নগরীতে ৭শ’ মোবাইল সেট ছিনতাইয়ে জড়িত পুলিশ

প্রকাশিত : 21 November, 2019     আপডেট : ৩ সপ্তাহ আগে  
  

কাউসার চৌধুরী ভারত থেকে চোরাইপথে আনা ৭০০ মোবাইল ফোন সেট ছিনতাইয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের এএসআই জাহাঙ্গীর হোসেন নেতৃত্ব দেন। জগন্নাথপুরস্থ সৈয়দপুরের সৈয়দ আরিফ আহমদসহ ৫ জন মিলে চোরাচালানের মাধ্যমে মোবাইল সেটের এই চালান সিলেটে এনেছিলেন। ২৭৯টি সেটসহ এএসআই জাহাঙ্গীর ও তার ৩ সহযোগীকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হলেও চোরাচালান চক্রের সদস্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। গ্রেফতারকৃতদের ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে পুলিশ। ছিনতাইয়ে পুলিশ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি ‘টক অব দ্যা সিটি’তে পরিণত হয়েছে। বিশাল এই চোরাচালানের ঘটনায় তোলপাড় চলছে। নগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা এএসআই জাহাঙ্গীর গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেটের ডাককে বলেন, অপরাধীর পরিচয় অপরাধী। অপরাধীর কোনো ক্ষমা নেই। এদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত জানা যাবে। চোরাচালান চক্রের সন্ধানেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ছিনতাই
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দ আরিফ নামের এক ব্যক্তি গোয়াইনঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে ৭০০ মোবাইল সেট নিয়ে প্রাইভেট কারযোগে সিলেট নগরে আসছিলেন। পথে শহরতলীর মালনীছড়া চা বাগান এলাকায় পৌঁছামাত্র এএসআই জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে কয়েকজন মিলে মোবাইল সেট’র চালান নিয়ে আসা প্রাইভেট কার থামাতে সিগন্যাল দেন। এ সময় কারের চালক কৌশলে হাউজিং এস্টেট হয়ে দ্রুত সুবিদবাজারের দিকে যেতে থাকে। গত শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় জাহাঙ্গীরসহ তার সহযোগীরা এক্সিও নতুন কারকে মোটরসাইকেলে করে পিছু নিয়ে সাগরদিঘীরপাড়স্থ ফিজা এন্ড ফ্যাক্টরির সামনে গতিরোধ করলে প্রাইভেট কারে থাকা দুজন দ্রুত নেমে পালিয়ে যায়। এ সময় জাহাঙ্গীরসহ অন্যরা এক্সিও প্রাইভেট কারটির পেছনের ভ্যানে থাকা মালামাল তাদের প্রাইভেট কারে নিয়ে যায়। পরে পরিত্যক্ত অবস্থায় এক্সিও কারটি উদ্ধার করে জালালাবাদ থানাপুলিশ। মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘এক্সিও কারে ভারত থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মোবাইল সেট ছিল। পুলিশ পরিচয়ে একটি ছিনতাইকারী চক্র মোবাইল সেটগুলো তাদের কারে নিয়ে যায়।’ একটি সূত্র জানায়, ফিজার সামনে থেকে এক্সিও কারটি নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজনের বাধার সম্মুখীন হন জাহাঙ্গীর। এরপর তিনি নিজেকে পুলিশ কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। পুরো ঘটনাটি সিসিটিভি’তে ধরা পড়ে। সিসি টিভি’র ফুটেজেই বিশাল এই চোরাচালান ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ধরা পড়ে। এএসআই জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে মোবাইল সেটের চালান ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

