‘জাহানারা বেগম মিনা’র বড় নাতি

,
প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর, ২০২১     আপডেট : ২ সপ্তাহ আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মিদহাদ আহমদ :
মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে আমার নানি খাদ্যনালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আম্মুরা পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে আমার আম্মুই সবার বড়৷ নানি যখন মারা যান, আমার ছোট খালা তখন ছয়/সাত বছরের হবেন৷ আম্মু আমাকে এখনও মাঝেমধ্য ওনার ভাইদের নামে ভুল করে ডেকে বসেন। আমি বুঝতে পারি, আমাকে সন্তান হিসেব লালন পালনের আগে আম্মু ওনার ভাই বোনদের সন্তান হিসেবে দেখেছেন। এজন্যই এই ভুল প্রায়শই হয় তাঁর। আম্মুর কাছে শুনেছি, আমার মামা খালাদের গোছল করানো থেকে শুরু করে স্কুলে দিয়ে আসা, নিয়ে যাওয়া সব আমার আম্মুই করেছেন। এখনও আম্মু মাঝেমধ্যে বলেন, আমার মা বলে গিয়েছেন আমি যেনো আমার ভাই বোনদের দেখে রাখি৷
আজ আমার নানির পঁচিশ তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমি আমার নানিকে দেখিনি কখনো। আমার জন্মের আগেই আমার নানি মারা গিয়েছিলেন। নানির বাঁধাই করা দুইটা ছবি আছে। আম্মু দেখতে নানির মতো হোননি। নানির লম্বাটে গঠন আর ইষৎ কালো চুল দেখে আমার আফসোস হয়, ইশ আমি তো আমার নানিকে দেখিনি! আমার নানির উপর মুগ্ধতার আরেকটা কারণ হলো আমার আম্মু৷ আমার আম্মুর মতো মেয়ে যে নারী গর্ভে ধরেছিলেন, সেই নারী বাস্তবে, প্রজ্ঞায়, জ্ঞানে, গরিমায়, লাবণ্যে কতটুকু যে ঐশ্বর্যপূর্ণ সহজ হবেন তা আর বলার ইয়ত্তা রাখে না। শুনেছি গ্রামে নাকি আমার নানিই একমাত্র মহিলা ছিলেন যিনি ইঞ্জেকশন পুশ করা জানতেন সেই সময়ে৷ এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে লোক এসে নানিকে নিয়ে যেতেন ইঞ্জেকশন পুশ করে দেওয়ার জন্য৷ গ্রামের মেয়ে বউদের এখানে ওখানে যাবার জন্য গহনা প্রয়োজন। সবাই অনায়াসে চলে আসতেন আমার নানির কাছে। এখনও নানাবাড়িতে গেলে আশেপাশের মানুষদের মুখে আফসোস শুনি, ‘ইশ রুজির এক মা আছিল!’
মানবজন্মে কিছুটা আফসোস থাকতে হয় বোধহয়। আমার আফসোস খুব একটা নেই। তবে এই আফসোস আমাকে কষ্ট দেয় যে আমি আমার নানির আদর পাইনি। আমার নানিকে জড়িয়ে ধরে কোন খুশির সংবাদ দিতে পারিনি। আমার নানির কাছে আম্মুর নামে নালিশ দিতে পারিনি আর আরেকটা আফসোস সেটা হলো, নানির কানে কানে বলতে পারিনি যে, ‘আমার আম্মুর মতো মেয়ে জন্ম দেওয়ায় আপনাকে অনেক ধন্যবাদ’।
বেঁচে থাকলে আজ আমার নানির বয়স হতো ঊনষাট বছর৷ আধাপাকা চুলের ভেতর একটা কচুপাতা রঙের শাড়িতে আমার নানিকে বোধহয় রাণীর মতো দেখাতো৷ সুপারি খেলে হয়তো বকাঝকা দিতাম নানিকে। আমার বকা শুনে হয়তো আমার নানি তাঁর দাঁতগুলো ঝকঝকে রাখতেন সবসময়৷ বাইরে থেকে ঘেমে নেয়ে বাসায় আসলে, নানিই মনেহয় ফ্যান ছেড়ে দিয়ে লেবুপানি বানিয়ে নিয়ে আসতেন সামনে৷ পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলে হয়তো নানিই পাশে বসে বলতেন, ‘আরেহ আমার মিদহাদ, এইটা তো কিছুই না, সামনে ভালো হবেই।’ আর ভালোকিছু করলে হয়তো নানি নিজেই আমার কাছে ট্রিট চেয়ে বসতেন। একসাথে নানি-নাতি ঘুরতাম, খেতাম, সময় কাটাতাম! কী সব কল্পনা আমার! অথচ এসব কল্পনার ছিটেফোঁটাও আমার জীবনে এলো না। এ যে আমার জন্মের আফসোস মালিক!
আল্লাহ, আমার নানির সাথে বেহেশতে আমাকে খুব করে সময় কাটানোর সুযোগ করে দিও। আমার আম্মু, ভাই আর বোন বাদে আমার নানিই একমাত্র ব্যক্তি যাকে দেখিনি অথচ আমি তাঁকে অনুভব, উপলব্ধি করি প্রতিটা মুহূর্তে। এই জীবনের শেষে পরজীবন আমার পরম জনদের সাথেই যেনো হয় মালিক। নানির বড় নাতি, নানির জন্য দোয়া আর আফসোস ছাড়া কিচ্ছুই করতে পারবে না৷ আল্লাহ আমার নানিকে যেনো জান্নাতুল ফিরদৌস দান করেন৷ সম্মানিত মহিলাদের কাতারে যেনো আমার নানির জায়গা হয় প্রভু। আমার জীবনের প্রধান আফসোসের নারীকে আবার আমার জীবনের সাথে মিলিয়ে দিও কোন এক সময়ে প্লিজ।
১৩ অক্টোবর ১৯৯৬- ১৩ অক্টোবর ২০২১


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন