আধো ভাষায় বললেন, আমি কিন্তু পড়বো আপা। আমি তোমার মত কাঁদবো না। ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললেন করিমুন্নেছা। অবশ্যই পড়বি তুই। আমার স্বপ্ন সার্থক করবি। রাতে সবাই ঘুমানোর পর বেগম রোকেয়া বড় ভাইয়ের কাছে পড়তে বসতেন। দুচোখে ঘুম আসলোও পানি ঝাঁপটা দিয়ে ঘুমকে দূর করে তিনি পড়ায় মনোযোগ দিতেন। এভাবে তিনি বাংলা ও ইংরেজি পড়াশোনা দক্ষ হয়ে ওঠেন।

৫. মুসলিম নারী সমাজের এই কড়াকড়ি শাসন রোকেয়ার মন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। রোকেয়ার দুই ভাই তখন স্কুলের পাঠ শেষ করে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু বেগম রোকেয়ার লেখাপড়া তাতে কোন সমস্যায় হয়নি। তিনি প্রতিদিন রাতেই সবার অগোচরে নিয়মিত পড়ালেখা করতেন। ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী হিসেবে নামাজ ছিল ফরজ। তাই রাতের পড়া শেষে তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ে, তবে ঘুমাতে যেতেন। তিনি লুকিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন লাগলেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন ও স্বপ্ন দেখতে লাগলেন, নারী মুক্তি, নারী শিক্ষা আর নারী জাগরণের। বেগম রোকেয়ার পড়ালেখার কথা তার বাবা যখন জেনে গেলেন। তখন বেগম রোকেয়া বললেন, দুনিয়ার নারী জাতির দিকে তাকিয়ে দেখুন, শিক্ষায়-দীক্ষায় তারা কত উন্নত। সেদিক থেকে নারী সমাজ কত অবহেলিত। এই অবহেলা একমাত্র কারন আমাদের বন্দিনী জীবন। এ জাতিকে শিক্ষার আলো না দেখালে অদূর ভবিষ্যতে সমগ্র জাতিই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। তাই আমার স্বপ্ন মুসলিম নারী জাতির জাগরণ, তাদের মুক্তি, তাদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়া। এ স্বপ্ন আমাকে সার্থক করতেই হবে আব্বা। বেগম রোকেয়ার কথা শুনে তার বাবা বিস্ময়ে যেন হতবাক হয়ে গেলেন। মেয়ের কথা শুনে বাবা মনে মনে ভাবলেন সত্যিই তো ছেলেরা যদি শিক্ষালাভ করতে পারে তাহলে মেয়েরা কেন পারবে না। নারী শিক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু-হঠাৎ করে তো এ সত্যটা মেনে নেবে না। সমাজে যে দীর্ঘকাল থেকে একটা রীতি চলে আসছে তা রাতারাতি পাল্টানো সম্ভব না। জহিরুদ্দিন সাবের কঠিন সমস্যা পড়লেন বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন নিয়ে। অবশেষে স্থির হলো, এ সমস্যা সমাধান হলো রোকেয়ার বিয়ে। তাতে সমাজের মানুষের কাছ থেকে তাদেরকে কোন কথা শুনতে হবে না।

গড়নের সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারিনী এবং জমিদারের কন্য। রোকেয়ার বিয়ে ব্যবস্থা চলছে এ খবর চলে যায় বড় দুই ভাই ইব্রাহীম সাবের ও খলিল সাবেরের কাছে। তারা আতংকিত হয়ে পড়লেন বিয়ের কথা শুনে। তাহলে কি ছোট বোনের ইচ্ছা পূরন হবে না। তারা ভাবলেন রোকেয়াকে এমন পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। যেন স্বমীর ঘরেও তার স্বপ্ন, ইচ্ছা ও শিক্ষার পূর্ণ মর্যাদা পায়। সর্বগুনে গুনাম্বিত বেগম রোকেয়ার জন্য পাত্রের অভাব হলো না। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে লাগলো আবার পালিয়েও যেতে লাগলো। কারণ বাংলা-ইংরেজী জানা মেয়ের সাথে কোন মুসলিম পাত্র বিয়ে হতে পারে না। মুসলমান হয়েও যে মেয়ে শরিয়ত মানে না, তাকে কিছুতেই সংসারে ঠাঁই দেয়া চলে না। এই অজুহাতেই পাত্র পক্ষ একে একে সবাই কেটে পড়লো।

৭. অবশেষে অবাঙ্গালী এক পাত্র, বয়স চল্লিশ, খান বাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন বি-এ, এম, আর,এ,সি সাথে বিয়ে ঠিক হয়। তিনি উড়িষ্যার কনিকা ষ্টেটের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ম্যানেজার। ভাগলপুরে থাকেন। উচ্চ শিক্ষিত এবং বিনয়ী ব্যক্তি। ভদ্রলোক বিপতœীক, মৃত স্ত্রীর একটি কন্যা সন্তানও আছে। সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন বিহারের এক দরিদ্র সৈয়দ পরিবারের সন্তান। শৈশব থেকেই তার স্বপ্ন তিনি উচ্চ শিক্ষিত হবেন। তাই দারিদ্রতার কারণে তাঁকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হয়েছিল। অর্থাভাবে কলেজ জীবনে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হবার উপক্রম হয়। কিন্তু তিনি হতাশ হননি। কলেজে পড়তেই তিনি বিহার ছেড়ে বাংলায় চলে আসেন। কারন পাটনার কলেজের বেতন ছিল মাসিক ছয় টাকা। কিন্তু হুগলী কলেজের বেতন ছিল মাত্র এক টাকা। অর্থাভাবে তিনি এসে হুগলী কলেজে ভর্তি হন এবং মনযোগ সহকারে লেখাপড়া করতে থাকেন। এই খান বাহাদুর সাখাওয়াৎ হোসেনের সাথেই রোকয়ার বিয়ে ঠিক হয়। কারণ, তিনি শিক্ষিত মানুষ, রোকেয়ার শিক্ষা- সাধনার কদর দিতে বুঝবেন। ১৮৯৮ সালে সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয়। স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেন বেগম রোকেয়ার শিক্ষাপ্রীতিতে অত্যন্ত খুশী হলেন।
৮.বিয়ের পর সব মেয়েকেই তাঁর স্বামীর বাড়ী যেতে হয়। তাই বেগম রোকেয়াকেও যেতে হলো তার স্বামীঘরে ভাগলপুরে। ভাগলপুরে এসে প্রথম প্রথম খুবই অসুবিধা বোধ করতে লাগলেন বেগম রোকেয়া। কারণ এখানে কেউ বাংলা বলে না। উর্দুই এখানকার ভাষা। চাল-চলন, রীতি-নীতিতেও যতেষ্ট পার্থক্য। নতুন পরিবেশের সাথে বেগম রোকেয়ার কিছুদিন সময় লাগলো। পরে অবশ্য তিনি অত্যন্ত সহজ হয়ে উঠলেন। স্বামীর প্রথম পক্ষে মেয়েটিকে তিনি আদর যতœ আর ভালোবাসা দিয়ে বড় করতে লাগলেন। সৎমা সম্পর্কে মানুষের যে ধারণা ছিল, রোকেয়ার ¯েœহ-ভালোবাসা দেখে সে ধারণা মানুষের ভুল ভেঙ্গে গেল। স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেন বেগম রোকেয়ার সবসময় সুখ-দুঃখের খোঁজ নিতেন। বয়সে অনেক ব্যবধানের হলেও সৈয়দ সাখাওয়াৎ ছিলেন বন্ধুর মত।

৯. বেগম রোকেয়া অনেক আগে থেকেই তাঁর মনের কথা, উচ্ছাসের কথা কাগজের বুকে লিখে রাখতেন। অনেকেই একে সাহিত্য চর্চা বলতেন। কিন্তু বেগম রোকেয়া তাঁর এই লেখাকে সাহিত্য বলে মনে করতেন না। তিনি তাঁর মনের কথাগুলোই লেখার অক্ষরে সাজিয়ে রাখতেন মাত্র। স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেন বেগম রোকেয়ার এই লেখার অভ্যাসের খুবই প্রশংসা করলেন। যখন যা মনে আসে তাই লিখবে। গল্প লিখবে, কবিতা লিখবে। স্বামীর উৎসাহ পেয়ে তিনি নিয়মিত লিখতে লাগলেন। সমাজ জীবনে যে সব সমস্যাগুলো চোখে পড়ে সেগুলোকেই অন্তস্পর্শী করে লেখাটাই সাহিত্য। বেগম রোকেয়া সেই থেকে নিয়মিত লিখতে লাগলেন। পুরনো লেখাগুলো নিজেই আবার পড়ে পড়ে সংশোধন করতে লাগলেন। একদিন সাখাওয়াৎ হোসেন বললেন, – এত যে লেখ, কই কখনও তো কোন পত্রিকায় তোমার লেখা দেখি না। পত্র-পত্রিকায় পাঠাও না কেন? বেগম রোকেয়া জবাব দেন, স্কুলগত কোন শিক্ষা নেই আমার। আমি আবার কি লিখবো। যা মনে আসে তাই লিখি! এসব কি ছাপতে দেবার মত! সাখাওয়াৎ হোসেন বললেন, তোমার মনের অভিব্যক্তি যা, তাই তো তুমি লিখে থাক। সেই লেখাই তো তোমার সাহিত্য চর্চা। আমার বিশ্বাস, তোমার লেখা অবশ্যই পত্র-পত্রিকার সম্পাদকেরা মনোনীত করবেন। আমি চাই তোমার মনের ইচ্ছা, লেখার মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে তুলে ধর! আমার মন বলছে, লেখা ও কর্মের ভিতর দিয়ে তুমি একদিন মুসলিম নারী সমাজে একটা স্বতন্ত্র আসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন নিজেও উপলব্ধি করতেন মুসলিম নারী জাতির দু:খ দুর্দশা। তিনি স্বদেশে ও বিদেশে বিভিন্ন জাতির মেয়েদের সাথে মুসলিম মেয়েদের তুলনা করে বুঝেছেন, নারী জাতির শিক্ষা ব্যতীত সমাজ জীবন অম্পূর্ণ। মুসলিম জাতিকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে তাদের অবশ্যই শিক্ষিত হতে হবে। সেজন্যে কেবল উপযুক্ত বয়সে পুরুষদেরই শিক্ষিত হলে চলবে না। মায়ের দুধের সঙ্গে শিশুর মধ্যে শিক্ষার বীজ বপণ করতে হবে। ১৮.৭.১৮
১০. স্বামীর উৎসাহে বেগম রোকেয়া তাঁর অভিব্যক্তি লিখে পত্র-পত্রিকায় পাঠাতে শুরু করলেন। স্বামীর কথাই সত্য হলো। ১৯০৩ সালে (১৩১০-মাঘ) ‘নবনূর’ নামের বাংলা পত্রিকায় প্রথম মুদ্রিত রচনা ‘নিরীহ বাঙালী’ নামের একটি প্রবন্ধ প্রকাশ পেল। লেখিকা হিসাবে নাম প্রকাশ হলো- মিসেস আর, এস, হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। বেগম রোকেয়ার প্রথম রচনাটিই পাঠক সমাজে দারুণ ভাবে সমাদূত হলো। বেগম রোকেয়া এই প্রথম লেখিকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেন। মাসিক ‘নবনূর’ পত্রিকাটি ১৯০৩ সালে ১৫ই মে সৈয়দ এমদাদ আলীর সম্পাদনায় মুসলিমদের নিজস্ব পত্রিকা হিসাবে প্রকাশ পায়। সম্পাদক তাঁর এই পত্রিকায় মুসলিম রমনীদেরও সাহিত্য ক্ষেত্রে এগিয়ে আসবার আহ্বান জানান। এই পত্রিকার ১ম বর্ষেও দশম সংখ্যায় বেগম রোকেয়ার ‘নিরীহ বাঙালী’ প্রবন্ধ প্রকাশ পায়। ‘নবনূর’ পত্রিকায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পর পাঠক সমাজে লেখিকা হিসাবে মিসেস আর, এস, হোসেনের খুব নাম হলো। পত্রিকা অফিসে বহু প্রশংসা পত্র আসতে লাগলো। ফলে ‘নবনূর’ পত্রিকায় লেখিকা হিসেবে বেগম রোকেয়ার একটা স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। তিনি নিয়মিত লিখতে লাগলেন।

