জুতা

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

জুঁই ইসলাম:
মিতু উঠ স্কুলে যাবে সকাল ৮টা বাজে। মা আরেকটু ঘুমাই প্লিজ। আমি তোকে ৭টা থেকে ডাকছি প্রতিবারই বলছিস এই উঠবো এই উঠবো । কিন্তু তুই তো উঠছিস না। মা আজ উঠতে ইচ্ছে করছে না। আজ স্কুলে না গেলে হয় না?
মিতু আজ স্কুলে যাবে না শুনে মিতুর মা খুব অবাক হলেন মিতুর মুখে এই প্রথম তিনি শুনলেন সে স্কুলে যাবে না। আচ্ছা মা শরীর খারাপ হলে বাদ দে ঘুমা। মিতু অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। খুব ভালো ছাত্রী। ক্লাস ফাইবে গোন্ডেনপ্রাপ্ত। বয়স ১৩ বছর। খুব মিষ্টি একটি মেয়ে। মিতুর একটি মাত্র ছোট ভাই। সে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। বাবা একজন দিনমজুর। বাপ মা দু‘জনই লেখা-পড়া জানেন না তাই খুব ইচ্ছা দু“টো সন্তানকে লেখা-পড়া করানো যদিও খুবই অভাবের সংসার । মিতু‘র মার খুব ইচ্ছে মেয়েকে ডাক্তার বানাতে, মিতুর বাবা এই কথা শুনে প্রায়ই মিতুর মাকে বলেন সিলেটি ভাষায় ‘‘ফাড়া খেতাত হুতিয়া লাখ টাকার স্বপ্ন’ দেখা নাকি গরীবের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাই মিতুর মা এইসব স্বপ্ন দেখে দেখেই চুলগুলো সাদা করবে।
আজ মিতুর মন খারাপ। স্কুলে যায়নি সে। স্কুল সে কোন দিন মিস করে না। কিন্তু আজ যাওয়া সম্ভব না। কারন তার স্কুল যাওয়ার সু-জুতাটা হারিয়ে গেছে তার। তিন বছর থেকে একই জুতা সে পড়ে আসছে। জুতার অবস্থা খুবই খারাপ। বলা যায় এক কথায় বেহাল অবস্থা। এই বেহাল অবস্থার জুতা পরেও সে প্রতিদিন গিয়েছে। মিতুর ধারনা সে স্কুলে গেলেই তার সহপাঠিরা পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্যদশ জনের মত সুন্দর পরিচ্ছন্ন জুতা তার টা না একেবারে জরাজীর্ণ বলা যায় ক’জন ত বলেই দেয় এই মিতু এই জুতা ফেলে দেওয়ার মতো হয়ে গেছে। মিতু খুব লজ্জা পায় তাদের এই জাতীয় হাসি তামাশার কথা শুনে কিন্তু কিছু করার নাই। এই জুতা ছাড়া আর কোন জুতা নাই যে মিতু স্কুল পড়ে যাবে। প্রতি মিতু এই সাদা সু জুতাটাকে ঘষে ঘষে সুন্দর করে ধোয়ে রোদে শুকায়। অনেকবার এই জুতাটা মুচি দিয়ে ঠিক করিয়েছে মিতু। ক্লাসে মিতু এমনভাবে বসে যাতে তার পায়ের জুতাটা কেউ না দেখে। কিন্তু তার ধারনা ক্লাসে সবাই তার জুতা নিয়ে সমালোচনা করে। তার পায়ের দিকে তাকিয়ে তাকে। গতকাল স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে খুব গরম লাগছিল তাই মিতু জুতাটা ক্লাসে রেখে বাইরে হাটছিল। কিন্তু ক্লাসে এসে সে আর জুতটা পায়নি। জুতা না পেয়ে সে অনেক কেঁদেছে, যথাসম্ভব সব জায়গা খুঁজেছে কিন্তু পাইনি। যাও ছিল ছেঁড়া জুতা কোন মতে যাওয়া আসার তাও গেল। ক্লাসের সবাই মিতুর জুতা হারিয়ে যাওয়া কথা শুনে বলছে মিতু এইবার তুই একটা নতুন জুতা কিনবে। কেউ কেউ তো হেসে লুঠোপুঠি খেয়ে বলেছে এই ফকির মার্কা জুতা হারিয়েছিস খুব ভালো হয়েছে। ওদের হাসি-ঠাট্টা দেখে মিতুর চোখে পানি জমেছে। ক্লাসে মিতুর দু‘জন কাছের বান্ধবী মিতুকে জড়িয়ে ধরে বললো তুই চিন্তা করিসনে আমরা জুতাটা খুঁজবো দেখি পাই কি-না।
