নবজাগরণের কবি ফররুখ আহমদ

প্রকাশিত : ২৬ জুন, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: ফররুখ আহমদ বাংলাসাহিত্যের নবজাগরণের কবি। তিনি অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যে ছন্দের কবি, সংগীত ঝংকারের কবি বলতে ফররুখ আহমদকেই বুঝায়। সৌন্দর্য, জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, রোমান্টিকতা, প্রেম, ভালোবাসা, অনুরাগ, উদাস জীবনের বাসনা, স্বদেশ সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রভৃতি ফুটে ওঠেছে তাঁর কবিতা ও গানে। কবিতায় ও লেখায় অন্তর্মুখীনতা লক্ষ্যণীয়, যা আজ অনেক কবির রচনায় দু®প্রাপ্য। গানের ভুবনে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল তারকা। কিন্তু নিঃশব্দ পদচারী। ফররুখ কখনও আত্মপ্রচারে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর গানে ও কবিতায় অসাধারণ মৌলিকত্ব ছিল। শিশু সাহিত্য, প্রবন্ধ, নাটক ও অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর অবাধ পদচারণা ছিল। ফররুখ আহমদ ৪০-এর দশকে বাংলা সাহিত্যে একজন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবেই আভির্ভূত হননি, তাঁকে বলা চলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে হাজার বছরের অন্যতম কবি। তাঁর মতো দীপ্ত প্রতিভা বিরল। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি ইসলামের নিগূঢ় তত্ত্বকে তার কাব্য সম্ভারে একীভূত করেছেন, নিজস্ব জীবনাচারেও আদর্শিক চেতনাকে নিবিড়ভাবে ধারণ করেছিলেন। সাত সাগরের মাঝি কাব্য তাঁর শিল্প নৈপূণ্যের এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। কবি ফররুখের কাছে সবসময় সুবিধাবাদী রাস্তা রোধ্য ছিল। তিনি বরাবরই ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপোষহীন।
কবি ফররুখ আহমদ ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানাধীন মাঝআইল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা খাঁন বাহাদুর সৈয়দ হাতেম আলী এবং মা বেগম রওশন আখতার। তিনি শৈশবেই মাতৃহারা হন। দুবছর বয়সে ফররুখের মাতৃহারা জীবন শুরু। তিন ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। মাকে হারিয়ে ছোট দুই ভাইবোন দাদির কাছে লালিত পালিত হন। দাদি শৈশবেই কাসাসুল আম্বিয়া, তাজকেরাতুল আওলিয়াহসহ অনেক ইসলামী বই-পুস্তকের কাহিনী পড়ে শোনাতেন। আর সে সময় থেকেই কবির মধ্যে ফুটে ওঠে ইসলামী ভাবধারা। ছাত্রজীবনে ফররুখ আহমদ গ্রামের পাঠশালায় অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে মডেল এমই স্কুলে ভর্তি হন। তিনি তাঁর স্কুল ও কলেজ জীবনে যে সকল গুণী শিক্ষকদের সাহচর্য পান তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা, কথা-সাহিত্যিক আবুল ফজল, কবি আবুল হাশিম, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। সাহিত্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় কবি আহসান হাবীব, কথাশিল্পী আবু রুশ্দ, কবি আবুল হোসেন, কবি সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখের সঙ্গে, সেই সাথে বন্ধু হিসেবে পেলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ফতেহ লোহানীকে। এ সময়ই বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবির গুচ্ছ-কবিতা ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় চলে যান। সেখানে কিছুদিন থাকার পর কালীগঞ্জ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১ম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএ শ্রেণিতে ভর্তি হন, কিন্তু পরীক্ষা না-দিয়েই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
কর্মজীবন : ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখ আহমদের বিয়ে হয়। তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লেখেন যা ‘সওগাত’ পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।