১১. নারী শিক্ষা জন্যে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন বেগম রোকেয়ার বহু দিনের। তার স্বামী সে কথা জানেন। তিনিও উপলদ্ধি করেন একটি গার্লস স্কুলের প্রয়োজন। কিন্তু মুসলিম সমাজে মুসলিম মেয়েদের জন্যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা সে যুগে নিতান্ত সহজ ব্যাপার ছিল না। তাই সময়ের প্রতিক্ষা করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে বেগম রোকেয়া পর পর দুটি কন্যা সন্তানের জননী হলেন। কিন্তু তারা অল্প বয়সেই মারা যাওয়ায় বেগম রোকেয়া নিসন্তানই রয়ে গেলেন। এই দুই কন্যা সন্তানের পর তাঁর কোন সন্তান হলো না। সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের আগের স্ত্রী কন্যা বড় হয়েছে। একটি সৎ পাত্র দেখে তাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। নি:সঙ্গ সংসারে ছোট বোন হোমায়রাকে নিজের কাছে এনে রাখলেন বেগম রোকেয়া।

১২.
ছোট সংসারে কাজ সেরে যে সময় পাওয়া যেত, সেই সময় বেগম রোকেয়া তাঁর স্বপ্ন সাধনার কাজে লাগাতে, নারী সমাজের উন্নয়ন জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রনয়ন এবং প্রবন্ধ, কবিতা রচনা করতে লাগলেন। ভাগলপুরে বাঙ্গালী নারীর অভাবে তিনি উর্দু ভাষিনী নারীদের নিয়েই কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া মনস্থ করলেন। তিনি নারী জাতির প্রগতি নিয়ে পরিচিতা মহিলাদের সঙ্গে ভাবের আদান- প্রদানও করতে লাগলেন। বেগম রোকেয়ার নারী প্রগতির কথা শুনে অনেকেই তাঁকে সাধুবাদ দিলেন। প্রথমেই স্থির করলেন একটি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠার। মুসলিম বালিকাদের সেখানে পড়ানো হবে। উর্দু এবং ইংরেজী ছাড়াও সংসার জীবনের বিভিন্ন দিকের সর্বাধুনিক শিক্ষা দেয়াই হবে সে স্কুলের উদ্দেশ্য।

