তারেক খানের কনডম পলিসি: বাঙালির ভাগ্যলিপি

,
প্রকাশিত : ১৫ জুন, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নাসিম আহমদ লস্কর
একটি দেশের ষোলো কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটির বেশি বিদেশে দাসবৃত্তি করছে! ভাবতেই নিজেকে ছোট মনে হয়! কান্না পায়। তারেক খানের কান্নার নাম বলতে পারি ‘কনডম পলিসি’।
শুধু কাঁদলে হয়ত নামটা অন্য কিছু হত। শুধু না কেঁদে তারেক খান দেখিয়েছেন কেন এত মানুষ বিদেশে দাসবৃত্তি করতে যায়। জেনে-শুনে। এবং যাওয়ার জন্য তারা কতটা মরিয়া হয়ে ওঠে!
আর দেশের ভেতরে সেইসব মানুষেরা, তাদের স্বজনরা কী করেন, কী করে বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাড় করেন, প্রশাসন কী করে, ইত্যাদি।
তারেক খান সাম্প্রতিক সময়ের একজন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক। যদিও তিনি বেশি পরিচিত নন। অনলাইনে তার বইয়ের রিভিউ দেখে পড়তে বিশেষ উৎসাহিত হই।
তারেক খান চান, দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র তথা সমগ্র বিশ্বের ইতিবাচক পরিবর্তন হোক। তিনি স্বপ্ন দেখেন নতুনত্বের। সেখানে প্রচলিত যে শাসনপদ্ধতি, যার ভিত শোষণের ওপর দাঁড়িয়ে, তারেক সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য উপায়-প্রক্রিয়াও নিয়ে এসেছেন তার উপন্যাসে এবং এ ব্যাপারে তারেক খান সত্য প্রকাশে নির্ভীক।
এ উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র তানজিব। তানজিবের বক্তব্যই লেখকের বক্তব্য। বাকি চরিত্রগুলো এসেছে কাহিনির স্বার্থে।
তানজিব এক তরুণ কলেজ শিক্ষক। ঘুণে ধরা সমাজের পরিবর্তন যার লক্ষ্য। ক্লাসে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে যখন কনডম সম্পর্কিত আলোচনা করেন তখন সবাই মজা লুটে কিন্তু ভাব দেখায় এমন যেন তারা বিব্রত হচ্ছে।
জনবিস্ফোরণ যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ। রাষ্ট্র চাইলে জনসংখ্যা হ্রাস করতে পারে। এটা করা দরকার কারণ জমি বাড়ানো যাচ্ছে না। আবার জমির ওপর নির্ভরতাও কমানো যাচ্ছে না।
উপন্যাসটির গঠনশৈলী ও চরিত্রায়ণ ব্যতিক্রমধর্মী। বেশির ভাগ উপন্যাসে দেখা যায় কাহিনির দীর্ঘসূত্রিতা। কিন্তু এখানে রয়েছে বিশ্লেষণ। তবে পড়লে মনে হয় বহুকাল ধরে একটা অবস্থার মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে মানুষ, পাঠক। কীভাবে সাঁতরে তীরে উঠতে হবে তারেক খান সে ব্যাপারেও সঠিক পরামর্শ হাজির করেছেন তার উপন্যাসে।
উপন্যাসটি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর মোহাম্মদ আজম বলেছেন, “কনডম পলিসি রাজনৈতিক উপন্যাসের এক নতুন দৃষ্টান্ত।”
মোহাম্মদ আজম আরো বলেছেন, “ছোট্ট কাহিনিটির মধ্যে আরেকটা ভারি ব্যাপার ঘটেছে। এর বিষয়ের বিস্তারটা যথেষ্ট বেশি। ছোট আকারের মধ্যে বড় বাস্তবতা; সেই বাস্তবতায় আবার নিখুঁত ছবি। কোনো কোনো অংশ প্রায় ফটোগ্রাফিক বাস্তবতার মতো। এ কথাটা আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখালেখি সম্পর্কে বলি। তারেক খানের এ উপন্যাসের ব্যাপারটা যদিও সেরকম নয়; কিন্তু এখানেও নানা ধরনের নিখুঁত বাস্তবতা, ডিটেল বাস্তবতা সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকরভাবে আছে। ওই ছোট্ট আয়তনের মধ্যে বিস্তারটা হয়েছে বেশ বড়। ওই ছোট আয়তনের মধ্যেই আছে ব্যক্তি; আছে কেন্দ্র ও প্রান্ত; আছে গ্রাম, আছে ঢাকা শহর; আছে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতির লোক-যারা রাষ্ট্র চালায় বা চালাবে এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এ রকম বড় আকারে তিনি কাজ করেছেন। এর আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এর আগে আমি ‘বান্ধাল’ পড়ার সময় দেখেছি