ফররুখ আহমদের ছেলেমেয়ে এগারো জন। তাঁরা হলেন : সৈয়দা শামারুখ বানু, সৈয়দা লালারুখ বানু, সৈয়দ আবদুল্লাহল মাহমুদ, সৈয়দ আবদুল্লাহেল মাসুদ, সৈয়দ মনজুরে এলাহি, সৈয়দা ইয়াসমিন বানু, সৈয়দ মুহম্মদ আখতারুজ্জামান, আহমদ আখতার, সৈয়দ মুহম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান, সৈয়দ মুখলিসুর রহমান, সৈয়দ খলিলুর রহমান ও সৈয়দ মুহম্মদ আবদুহু। ফররুখ আহমদের কর্মজীবন শুরু হয় কোলকাতায়। ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে এবং ১৯৪৬ সিলেটের জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন তিনি। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক ‘মোহাম্মদী’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে চাকরি করেন ঢাকা বেতারে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফররুখ আহমদ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। এখানেই প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।
সাহিত্যকর্ম গ্রন্থতালিকা :
কবি ফররুখ আহমদ কবিতা-ছড়া, গান, হামদ, নাত ইত্যাদি লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তাঁর প্রধান পরিচয় ‘কবি’। ফররুখ আহমদ সনেট রচনারও করেছেন। তাঁর রচনায় ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব দেখা যায়। এছাড়া আরবি ও ফারসি শব্দের প্রাচুর্য তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলামি ঐতিহ্যের প্রতি ছিল তার অগাধ আস্থা। তার লেখাগুলো চল্লিশের দশকে এক জরগরণ সৃষ্টি করে। বর্তমানেও সাহিত্যাঙ্গানে তিনি বহুল পঠিত কবি। তার গ্রন্থগুলো পাঠকসমাজে এখনও ব্যাপক সমাদৃত। কবির রচনা নিয়ে বর্তমান সময়ের গবেষকরা আলোচনা-সমালোচনা লিখছেন। এজন্য তার রচিত গ্রন্থসমূহ সমগ্র বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে উঠেছে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : সাত সাগরের মাঝি (ডিসেম্বর, ১৯৪৪), সিরাজাম মুনীরা (সেপ্টেম্বর, ১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (জুন, ১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (সেপ্টেম্বর, ১৯৬৩), ধোলাই কাব্য (জানুয়ারি, ১৯৬৩), হাতেম তায়ী (মে, ১৯৬৬), নতুন লেখা (১৯৬৯), কাফেলা (অগাস্ট, ১৯৮০), হাবিদা মরুর কাহিনী (সেপ্টেম্বর, ১৯৮১), সিন্দাবাদ (অক্টোবর, ১৯৮৩), দিলরুবা (ফেব্র“য়ারি, ১৯৯৪), শিশুতোষ গ্রন্থ: পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), চাঁদের আসর (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০), ফুলের জলসা (ডিসেম্বর, ১৯৮৫) ইত্যাদি।
বিশ্ব সাহিত্যে রূপক কবিতার স্রষ্টা হলেন ফার্সি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি হাফিজ, ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসী, শেখ সাদী প্রমুখ খ্যাতিমান কবিগণ। এ ছাড়া উর্দু ও ফার্সি ভাষায় এ জাতীয় কবিতা লিখেছেন কবি আল্লামা ইকবাল। উল্লেখিত কবিগণ বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে পরিচিত ও খ্যাতির শিখরে উপনীত হয়েছেন এ জাতীয় কবিতার ভেতর দিয়ে। তাদের কবিতা পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। রূপক কবিতা বলতে এমন এক ধরনের কবিতা বুঝায় সেখানে কবি তাঁর কোন বক্তব্য বা তত্ত্বকে সরাসরি প্রকাশ না-করে অন্য কোন বাহ্যিক ঘটনা, চিত্র ইত্যাদির আড়ালে রেখে সমান্তরালভাবে এর গূঢ় অর্থ প্রকাশ করে থাকেন। বাংলা সাহিত্যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদ এ জাতীয় কবিতা লিখেছেন। তবে প্রাচীন যুগের বাংলা কবিতায় কাহ্নকাদের কবিতাগুলোতে রূপকের ভাবধারা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। প্রাচীন আরবি সাহিত্যেও এই রূপকের ব্যবহার