সহপাঠিদের জুতা নিয়ে নানা বার্তা শুনে মিতু মনে মনে শুধু ভাবে তোরা যে যা বলিস – তোরা একটা হারালে ১০ টা কিনবে কিন্তু আমি তো কাল থেকে স্কুলই আসতেই পারব না। আমার জুতা হারিয়ে গেছে। আর বাবা তো আমাকে জুতা কিনেও দেবেন না। খুব মন খারাপ করে মিতু বাড়ির দিকে রওয়ানা হল।
আজ স্কুলে না যাওয়াতে মিতুর মা জিজ্ঞেস করলেন মা তুর কী হয়েছে? তুর মুখে হাসি নাই, স্কুলেও গেলে না। বল কি হয়েছে? মা বকা দিবে নাতো ? না বল কি হয়েছে? মা আমার স্কুল সু হারিয়ে গেছে গতকাল। জুতা ছাড়া কি করে স্কুল যাবো ?
মার চোখে বিষন্নতা দেখে মিতু মা-কে সান্তনা দিয়ে বলে মা বাবাকে বল আমাকে একটা জুতা কিনে দিতে। মারে আমি তো বলবো কিন্তু তুর বাবা সংসার চালাতে এখন অনেক কষ্ট হয় আর তুকে এখন জুতা কিনে এনে দিবে? মা আমি জানি তো বাবা দিতে পারবেন না তাই তো ছেঁড়া জুতাকে বার বার ঠিক করে এতদিন চলেছি কিন্তু ্এখন হারিয়ে গেলো তো কি করবো?
পিটি সু ছাড়া স্কলে ঢুকতে দিবে না। আর সু ছাড়া স্কুলে গেলে স্যাররা অপমান করেন সবার সামনে। মিতুর মা বললেন তুর স্যাররা কি বুজেন না আমাদের মত হত দরিদ্র গরীবের কথা। না মা পিটি করার সময় যদি পিটি সু না থাকে লাইন থেকে বের করে নিয়ে সবার সামনে বকাঝকা করে অপমান করেন। মা আমি প্রয়োজনে না খেয়ে থাকব সেই টাকা দিয়ে বল বাবাকে জুতা কিনে দিতে। আমি স্কুল যেতে চাই, পড়তে চাই মা। স্কুল ছাড়া আমার ভালো লাগে না কিছু।
মিতুর কথা শুনে মা-র চোখেও পানি এসে গেল।
রাতে মিতুর বাবা ঘরে ফিরলেন মিতু ভয়ে ভয়ে বাবাকে জুতার কথা জানালো। বাবা বললেন ঠিক আছে ক‘দিন যাক এখন তো মা হাতে টাকা নেই কি করে আনবো ? বাবা আমি কি এতদিন স্কুল যাবো না ? জুতা ছাড়া তো স্কুলে যাওয়া সম্ভব না, আর তুমি তো বলেছিলে আমি এবার বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হলে জুতা কিনে দিবে কিন্তু আজও তো দিলে না বাবা। মারে টাকা থাকলে এখনই এনে দিতাম। আমার কি ইচ্ছা করে না কিন্তু পারি নারে মা। বাবা আমি বুজি তোমার কষ্ট কিন্তু আমার তো কিছু করার নাই। মিতু কাঁদছে দেখে বাবার মনও খারাপ হয়ে যায়। মিতু বাবাকে বলে গরীবদের পড়া লেখা না করাটাই ভালো তাই না বাবা? না মা এ কথা বলতে নেই কষ্টে করে জীবনে যারা বড় হয়েছেন তারা খাঁটি মানুষ। আর তুইও একদিন খাঁটি মানুষ হবে আমার বিশ্বাস।
মিতু স্কুলে যায় না ৫ দিন হয়ে গেল। খুব মন খারাপ করে বসে থাকে। কি করবে বুজে উঠতে পারে না। বাবা ঘরে এলেই রোজ ভাবে এই বুজি বাবা জুতা নিয়ে এলেন কিন্তু না। দু’দিন তো পায়ের মাপও নিয়ে গেলেন কিন্তু রাতে খালি হাতেই ঘরে ফিরেন।
মেয়ে রোজ রোজ জুতার কথা বলে কিন্তু আনতে পারছেন না, এ নিয়ে মনে মনে মিতুর বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে। কি করে আনবেন একটা জুতা কিনতে কম করে হলেও ৭০০ / ৮০০ এই পরিমান টাকা তো এখন হাতে নেই। তারপরও মনে মনে ঠিক করেছন আজ একবার মাকের্ট যাবেন মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যায় না। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে প্রায়।