১৩. বেগম রোকেয়ার প্রতিটি লেখনীর মধ্যেই নারী জাতির দু:খ-দুর্দশার কথা ফুটে উঠতে লাগলো। ‘নবনূর’ ছাড়াও মহিলা পত্রিকাতেও তিনি নিয়মিত লিখতে লাগলেন। কখনও গল্প, কখনও কবিতা, তবে সব সময়ই প্রবন্ধ লিখতেন। তাঁর প্রতিটি লেখাই ছিল সজীব ও প্রাণবন্ত। বিশেষ করে প্রবন্ধগুলোতে সুচিন্তা ও যুক্তিশীলতার প্রভাব ফুটে উঠতো। একবার নবনূরে প্রকাশিত বেগম রোকেয়ার‘ আমাদের অবনতি’ নামের একটি প্রবন্ধ নিয়ে পর পর দুটি সংখ্যায় প্রতিবাদী প্রবন্ধও প্রকাশ হয়। নবনূর ছাড়াও তৎকালীন ‘কোহিনূর পত্রিকাতেও সমালোচনা প্রকাশ হয়। ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন: আমরা সমাজেরই অর্ধঅঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কি রুপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কত দূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে-একই। তাঁহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাই। শিশুর জন্য পিতা এবং মাতার উভয়েরই সমান দরকার। কি আধ্যাত্মিক জগতে, কি সাংসারিক জীবনের পথে-সর্বত্রই আমরা যাহাতে তাঁহাদের পাশাপাশি চলিতে পারি,্ আমাদের এইরূপ গুনের আবশ্যক।’ মাসিক ‘নবনূর ভাদ্র, ১৩১১, ২য় বর্ষ, ৫ম সংখ্যা। বেগম রোকেয়াকে নানাভাবে উপদেশ দিতেন সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন। তাকে স্মরন করে দিতেন যে-মানুষের প্রতিটি সৎ কার্যে আল্লাহতায়ালা সহায় থাকেন। নিরলস ভাবে কাজ করে যাও, সুফল একদিন পাবেই পাবে। বেগম রোকেয়ার স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্যে সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের চাকুরি জীবনে যে অর্থ জমিয়েছিলেন, সে অর্থ থেকে দশ হাজার টাকা বেগম রোকেয়াকে দিলেন তাঁর স্বপ্নের একটি স্কুলর প্রতিষ্ঠার জন্যে। শূন্য হাতে এককালীন দশ হাজার টাকা পেয়ে বেগম রোকেয়া যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। স্বামীর এই অর্থ সাহায্য পেয়ে তিনি যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভেঙ্গে পড়তে লাগলেন। ডাক্তারী পরিক্ষায় বহুমূত্র রোগ ধরা পড়লো। শরীর দ্রুত জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে যেতে লাগলো। স্বামীর চিকিৎসার জন্য বেগম রোকেয়া তাকে কলকাতায় নিয়ে গেলেন। কলকাতায় সুচিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সব কিছু উপেক্ষা করে সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন ১৯০৯ সালের ৩রা মে পরলোক গমন করেন।

১৪.আঠাশ বছর বয়সে বিধবা হলেন বেগম রোকেয়া। স্বামীর আকষ্মিক মৃত্যুতে বেগম রোকেয়ার মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাত হলো। তাঁর নি:সন্তান জীবনে একটা বড় সান্তনা ছিলেন স্বামী, আজ তাও আর রইলো না। তিনি একটা সজীব বিষাদ মূর্তিতে পরিণত হলেন। শোকে শোকে আরো কিছুদিন কাটলো। কিছুটা মানসিক স্থিরতা এলো বেগম রোকেয়ার মধ্যে। তিনি স্থির করলেন, স্বামীর দেয়া সাহায্যেই তাঁর স্মৃতিকে রক্ষা করে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তার স্বপ্ন এবং স্বামীর স্মৃতিকে সার্থক করে তুলবেন। এই মনস্থির করেই তিনি সেই কট্টর সমাজ ব্যবস্থাতার মধ্যেই কেবলমাত্র মুসলিম মেয়েদের জন্যে একটি নামে মাত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বসলেন। স্বামীর মৃত্যু পাঁচ মাস পর উর্দুভাষী বিহারের ভাগলপুরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন, ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। বেগম রোকেয়ার এই দু:সাহসিক প্রতিষ্ঠার কট্টর সমাজ বিরূপ সমালোচনা শুরু করলো। যে সমাজে নারীর একমাত্র স্থান পর্দার অন্তরালে, সেই সমাজের মেয়েরা যদি স্কুলে গিয়ে বসে, তাহলে আর বেপর্দা বাকী রইলো কি? কিন্তু এসব তীব্র সমালোচনার মুখেও বেগম রোকেয়া নির্বিকার ভাবে মুসলিম পরিবারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ছাত্রীর সন্ধান করতে লাগলেন। কারন মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে তো একটা স্কুল চলতে পারে না। যদিও এই স্কুলের তিনিই প্রতিষ্ঠাত্রী এবং শিক্ষার্থী। রোকেয়ার এই আবেদনে সন্তোষজনক সাড়া এলো না। কারণ মুসলিম পরিবারই তাদের কন্যাকে ধর্মীয় নিষেদ উপেক্ষা করে স্কুলে পাঠাতে রাজী নন। কিন্তু এতেই দমে যাবার পাত্রী রোকেয়া নন। তিনি চান নারী জাতির জাগরণ। অবরোধ বাসিনীদের মুক্তি। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর উপযুক্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা। নারী প্রগতি। নারী শিক্ষা। নারী স্বাধীনতা।

