জুবায়ের বলেছিল নামাজ পড়ে খাবে

প্রকাশিত : ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০     আপডেট : ৩ সপ্তাহ আগে
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: মা’কে বলে গিয়েছিল ছোট্ট জুবায়ের। এশার নামাজ পড়ে এসেই খাবে। না, সে তার কথা রাখতে পারেনি। মা সারাজীবন অপেক্ষায় থাকবেন। কিন্তু জুবায়ের কোনোদিন আর আসবে না। বরিশালের পটুয়াখালীতে স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্লেতে পড়তো জুবায়ের। ছিল সদা চঞ্চল স্বভাবের। বন্ধুদের মধ্যে সবসময় নেতৃত্ব দিতো।
শুক্রবার রাতে বাবার সঙ্গে মসজিদে যায়। যাওয়ার আগে মাকে নামাজ পড়ে এসে খাওয়ার কথা বলে যায়। এরপর তো সব শেষ।

জুবায়েরের মা রাহিমা বেগম হাসপাতালের করিডোরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন এবং বিলাপ করছিলেন। বলেন, আমার বাবা বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে বাসায় টিভিতে কার্টুন দেখছিল। এ সময় ওর বাবা নামাজ পড়তে মসজিদে যেতে ডাকেন। বাবার সঙ্গে সে নিয়মিত মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়তো। কিন্তু শুক্রবার রাতে ওর বাবা ডাকার পর জুবায়ের যেতে রাজি হয়নি। অনেক বুঝিয়ে যখন মসজিদে নিয়ে যায় এ সময় আমাকে বলে, ‘মা অনেক খিদা পেয়েছে। নামাজ শেষে বাসায় এসে ভাত খাবো’। কোথায় আমার জুবায়ের। আমি আর কোনোদিন ওর মুখে ভাত তুলতে পারবো না। আমার ছেলেকে শেষবার ভাতটা পর্যন্ত খাওয়াতে পারিনি। দগ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে আসলে মারা যাওয়ার আগে আমাকে বলে, মা আমি পানি খাবো। বেশি করে পানি দাও। অনেক পানি খাবো। আর কথা বলেনি আমার কলিজার টুকরা।

জুবায়েরের চাচা নাহিদ হাসান শাকিল মানবজমিনকে বলেন, নগরীর পশ্চিম তল্লা মসজিদের পাশেই একটি বাসায় ভাড়া থাকেন তারা। বাবা জুলহাস মিয়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। সন্ধ্যায় গার্মেন্ট থেকে বাসায় ফিরে মাগরিব ও এশার নামাজ জামায়াতের সঙ্গে পড়েন। সঙ্গে নিয়ে যেতেন একমাত্র সন্তান জুবায়েরকে। বাবা জুলহাস দগ্ধ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। শরীরের প্রায় পুরো অংশ ঝলসে গেছে। কথা বলতে পারছেন না। ছেলে মারা যাওয়ার খবর এখনো তাকে জানানো হয়নি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে জুবায়ের মারা যায়। তার শরীরের ৯৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।

জুবায়েরের প্রতিবেশী বলেন, আমার ছেলেসহ মোট ৫ বন্ধু একসঙ্গে খেলা করতো। খুব বেশি দুষ্টুমি করতো না। বাবা-মা দুজন চাকরি করাতে তাকে পড়ালেখার জন্য নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সম্প্রতি সে বেড়াতে আসে। গত শুক্রবার বাবার সঙ্গে একত্রে জুমার নামাজ পড়েছে শিশু জুবায়ের। এশার নামাজের ঠিক শেষ মুহূর্তে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গত শুক্রবার রাত ১১টায় মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ ওর কথা হয়। এ সময় মায়ের কাছে পানি খাওয়া শেষে নার্স ওর মাকে বের করে দেয়। কিছুক্ষণ পর আমরা সংবাদ পাই সে আর বেঁচে নেই।

কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ছিলেন রিফাত (১৮)। মসজিদে যাওয়ার আগে মাকে বলেন, নামাজ পড়ে বাসায় এসে শোল মাছ দিয়ে ভাত খাবো। কিন্তু এটাই যে তার শেষ যাওয়া জানতেন কি রিফাত বা তার মা। হাসপাতালের করিডোরে বিলাপ করছিলেন রিফাতের মা। রিফাতের মা জানায়, স্কুলে পড়ুয়া রিফাত খুবই শান্ত স্বভাবের ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি ছিল। রিফাত আমাকে বললো, ‘কি রান্না করেছো মা? বললাম শোল মাছ রান্না করেছি বাবা। তাড়াতাড়ি এসো। আমাকে বললো, মা নামাজ পড়ে বাসায় আসছি। বাসায় এসে ভাত খাবো’। আল্লাহ আমারে নিয়ে যাও। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোর রাতে মারা যায় রিফাত।

নিহত রিফাতের বাবা রিকশাচালক আনোয়ার হোসেনের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। আনোয়ার হোসেন বলেন, কোথায় গেল আমার বাবাটা। আমার বাবা নেই। আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছে। বাবাকে এখনো দেখতে পারলাম না। ছেলের কলেজের পরিচয়পত্র দেখিয়ে আনোয়ার বলেন, এই দেখেন আমার বাবা। আব্বা কোথায় আছো তুমি?
আমার সংসারে অনেক সুখ ছিল। আমার স্বামী দেখতে অনেক সুদর্শন ছিলেন। চেহারার মতো মনটাও ছিল সুন্দর। ছিলেন শিক্ষিত। সে স্থানীয় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। ভালো বেতন পেতেন। অফিস শেষে মসজিদে নামাজে চলে যেতেন। এভাবেই স্বামী ইব্রাহিম বিশ্বাসের (৪৫) কথা বলছিলেন স্ত্রী নাসরিন। তিনি বলেন, করোনার কারণে তিন মাস আগে তাকে অফিস থেকে বাদ দেয় কর্তৃপক্ষ। অফিসে প্রায় সাড়ে চার থেকে পৌনে পাঁচ লাখ টাকা পেতেন। এক টাকাও দেয়নি। স্বামীর কাজ না থাকাতে আমি বাসায় বসে দর্জির কাজ করতাম। আমি সব কাজ জানি। দুই ছেলে মেয়ে মাদ্রাসায় পড়ে। ছেলে কুরআনে হাফিজ। ঘটনার দিন মেয়ে বারবার বাসায় আসতে চেয়েছে মাদ্রাসা থেকে। হঠাৎ এক প্রতিবেশী বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করতে বলেন। এ সময় আমি মসজিদের দিকে পাগলের মতো ছুটে যাই। দেখি চারদিকে কেয়ামত। তার ফোনে ফোন দিচ্ছি অনবরত। ফোন বাজে। কিন্তু কেউ রিসিভ করে না। ভেবেছি কিছু হয়নি। এ সময় একজন পরিচিত ভাই আমার নম্বরে ফোন দিয়ে বলেন, ভাবি ভাইকে পেয়েছি। সর্বশেষ আমার সঙ্গে তার কথা হয়। হাসপাতালের বিছানায় কোলে মাথা রেখে বললেন, ‘বাসা থেকে ফ্যান নিয়ে এসো। আমার ফোনে টাকা রিচার্জ করে দিও’। তখনো বুঝতে পারিনি সে চলে যাবে। সংসারে আয় কম ছিল কিন্তু সুখের অভাব ছিল না আমাদের। আমার স্বামীর আয়েই মূলত সংসার চলেছে। এখন দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো। কি করবো।

এদিকে হাসপাতালে হতাহতদের দেখতে আসেন নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। তিনি বলেন, আমরা আহতদের রক্তদান সেবা, চিকিৎসা সহায়তা থেকে শুরু করে মৃতদের সৎকারে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জায়েদুল আলম বলেন, নিহতদের পরিবারের সদস্যরা যদি বিনা ময়নাতদন্তে তাদের স্বজনদের লাশ নিয়ে যেতে চান তাহলে সেভাবেই হস্তান্তর করা হবে। বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আমরা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছি। সূত্র: মানবজমিন


  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আরও পড়ুন

স্বাধীনতা দিবসে ৭জন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা দিল কেমুসাস

         মো. আব্দুল বাছিত: বীর মুক্তিযোদ্ধারা...

জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা

         সেলিম আউয়াল: খেলাফত আন্দোলন ও...

ইসহাক কাজলের সাংবাদিকতা ও লেখনী স্মরণীয় হয়ে থাকবে

         সাংবাদিক ইসহাক কাজল ছিলেন একজন...