তিনি আমাদের চেতনা, তিনিই প্রেরণা

প্রকাশিত : ১৭ মার্চ, ২০২০     আপডেট : ২ মাস আগে  
  

‘শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণি।’ কোন সে ধ্বনি?-‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। মুজিব মানে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আরেক নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব অবিচ্ছেদ্য; ব্যক্তি ও তার সৃষ্ট দেশ-দুটিই চিরজীবী। এ দেশের পরাভব নেই, তার স্রষ্টা মহানায়কের মৃত্যু নেই, তিনি অমর। দেশের বিলুপ্তি ঘটাতে পারবে না কেউ-কারণ এ দেশের উৎসে আছেন এক মহানায়ক, কালোত্তীর্ণ জাতীয় নায়ক। তিনি কেবল ইতিহাস সৃষ্টি করেননি, তিনিই হয়ে উঠেছেন ইতিহাস। ইতিহাসের শেষ নেই, কাল নিরবধি। সেই কালস্রোতে বঙ্গবন্ধু এক অমর আবহমান ভেলা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন, আছেন, থাকবেন।

আজ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের এক অভাবনীয় ঘটনার মহানায়কের জন্মদিন। আজ থেকে তার শততম জন্মবর্ষ শুরু হলো। বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের জনক তিনি। তাকে ঘিরে রূপকথার মতো এক সবুজ-শ্যামল পলিমাটির দেশের উত্থান ঘটেছিল ঊনপঞ্চাশ বছর আগে। সেই থেকে যাত্রা চলছে এই নতুন রাষ্ট্রের।

এই রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন অনেকেই, রূপ দিলেন বঙ্গবন্ধু। চর্যাপদের কবি থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সপ্তদশ শতকের আবদুল হাকিম থেকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল, চ-ীদাস থেকে ডিএল রায়, লালন থেকে রমেশ শীল কত কবি, সাধক, গায়ক ও মনীষী এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা রূপ পেয়েছে শেখ মুজিবের জাদুকরী নেতৃত্বে। বাংলাদেশ তাই একটি স্বপ্নের নাম। বহু মানুষের স্বপ্নসাধের দেশ এই বাংলাদেশ।

যদি প্রশ্ন ওঠে কার স্বপ্ন? কবি, সাধক ও মনীষী ছাড়াও এ ছিল সেইসব মানুষের স্বপ্ন, যারা এর জন্য আন্দোলন চালিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। নেতাজি থেকে সূর্য সেন, হক-ভাসানী থেকে শেখ মুজিব, ক্ষুদিরাম থেকে আমাদের বীরশ্রেষ্ঠরা, স্বাধীনতার বেদিতলে নিবেদিত লাখো শহীদ কার নয়! মুক্তিযোদ্ধা থেকে সাধারণ কৃষক, জেলে, কামার, মজুর, শিক্ষক সবাই এই স্বপ্নের সাথী।

বলা যায়, সেই বায়ান্ন থেকে যে ভাষার লড়াই, চুয়ান্নতে দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনীতির প্রত্যাখ্যান, বাষট্টির গণতান্ত্রিক শিক্ষার আন্দোলন, ছেষট্টির স্বায়ত্তশাসনের দাবি, আটষট্টির সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের সংগ্রাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনী রায়, একাত্তরের অসহযোগ ও মুক্তিযুদ্ধ-এসবের ধারাবাহিকতায় এসেছে স্বাধীনতা, ঘটেছে স্বপ্নসাধের পূরণ। দীর্ঘ চব্বিশ বছরের বন্ধুর পথপরিক্রমায় কত মানুষ পথে নেমেছেন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, নির্যাতন সয়েছেন, জীবন বিলিয়েছেন অকাতরে তার কোনো হিসাব আছে?

বাংলাদেশ অযুত মানুষের দান। কিংবা বলা যায়, অসংখ্যের এক স্বপ্নময় নির্মাণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। যে কোনো যুদ্ধের মতো এও ছিল রক্তাক্ত-মর্মান্তিক সব অভিজ্ঞতায় ঠাসা। এমন অভিজ্ঞতার দিকে এ জনপদের মানুষ কোন জাদুর বলে এগিয়ে গেল? স্বভাবে ঘরোয়া, আড্ডাবাজ, কাজের চেয়ে কথার বীর, কলহ ও কোন্দলে পটু মানুষগুলো কীভাবে এক হলো? কোন মন্ত্র তাদের সত্যিকারের বীরে রূপান্তরিত করল?

সেই জাদুকরের নাম বঙ্গবন্ধু, তার জাদুকরী নেতৃত্বই ঘরকুনো ভীতু মানুষগুলোকে যুদ্ধের ময়দানে জান বাজি রেখে লড়াই করার প্রেরণা দিয়েছে। তিনি জাতির জিয়নকাঠি, তাদের অনুপ্রেরণা।

একাত্তরের যুদ্ধ বাঙালিকে ঐক্যের সূত্রে বেঁধেছিল ও উজ্জীবিত করেছিল। প্রায় গোটা জাতির মনজুড়ে তখন জেগে ওঠা জ্বলজ্যান্ত একটি স্বপ্নÑ স্বাধীন স্বদেশ, যা তার কোনোকালে ছিল না; আর চব্বিশ বছরের লড়াই-সংগ্রামে তৈরি হওয়া এক জেদ-অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়, যে কোনো মূল্যে। এই ঐক্যের প্রেরণা ও উজ্জীবনের কা-ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