হাতে মাত্র ৩০০ টাকা নিয়ে মাকের্ট ঢুকলেন। এক দোকান পর অন্য দোকান শুধু ঘুরছেন কিন্ত দরদাম হচ্ছে না। জুতার অনেক দাম। অনেক ঘুরাঘুরি করে তিনি এ দামে কোন জুতা কিনতে পারলেন না। বাড়ি ফিরে এলেন্।
ঘরে এসে দেখেন মিতু খুব জ্বর এল। মিতুর মা মাথায় পানি ঢালছেন। মিতুর বাবা মিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই দেখেন অনেক জ্বর। মিতুর বাবা এই অবস্থা দেখে পাশের ফার্মেসির ডাক্তারকে নিয়ে এলেন। অতিরিক্ত জ্বরে মিতু আবুল-তাবুল কথা বলছে কোনো কিছু বুজা না গেলেও মিতুর বাবা বুজতে পারছেন মিতু বার বার বলছে স্কুল যাবো, স্কুল যাবো… ।
ডাক্তার ঔষুধ লিখে দিয়ে বললেন মেয়েটা কোন কিছু নিয়ে খুব টেনশনে আছে আর বয়ঃসন্ধিকালের বাচ্চারা কোনো কিছু নিয়ে অতিরিক্ত টেনশনের কারণে হঠাৎ এই রকম জ্বর আসতে পারে।
মিতুর মা-বাবা দু‘জনই সারা রাত মিতুর পাশে বসে রাত কাটালেন। বোনের এই অবস্থা দেখে মিতুর ছোট ভাই বললো বাবা-মা আমার পড়ালেখা ভালো লাগে না আমার তো স্কুল জুতা আছে-আপাকে দিয়ে দাও। আমি পড়তে চাই চাই না । আমি স্কুলে যেতে চাই না। পড়ালেখা করে কি সবাই আজকাল মানুষ হয় ? পড়ালেখা না করেও অনেক আদর্শবান মানুষ এ সমাজে আছেন যারা স্কুলে জীবনেও যাননি।
আজ মিতু একটু সুস্থ তাই বাসায় পড়ছিল বসে বসে। এমন সময় তার কাছের দু‘বান্ধবী এসে জানালো মিতু তোর জুতা পাওয়া গেছে ! সত্যি ? কোথায় রে ? এই দেখ। এটা তো দেখি নতুন জুতা । এটা তো আমার না। আমরা দু’জন কিনে এনেছি। কাল স্কুলে পিকনিক হবে। রাজ্জাক স্যার তুর জুতার খবর শুনে আমাদের টাকা দিয়েছেন। তাই কিনে আনছি। তিনি সব জানেন তোর বাবার সাথে উনার দেখা হয়েছে। স্যর বলেছেন আমাদের সাথে এখনই তুই স্কুলে যেতে। আজ বড় স্যাররা আসবেন স্কুল ভিজিট করতে। তুই ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল তুকে তো উনারা খুঁজবেনই। ওদের কথা শুনে মিতুর চোখে মুখে খুশীর ঝিলিক।
নতুন জুতা পড়ে সে স্কুলে গেলেও তার হারিয়ে যাওয়া ছেড়া জরাজীর্ণ জুতাকে চারিদিকে মনে মনে খুঁজছিল। পুরনো নষ্ট জিনিসের প্রতিও মানুষের টান থাকে/ মায়া থাকে মিতু নতুন জুতা পড়ে হাড়ে হাড়ে সেটা টের পাচ্ছে।
রাস্তায় ক্লাসমিট আবিরের সাথে দেখা হলে আবির মিতুর কাছে ক্ষমা চায় বলে সেদিন মজা করে আমি তোর জুতা লুকিয়ে ছিলাম। আমি যেখানে লুকিয়ে রেখেছিলাম পরে দেখি সে জায়গায় জুতা নেই। অনেক খুঁজছি কিন্তু পাইনি তাই ভয়ে কাউকে বলিনি। দুঃখিত মিতু, তোকে কষ্ট দিয়েছি। তবে আমার কারণে তুই এখন একটা নতুন একটা জুতা পেয়েছিস দেখে ভাল লাগছে। ধন্যবাদ দে আমাকে।
০৪.০২.১৯

আরও পড়ুন



বঙ্গবন্ধু না হলে আমরা স্বাধীনতা পেতাম না

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :  কোম্পানীগঞ্জ...

হযরত শাহজালাল রহ. লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদরাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন আল্লামা মুফতি...

যুক্তরাস্ট্রের ৮টি রাজ্যে তুলে দেয়া হচ্ছে লকডাউন

এমদাদ চৌধুরী দীপু(নিউইয়র্ক,৩০,এপ্রিল,২০২০ ইং) যুক্তরাস্টের...