ছিল। তখনকার কবিরা বেশি বেশি রূপক ব্যবহার করতেন। আরবের প্রখ্যাত কবি ইমরুল কায়েস তার কবিতায় অসাধারণ দক্ষতায় রূপকের ব্যবহার ঘটিয়েছেন। এছাড়াও সে সময়ের আরবি কবি তুরফা, জোহায়ের, মুতানব্বী, তরীফ, লাবীব সহ অনেক কবির কবিতায় রূপক বিশাল আকারে ব্যবহৃত। কবি ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝি কাব্যগ্রন্থের ‘পাঞ্জেরী’ কবিতাটি তার লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতা। কবিতাটিতে কিছু সাধারণ প্রতীকি শব্দ ব্যবহার করে কবি তাকে অসাধারণ বক্তব্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘পাঞ্জেরী’ ফারসি ভাষার শব্দ। এ শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে জাহাজের অগ্রভাগে রক্ষিত পথনির্দেশক আলোকবর্তিকা কিংবা আলোকবর্তিকাধারী ব্যক্তি। যার মাধ্যমে নাবিকগণ সমুদ্রের দুর্গম পথ অতিক্রম করে, আলো দেখে পথ চলে। তবে কবি এখানে একজন সাধারণ চালক নয় প্রতীকী হিসেবে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী কোটি কোটি মানুষের সুযোগ্য নেতাকে বুঝিয়েছেন। সাধারণ যে ব্যাখ্যা, তাহলো বন্দরে অপেক্ষমান জাহাজের হাজার হাজার যাত্রী সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছার জন্য সমুদ্র বন্দরে অপেক্ষা করছে। সকল মানব সন্তানদের নানা বিড়ম্বনার মধ্যে সময় কাটছে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ব্যাধি-বিপদ তাদের প্রতি মুহূর্তে গ্রাস করছে। কবি এর অর্থ প্রকাশ করেছেন রূপকভাবে : এভাবে ভারতের পরাধীন কোটি কোটি মানুষ অবৈধ ইংরেজ শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষণ সহ্য করে অপেক্ষা করছে স্বাধীনতা লাভের আশায়। কিন্তু তাদের সে স্বপ্নের স্বাধীনতা সূর্য কবে উদিত হবে? সচেতন কবির মনে এমন প্রশ্নের উদয় হতেই পারে। রোমান্টিক কবি ফররুখ আহমদ স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন দেশের স্বাধীনতার, মানুষের স্বাধীনতার। নেতৃত্ব দানকারী নেতাকে, পাঞ্জেরীকে তাই বার বার তাগিদ দিচ্ছেন সচেতনতার দিকে। জিজ্ঞেস করছেন :
‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে’
ইসলামী আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য এ জাতি আজ বিপদাপন্ন। কবির বিশ্বাস, মুসলমানগণের নেতৃত্ব সচেতন হলে ইসলামের নতুন চাঁদ আর কাক্সিক্ষত পতাকা সগৌরবে উড্ডীন হবে। দেশ থেকে দূর করতে হবে বিদেশি হায়েনাদের। জাতি পাবে পুনর্বার স্বাধীনতার সুখ। কবি ফররুখ স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে নেতাকে সচেতন করার উদ্দেশে বলছেন :
‘আমাদেরই ভুলে পানির কিনারে মুসাফির দল বসি
দেখেছে সভয়ে অস্ত গিয়েছে তাদের সেতারা শমী।’
কবি নেতার ভুল ভ্রান্তির সমালোচনা করেছেন। পুনরায় নেতার ভুল নেতৃত্বের কারণে দুর্ভাগ্যের রাত যেন নেমে না আসে জনগণের জীবনে। আজ জনগণের মধ্যে আর্তনাদ আর ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না-হতাশা। আমরা জানি যে কোন বৃহৎ সংগ্রামে নেতৃবৃন্দ জাতিকে দেন নেতৃত্ব কিন্তু কর্মীবাহিনী থাকেন জনগণের পাশাপাশি, দুঃখ-কষ্টে বা মিছিলে। কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন সেই মিছিলের সৈনিক। তার কবিতায় বারবার উচ্চারিত হয়েছে মজলুম মানুষের কথা। তিনি সচক্ষে দেখেছেন ১৩৫০ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্র যা ছিল ভারতবাসী জনগণের উপর ইংরেজদের চাপিয়ে দেওয়া দুর্ভিক্ষ। লাশ কবিতায় বাস্তবভাবে তুলে ধরেছেন সে ভয়াবহ ছবি। ‘পাঞ্জেরী বা নেতার কাছে কৈফিয়ত চাচ্ছেন কবি। এ কৈফিয়ত ক্ষুধার্ত নিপীড়িত লাখো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে দিতে হবে। নেতা কোন ভুল-ভ্রান্তি করবেন বলে মেনে নেবেন না জনগণ ক্ষমা করবেন না তাকে। কবি চান পাঞ্জেরি বা নেতা কর্তৃক স্পষ্ট স্বাধীনতার আহবান।
পাঞ্জেরী!
জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রূকুটি হেরি
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি।
বাংলা সাহিত্যে মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ রোমান্টিক কবি হিসেবে পরিচিত। তাই বলে তিনি বাস্তবতার ধরাছোঁয়ার বাইরে আলাদা এক জগতে বাস করেননি। রোমান্টিক তার সাগরে অবগাহন করেও এক বাস্তব জগতের প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীকে এদেশ থেকে তাড়িয়ে এক স্বাধীন সার্বভৌম দেশ গড়ার স্বপ্ন কোন রোমান্টিক কল্পনা বিলাস নয়। প্রাবন্ধিক মোহম্মদ মাহফুজউল্লাহ লিখেছেন : ‘ফররুখ ইসলামী আদর্শ ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ আর মুসলিম রেনেসাঁর রূপকার হলেও তার রচনার শোষিত বঞ্চিত ও ক্ষুধাতুর মানুষের বেদনা মূর্ত হয়েছে।’
কবির অধিকাংশ কবিতায় দুঃখ-দুর্দশার বাস্তবচিত্র থাকলেও তার মধ্যে আছে আশার বাণী। কবি ছিলেন স্বপ্নচারী, তার স্বপ্নচারিত রোমান্টিকতা থাকলেও তাতে স্বপ্নবিলাসিতা প্রকাশ পায়নি। কবি বিশ্বাস করতেন এমন একটি সুন্দর রাষ্ট্র কায়েম হবে যেখানে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য থাকবে না। সুশৃঙ্খল ক্ষুধামুক্ত ভালোবাসাবাসির এক সুন্দর দেশের স্বপ্ন কবি দেখেছিলেন। তার ‘পাঞ্জেরী’ হলেন সেই সুন্দর দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের যোগ্য নেতা। ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘পাঞ্জেরী’তে ক্লান্তি ও জিজ্ঞাসার সুর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় ধুয়ার মতো বারবার ঘুরে আসা একটি চরণে :
‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী!’
অতল ক্লান্তির অনবদ্য পোরিক প্রতিমূর্তি এই কবিতা সম্ভবত গীতি কবিতাবলির মধ্যে ফররুখের শ্রেষ্ঠ রচনা।’ ফররুখ আহমদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তার লেখায় জাতীয় জাগরণের রূপ ফুটে উঠেছে। জাতীয় জীবনের অংশ আকাক্সক্ষা, মানবতার রূপ, আদর্শ সমাজের বাণী ফুটে উঠেছে। তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষতার নামাবলি পড়ে কবি ময়ূর পুচ্ছ পরে ময়ূর সাজতে চাননি। ঘৃণা করতেন পাশ্চাত্যের জড় মেকি সভ্যতাকে। কখনো বিচ্যুত হননি তার পথচলার আদর্শ থেকে।
মূল্যায়ন : ফররুখ আহমদ আপাদমস্তক একজন মানবতাবাদী কবি। তাঁর জীবনেও কালের বাতাস আঁচড়ে পড়েছে। বঞ্চিত মানবতার কল্যাণের জন্য তিনি মার্কসবাদ ও এম.এন. রায়ের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রাথমিকভাবে কমিউনিজমের দিকে পা বাড়ান। কিন্তু তিনি যখন বুঝতে সক্ষম হলেন যে, কমিউনিজম যে সাম্যবাদের মন্ত্র শোনাচ্ছে ইসলামের সাম্যবাদ তার চেয়ে উন্নততর; ইসলামে আত্মার যে খাদ্য আছে তা কমিউনিজমে নেই। তাছাড়া সবদিক দিয়ে নির্যাতিত ও বঞ্চিত শ্রেণিই ছিলো মুসলমান। তাদের কল্যাণের জন্য রাসুল (সা.) প্রদর্শিত মানবতাবাদই শ্রেয়। তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন যে, পরদেশি ব্রিটিশের শাসন ও শোষণ মুসলমানদেরকে পৃথক ও শত্র“জাতি বিবেচনা করে হিন্দুদের আত্মকেন্দ্রিক উচ্চাকাক্সক্ষায় জেগে ওঠা নীতির বঞ্চনা এবং হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধনিক ও স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর শোষণের কষাঘাতে মুসলিম সমাজের কণ্ঠবোধ করেছে। মুসলিম সমাজ সেই ভয়াবহ ছোবল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষিতে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী মুজাহিদদের রক্তাক্ত ময়দান, হজরত শাহসুফী আবুবকর সিদ্দিকীর তাসাউফী অন্তর, মুনসী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ও ইসমাইল হোসেন শিরাজীর প্রতিবাদীকণ্ঠ এবং মহাকবি ইকবাল ও কাজী নজরুল ইসলামের মানবতাবাদী বিদ্রোহী চেতনাকে অবলম্বন করে সামনে অগ্রসর হন। আদর্শবাদীতা, রোমান্টিসিজম এবং মেধা ও মননের প্রখরতায় নির্মিত তীক্ষè কাব্যশক্তিকে তিনি মানবতার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। দীপ্ত উচ্চারণ :
‘জীবন আমার করে যেন / দুঃস্থ জনে সমর্থন
দুঃখি এবং বৃদ্ধ জয়ীফ / যেন আমার হয় আপন।’
মানুষকে খুব আপন করে দেখতেন ফররুখ। পোশাক পরিচ্ছদ খাওয়া দাওয়া চলাফেরা এমনকি চিন্তার দিক থেকেও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম করে ফেলতেন। সকল মতাদর্শের কবি বন্ধুদের সাথেই ছিল তার সখ্যতা। সকল মানুষকেই তিনি সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন, এমনকি যথাসাধ্য সাহায্যও করতেন। কিন্তু নিজে যেমন সাহায্য নেওয়াটা পছন্দ করতেন না তেমনি নিজেকে সাহায্যকারী হিসেবে গর্বিতও মনে করতেন না। তিনি সমস্ত মানুষকে আত্মার আত্মীয় বলে মনে করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন ‘মানুষকে জন্মাতে হয় বলেই ভিন্ন ভিন্ন মায়ের পেটে জন্মে।’ কেউ কাউকে পর ভাবা ঠিক নয়। যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক তারা রক্তীয়, আর যাদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কÑআত্মার সম্পর্ক তারাই আত্মীয়, পরম আত্মীয়। তিনি সকল মানুষের সাথেই একাত্ম হয়েছিলেন বটে, কিন্তু আদর্শকে বিকিয়ে দিয়ে নয়। মাখানো ময়দার মধ্য থেকে চুলকে যেভাবে বের করা হয়, ঠিক সেভাবেই তিনি ওই সমাজ থেকে নিজের আদর্শকে পংকিলতা মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কবি নিজে ছিলেন নীতিগত দিক থেকে এক পায়ে খাড়া। বেশ বলিষ্ঠ কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন :
‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া
তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।’
স্বার্থন্ধতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। স্বভাবে, অভাবে, সুখে দুঃখে কোন সময়ই তিনি চাটুকারিতার আশ্রয় নিতে যাননি। দুনিয়ার তথাকথিত বৈভব সাফল্য তার কাছে ছিল এক পাশবিক মত্ততা। পাকিস্তানের সমর্থক আখ্যা দিয়ে ফররুখ আহমদকে কেউ কেউ ভিন্ন চোখে দেখার চেষ্টা করেন। সত্যিকার অর্থে তিনি পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন না বরং একজন মানবতাবাদী হিসেবে তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। ব্রিটিশ কবল থেকে মুক্ত হবার জন্য তার স্বাধীনচেতা অন্তর সব সময় অস্থির ছিল। মুসলমানদের হাতে দেশের ক্ষমতা এলে মানবতা বিকশিত হবে এটা তাঁর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী জাতিকে হতাশ করেছে। এমনকি এ হতাশাব্যঞ্জক আচরণের কারণে তিনি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কোন মোসাহেবী তো দূরের কথা সংস্কারমূলক সমালোচনা ছাড়া তাদের পছন্দসই কোন কথাই বলেননি। এমনকি পাকিস্তানী শাসকদের অনভিপ্রেত কার্যাবলির প্রেক্ষিতে তিনি ‘রাজ রাজরা’ নামক ব্যঙ্গ নাটকের মাধ্যমে তাদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। এমনকি যারা স্বার্থ হাসিলের জন্য নীতি বিসর্জন দেয়, তাদের জন্য তিনি শিশুতোষ কাব্য নাটিকায় বাদুরের সাথে তুলনা করেন এবং শেষ পঙ্ক্তিতে প্রমাণ করেছেনÑ‘সুযোগ মতো যারা ও ভাই মতটা বদল করে / অতি চালাক বাদুরগুলোর মতই তারা মরে।’ নৈতিক অবস্থানকে মজবুত করতে শিশু-কিশোরদেরকেও নির্যাতিত অভাবী ও দুঃস্থজনের পার্শ্বে দাঁড়ানোর ছবক দিতেন কবি ফররুখ আহমদ।
মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়েই কবির ছিল কবির পথ চলা। মানুষের অধিকার যার হাতে ক্ষুন্ন হয় সে তাঁর বন্ধু হলেও তিনি তার বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরই যখন তিনি বাংলা ভাষার ক্রান্তিকালের আভাস পেলেন তখনই তিনি ভাষার পক্ষে প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবি। প্রবন্ধের সূচনাই তিনি করেছিলেন এভাবে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আলোচনা হয়েছে। জনগণ ও ছাত্র সমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে।’ ভাষা আন্দোলন শুরু পূর্বেই তার এ প্রবন্ধ ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। জালিমের নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, অমানবিকতা ও অসহায়দের চিত্রিত করতে কবি ফররুখ নির্মাণ করেছেন বিরান মড়কের গান, তুলে এনেছেন অসহায় মানুষের ‘আউলাদ’ পথে পথে খুঁজেছেন ‘লাশ’ আর মুক্তিকামী মানুষের জন্য খুঁজে ফিরেছেন ‘উমর দরাজ দিল’ সাত সাগরের মাঝি হয়ে সফর করেছেন ‘বার দরিয়ায়’ পরখ করেছেন ‘দরিয়ার শেষ রাত্রি’ সিন্দবাদকে ডেকে হাতেম তায়ীকে সঙ্গী করে ‘হেরার রাজ তোরণে’ পৌঁছতে চেয়েছেন সগৌরবে। এ পথের যাত্রী মজলুম মানবতাকে তাই আয়েশী জীবন ফেলে কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করার জন্য কবির উদাত্ত আহ্বান :

‘ছিড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল অবসাদ
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও হে মাঝি সিন্দবাদ।’
ফররুখ আহমদ সম্পর্কে ফজল মাহমুদ বলেছেন : ‘আমরা আল্লাহর কাছে কায়োমনবাক্যে প্রার্থনা করি যে, আল্লাহ কবি ফররুখ আহমদের জীবনের সকল ভাল কাজগুলোকে কবুল করে নেন এবং জান্নাতে যাওয়ার উছিলা হয় তার সে মহৎ কর্মগুলো। আর তাঁর জীবনের মানবীয় ভুলত্র“টি আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আজ জাতির এ মহাসংকটকালে ফররুখ আহমদের মত নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী, কবি ও বিপ্লবীর বড় প্রয়োজন। আমরা যেন কবি ফররুখ আমাদের জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতির এ দুর্দিনে নিজেকে শোধরাতে পারি ও মানবতার মুক্তির সংগ্রামে কাজে লাগাতে পারি।’