একাত্তরের আগেই বাংলাদেশের দিক থেকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদী একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের অগ্রগামিতা স্বীকৃত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ জাতি পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে কী চেয়েছে? বাঙালি জাতীয়তার বিকাশের সব বাধা দূর হোক, ধর্মভিত্তিক সব ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতা ঘুচিয়ে অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করুক; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুষ্টিমেয়র হাতে কায়েমি না হয়ে সমাজে যথার্থ গণতান্ত্রিক বাতাবরণ তৈরি হোক; অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সাম্য ও ন্যায়ের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক ধারায় সমাজব্যবস্থা কায়েম হোক।

সেই দেশ মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় হারিয়ে বসল নেতাকে, ঐক্যের প্রতীক, সংগ্রামের প্রেরণা, চেতনার মুখটিকে। অপশক্তি ক্ষমতায় বসে জনগণ ও তাদের স্বপ্নের দেশের অগ্রযাত্রা বানচালের কাজে নেমে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দেওয়ার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার, চেতনা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে মেতেছিল তারা। ষড়যন্ত্রের দুই দশকজুড়ে কিন্তু কবি, ছড়াকার, গীতিকার, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরা এর কিছুই নষ্ট হতে দেননি। বরং নানা আবেগে বঙ্গবন্ধুর অবিনশ্বরতা, ইতিহাসে তার অমর অবস্থান, জাতির জীবনে তার একক স্বতন্ত্র সুউচ্চ আসন সুস্পষ্ট হয়েছে।

গ্রামের বালক কর্মী থেকে গোটা দেশের মহানায়ক, ডানপিটে গ্রামীণ সংগঠক থেকে দূরদর্শী বিচক্ষণ নেতা, সামান্য রাজনৈতিক কর্মী থেকে জাতির পিতা-এ যাত্রা দীর্ঘ, এ যাত্রা আন্দোলন, কারাবরণ, নির্ভীক নেতৃত্বের এক রূপকথার মতো।

কৈশোর থেকে তার মধ্যে দলে কাজ করার, দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার, দুস্থ ও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছিল। তারুণ্যে তার সাংগঠনিক প্রতিভা ও জনগণের পাশে থাকার গুণ প্রকাশ পায়। প্রথম যৌবনে তিনি নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, চিন্তাশীল, সজাগ সপ্রতিভ সংগঠক, উত্তর-তিরিশে তিনি তরুণ নেতা, দক্ষ সংগঠক, দূরদর্শী বিশ্লেষক, দক্ষ রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন। প্রবীণ মুজিব জাতীয় নেতা, জনমানুষের নয়নের মণি, তার সময়ের বয়োজ্যেষ্ঠ-সমবয়সী সবাইকে ছাপিয়ে তিনিই এই বাংলার একক নেতা। একাত্তরে মানুষের কণ্ঠে বেজেছে স্লোগান-এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ। আর সব ছাপিয়ে দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত ধ্বনি জয় বাংলা সারাদেশে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কিন্তু এই সবকিছুর প্রেরণা একজনই, এক নেতা-তিনি মুজিবুর। যুদ্ধকালে তিনি তো কারাগারে, কিন্তু তাতে কী? ততদিনে নেতার ছবি, বজ্রকণ্ঠ সবার অন্তরে, সবার প্রাণে বাজে ৭ মার্চের ভাষণ-প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব। আর চূড়ান্ত ঘোষণা! সেটাই হয়ে দাঁড়াল মূল প্রেরণা, সর্বক্ষণের জপমন্ত্র, সবার অভীষ্ট লক্ষ্য-এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

যিনি এমন দৃষ্টান্তমূলক জীবনযাপন করেছেন, এমন ত্যাগ-বীরত্বে অনুপ্রেরণাময় জীবনের অধিকারী, তিনিই তো জনগণের নেতা, নয়নের মণি, তাদের ভক্তি ও ভালোবাসার আশ্রয়। ষড়যন্ত্রকারীরাই ইতিহাসের অভিশপ্ত কাপুরুষ। সুপুরুষ বীরনায়ক বঙ্গবন্ধু শতবর্ষে আরও দীপ্যমান, আরও ভাস্বর, আরও সত্য।

তার কন্যার নেতৃত্বে ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। এগিয়ে যাচ্ছে অনেক দেশকে পেছনে ফেলে। তবে হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সফল করার জন্য বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং দুর্নীতি দূর করতে হবে। উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে টেকসই করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে জাতি শপথ নেবে সব সংকট, সব দুর্বলতা, সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার।

আবুল মোমেন

১৭ মার্চ ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২০ ০২:০০ আমাদের সময়

আরও পড়ুন



ছাত্রলীগ নেতা ফয়জের জন্মদিনে আসাদ উদ্দিন আহমদ

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট মহানগর...

ত্রয়োদশ কেমুসাস বইমেলা রোববার শুরু হচ্ছে

দেশের প্রাচীন সাহিত্য প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয়...

সিসিক নির্বাচনে দুটি ভোট কেন্দ্রে ইভিএম

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট সিটি...

চুনারুঘাটে ব্যবসায়ী নেতা হত্যায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ব্যবসায়ী নেতা আবুল...