জীবন চলে জীবনের নিয়মে

,
প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অবঃ): দশ ভাই-বোনের মধ্যে কেবল আমার জন্মই হয়েছিল নাকি আমাদের গ্রামে পাঁচপাড়ায়। ১৯৪৯ সালে। ছোট বেলার তেমন কোন স্মৃতিই আমার মনে নেই-কেবল মনে পড়ে সাঁতার শেখানোর জন্য বাবা যখন বাড়ির বড় পুকুরের মাঝখানে ছেড়ে অসতেন আর আমি জলে হাবুডুবু খেতে খেতে কোন রকমে পারে আসার চেষ্টা করতাম আর পুকুরের জল খেয়ে খেয়ে সাঁতার শিখে গিয়েছিলাম-সেই স্মৃতিটুকু কিছুটা আবছা আবছা মনে পড়ে-তখন মনে হত বাবা বুঝি বড়ই নির্দয়-না হলে আমাকে মাঝ পুকুরে অথৈ জলে এভাবে ছেড়ে আসতেন না। এখন বুঝি ওটাই ছিল জীবনে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার প্রথম পাঠ। এখনও সে শিক্ষা আমার জীবনে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে-অনুপ্রেরণা দিচ্ছে জীবনের চলার পথে।

আমার জীবনের শুরুটা হয়েছিল এমনি ভাবে সেই গ্রামের সবুজ শ্যামলিমায়। কিন্তু বাবা, যিনি ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক, আমাদের গোটা পরিবারকে নিয়ে শহরে পাড়ি দিয়েছিলেন একটাই উদ্দেশ্য ছিল সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া। অভাব অনটন আর দারিদ্র্যের মধ্যে আমাদের বেড়ে উঠা তবে কখনো মূল লক্ষ্য থেকে আমাদের বিচ্যুত হতে দেন নি আমার বাবা-মা, আমাদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে যেতে এতটুকুও কার্পণ্য করেননি। শত দুঃখকষ্টে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যান আমার বাবা-মা। জানি না আমরা ভাই-বোনেরা বাবা মায়ের স্বপ্ন কতটুকু পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম?

 

১৯৬৪ সালে মেট্রিক বা এস এস সি পাশ করেই পরিবারের অভাব অনটন দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে চাকুরির জন্য কিছু কিছু চেষ্টা করেছিলাম। তখন নতুন করে দেশে বিদেশি আর্থিক সাহায্যে শুরু হয়েছিল ‘ম্যালেরিয়া এরিডিকেশন প্রোগ্রাম’ নামে একটি প্রকল্প। আমি সেখানে ‘মাইক্রস্কপিস্ট’ নামে একটি অতি সাধারণ পোস্টে ইন্টারভিউ দিয়ে বিফল হয়েছিলাম কারণ বলা হল আমার ‘বয়স কম’! তারপরেও বনবিভাগের রেঞ্জার পদের জন্য আরো একবার ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম কিন্তু ঐ একই কারণে চাকুরীটা হল না। শেষ পর্যন্ত এম সি কলেজে ঘুরে বেড়ানোর সময় সেনাবাহিনীর কমিশন্ড র‌্যাঙ্কে অফিসার পদে একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় ইন্টারভিউ দিয়ে প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হয়ে গেলাম পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর জন্য এবং চূড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত হয়ে গেলাম। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলাম ১৯৬৭ সালের নভেম্বর মাসে।