৩ জনই নেত্রকোনার
এদিকে, ঘটনাটি পুলিশ বিভাগে জানাজানির পর মহানগর পুলিশে তোলপাড় শুরু হয়। উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ কোতোয়ালী থানার এসি নির্মলেন্দু চক্রবর্তীর নেতৃত্বে অভিযান চালায় পুলিশ। সাঁড়াশি অভিযানের এক পর্যায়ে গত মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টায় নগরীর ২৬নং ওয়ার্ডের কায়স্থরাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিকটস্থ বাসা থেকে এএসআই জাহাঙ্গীর হোসেনকে (৩৪) গ্রেফতার করা হয়। জাহাঙ্গীর নেত্রকোনা সদরের পশ্চিম সাতপাই গ্রামের আব্দুস সাত্তারের পুত্র। এ সময় জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো ল-১৪-৮২৬৫) জব্দ করা হয়। এরপর জাহাঙ্গীরের দেয়া তথ্য ও দেখানো অনুযায়ী কাজীটুলা মক্তবগলির ৪৪নং বাসার ৫ম তলা থেকে ফারুক মিয়াকে (৩৬) গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ফারুক দোয়ারাবাজারের বগুলার আব্দুল খালেকের পুত্র। এ সময় ফারুকের কক্ষ থেকে প্লাস্টিকের টেপ দিয়ে মোড়ানো ৩টি কার্টুনে থাকা স্যামসাং, অপ্পো, শাওমীসহ বিভিন্ন কোম্পানির ভিন্ন ভিন্ন মডেলের ২৭৯টি এন্ড্রুয়েড সেট জব্দ করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যমতে, শাহী ঈদগাহ থেকে মোশারফ হোসেন খানকে (৩৮) গ্রেফতার করা হয়। সে নেত্রকোনা সদরের প্রফেসর পাড়ার ৭৭নং বাসার আব্দুল হামিদের পুত্র। তাকে সিলেট থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এরপর জহিরুল ইসলাম সোহাগকে (৩৯) গ্রেফতার করা হয়। সেও নেত্রকোনা সদরের পারলার রফিক উদ্দিনের পুত্র। দুর্ধর্ষ এই ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই নেত্রকোনার। অভিযানকালে ঘটনায় ব্যবহৃত দুটি কারও (ঢাকা মেট্রো-খ-১১-৩৪৪৩ ও ঢাকা মেট্রো খ-১৪-০৩৮৩) জব্দ করে পুলিশ। পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, এএসআই জাহাঙ্গীর তার নিজ এলাকার ছিনতাইকারীদের নিয়েই ছিনতাইকারী চক্র গড়ে তুলেন।
আলোচনায় সৈয়দ আরিফ
কোতোয়ালী থানায় দায়েরকৃত পৃথক মামলায় মোবাইল সেটের চালানের মালিক সৈয়দ আরিফ আহমদ (৩৫) বলে উল্লেখ করা হয়। আরিফের সাথে মৃদুল (৩৩) নামের আরেকজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে আরিফের ঠিকানা ও পিতার নাম অজ্ঞাত লিখলেও থানায় দেয়া হয়েছে জগন্নাথপুর। এদিকে, পুলিশ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, সৈয়দ আরিফ আহমদ জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরের সৈয়দ তৈয়মুছের পুত্র। বর্তমানে নগরীর শামীমাবাদ আবাসিক এলাকার একটি বাসার ২য় তলায় বসবাস করছেন। মৃদুল হলেন নগরীর শেখঘাটের বাসিন্দা। এদের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন জিল্লু মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি। তবে এজাহারে জিল্লুর নাম উল্লেখ করা হয়নি। সূত্র বলেছে, এক্সিও কার থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া দুজনই হলেন মৃদুল ও জিল্লু।
সাপ্লাই হতো বিভিন্ন মার্কেটে
পুলিশ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সৈয়দ আরিফ ভারতীয় মোবাইল সেট চোরাইপথে এনে সিলেটের মোবাইল মার্কেট বিশেষ করে করিম উল্লাহ মার্কেটসহ বিভিন্ন মোবাইলের দোকানে-মার্কেটে সাপ্লাই দিতেন। দীর্ঘদিন ধরে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এই কাজটি করে আসছেন আরিফ। কেবল মোবাইল সেটই নয় বিভিন্ন মালামাল চোরাইপথে এনে সিলেটে বিক্রি করেন আলোচিত আরিফ আহমদ। তবে যে আরিফকে পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিনের চোরাচালানী-এই আরিফের এখনো হদিস পায়নি পুলিশ। এমনকি তার সহযোগীদেরও এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন
এদিকে, গ্রেফতারকৃত জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীদেরকে গতকাল বুধবার সকালে মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট-১ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ জিয়াদুল ইসলামের আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত জাহাঙ্গীরসহ ৪ আসামীকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। পরে তাদেরকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এএসআই জাহাঙ্গীর হোসেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের ভূমি শাখায় কর্মরত রয়েছেন। এ ঘটনায় সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই অনুপ কুমার চৌধুরী বাদী হয়ে গত মঙ্গলবার রাতে কোতোয়ালী থানায় পৃথক মামলা দায়ের করেন। ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন ২০০২ সংশোধনী ২০১৯ এর ৪/৫ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নং ৪২। চোরাচালানের ঘটনায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-বি ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলা নং ৪৩।
বক্কর মিয়া সীমান্তের হোতা
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার চোরাইমাল ব্যবসায়ী মোঃ বক্কর মিয়ার কাছ থেকেই ৭০০ মোবাইল সেট কিনে আনেন আরিফ। কেবল ভারতীয় সেট সিলেটে নিয়ে আসা-ই নয়, সিলেট তথা বাংলাদেশে চুরি-ছিনতাই হওয়া মোবাইল সেটের চালানও এই বক্কর মিয়া ভারতের চোরাচালানীদের নিকট পৌঁছে দেন। মোবাইল সেটসহ বিভিন্ন মালামাল চোরাইপথে নিয়ে আসেন বক্কর মিয়া। এরপর তার নির্ধারিত চক্রের কাছে তুলে দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য
নগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুসা সিলেটের ডাককে বলেন, চোরাচালান ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত দুটি কার, মোটরসাইকেলসহ মোবাইল সেট জব্দ করা হয়েছে। ৪ জনকে গ্রেফতারের পর জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। চোরাচালানের হোতা সৈয়দ আরিফসহ চক্রের সদস্যের নামেও মামলা করেছে পুলিশ। পুলিশ কাউকে ছাড় দেবে না। এই চক্রের শেকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হবে। এদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।সুত্র সিলেটের ডাক

আরও পড়ুন