জামান ভাইয়ের স্মৃতির ছায়ায়

,
প্রকাশিত : ২১ অক্টোবর, ২০২০     আপডেট : ৬ মাস আগে
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

সেলিম আউয়াল :
চিন্তায় কেউ মক্কা, কেউ মস্কো, কেউ পিকিং, নানা জনের নানা গন্তব্য-কিন্তু বসতেন সবাই কাছাকাছি। জম্পেস আড্ডা হতো, ভাবের বিনিময় হতো নিজেদের মধ্যে, বন্ধুত্বের সৌরভ বইতো, নিজেদের মধ্যে খুনসুটিও হতো-চিন্তায় বহুদূর হলেও বন্ধুত্বে ছিলেন তারা কাছাকাছি। এটি ছিলো সিলেটে ছাপাঘরের লেখকদের আড্ডার কথা। জামান মাহবুব লিখেছেন-‘জিন্দাবাজার পয়েন্টের পশ্চিম—উত্তর কোণে ছোট্ট একটা প্রেস ‘‘ছাপাঘর’। টিনের পুরনো ঘর। চেয়ার—টেবিল নড়বড়ে। মেশিনপত্র মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে কী করে যে টিকেছিল, তা—ই বিস্ময়কর। সিসার অক্ষর। সিরাজ আহমদ ও পুস্পরানি দাস কম্পোজ করেন। ছাপা হয় হাফ—ডিমাই ট্রেডল মেশিনে। মেশিনম্যান আবদুন নূর পায়ের চাপে ধীরলয়ে কাগজ ছেপে যান। ছাপাঘরের মালিক আকসার বকস। বন্ধুবৎসল, সজ্জন লোক।…ছাপাঘরের আড্ডায় মাঝে মাঝে আসতেন দিলওয়ার, চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ, আফজাল চৌধুরী, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ নূরুল হক, মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সুনির্মল কুমার দেব মীনসহ আরো অনেকেই। আর প্রায় নিয়মিত আসা—যাওয়া করতেন নৃপেন্দ্রলাল দাশ, তবারক হোসেইন, মাহমুদ হক, শামসুল করিম কয়েস, জামান মাহবুব, তুষার কর, রাগিব হোসেন চৌধুরী, মহিউদ্দিন শীরু, খলিলুর রহমান কাসেমী, মুকুল আশরাফ, আজিজুর রহমান, গোলাম মওলা, বুদ্ধদেব চৌধুরী, ভবতোষ রায় বর্মণ রানা, ভবতোষ চৌধুরী, সেলু বাসিত, মাহবুবুর রহমান, আজিজ আহমদ সেলিম, ভীষ্মদেব চৌধুরী, কুমার দিলীপ কর, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ইশতিয়াকুল হোসেন, লিয়াকত আলী, সৈয়দ আলী আহমদ, মোস্তফা বাহার, কাশীনাথ ভট্টাচার্য, হারুনুজ্জামান চৌধুরী, নিজাম উদ্দিন সালেহ, শাহাদাত করিম, রফিকুর রহমান লজু, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।’
ছাপাঘরের সেই সব আড্ডায় তারা যে কতো মজা করতেন, আজকাল ভাবাই যায় নাÑ‘বন্ধুদের মধ্যে কুমার দিলীপ কর ছিল সবার প্রিয়। সরেস কথাবার্তা ও বন্ধুবাৎসল্যে তার জুড়ি নেই। সে একাধারে কবি, গল্পকার, গীতিকার, গায়ক, ছড়াকার, সম্পাদকÑকী নয়? তার সম্পাদনায় বেশ কটি লিটল ম্যাগাজিন বের হওয়ায় পরিচিতিও ছিল ব্যাপক। ঐ বয়সে তার ভিজিটিং কার্ডে পরিচিতির যে দীর্ঘবহর, তা যে কারো কাছেই ছিল ঈর্ষণীয়। আলোর মুখ দেখেনি তেমন বহুসংখ্যক পত্রিকার সম্পাদক ছিল সে। প্রশ্ন করলে বলত-‘সবুর কর, বেরুবে।’ ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরকে পটানোর জন্য তার অভিনব একটি কৌশল ছিল। একান্তে ডেকে নিয়ে বলতÑ‘বুঝলি, সিলেটে প্রতিভা থাকলে তিনটি আছে। এক. তুই, দুই.কুমার দিলীপ কর আর তিন. মোহাম্মদ আকসার বকস।’ এই ‘তুই’ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতো। কিন্তু সে এবং মোহাম্মদ আকসার বকস ছিল কমন। প্রেস থাকার সুবাদে আকসার বকসের প্রতি তার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব ছিল।’