জন্মভূমি থেকে পনেরশত মাইল দূরে পাকিস্তানের এবটাবাদের পাহাড় ঘেরা রুক্ষ এলাকায় সম্পূর্ণ বৈরী আবহাওয়া এবং পরিবেশে পি এম এ তে কঠিন সামরিক প্রশিক্ষণ প্রথম প্রথম খাপ খাইয়ে নেয়াটা ছিল খুবই কঠিন-একেবারেই অভ্যস্ত ছিলাম না তাই ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়ার কোন সুযোগ ছিল না। দু’বছর কঠিন পরিশ্রমের পর শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কমিশন্ড অফিসার হিসাবে আর্টিলারি কোরে কমিশন লাভ করি। যারা পাকিস্তানের ক্যাডেট ছিল তাদের মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজন আমাদের পাসিংআউট প্যারেডে উপস্থিত ছিলেন-আমাদের কেউ ছিলেন না-স্বাভাবিক কারণেই।
চাকুরীকালিন সময়েই ১৯৭০ সালেই আমার ইউনিট ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু বিধিবাম পাকিস্তানের কোয়েটার ইনফেনট্রি স্কুলে প্রশিক্ষণের জন্য চলে যেতে হয়। ফলে প্রচুর আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ক’মাস পরেই শুরু হওয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিতে ব্যর্থ হলাম। তবে বন্দী অবস্থায়ও পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। বৈরী পরিবেশে এবং দুর্ভাগ্যক্রমে বার বার ব্যর্থ হতে হয়েছে। দীর্ঘ দু বছর পাকিস্তানের বিভিন্ন দুর্গে বন্দিত্ব ও অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতে ফিরে এসেছিলাম ১৯৭৩ সালে। নতুন দেশে নতুন পরিবেশে নতুন করে আবার সৈনিক জীবন শুরু করলাম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তখন একেবারে নতুন। মাত্র শুরু করেছে নিজেদের পুনর্গঠন। আমরা যারা পাকিস্তানের বন্দিত্ব থেকে সদ্য মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম আমরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করতে। ইতোমধ্যে ময়মনসিংহে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত হলাম। গ্রামগঞ্জে ছুটে বেড়ালাম দিনরাত অবৈধ অস্ত্রের সন্ধানে সফলতাও এসেছিল-কিন্তু ক’দিন পরই অভিযান অসমাপ্ত রেখেই অভিযান সমাপ্ত করতে আদেশ আসে।

দিন যায়, কর্মক্ষেত্রে আমার পদোন্নতি হতে থাকে সময়মতই। কর্নেল পদে র‌্যাঙ্ক পরিয়ে দেন স্বয়ং তৎকালিন বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ-জীবনের একটি স্মরনীয় ঘটনা-খুব কম সংখ্যক অফিসারের এমন সৌভাগ্য হয়েছিল! আর যখন ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পাই, সেদিন ভোরবেলা আমার জি ও সি জেনারেল মাহমুদুল হাসান ফোন করে আমার স্ত্রীকে ব্রিগেডিয়ার পদের ব্যাজেজ অব র‌্যাঙ্ক পরিয়ে দিতে অনুরোধ করেন-এও মনে রাখার মত এক অনন্য ঘটনা।

১৯৯০-এ উপসাগরীয় যুদ্ধ অংশ নেয়ার জন্য ডেপুটি কমান্ডার হিসাবে সৌদিআরবের দাহরানে প্রায় আড়াই হাজার সৈন্য নিয়ে যাত্রা করি-সকল সৈন্যদের দায়িত্বটা ছিল অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং তাও আবার বিদেশের মাটিতে যুদ্ধাবস্থায়। দেশে তখন রাজনৈতিক উত্থান পতন চলছে এরশাদ সরকারের পতন আর নতুন সরকার গঠন ইত্যাদি। আমরা আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনেই ব্যস্ত। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এসে ক’দিনের মধ্যেই ভারতে বাংলাদেশের সামরিক উপদেষ্টা হিসাবে বদলী হয়ে নয়াদিল্লি চলে যেতে হল। যদিও একটি অত্যন্ত লোভনীয় পদ ছিল কিন্ত তবুও দেশ ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছিল। ভারতের দিনগুলো বেশ ভালোই কেটেছে। ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে আবারও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যথারীতি ব্রিগেড কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ লাভ করি। তারপর সেনাবাহিনীর প্রধান ¯্রােতধারা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে পোস্টিং হয়। আমি অবশ্য উপভোগ করেছি সেনাবাহিনীর প্রত্যেকটি দিন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব পালনের সময়, উপসাগরীয় যুদ্ধের কঠিন দিনগুলো, ভারতে বাংলাদেশের সামরিক উপদেষ্টা হিসাবে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের দিনগুলো এবং টি বোর্ডের দিনগুলো।

