দশ টাকার গল্প

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

ছালিক আমীন: জুনু বিয়ে করেছে ঠিক বয়েসে। আবার বউটা তালাক দিয়েছে ভুল বয়েসে। বিয়ের বছর একটা ছেলে। ছেলেটা মাকে সাথি করে জুনু (বাবা) কে ছেড়ে চলেগেল।

সংসারে জুনু একা। বউ, বাচ্চা হারিয়ে এক্কেবারে একা। বছর যেতে না যেতে জুনুর মনে মনে আরেকটা বিয়ে করবে। ভালো সুযোগ খোঁজছে। ভালো সুযোগ মানে- যৌতুক। জুনু যৌতুক নিয়ে আবারও দ্বিতীয় বিয়ে করে বসল। বিয়ের বছর পরে একটা বাচ্চা। তারপরে আবারও আরেকটা বাচ্চা।

এবারের বাচ্চাটা ঠিক বাঁচানো গেলো না। মাকে দেখেই শিশুটা মারা গেল। বাচ্চা জন্মদিয়েই বউটা ভীষণ অসুস্থ। গরিবী সংসার। কোনো রকম টানাটানিতে চলে। অসুস্থ বউটা টাকার অভাবে বিছানায় পড়ে আছে।

আত্মীয়স্বজনের কমতি নেই। সবাই একটু একটু সাহায্য দিলে বউটা বাঁচানো যেত। কিন্তু কেউ ত দিচ্ছে না? কেবল বউটার মরণটা কীভাবে হচ্ছে সেটা দেখার জন্যে সবাই প্রতিনিয়ত ছুটে আসছে।

আজ শনিবার। বউটার অসুস্থতার সাতদিন। শশুড়ের ঘাড়ে আর কত পড়ে থাকে জুনু? কি করবে ঠিক ভেবেও পাচ্ছে না।

সংসারে জুনু একা তাকলে কি হল। সবাই আছে ওর। বাড়িতে এক দুটি নয়? সাতটি পরিবার রয়েছে। আজ সবাই ছুটে আসছে জুনুর বউটা দেখার জন্যে। বেলা বারোটা। চার পরিবারের চার বেটি জুনুর বউটা দেখতে রওয়ানা দিয়েছে। অনেক দূর জুনুর শশুড়বাড়ি। গাড়ি করে যেতে হবে। সবাই পঞ্চাশ করে সাথে নিল। পথ খরচ চল্লিশ করে। এটা যাওয়া এবং আসার ভাড়া। চল্লিশ বাদ দিয়ে দশ করে সবার কাছে অতিরিক্ত। রোগী দেখতে মোছা লাগে। পঞ্চাশ টাকার বিস্কুট নিল পরী। দশ টাকা ঢুকে পড়ল পরীর হিসেব থেকে বিস্কুটে।

বাড়ি ফেরার পথে পরী ভাড়া দিতে বেপাকে পড়ে গেলো। দশ টাকা ধার নিলো সুমনের আম্মার থেকে। পরী সারা রাস্তা দশ টাকার চিন্তায় অস্থির। হিসেব পাচ্ছে না! দশ টাকা কোথায় হারাল তার। এ নিয়ে কেউ ভাবছে না! যার গেছে সে-ই ভাবছে। তারপরে সবাই বাড়িতে এসে পৌঁছল।

পরী দশ টাকা সুমনের আম্মাকে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু ঘরে তো কোনো টাকা নেই জমা। এ নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েগেল পরী। চিন্তা করতে করতে খোঁজে পেলে ঘরের পাতিলে রাখা একটা ডিম। ডিমটা বিক্রির জন্যে পরী চেষ্টা চালালো। পারল না। শেষে ডিমটা সিদ্ধ করে সুমনের আম্মাকে পরী ডিমটা বুঝিয়ে দিল। সুমনের আম্মা পরীর কান্ড দেখে বরাবরের মত অবাক। কি করবেন? ভেবে পাচ্ছেন না।

শেষে পরীকে বুঝিয়ে বললেন ডিমটা তোমার বৃদ্ধ আম্মাকে খাইয়ে দাও। আমি দশ টাকা আপাদত নিচ্ছি না। পরী সুমনের আম্মার কথার প্যাঁচ না বুঝে ডিমটা মাকে খাইয়ে দিল। গল্পটা এখানে শেষ? না শেষ নয়।

এবার দশ টাকার চিন্তা পরীর মাথা থেকে সুমনের আম্মার মাথায় ঢুকে পড়ল। কারণ অংক করলে দেখা যায় সুমনের আম্মার দশ টাকা হারাতে বসেছেন।

তবে এতো সহজেই উনি দশ হারাবেন না। একা একা অংক করতে শুরু করলেন। এক সময় দশ টাকার গরমিল খোঁজে বের করলেন।

জুনুর অসুস্থ বউটাকে দেখতে গিয়েছিলেন- লীলা, নীলা, পরী ও সুমনের আম্মা। সবাই বাড়ি থেকে রওয়ানা হতে পঞ্চাশ করে সাথে নিয়েছিল। চল্লিশ করে পথ খরচ। বাকি থাকে চারজনে চল্লিশ টাকা। কিন্তু জুনুর বউয়ের জন্যে পঞ্চাশ টাকার বিস্কুট নিয়ে ছিল ওরা। দশ ঢুকে যায় পরীর হিসেব থেকে।

এই দশ নিয়ে এতোই বৈঠক, এতোই গোলমাল।

সুমনের আম্মা দশ টাকার গোপন রহস্য খোঁজে বের করলেন। সবাই বিষয়টা বুঝতে পেরে হাসতে শুরু করল। হাসি শেষ হলে সবাই আড়াই টাকা করে আবারও তুলল। পরী দশ টাকা পেয়ে সুমনের আম্মাকে বুজিয়ে দিল।

সুমন মার থেকে ‘দশ টাকার গল্প’ শোনে- আজ স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সবাইকে হাসাতে হাসাতে প্রথম পুরুষ্কার চিনিয়ে নিল।

.

ছালিক আমীন

সহকারী শিক্ষক

সাজ্জাদ মজুমদার বিদ্যানিকেতন

জকিগঞ্জ, সিলেট।

আরও পড়ুন