জামান মাহবুব একজন গল্পকার। কিন্তু সিলেটের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে তার পরিচয় শিশু একাডেমির ‘মাহবুবুজ্জামান স্যার’ অথাব ‘জামান ভাই’। তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সিলেট জেলা শাখার জেলা সংগঠক (জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা) হিসেবে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ এপ্রিল থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তেত্রিশ বছর দায়িত্ব পালন করে অবসর নেন। সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের দর্শা গ্রামের চৌধুরীবাড়িতে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ অক্টোবর জামান মাহবুবের জন্ম। তিনি ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। জামান মাহবুব বিভিন্ন সময় সাহিত্য সংকলন—স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থÑ অনুর গল্প, লাল কাতান। ‘ঝরণাতলার নির্জনে’ তাঁর স্মৃতিকথাগ্রন্থ; একশত তেতাল্লিশ পৃষ্ঠার বইটিতে রয়েছে বিভিন্ন লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী, সংগঠককে নিয়ে স্মৃতিচারণ, শৈশবের ঈদস্মৃতি, কলেজের স্মৃতি এবং শিশু একাডেমির বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে স্মৃতিচারণমুলক একত্রিশটি লেখা। বইটি একুশে বইমেলা ফেব্রুয়ারি ২০১৮—তে বের করে চৈতন্য, সিলেট।
সিলেটের লেখকদের নাম খাটো করার একটি মজার বিষয় লিখেছেন জামান মাহবুব,‘মাহমুদ হকের কাঁচি তুষার কান্তি করকে তুষার কর, আলী মোস্তফা চৌধুরীকে মোস্তফা বাহার, এবিএম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে সিরাজ চৌধুরী, নূর—ই ইসলাম সেলুকে সেলু বাসিত, আবুল কাশেম মিলুকে মিলু কাশেমÑএমনি কত নবীন লিখিয়ের সুদীর্ঘ নামের যে অঙ্গছেদন করল, তার হিসেবে নেই। তাঁর এই আধুনিক মানসিকতা কবিতা রচনায়, প্রবন্ধ নির্মাণে, সুরুচিসম্পন্ন সংকলন প্রকাশে ক্রিয়াশীল ছিল। তখনকার লিখিয়েদের অনেকেই কবিতা, গল্প, ছড়া লিখেই ছুটে যেতেন মাহমুদ হকের কাছে। তিনি ভুলত্রুটি নির্দেশ করে সংশোধন করে দিতেন। লেখালেখির ক্ষেত্রে সিলেটে তাঁর মতো আর কেউ সার্থক গুরুগিরি করতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই।’