১৫. এমনই সময় বেগম রোকেয়ার জীবনে আর একটা ঘূর্ণিঝড় এলো। সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের মৃত্যু সংবাদ শুনে বেগম রোকেয়ার সৎ মেয়েটি তাঁর জামাতা নিয়ে এসে হাজির ভাগলপুর। দীর্ঘদিন পর মেয়ে-জামাতাকে পেয়ে আত্মহারা হয়ে উঠলেন বেগম রোকেয়া। কিন্তু পরে জানতে পারলেন মেয়ে এবং জামাই এসেছে পিতৃসম্পত্তির দখল নিতে। তারা স্থানীয় কিছু লোকের সহায়তায় নানা রকম গোলযোগ শুরু করলো। সর্বক্ষণ মেয়েটা তার সাথে দুর্ব্যবহার করতে লাগলো। বেগম রোকেয়া নীরবে সবকিছু সহ্য করেও স্বামীর স্মৃতিটুকু আঁকড়ে থাকতে চাইলেণ। কিন্তু শেষে প্রকাশ্যে অপমান-অপদস্ত হবার আশংকা দেখে তিনি সব কিছু ফেলে রেখে তাঁর ছোট বোন হোমায়রাকে নিয়ে কোন মতে ভাগলপুরের স্বামীগৃহ থেকে বেরিয়ে এলেন ১৯১০ সালের শেষ দিকে।

১৬. কলকাথায় এসে বেগম রোকেয়া আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখলেন, নতুন করে পরিকল্পনা করলেন স্বামীর স্মৃতিটুকু বাঁচিয়ে রাখতে, তাঁর আজীবনের সংকল্পকে বাস্তবে রূপ দিতে। আবার তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁর পরিকল্পনার কথা শুনে অনেকে সাধুবাদ দিলেন, অনেকে সমালোচনা করলেন, অনেকে ধর্মীয় অনুশাসনের ভয়ও দেখালেন। এক এক বাড়িতে একবারের জায়গা দশবার করে যেতে লাগলেন। তাঁদেরকে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং উপকারিতার কথা বুঝাতে লাগলেন। তার কথা শুনে অনেকেই খুশি হলেন বটে, কিন্তু মেয়ে ভেবে দেখি, পরে বলবো, পর্দার বাইরে গিয়ে লেখাপড়া তা কি করে সম্ভব’ ইত্যাদি বলে এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু তবুও তার চেষ্টার অন্ত নেই। অবশেষে মাত্র আট জন ছাত্রী নিয়ে উর্দুমাধ্যম স্কুল করার ইচ্ছা করলেন এবং ঘর খুঁজতে লাগলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই একটি ঘর পেয়ে গেলেন ১৩ নং ওয়ালি উল্লাহ লেনে। সেই ছোট্ট একটা ঘরে মাত্র দু’খানা বেঞ্চ পেতে ১৯১১ সালের ১৬ই মার্চ তিনি আবার ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে নিজেই শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। অল্পদিনের মধ্যে ছাত্রীদের লেখাপড়ায় দ্রুত উন্নতি করতে লাগলো। তখনকার দিনে মুসিলম মেয়েদের পর্দার বাইরে এসে স্কুল বসানো ছিল একটা ছোটখাটো যুদ্ধ জয়েরই তুল্য। বেগম রোকেয়া সেই যুদ্ধে বিজয়িনী হলেন দেখে অনেকেই ছাত্রী দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। দু’একজন করে ছাত্রী বাড়তে লাগলো। বাড়তে বাড়তে ১৯১৩ সালে ছাত্রী সংখ্যা হলো ত্রিশ।

১৭. ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধির কারনে স্কুলের স্থান পরিবর্তন করে নিয়ে গেলেন ইউরোপীয়ান এসাইলাম লেনে। এসময় অনেকে বুঝতে পারলেন, সত্যিই মুসলিম নারীদেরও শিক্ষার প্রয়োজন আছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চললে তারা পিছিয়ে পড়বে, ক্রমে ক্রমে তারা একটা অশিক্ষিত- অবহেলিত জাতি হিসেবে গণ্য হবে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বেগম রোকেয়ার এই অসাধ্য সাধনকে কেন্দ্র করে বহু প্রশংসা প্রকাশ হলো। সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের কার্যবিরনী ছাপা হয়ে মুসলিম জনগনকে উৎসাহিত করলো। বেগম রোকেয়ার এই মহতী প্রচেষ্টায় বিভিন্ন দিক থেকে উপদেশ, প্রশংসা ও আর্থিক সাহায্য আসতে লাগলো। সে সময় যে সব সহৃদয় ব্যক্তি আন্তুরিক সাহায্য-সহানুভুতি দিয়ে স্কুলিটির উন্নয়নে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন-নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, বিহারের স্যার আলী ইমাম ও হাসান ইমাম, বিচারপতি সৈয়দ আমীর আলী, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, নবাব বদরুদ্দীন হায়দার, নবাব সামসুল হুদা, ভূপালের মহামান্যা বেগম সুলতানা জাহান, রেঙ্গুনের আব্দুল করিম জামাল, মাওলানা মোহাম্মদ আলী বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। ১৯১৫ সালে এই স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা দাঁড়ালো পঁচাশীতে। ইউরোপীয়ান এসাইলাম লেনের বাড়ীতে আর ছাত্রীর স্থান সংকুলান হয় না। আবার অন্য কোথাও নতুন বাড়ীর সন্ধান চলতে লাগলো। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার বাড়ী পাওয়া গেল লোয়ার সার্কুলার রোডে। বেশ বড়সড় বাড়ী। অনেক ছাত্রী ধরবে। তাই আবার সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের স্থান পরিবর্তন করে স্থায়ী ভাবে নিয়ে আসা হলো ৮৬/ এ, লোয়ার সার্কুলার রোডে। বেগম রোকেয়া তাঁর স্কুলের শিক্ষায়িত্রীদের একত্রিত করে আন্তরিকতার সাথে স্কুলের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দিলেন। তিনি তাঁদের বললেন, আমার র্দীঘদিনের ইচ্ছা ছিল, মেয়েদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, যেন তারা ভবিষ্যৎ জীবনে আদর্শ গৃহিনী, আদর্শ জননী এবং আদর্শ নারী রূপে সমাজে পরিচিত হতে পারে। তাই শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয়, প্রতিটি ছাত্রীকে দেশ ও জাতির সেবা এবং পরোপকার ব্রতে উদ্বুদ্ধ করে তোলাও আমার স্কুলের অন্যতম উদ্দেশ্য।
১৮. স্বামীর মৃত্যুর পর কলকাতায় এসে বেগম রোকেয়া কর্মজীবনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রতিটি মুহুর্ত তিনি স্কুলের জন্যে কাজ করতে লাগলেন। সাহিত্য জীবনে তার মনের কথাগুলোকে কাগজে পাতায় লিখতে লাগলেন। তিনি একজন প্রখ্যাত মুসলিম লেখিকা হিসেবে পরিচিতা হলেন। পত্র-পত্রিকায় রচনা প্রকাশ ছাড়াও স্বামীর জীবিত কালে বেগম রোকেয়ার দুটি গ্রন্থ মুদ্রিত হয়েছিল। প্রথমটি মুদ্রিত হয় ১৯০৫ সালে নাম- মতিচুর। (১ম খন্ড) লেখিকা- সিসেস আর, এস, হোসেন। ১০১ পৃষ্টার বই। মূল্য- পাঁচ সিকি। মুতিচুর গ্রন্থটি লেখিকার প্রবন্ধ গুচ্ছ। প্রবন্ধগুলো তৎকালীন মাসিক নবনূরে প্রকাশিত হয়ে পাঠক সমাজে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। এই গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধের ভাষা সরল ও প্রাঞ্জল। রচনা ভঙ্গীও অতি মনোরম। প্রতিটি প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া তাঁর অন্তরের বক্তব্য সহজ ভাবে পেশ করেছেন। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থটি মুদ্রিত হয় ১৯০৮ সালে। গ্রন্থটি ইংরেজী ভাষায় লিখিত। নাম ঝঁষঃধহধ’ং উৎবধস(সুলতানার স্বপ্ন)। নকশাধর্মী এ গ্রন্থটিরও লেখিকা হিসেবে মিসেস আর,এস, হোসেন নাম ছাপা হয়েছিল। মাত্র ৩৮ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ছিল চার আনা। পরে অবশ্য লেখিকা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নাম দিয়ে বাংলা অনুবাদও করেছিলেন। এবার তিনি একটি মুসলিম নারী সমিতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করতে লাগলেন। এ বিষয়ে পরিচিতা এবং উৎসাহী মহিলাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করলেন। সমিতির কাঠামো খাড়া হয়ে গেল। পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ১৯১৬ সালে তিনি ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ বা মুসলিম মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সমিতির উদ্দেশ্য, মুসলিম নারী জাতির সার্বিক কল্যাণ, নারী জাতির মুক্তি, নারী জাতির জাগরণ, পুরুষ শাসিত সমাজে নারী জাতির যোগ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা। এই সমিতি নারী কল্যাণের জন্যে একটা আলাদা ফান্ড তৈরী করে বিধবা ও দুস্থ মহিলাদের আর্থিক সাহায্য দিতে লাগলো। বিবাহযোগ্য মুসলিম কুমারীদের উপযুক্ত পাত্রের সাথে বিয়ে দেবার সার্বিক দায়িত্বও মুসলিম মহিলা সমিতি গ্রহন করলো। অনাথ-এতিম অথবা গরীবের কন্যাদের লেখাপড়ার খরচও এই সমিতি বহন করতে থাকলো। নারী জাগরণের জন্যে বেগম রোকেয়া বিভিন্ন পত্রিকায় আবেদনমূলক রচনা প্রকাশ করতে লাগলেন। বেগম রোকেয়া ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ প্রবন্ধে লিখলেন-আপনারা কি কোনদিন আমাদের দুর্দশার বিষয় চিন্তা করে দেখেছেন? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্য জগতে আমরা কি? দাসী! পৃথিবী থেকে দাস ব্যবসা উঠে গেছে শুনতে পাই, কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়েছে কি? বেগম রোকেয়া সোচ্চার কন্ঠে সবাইকে বুঝাতে লাগলেন, মুসলমানদের যাবতীর দৈন্য-দুর্দশার একমাত্র কারণ স্ত্রী শিক্ষায় ঔদাস্য। ’বেগম রোকেয়া সবার উর্ধে¦ নারী শিক্ষাকেই প্রাধান্য দিয়ে বারংবার বলেছেন, -সম্প্রতি আমরা যে এমন নিস্তেজ, সংকীর্ণমনা ও ভীরু হয়ে পড়েছি, তা কেবলমাত্র নারী শিক্ষার অভাবেই হয়েছে।