তারপর …‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে : ডানার রৌদ্রর গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙ ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন।’
(বনলতা সেন, জীবনানন্দ দাশ)
অবশেষে ১৯৯৯ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে নতুন করে জীবন সংগ্রামের প্রস্তুতি নেই।
**********
অবসর যে কত কষ্টদায়ক হতে পারে তা উপলব্ধি করা সহজ নয়-যতক্ষণ না নিজে কেউ সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। প্রচন্ড কর্মকোলাহল থেকে হঠাৎ করে কর্মহীন সময় দুর্বিষহ লাগছিল। নাইজেরিয়ায় একটি ফরাসি কোম্পানিতে চাকুরী নিয়ে লেগোস চলে গেলাম। কিন্ত ক’মাস পরেই সেখান থেকে দেশে ফিরে আসলাম। এবার পরিবার পরিজন নিয়ে চলে গেলাম আমেরিকায়-ক’দিন কাজও করলাম একটি বীমা কোম্পানিতে, মেয়েদের স্কুল কলেজে ভর্তিও করিয়ে ছিলাম-মেয়েরা আমাকে ওখানে কাজ করতে আপত্তি করে বললো, ‘জীবনে অনেক তো কাজ করলে বাবা, এবার ফিরে চল দেশে’। ওরা আবার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসলো। কিছুদিন আইবিআইটি তে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করে ওটাও ছেড়ে দিলাম ।

আমি কেন জানি অনেক আগেই স্থির করে রেখেছিলাম অবসর গ্রহণের পর সিলেটেই বসবাস করবো। হয়ত ভেবেছিলাম যতক্ষণ কর্মক্ষম থাকবো দেশের ছেলে-মেয়েদের জন্য যদি পারি কিছু করবো বিধাতা সেই ইচ্ছাটাই পূরণ করলেন। জনাব হাফিজ মজুমদার সিলেটে একটি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন আর সেই সাথে খুঁজছিলেন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য একজন অধ্যক্ষÑআমি রাজি হয়ে গেলাম। চালচুলো কিছুই নাই, সব কিছু করতে হবে একেবারে শুরু থেকে। আত্মবিশ্বাস আর মজুমদার সাহেবের একনিষ্ঠ সহযোগিতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো স্কলার্সহোম-সিলেটের প্রথম ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুরুটা ছিল এক কষ্ট সাধ্য অভিযান ঘরে ঘরে গিয়ে ছাত্র-শিক্ষক যোগাড় করতে হয়েছিল। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউই ভরসা করতে পাচ্ছিল না অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করাতে হয়েছিল ছাত্র, অভিভাবক আর শিক্ষকদের। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৯ জন ছাত্র আর মাত্র ৯ জন শিক্ষক নিয়ে ২০০২ সালে ১ সেপ্টেম্বর, যাত্রা শুরু করেছিলাম স্কলার্সহোমের। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। ধীরে ধীরে এখন স্কলার্সহোম সিলেট শহরেই ৬ টি ক্যম্পাস, প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী আর প্রায় পাঁচ শত শিক্ষক মন্ডলী নিয়ে সিলেটের শিক্ষা জগতে এক বিশাল এবং চমৎকার পরিবার। প্রত্যেকটি পরীক্ষায় শত ভাগ সাফল্য নিয়ে ঈর্ষণীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে এগিয়ে চলেছে। সাফল্য এসেছে সিলেটের আপামর জনগণের সহযোগিতা আর শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে। এটাই সম্ভবত জীবনের শেষ কর্মকাল-তবে পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করছি উপভোগ করছি প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ আজ পর্যন্ত ।

*****


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : কথা দিয়ে

আরও পড়ুন

কাম্পানীগঞ্জে ৫ ডাকাত গ্রেফতার

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :  সিলেটের...

দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আ.লীগের সভাপতি সাইফুল, সম্পাদক শামীম

        সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী...

জীবন কবিতায় অনন্য কবি

        মীনাক্ষি সাহা: কিছু কথা কেবল...

মানুষের মুক্তির জন্য রাজপথে সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোড়ালো করার শপথ

        বাংলাদেশের মহান মুক্তিযোদ্ধের ঠিক আগে...