পুরস্কার : এই কবি তার সৃজনকর্মের উপর মৃত্যুর পরও পাঠক-সমালোচকের তুমুল আলোচনায় ছিলেন। তখন তার সাহিত্য আরো বড় পরিসরে মূল্যায়িত হতে থাকে। কবিকে মরণোত্তর অনেক পুরুস্কার প্রদান করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে একুশে পদক। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা পুরস্কার। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার। ১৯৮০ খ্রিস্টারে জুন মাসে বাংলা একাডেমী কর্তৃক ফররুখ আহমদ রচনাবলি, ১ম খণ্ড প্রকাশিত। ১৯৮১ খ্রিস্টাদের জুন মাসে বাংলা একাডেমী কর্তৃক ফররুখ আহমদ রচনাবলি, ২য় খণ্ড প্রকাশিত। ১৯৮২ সালে ঢাকায় ফররুখ একাডেমী প্রতিষ্ঠিত। প্রাতিষ্ঠানিক ফররুখ চর্চার শুরু। ১৯৮৩ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উদযাপন কমিটি কর্তৃক অন্য নয়জন বিশিষ্ট ভাষা-সৈনিকের সাথে ভাষাসৈনিক সংবর্ধনা ও পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।
শেষকথা : ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর, সন্ধেবেলা ঢাকায়। ফররুখ আহমদ মৃত্যুবরণ করেন। ফররুখ আহমদকে ইসলামী রেনেসাঁর কবি, গণজাগরণ ও ইসলামী ঐতিহ্যবাদী কবি, মন্বন্তরের কবি এবং চল্লিশের দশকের অন্যতম কবি। তিনি একজন পুরোপুরি মানবতাবাদী কবি। তার সময়ে মার্কস, ফ্রয়েড, ইয়েটস, এলিয়ট, বোদলেয়ার প্রমুখ ইউরোপীয় চিন্তাবিদ ও কবি সাহিত্যিকের বিভিন্নমুখী চিন্তা, ভাব বিষয় ও আঙ্গিক চেতনার ঢেউ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে বিদগ্ধ মানুষকে যেমন হতাশ ও ম্রিয়মান করে তুলেছিল। এই সংকটকালীন মুহূর্তে তিনি আশাপ্রদ ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দ্বারাও উন্মোচিত করেছিলেন। এছাড়া রাজনৈতিক জটিলতা, নৈরাশ্য ও সম্ভাবনার লুকোচুরি এবং ঘাত প্রতিঘাতের বিচিত্রময় বাতাস সাহিত্যের আকাশেও ব্যাপকভাবে প্রবাহিত হয়েছিল। এমন সন্ধিক্ষণে যারা বুদ্ধিবুদ্ধি ও সাহিত্যচর্চা করতে চেয়েছেন তাদেরকে এসব ধারার কোন একটাতে গা ভাসাতেই হয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এসব প্রভাব থেকে বেরিয়ে নবজগরণের কবিতা লিখেছিলেন তিনি। শুধু ক্ষুধা দারিদ্র্যই মানুষকে লাশে পরিণত করে না বরং নৈতিকতা বিধ্বংশী সংস্কৃতি ও চিন্তার বিকৃতি মানুষকে চিরদিনের জন্য লাশ বানিয়ে ফেলে। ফররুখ আহমদ তা সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তিনি সমস্ত নীতি নৈতিকতাহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উচ্চারণ করেন :
‘দল বেঁধে চলিছে শিশুরা মড়কের পথে
কুৎসিত কুটিল কালো অন্ধকার সড়কে বিপথে
যেখানে প্রত্যেক প্রান্তে আজাজিল পাতিয়াছে ফাঁদ
তারি পানে দুনিয়ার টানে চলে আজ মানুষের
দুর্বল, বিশীর্ণ আউলাদ।’
মানবতা আজ বিলুপ্ত! দিনে দিনে মানুষ পৃথিবীতে মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। ক্ষুধা দারিদ্র্যের পীড়নে প্রতিনিয়ত আত্মার মৃত্যু ঘটছে আর শোষকশ্রেণি ক্ষুধার্থ মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে। মানুষের হাড় নিয়ে খেলাঘর রচনা করছে। লোভ তাদের মনুষ্যত্বকে হরণ করে নিয়েছে এবং তাদের নৃশংসতা পৃথিবীকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কী করুণ অবস্থা! একদিকে মানুষের আর্তনাদ অন্যদিকে শোষকের অট্টহাসি। একদিকে মৃত্যু ফাঁদ অন্যদিকে পরিহাস, একদিকে গোলাপের পাপড়ি অন্যদিকে আবর্জনা, একদিকে আকাশে রঙিন খিলান অন্যদিকে বিষাক্ত কামনা। চারদিকে হাহাকার। এই গভীর হাহাকার থেকে তিনি রচনা করেছেন :
‘চলে দল বেঁধে শিশু ওষ্ঠে তুলি জীবনের
পানপাত্র সুতীব্র বিশ্বাদ
মানুষের বুভুক্ষ মুমূর্ষূ আউলাদ
এ কোন পরিক্ষা?
