নবীজির জীবনে ঈদুল ফিতর ও এতিম লালন-পালন

প্রকাশিত : ২০ মে, ২০২০     আপডেট : ২ সপ্তাহ আগে  
  

শেখ আব্দুর রশিদ  ঈদ শব্দটি আরবি।  এর অর্থ খুশি, আনন্দ।  এই খুশি বা আনন্দ কি জন্য? গুনাহ, পাপ বা ভুল থেকে মুক্তির ও পরিত্রাণের।  মহানবী (সা.) ঈদের দিনে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সবচেয়ে উত্তম পোশাকটি পরতেন।  সাহাবায়ে কেরামের সময়ে ঈদের দিন তারা শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন, “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ও্য়া মিনকা” অর্থাৎ মহান আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ভালো কাজগুলো কবুল করুন।  আজকের সময়ে এসে ঈদের মূল চেতনা থেকে আমরা সরে এসেছি কিনা তা দেখার বিষয়।  দ্বিতীয় হিজরি থেকে মুসলমানরা ঈদুল ফিতর পালন করে আসছেন।  নবীজি বা সাহাবায়ে কেরামের সময়ে ঈদে আনন্দ করতেন কিন্তু এত কেনা-কাটার ধুম ছিল না।  দ্বিতীয়ত সবাইকে নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতেন।  সবাইকে নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করা প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) এর জীবনের একটি ঘটনাঃ

ঈদের দিন।  মদীনার ঘরে ঘরে আনন্দ উল্লাস।  নবীজি (সা.) বাড়ি ফিরছিলেন।  দেখলেন, জীর্ণ মলিন পোশাকে এক শীর্ণকায় বালক মাঠের এক প্রান্তে বসে নীরবে কাঁদছে। নবীজি (সা.) ধীরে বালকের কাছে গিয়ে তার হাত ধরে কোমল কণ্ঠে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞাসা করলেন, কাঁদছ কেন বাছা? বালক ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে লাগল, যুদ্ধে আমার বাবা শহীদ হয়েছেন, মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়েছে।  বিষয়-আশয় অন্য লোক কেড়ে নিয়েছে।  মায়ের সাথে গিয়েছিলাম কিন্তু বৈ-পিতা তাড়িয়ে দিয়েছে।  অন্য বালকেরা কত সুন্দর আনন্দ করছে কিন্তু আমার না আছে থাকার জায়গা, না আছে পোশাক, না আছে ক্ষুধা মেটানোর খাদ্য।

শুনে নবীজি (সা.) এর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।  তিনি বললেন, আমার মাতা-পিতাও তো আমার বাল্যকালে মারা গিয়েছেন।  এবার বালক মুখ তুলে নবীজির দিকে তাকাল এবং তাকে চিনতে পেরে অপ্রস্তুত হলো।  নবীজি (সা.) স্নিগ্ধকণ্ঠে বললেন, যদি আমি তোমার পিতা হই, আয়েশা তোমার মাতা হন, ফাতেমা তোমার বোন হয়, তবে তুমি সুখী হবে? বালক মাথা নেড়ে জানাল যে, সে খুশি হবে।  মহানবী (সা.) বালকের হাত ধরে তাকে বাড়ি নিয়ে গেলেন এবং বিবি আয়েশাকে ডেকে বললেন, এই নাও! তোমার জন্যে একটি ছেলে এনেছি। আয়েশা (রা.) নিজ হাতে বালককে গোসল করিয়ে পরম তৃপ্তির সাথে তার আহার ও সুন্দর পোশাকের ব্যবস্থা করলেন।

নবীজি (সা.) এর জীবনকাল পর্যন্ত এই বালক তার পরিবারভূক্ত ছিল।  নবীজির মহাপ্রয়াণের দিন এই বালক রাস্তায় বিলাপ ও আর্তনাদ করতে লাগল।  তখন আবু বকর (রা.) তার হাত ধরে নিজ গৃহে নিয়ে নিজ পরিবারের অন্তর্ভূক্ত করে নিলেন।  অর্থাৎ সেই এতিমের দায়িত্ব নিলেন।  ধারা পরম্পরায় এই দায়িত্ব এখন আমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে।

সবাইকে নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করা বলতে নবীজি (সা.) বুঝিয়েছেন যে সমাজের সকল স্থরের মানুষকে সাথে নিয়ে, এর মধ্যে এতিমদের ব্যাপারে নবীজি (সা.) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।  নবীজি (সা.) বলেছেন, যে এতিমের দায়িত্ব নেবে জান্নাতে সে আমার পাশে থাকবে। দুই আঙুল পাশাপাশি তুলে ধরে দেখিয়ে বলেছিলেন কথাটি।  বোখারী শরীফের হাদীস হচ্ছে, এতিমের কল্যাণে কর্মরত ব্যক্তির মর্যাদা আল্লাহর পথে জেহাদকারীর মর্যাদার সমান।  ঈদের চেতনা থেকে দূরে থেকে ঈদ আনন্দ আমাদের কতটা পরিতৃপ্তি দেবে? পবিত্র কোরআনের সূরা মাউন এর ১-৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন “(হে নবী!) তুমি কি কখনো চিন্তা করেছ, কোন ধরনের লোকেরা কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে? এ ধরনের লোকেরা এতিমের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে, অভাবগ্রস্থকে অন্নদানে কোন আগ্রহ বোধ করে না বা অন্যকে ও উৎসাহিত করে না।  এছাড়াও সূরা দোহা, বাকারা, নিসা, বালাদ এবং সূরা বনি ইসরাইলে বর্ণিত এসব আয়াতে বিশদভাবে এতিমদের কথা এবং তাদের অধিকারগুলোর বিবরণ রয়েছে।  আল্লাহ এবং রসুলের প্রতি বিশ্বাস শুধু মুখে নয় বাস্তবে নবীজির জীবনের আচরণের সাথে নিজের আচরণের মিল রেখে চলাই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের  প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস।  অর্থাৎ একটা রাষ্ট্রের যে অংশেই বঞ্চিত এতিম থাকুক তার দায় একজন মুসলমানের থেকে যায়।  কারণ এতিমের লালন একজন মুসলমানের উপর ফরজ দায়িত্ব।  নবীজি (সা.)  এতিমকে নিজের পরিবারের সদস্যভূক্ত করে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে তাকে লালন করেছেন।