১৯. বেগম রোকেয়া তাঁর ‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে ‘নবনূরে’ লিখেছেন, নারী ও নর উভয়ে একই বস্তুর অঙ্গ বিশেষ। যেমন একজনের দুটি হাত কিংবা কোন গরুর গাড়ীর দুটি চাকা। সুতরাং উভয়েই সমতুল্য, অর্থাৎ উভয়ে মিলে একই বস্তু হয়। তাই একটিকে ছেড়ে অপরটি সম্পূর্ন উন্নতি লাভ করতে পারবে না। এক চক্ষু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে লোকে কানা বলে।’ মাওলানা মোহম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ‘নারী ভিখারিনী’ প্রবন্ধে তিনি লিখলেন, মুসলমানেরা স্বীকার করুন বা না করুন-তাঁহারা যে অযোগ্য, ইহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। কারন, সুশিক্ষিতা-সুযোগ্য মাতার গর্ভজাত সন্তান অপেক্ষা মুসলমানের ন্যায় অশিক্ষিতা-অযোগ্য মাতার গর্ভজাত সন্তান যে নিকৃষ্ট হইবে, ইহা তো অতি স্বাভাবিক। নারী যে বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের অংশী, সে সম্বন্ধে বেগম রোকেয়া সদা জাগ্রত ছিলেন। নারী-পুরুষের সাম্য, নারী সামাজিক সাম্যের পক্ষে তিনি ছিলেন সদা সোচ্চার। বেগম রোকেয়া তাঁর সাহিত্য জীবনে শুধু প্রবন্ধ এবং গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি কবিতাও লিখেছেন প্রচুর। তাঁর সে সব কবিতা মাসিক নবনূর, মাসিক সাধনা, কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতু, মাসিক সওগাত প্রভূতি পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে।

২০. আজীবন বেগম রোকেয়া নারী জাতির কল্যানের জন্যে নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন। একদিকে তাঁর রক্তকনিকায় গড়া সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল, অন্য দিকে মহিলা সমিতি। তার উপর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার জন্যে লেখা। তিনি কখনও নিজের করণীয় কাজ অপরের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারতেন না। কষ্ট হলেও তিনি নিজে সব কাজ তদারক না করা পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বেগম রোকেয়া নারী জাতির জন্য কাজ করেছেন। র্দীঘ বিশ বছর বিভিন্ন শোক-তাপ, অত্যাচার-উপহাসের মধ্যে দিয়েও বেগম রোকেয়া এতটুকু সংকল্পচ্যুত হননি। নিজেকে সামলে নিয়ে কাজে ডুবে থাকতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কাজ করে যাও, ফল একদিন পাবেই!! বেগম রোকেয়া তখন বার্ধক্যে উপনীত। মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে মাসিক ‘সওগাত’ বের হবে। প্রথম সংখ্যার জন্য সম্পাদক লেখা চেয়ে পাঠালেন। বেগম রোকেয়া নানা কাজের মধ্যে থেকেও ‘সওগাত’ নামে একটা কবিতা লিখে পাঠিয়ে দিলেন সম্পাদকের কাছে। সঙ্গে একটি ছোট্ট চিঠিও লিখলেন- ‘আমি কবি নই। উৎসাহ দমন করতে না পেরে এটা লিখেছি। কবিতা হিসেবে হয়তো কিছুই হয়নি, তবে অভিনন্দনরূপে গ্রহন করলে খুশী হব।’ কবিতাটির শুরু ছিল-
জাগো বঙ্গবাসি।
দেখ, কে দুয়ারে
অতি ধীরে ধীরে করে করাঘাত।
ঐ শুন শুন।
কেবা তোমাদের
সুমধুর স্বরে বলে ‘সুপ্রভাত’।
এ কবিতাটি সওগাতের প্রথম সংখ্যাতেই আত্মপ্রকাশ করেছিল বাংলা ১৩২৫ সালের অগ্রহায়ন মাসে। নিজের লেখা অনুবাদ ছাড়াও মেরী করেলির লেখা উপন্যাস ‘ গঁৎফবৎ ড়ভ ফবষরপরধ’ অনুবাদ করে নাম দিয়েছিলেন ‘ডেলিশিয়াহত্যা’। ইংরেজী ছাড়াও বেগম রোকয়ো উর্দু ভাষাতেও যতেষ্ট পারদর্শিনী ছিলেন। তিনি উর্দু থেকে অনুবাদ করেছিলেন, মাসিক ‘আল-এসলাম’-এ প্রকাশিত ‘নূর ইসলাম’ প্রবন্ধ দুটি। মাসিক ‘সাওগাত’ এ প্রকাশিত ‘বেগম তরজীর সাক্ষাৎকার’ নামক প্রবন্ধটি এবং মাসিক ‘মোহাম্মদী’-তে প্রকাশিত তাঁর বিতর্কিত তির্ষক প্রবন্ধ সমূহ, যা ‘অবরোধ- বাসিনী’ নামে প্রকাশ হয়েছে তার কয়েকটি। তিনি উর্দু লেখক শরফুদ্দীন আহম্মদ আজিমাবাদী ও মৌলবী নজির আহমদ খাঁর রচনাই বেশী অনুবাদ করতেন। কারণ, তাঁদের প্রবন্ধগুলির মধ্যে তিনি সমাজের প্রতি কটাক্ষের ইঙ্গিত পেতেন।

