দান করা বাংলার মানুষের জাতিগত ঐতিহ্য: শেখ আব্দুর রশিদ

প্রকাশিত : ০৫ জুন, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

শেখ আব্দুর রশিদ বাস্তব একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। গভীর রাতে চোর ঢুকেছে ঘরে। গৃহকর্তা জেগে উঠলেন, হাতেনাতে তাকে ধরে ফেললেন। চোর কেঁদে উঠল। জানালো আজ পাঁচ দিন, ঘরে খাবার নেই, অভুক্ত সন্তানের কান্না আর ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে সে আজ এসেছে চুরি করতে। গৃহকর্তার চোখ ভিজে গেল মমতায়। তিনি তাকে খাবারসহ আরো অনেক কিছু দিয়ে বিদায় করলেন। তিনি ছিলেন অঢেল ধন-সম্পদের অধিকারী। ১৭৭০ সালের মহা দুর্ভিক্ষে তিনি অনেক লঙ্গরখানা খোলেন অভুক্ত মানুষের খাবারের জন্যে। পরিচিতরা বলেছিলো, এ কি করছেন আপনি? আপনার সব সম্পদ তো শেষ হয়ে যাবে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “ আমার সম্পদ থাকতে যদি আমার দেশের মানুষ না খেয়ে মারা যায়, এমন সম্পদের উপর আল্লাহর লানত পড়ুক”। বঞ্চিত ও অভাবী মানুষের সাহায্য করে আজও অমর হয়ে আছেন বাংলার দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসীন। তার বিপুল অর্থসম্পদ তিনি ব্যয় করেছেন বাংলার অনগ্রসর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে। তাঁর শিক্ষার ফান্ড থেকে এখনও ছাত্র ছাত্রীরা বৃত্তি পায়।

সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ১৩৮৯ সাল থেকে ১৪১০ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। নারায়নগঞ্জে রয়েছে তাঁর সমাধি। তিনি বাংলার অর্থে তৎকালীন আরবের দরিদ্র্য শিক্ষার্থীদের জন্যে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন অসংখ্য মাদ্রাসা। পাশাপাশি ৩০ হাজার স্বর্ণমুদ্রাও আরবে পাঠিয়েছিলেন দরিদ্র্যদের মধ্যে বিতরণের জন্যে। আর সংস্কার করে দিয়েছিলেন মজে যাওয়া জলাধার ‘নহরে জুবাইদা’।

লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর অভিজ্ঞতায় বলেছিলেন, সত্তরের দশকের শেষ দিকে মিশনারি ধরনের দুজন বিদেশীর সাথে কথা হচ্ছিল। তাঁরা ইতালীয় নাগরিক, একটি প্রতিষ্ঠানের ত্রাণকর্মী। তিনি ইতালীয়দের বলছিলেন, ইতালির দুর্দিনে আমরা আপনাদের পাশে ছিলাম। কথাটা শুনে ঐ দুই নাগরিক এত অবাক হলেন যে তারা চা খাচ্ছিলেন, চায়ের চুমুক দিতে ভূলে গেলেন। একজন জানতে চাইলেন, সে সাহায্য কবে দেয়া হয়েছিল? তিনি বললেন এখন থেকে প্রায় একশ বছর আগে। ১৮৭০ এর দশকে ইতালিতে কলেরায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় খাদ্যাভাব। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর দাদা নবাব আবদুল গনি এক হাজার মণ চাল পাঠিয়েছিলেন ইতালিতে। কাছাকাছি সময়েই ইতালিতে ভুমিকম্পে শত শত হতাহত হয় এবং গৃহহীন হয় লাখ লাখ মানুষ। ঢাকার নবাব বাহাদুর ৪ হাজার ১০০ টাকা সাহায্য দেন ইতালি সরকারকে। সেই টাকা দিয়ে দেড় হাজার মণ চাল কিনে পাঠান। দেড়শ বছর আগে ইরানে দুর্ভিক্ষে বহু মানুষ মারা যায়। নবাব আবদুল গনি ৩ হাজার টাকা দান করেন এবং সেই টাকা দিয়ে প্রায় দেড় হাজার মণ চাল পাঠানো হয়। ঢাকার নবাব আয়ারল্যান্ডকেই সবচেয়ে বেশী ত্রাণ দিয়েছেন। একবার ডাবলিনের মানুষকে বাঁচানোর জন্য ৩ হাজার ৯০ টাকার দেড় হাজার মণ চাল-আটা পাঠান। দ্বিতীয়বার নবাব আবদুল গনি আয়ারল্যান্ডের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্যে ডাচেস অব মার্লবারোকে পাঠান ৩ হাজার ৯৯ টাকা। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তুরস্কে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে নবাব খাজা আহসানউল্লাহ ৫০০ মণ চাল পাঠান। বুলেগেরিয়ার দুর্ভিক্ষ-মহামারিতে ১২ হাজার ৫০০ মণ চাল-গম দিয়ে জাহাজ পাঠান। ১৮৭১ সালে ফ্রান্স-জার্মানি যুদ্ধে দুই দেশেরই মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছিল। নবাব আবদুল গনি পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। সেই টাকায় আড়াই হাজার মণ চাল-গম নিয়ে কয়েকটি জাহাজ ফরাসি বন্দরে যায়। আমাদের প্রতিবেশীদেরও আমরা সাহায্য করেছি। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পূর্ব চীনের দুর্ভিক্ষে বাঙালি সাহায্য নিয়ে এদেশ থেকে সাংহাই বন্দরে গেছে জাহাজ।

দেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ সংগঠিত প্রতিটি দুর্যোগ থেকে আমরা উতরে উঠেছি, কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ দানশক্তি। আমরা দেখলাম মায়ানমার থেকে যখন অসহায় রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে আশ্রয় নিল দেশের মানুষ সর্বস্ব দিয়ে তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল। এই ২০২০ এর মার্চে বাংলাদেশে করোনা ধরা পড়ার পর সারা দেশে লকডাউন শুরু হয়। দেশের সকল পাড়া-মহল্লায় সংগঠিত হয়ে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এদেশের মানুষ দিতে জানে, দিতে চায়। পূর্বসূরীদের মত দানের এই সুন্দর অভ্যাস দেশের মানুষের মধ্যে জাগরুক রয়েছে।

১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার লক্ষ সৈন্য আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, কামান ও গুলাবারুদ থাকা সত্তেও বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের কারণে নবাব বাহিনীর সেদিনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় দু’শ বছরের ব্রিটিশ শাসনের যাঁতাকলে বাংলার মানুষ সব হারিয়ে হয়েছে নিঃস্ব। আমরা হারিয়েছি নৈতিক চরিত্র এর সাথে হারিয়েছি আমাদের জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা এখন মনে করি বড় কিছু করা আমাদের জাতে নেই, আমাদের দ্বারা কিচ্ছু হবেনা। আমরা এরকম চিন্তা কেন করছি? উত্তরটা পাওয়া যাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ২ ফেব্রুয়ারী ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকেলের নিম্নোক্ত বক্তব্যতে “ I Have Travelled across the length and breadth of India and I have not seen any person who is a beggar, who is thief such wealth I have seen in this country, such high moral values, people of such caliber, that I do not think we would ever conquer this country, unless we break the vary backbone of this nation, which is her cultural and spiritual heritage and therefore, I propose we replace her old and ancient education system, her culture, for if the Indians think that all that is foreign and English is good and greater than their own, they will lose their self-esteem, their native culture and they will become what we want them, a truly dominated nation”. আর এভাবেই তৎকালীন শাসকরা গোলাম শ্রেণী তৈরীর নিমিত্তে ভারতবর্ষ তথা বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন করে। এবং আমাদের মনোজাগতিক স্থরে হীনমন্যতা ঢুকিয়ে দেয় এবং সাথে সাথে আমরা নিজেরাই যে অন্যের সাহায্য ছাড়াই নিজেরাই নিজেদের অবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে পারি সেই আত্মবিশ্বাসটুকু নষ্ট করে দেয়।

বাংলার অতিত মহান ছিল, ভবিষ্যতও মহান হতে পারে। জাতিগত বর্তমান অবস্থার আলোকে ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে আমাদের মহান অতিত অবস্থার আলোকে ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে হবে। পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে একটা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠা এ ছিল বাঙ্গালীর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। ৩০ লক্ষ শহীদ, ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত আর কোটি কোটি মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা সেদিনই সার্থক হবে যেদিন দেশের নাগরিকেরা সবাই অর্থনৈতিকভাবে হবে স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল।

উপস্থিত সহায়তার পাশাপাশি দানকে সংঘঠিত করতে পারলে তা দারিদ্র ও বেকারত্ব বিমোচনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা যখন ভিক্ষুককে কিছু দান করছি এ দানের টাকা বাস্তবে কোন কাজেই লাগছে না। বরং এতে দান নির্ভর ভিক্ষুক বাড়বে, এ ধরনের দানকে রাসুল (সা.) নিরুৎসাহিত করেছেন। এক ব্যক্তি নবীজির কাছে ভিক্ষা চাইতে এলে তিনি তাকে কাজ করে খেতে উপদেশ দিলেন। তিনি তার কম্বল বিক্রি করে সে অর্থের অর্ধেক দিয়ে সে দিনের খাবার ও বাকি অর্ধেক দিয়ে কুঠার কিনে দিয়ে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করার ব্যবস্থা করে দিলেন।

দানের একটা অংশও যদি সংঘে নিয়মিত জমা দেয়া যায় তাহলে তা দিয়ে যে ফান্ড হবে তা থেকে ক্রমাগত বেকারত্ব ঘোচানোর মধ্য দিয়ে এমন একটা সময় আসবে যেদিন দানের অর্থ গ্রহণ করার মত কাউকে এদেশে পাওয়া যাবে না। দেশের দানের টাকায় বহির্বিশ্বের অসহায় বঞ্চিতদের উন্নয়নে কাজ করবে বাংলাদেশ। সেদিন বেশি দূরে নয়।

তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো ও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা সমূহ।

লেখকঃ শেখ আব্দুর রশিদ

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান রাষ্ট্রবিজ্ঞান

লতিফা-শফি চৌধুরী মহিলা ডিগ্রি কলেজ

চেয়ারম্যানঃ (সিফডিয়া) সিলেট সেন্টার ফর ইনফরমেশন এন্ড ম্যাস মিডিয়া

আরও পড়ুন

সুনাগমঞ্জে স্কুল ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন সম্পন্ন

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংকের...

শান্তির বাসা

মিজানুর রহমান মিজান যত আছে...

সিটি সেন্টার দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন চলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ...

সাংবাদিক মারুফ হাসানের মা ইন্তেকাল করেছেন

ডেইলি সিলেট ডট কমের নির্বাহী...