এখানে জ্বলিছে শুধু ক্ষুধাতুর দিবসের শিখা
বিষাক্ত ধোঁয়ার কুজ্ঝটিকা
মৃত্যুর বিকট বিভীধিকা।
মজলুম মনের বোঝা, ভারাক্রান্ত বেদনা আগাধ
তারি মাঝে লাথি খেয়ে চলে আজ আদমের মৃত আউলাদ।
বিবেকহীন শোষকের শক্তিকে তিনি ভয় পাননি । কবি মনে করেন এ শোষণ-নির্যাতন চিরদিনের নয়; ইতিহাস সাক্ষীÑসামুদ, ফেরাউন, নমরুদসহ পরাক্রান্ত উদ্ধত্যবাদীদের পতনের কাহিনিকে সামনে তুলে ধরেন তিনি।
‘অনেক সভ্যতা জানি মিশেছে ধূলির নীচে, অনেক সামুদ
কত ফেরাউন, কত জালিম পিশাচ নমরুদ
মিশে গেল ধুলি তলে
নতুন যাত্রীর দল দেখা দিল দুর্গম উপলে
উড়ায়ে নিশান
সাথে করে নিয়ে এল জীবনের অ-শান্ত তুফান’
তিনি আরও উল্লেখ করেন :
‘মজলুমানের রক্তে এখনো পৃথি লাল
কোথায় ওড়াবো শান্তি প্রতীক আল হেলাল?
ঘোরে বুভুক্ষু জনগণ পথে পাংশু মুখে
দ্বার থেকে দ্বারে ফেরে তার দাবি ক্লান্ত বুকে
চির পলাতক শিকার সে হোক দৃপ্ত আজ
মানবতা হোক নির্যাতনের মাথার তাজ।
বাংলার রেনেসাঁস বাঙালি মুসলমানদের যোগসূত্র রচনায় কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন ও ফররুখ আহমদের বিশাল ভূমিকা আছে। এদের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা আছে ঠিকই, কিন্তু গভীর বৈযুজ্যও আছে। ইসলামি বোধ সত্ত্বেও নজরুল হিন্দু-মুসলমানের মিলনেরও পুরোধা পুরুষ। জসীম উদ্দীনও গ্রামীণ কাহিনীর ভেতরে হিন্দু-মুসলমান নায়ক-নায়িকার মিলন দৃশ্য রচনা করেছেন, কিন্তু ফররুখ ১৯৪৩ এর পরে তার জীবনে কেবল ইসলাম ও মুসলমান ছাড়া কিছু ছিল না। নজরুল ও জসীম উদ্দীনের মতোই ফররুখও মূলত মানবতাবাদী, মানবপ্রেমিক কিন্তু মানবতাকে সরাসরি স্পর্শ করেছেন ইসলামের মধ্য দিয়ে। আর এখানেই তার স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। বাংলাসাহিত্যের এ মহান কবি তার অমর সৃষ্টি ও উত্তম আদর্শিক চেতনায় উজ্জ্বল আভায় উদ্ভাসিত। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মে আপন মহিমায় বেঁচে থাকবেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক

আরও পড়ুন

স্বাধীনতা দিবসে সিলেট শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

মহান স্বাধীনতা দিবসের ৪৯তম বার্ষিকী...

নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক:  পবিত্র রমজান...

হাউজিং এস্টেটে সাহেদ খুনের ঘটনায় ২ জন আটক

সিলেট নগরীর হাউজিং এস্টেটে প্রতিপক্ষের...