এতিম লালনে আল্লাহর নির্দেশ এবং নবীজির বাস্তব জীবনে দেখানো পথ অনুসরণ করাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবার ব্যবস্থায় হয়েছে পরিবর্তন।  এখনকার যুগে নিজের পরিবারে একজন বাড়তি মানুষ যুক্ত করে সঠিকভাবে পরিচর্যা বা সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ অনেকের নেই।  এজন্যে প্রয়োজন এতিম লালনে সঙ্ঘবদ্ধ একটা প্লাটফর্ম। যেখানে একজন এতিম দক্ষ, যোগ্য ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। আর সেরকম একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে বান্দরবানের লামায়।  কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ।  যা অবহেলিত, বঞ্চিত ও অসহায় এতিম শিশুদের একটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।  ২০০১ সালে ছোট্ট একটি কুড়েঘরে সাতটি শিশু নিয়ে যার যাত্রা শুরু।  আজ সেখানে পড়ছে আড়াই হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী।  এখানে পড়াশুনা করেই আজ কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে।  এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা এস এস সি, এইচ এস সিতে পাচ্ছে গোল্ডেন এ প্লাস, ভর্তি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চুয়েট, মেডিকেল কলেজ সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।  শুধু তাই নয় ক্রীড়া নৈপূণ্যে পর পর টানা চার বছর ধরে দেশ সেরা স্কুলের মর্যাদা লাভ করে আসছে। মহান স্বাধীনতা দিবসে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে “জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশে” কুচকাওয়াজে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর ধরে ১ম হয়ে প্রমাণ করেছে সঠিক পরিচর্যা পেলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও আলোকিত মানুষ হয়ে নিজেকে বিকশিত করতে পারে।  জাতি, ধর্ম, বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে একই আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে এরা। যার উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। এতিম লালনের সার্থকতা তখনই হবে যখন সে সমাজ তথা দেশে নিজেকে মর্যাদার আসনে আসীন করে নিতে পারবে।

প্রতি বছর সারাদেশ থেকে এতিম শিশু শিক্ষার্থী নেয়া হয় স্কুলটিতে।  আর দান এবং দাতার সংখ্যা যত বাড়ছে সেখানে তত বেশী শিশু নেয়া হচ্ছে। কোয়ান্টাম স্বপ্ন দেখে একটা সময় আসবে যখন দেশের কোথাও কোন অসহায় শিশু থাকবে না।  যাদের সকলের ঠিকানা হবে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ।  লক্ষ শিশু লালনের লক্ষ্য নিয়ে ধীরে ধীরে সেখানে অবকাঠামো তৈরী হচ্ছে।  পবিত্র রমজান মাসে অনেকে ব্যস্ত থাকেন ঈদের কেনাকাটায়।  মার্কেটে ঘুরে জিনিস পত্র কিনছেন তারা।  শিশুদের জামা-কাপড়, জুতা, খেলনা ইত্যাদি আকর্ষণীয় অনেক কিছু কিনে ব্যাগ ভর্তি করে বাসায় ফিরছেন। এদের ঈদের আনন্দ প্রস্তুতি দেখে অসহায় এতিমদের মনের অবস্থা কি হতে পারে তা কি কারো খেয়াল আছে? এই এতিমরা ব্যক্ত করতে না পারলেও  তাদের মনে কিন্তু দাগ কাটছে।

সেদিক থেকে নিয়মিত নিজের উপার্জনের একটা অংশ বা ঈদের খরচাপাতি ও নিজেদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি থেকে কিছুটা অর্থ বাচিয়ে এতিম লালনের জন্য দেয়া যায়।  এক্ষেত্রে শুধু সদিচ্চাটাই যথেষ্ট।  এতিমের মাথার ওপর যার হাত থাকে, স্রষ্টার রহমত তার ওপর থাকে।  আসুন সকলে স্রষ্টার রহমতের ছায়ায় থাকি, আমিন।

 

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব ও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা সমূহ।

লেখকঃ

 

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান রাষ্ট্রবিজ্ঞান

লতিফা-শফি চৌধুরী মহিলা ডিগ্রি কলেজ

চেয়ারম্যানঃ (সিফডিয়া) সিলেট সেন্টার ফর ইনফরমেশন এন্ড ম্যাস মিডিয়া

 

আরও পড়ুন



রসময় স্কুলের পুনর্মিলনীর লোগো উন্মোচন ও নিবন্ধন উদ্বোধন

সিলেট নগরীর দাড়িয়াপাড়াস্থ প্রাচীণ বিদ্যাপীঠ...

রোটারী ক্লাব সিলেট অরেঞ্জ সিটির খাবার বিতরণ

শিশু সানজিদা, ইব্রাহিম আর সুমাইয়ারা...

চুনারুঘাটে সাদপন্থীদের ইজতেমা বন্ধের দাবীতে বিক্ষোভ

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি হবিগঞ্জে সাদপন্থীদের...