এবং আলোচনায়ও শনাক্ত করেছিলাম, সেটা হলো ব্যক্তি-চরিত্রের সাথে উৎপাদন-বণ্টনের সম্পর্ক। ঢাকার লেখকদের একটা বড় অংশ এ ব্যাপারে সচেতন না থেকেই উপন্যাস লেখেন। কনডম পলিসির এই সচেতনতা খুব উপভোগ্য। একটা চরিত্র উৎপাদন-সম্পর্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে, ওই সম্পৃক্ততার বশেই অ্যাকশন বা রিঅ্যাকশনের সাথে যুক্ত হয়। এটা শুধু শ্রেণিগত ব্যাপার নয়। মুহূর্তের আরো নানান ডাইমেনশন থাকে। মানসিক অবস্থা, সংশিষ্ট অন্য চরিত্রগুলোর সাথে লেনদেন ইত্যাদি নানা অবস্থার একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ব্যক্তি তার সংলাপ উচ্চারণ করে। কাজে নীরত হয়, বা অন্যের কথায়-কাজে প্রতিক্রিয়া জানায়। তারেক খান এসব ডিটেলসের ক্ষেত্রে দারুণ সতর্ক ছিলেন। একটা চরিত্র হয়তো একটি মাত্র বাক্যে প্রকাশিত হচ্ছে, কিংবা শুধুই একটি শব্দে। হয়তো উচ্চারণটা শুরু হলো মাত্র; তারপরই ডট চিহ্ন। এ উপন্যাসের বয়ানরীতি অনুযায়ী হয়তো তার পরই বর্ণনার বিষয় পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কিন্তু ওই একটি শব্দেই বা অসমাপ্ত বাক্যেই পুরো পরিস্থিতি পাঠ করা যায়।
“তার মানে কনডম পলিসির মাইক্রোলেভেল বেশ উপন্যাসসম্মত; আবার একই সঙ্গে বিশিষ্ট। উপন্যাসসম্মত এই অর্থে যে, স্থান-কালের যে ধরনের জীবন্ত পরিস্থিতির মধ্যে উপলব্ধির একটা তাজা আবহ তৈরি করতে হয়, লেখক তা করতে পেরেছেন। পুরো পটভূমি এবং চরিত্রগুলো একত্রে মনের চোখে ধরা থাকলেই কেবল এ ধরনের সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিটেল সম্ভব। অন্যদিকে আবার এ বয়ান বিশিষ্ট। কারণ, এখানে ডিটেলস বিস্তীর্ণ পরিসরে সামগ্রিক ছবিটা তৈয়ার করে নাই। সংক্ষিপ্ততার মধ্যেই বিস্তারের কার্যকর আবহটা তৈরি করেছে। এই কাজটা তারেক করল কিভাবে? কাজটা তারেক করেছে বহু আগের একটা ন্যারেটিভ-টেকনিকে। স্ট্রিম অব কনশাসনেস পদ্ধতিতে। একটি অত্যন্ত পরিচিত সাহিত্যরচনা পদ্ধতি। বাংলায় আমরা একে বলি চেতনাপ্রবাহরীতি। গত শতকের তৃতীয় দশকের গোড়ায় জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফসহ বহু লেখক এ বর্ণনাপদ্ধতিকে অত্যন্ত কার্যকর রীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। বাংলায়ও কেউ কেউ লিখেছেন। এখানে সতর্কতার জন্য একটা কথা বলার দরকার বোধ করছি। আমার যেহেতু বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যের ইতিহাসের সাথে কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে, সে কারণে জানি, উপনিবেশিত মনোভঙ্গির কারণে পশ্চিমা সাহিত্যকলার নামে সাহিত্য-বিশ্লেষণ বাংলাভাষীদের এক পুরনো খাসিলত। বহু লেখকের উপন্যাস স্ট্রিম অব কনশাসনেস রীতিতে লেখা হয়েছে বলে বাজারে জাহির আছে। আদতে বাংলা ভাষায় রীতিটির চর্চা খুবই কম। স্ট্রিম অব কনশাসনেস একটা জটিল পদ্ধতি যা কাহিনিক্রম লঙ্ঘন করে, সময়ক্রম লঙ্ঘন করে, স্বাভাবিক ন্যারেটিভ ভঙ্গিকে লঙ্ঘন করে। ব্যক্তির নিজের মনোজগতের নিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত- প্রধানত অনিয়ন্ত্রিত; জ্ঞাত এবং অজ্ঞাত- প্রধানত অজ্ঞাত চিন্তাপ্রবাহকে সরাসরি বাক্যে-শব্দে ধরার একটি পদ্ধতি এটি। যেমন খুব ব্যাপকভাবে বলা হয়, কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসে স্ট্রিম অব কনশাসনেস আছে। আমি নিজে একাধিকবার এই উপন্যাস পড়েও এর সত্যতা পাই নি। এ উপন্যাসটি একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এর গুরুত্ব নির্দেশের জন্য চেতনাপ্রবাহরীতির বরাত প্রয়োজনীয় নয়।” (সূত্র: যঃঃঢ়ং://নরঃ.ষু/২গঔফখঊঙ)

শিক্ষার্থী; শাবিপ্রবি, সিলেট।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : ছুটি শেষে শাবি খুলছে কাল

আরও পড়ুন