তেলে তেলে তেলাকার: ছন্দে ছন্দে বাস্তবতা

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

নাসিম আহমদ লস্কর: সাহিত্যের অন্যতম একটি শাখা হচ্ছে ছড়া। ছড়ার মাধ্যমেই ছড়াকাররা ফুটিয়ে তুলেন জীবনের সাদাকালো প্রতিচ্ছবি, প্রেম- ভালোবাসার কথা, সমাজ বাস্তবতা, দেশপ্রেম ইত্যাদি। বোধের জগৎ যখন ছড়াকারকে নাড়া দেয় তখনই তিনি রচনা করেন ছড়া। একজন সফল ছড়াকার ছড়ায় সেসব বিষয়বস্তু নিয়ে আসেন যেগুলো মানবজীবনকে স্পর্শ করে।
কবি ও ছড়াকার সিদ্দিক আহমদ একজন বেশ সিদ্ধহস্ত ছড়াকার। তিনি সিলেটের পায়রা প্রকাশের সত্বাধিকারী। লেখালেখির অন্যান্য শাখায়ও তাঁর বিচরণ রয়েছে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১১টি। তাঁর রচিত ছড়াগুলোতে ফুটে উঠেছে দেশ ও দশের কথা, সমাজ বাস্তবতা, প্রেম-ভালোবাসা সহ নানা বিষয়বস্তু। ‘তেলে তেলে তেলাকার’ তাঁর রচিত একটি ছড়াগ্রন্থ যে গ্রন্থটিতে ফুটে উঠেছে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি সহ আরো কিছু মৌলিক বিষয়ের। একুশে বইমেলা ২০১৮তে পায়রা প্রকাশ থেকে এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি বাছিত ইবনে হাবীবকে। বইটিতে মোট ৬৪টি ছড়া স্থান পেয়েছে। এখানে কিছু ছড়া নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা হলো।

‘চলে যদি যাও
পৃথিবীর শেষ কোনপ্রান্তে
তবে মনে রেখো আমিও
আসবো তোমার অজান্তে।’
যাও তুমি
পৃথিবী এমন এক মোহময় জায়গা যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভালোবাসার সম্ভার। মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে তখন সে ওই মানুষটির আত্মার সাথে মিশে যেতে চায়। তাই সে তাঁর কল্পনার জগতে চাষ করে প্রিয় মানুষটির অদৃশ্য আত্মার সাথে মিশে যাওয়ার ভাবনা।
‘কেউ তেল দেয়
কেউ তেল নেয়
কেউ তিল করে
কেউ তাল করে’
তেলে তেলে তেলাকার
এই ছড়াটি হচ্ছে গ্রন্থটির নাম ছড়া। ছড়াটিতে সমাজের এক বীভৎস বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। আমাদের বর্তমান সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে ছড়াটি। মানুষ নিজের সুবিধা আদায়ের জন্য অনেক সময় সত্যকে বিসর্জন দেয়, অন্যায়কে ন্যায় বানানোর চেষ্টা করে। ছড়াকার বিষয়টি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে অবলোকন করেছেন এবং তা তুলে ধরেছেন।
‘সিলেট আমার প্রাণের শহর
জুড়ায় মনঃপ্রাণ
সাতকরা আর কমলালেবুর
কি যে মিষ্টি ঘ্রাণ।’
সিলেট
মানুষ যেখানে জন্মগ্রহণ করে সেখানকার প্রতি তাঁর থেকে যায় নাড়ির টান। আর সে টান থেকেই লেখক ছড়াটি রচনা করেছেন; ফুটিয়ে তুলেছেন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাতকরা আর কমলালেবুর কথা।
‘তিড়িং বিড়িং সবাই লাফায়
কাজে হুক্কাহুয়া
কথার বেলায় বলেছি সবাই
কাজের নামে ভূয়া।’
তিড়িং বিড়িং
কথায় আছে, ‘কাজের বেলায় কাজী/ কাজ ফুরালে পাজি।’ সমাজে অনেক চাটুকারের বাস রয়েছে যারা মুখসর্বস্ব। বাস্তবে তারা কোন গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে না যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমাজ ব্যবস্থায়। ব্যাহত হয় উন্নতি। ছড়াটি সমাজ সচেতন লেখকের শৈল্পিক প্রতিবাদ।
‘ছড়া দিয়ে গড়া হয় বিবেকের দ্বার
ছড়া তাই আলোকিত ঘর
ন্যায় অন্যায়ের বিবেকী ঘর’
ছড়া নাকি খুলে দেয়
ছড়া হচ্ছে সত্য প্রকাশের এক শক্ত মাধ্যম যা পাঠ করলে পাঠক খুঁজে পায় জীবনের স্বরূপ। ফলে খুলে যায় মানুষের বিবেকের দ্বার। লেখকের শাণিত বিবেক বিষয়টি সুনিপুণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে।
‘মানুষে মানুষ মারে ধরে
লুণ্ঠিত মানবতা
কোথায় পাবো ওমর, আলী
রুখবে দানবতা।’
আমার আরাকান
বিশ্বসমাজ বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। চারদিকে যুদ্ধের দামামা বাজছে। ছড়াকার এ দুঃসময়ে মানবতার কাণ্ডারিদের অভাববোধ করেন। তিনি প্রত্যাশা করেন নতুন প্রকৃত মানব হৃদয়ের অধিকারীদের যারা সমাজে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন শান্তির স্বর্গ।
‘মা আমার প্রিয় ডাক
এই ভূবন জুড়ে
মা আমার চলে গেলে
হৃদয় মরে পুড়ে।’
মা
মা একটি শব্দ যা প্রতিটি মানুষের আত্মার সাথে মিশে থাকে। মা শব্দটি কেবল শব্দ নয়, এটি একটি শিল্প। ছড়াকার এখানে ‘মা’ নামক প্রিয় শব্দটির প্রশংসা করেছেন। মা দূরে গেলে প্রতিটি মানুষের মন আহত হয়; যেমনটি আহত করেছে লেখককে।
‘মা মাটি দেশ
ভালোবাসি বেশ।’
মা মাটি
অত্যন্ত ছোট এ ছড়াটিতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ফুটে উঠেছে অনুভূতির বিশাল ভাণ্ডার। প্রতিটি মানুষের কাছে তাঁর মা, মাটি, দেশ সবচেয়ে আপন। এ চিরসত্য কথাটি এ অণুছড়ায় বেশ ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।
বইটি পাঠ করে আমার বেশ ভালো লেগেছে।বইটির প্রতিটি ছড়াই অতি অল্প কথায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বেশীরভাগ ছড়া সমাজের চাটুকারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। এ অসুস্থ সমাজকে সুস্থ, স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে বইটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। আমি বইটির পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।

লেখক: নাসিম আহমদ লস্কর
শিক্ষার্থী; বিবিএ প্রোগ্রাম
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

আরও পড়ুন



সিলেটে অবৈধপথে আসছে গরু

ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিলেটের বিভিন্ন...