২১. বেগম রোকেয়ার জীবনের বিপুল কর্মপ্রয়াস আর সাহিত্য সাধনা বলতে গেলে পরস্পরের পরিপূরক ছিলো। সাহিত্যের মধ্য দিয়া তিনি ভবিষ্যৎ নারী জাতির শক্তি ও স্বাধীনতার যে গৌরবোজ্জ্বল স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা লক্ষ্য করা যায় তাঁর কর্মজীবনে। বেগম রোকেয়াকে যারা দেখেছিলেন তারাই বলতে পারবেন – মুসলমান মেয়েরা সুশিক্ষা লাভ করবেন, এই অভিলাষই ছিল তাঁর সকল কর্মপ্রচেষ্টার কথা। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তাঁর আশা-আকাঙ্খা ও লক্ষ্য ছিল অনেক বেশী উচ্চ, তাঁর নারীত্বের আদর্শ ছিল তার অপেক্ষা কত বেশী মহান, নারীশক্তিতে তাঁর বিশ্বাস ছিল কত পর্বত প্রমাণ-তাঁর সাহিত্যের সঙ্গে যাঁর ঘনিষ্ট পরিচয় আছে, শুধু তিনিই একথা জানেন।
বেগম রোকেয়াকে চিনবার একমাত্র উপায় তাঁর সাহিত্য। তার কর্মপ্রচেষ্টা উৎসের সন্ধান পেতে হলে ফিরে যেতে হবে তার সাহিত্যের দিকে। শুধু আজকে নয়, দীর্ঘকাল পরেও মানুষ সাহিত্যের ভিতরেই তাঁর সত্যিকার পরিচয় খুঁজে পাবে।
স্বাধীন, শিক্ষিত এবং আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন নারী সৃষ্টির জন্যে যে শিক্ষা ও কর্মসূচির পরিকল্পনা বেগম রোকেয়া সৃষ্টি করেছেন, তা সর্বতোভাবেই উদার এবং কল্যাণমুখী। রোকেয়া মনে করতেন, সব বিদ্যাতেই মহিলাদের সমান অধিকার। প্রকৃতপক্ষে, নারীকে সববিদ্যায় পারদর্শী করে সুমার্জিত এবং পূর্ণবিকশিত একটি ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করাই ছিল তার বাসনা।

২২. শেষ বয়সে বেগম রোকেয়ার শরীর ভেঙ্গে পড়লোও মনের দিক থেকে ভেঙ্গে পড়লেন না তিনি। একই ভাবে পরিশ্রম করে যেতে লাগলেন। সেই ফজরের আজানের আগে উঠে মধ্য রাত পর্যন্ত তিনি কাজ করতেন। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ভোরে নামাজ পড়ার জন্য বিছানা ছেড়ে যখন উঠলেন। অজু শেষ হবার আগেই তার বুকের ব্যথাটা বেড়ে গেলো। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই বেগম রোকেয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বেগম রোকেয়া কর্মজীবনে যেমন ছিলেন একজন নিরলস ও নিঃস্বার্থ নারী-সমাজ সেবিকা, তেমনি সাহিত্য জীবনেও তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা লেখিকা। অবরোধ থেকে বেরিয়ে এসে একজন মুসলিম নারী হয়ে যে দুঃসাহসিক পরিচয় তিনি দিয়েছেন, তা সত্যিই জাতির ইতিহাসে প্রশংসনীয়। আজকের যুগে মুসলিম রমনীরা অবরোধের বেড়া ডিঙ্গিয়ে যতটা পথ অগ্রসর হয়েছেন, তার মুলে রয়েছে বেগম রোকেয়ার ভালোবাসা, পরিশ্রম, একনিষ্ঠ সাধনা। বেগম রোকেয়া আজীবনই নারীর মুক্তি আর জাগরণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন। তাই এদেশের মুসলিম নারী জাগরণের প্রথম পথ প্রদর্শিকা হিসেবে বেগম রোকেয়ার নামই চির অম্লান হয়ে থাকবে।
সূত্র –
১.রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
জীবন ও সাহিত্যকর্ম-লেখক মুহম্মদ শামসুল আলম
২. ছোটদের বেগম রোকেয়া।

আরও পড়ুন