সিলেটে গ্রন্থাগার আন্দোলনের পথিকৃৎ মুহম্মদ নূরুল হকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ষাটের দশকের দরগাহ মহল্লার সন্ধ্যের একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন তিনিÑ‘সে সময় দরগাহ মহল্লার রাস্তাঘাট ছিল কাঁচা। লোক চলাচল কম। শুধু জুম্মাবার আর ওরসের সময় লোক সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। গাড়ির দেখা কালেভদ্রে মিললেও প্রায়ই রিকশা চলত টুংটাং শব্দ তুলে। সন্ধ্যেবেলা পেছনের দুই চাকার ওপরে কেরোসিনের ঢাকনা দেওয়া কুপি জ¦ালিয়ে রিকশা চললে মনে হতো, দুটো আলোর রেখা অন্ধকার ভেদ করে নিকট থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। বিদ্যুতের খুঁটিতে লাগানো কমশক্তির বাতির আলো যতটা না অন্ধকার দূর করত, তার চেয়ে বেশি পরিমাণে বাড়িয়ে দিত আমার ভূতের ভয়।’
গবেষক অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর বাসার আপ্যায়নের স্মৃতি লিখেছেন, আমিসহ অনেকেরই এই বিষয়ে অভিন্ন স্মৃতি। জামান মাহবুব লিখেছেনÑ‘স্যারের কাজিটুলাস্থ লোহারপাড়া গলির বাসায় গেলাম। কলবেল টিপতেই স্যার দরজা খুলে দিলেন। ঘরে ঢুকে সোফায় বসলাম। সকালের প্রসন্ন আলো দরজা ও জানালা গলিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে পড়েছে। এরই মধ্যে স্যার ভেতরে গিয়ে নিজের হাতে ধুমায়িত কাপ ও নাস্তার প্লেট এনে আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন: ‘নাও, একটু মুখে দাও।’ ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলি: ‘স্যার, আপনি কষ্ট করতে গেলেন কেন? আমি তো চা পান করেই বেরিয়েছি।’ স্যার বললেন ‘ওতে কিছু হবে না। শুরু করো।’
সংগীত সাধক রামকানাই দাশের শিক্ষকসুলভ আত্মমর্যাদার একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেনÑ‘একদিন দুপুরে রামকানাই দাশ শিশু একাডেমিতে এলেন। সচরাচর সপ্তাহে দুদিন মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার বিকেলে সংগীতের ক্লাস নিতে আসতেন। হঠাৎ একদিন অসময়ে আসায় আমি খানিকটা বিস্মিত। বললাম: ‘দাদা, মন খারাপ?’ তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন: ‘ছেলেমেয়েদের গান শিখিয়ে কী হবে, যদিÑনা ওদের মা—বাবা শিক্ষকের মর্যাদা দেন।’ তারপর শান্ত হয়ে বললেন: ‘জাতীয় সম্মাননা পাওয়া ছেলেটির বাসায় কাল রাতে গিয়ে দেখি, বিরাট কাণ্ড! অসংখ্য লোক। ভুরিভোজ চলছে। সেই সাথে ছেলেটি গাইছে একের পর এক গান। সঙ্গে গাইছে তার মা—ও। আমাকে দেখে ছেলেটির বাবা বললেন, গুরুজি, ওর জাতীয় পুরস্কার পাওয়াকে সেলিব্রেট করার জন্য আমার ব্যবসায়ী বন্ধুদেরকে নিমন্ত্রণ করেছি। আপনাকে জানানো হয়নি। ভালো হলো এসেই যখন পড়েছেন। খেয়ে যাবেন কিন্তু!’ রামকানাই দাশের আত্মসম্মানবোধ প্রখর। তিনি সেখানে আর এক মুহূর্তও থাকেন নি। ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে চলে আসেন। তাঁর অন্তরবেদনা আমাকেও স্পর্শ করল।’
নিজের কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা লেখালেখি করতো তাদের জন্য মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ কে. কে. পাল চৌধুরীর ছিলো একটা আলাদা পক্ষপাতিত্ব। আমিও তার পক্ষপাতিত্বসুলভ স্নেহেও সিক্ত। জামান মাহবুব লিখেছেনÑ‘অধ্যক্ষ মহোদয় (কে. কে. পাল) একদিন আমাকে তাঁর কক্ষে ডেকে পাঠালেন। দুরু দুরু বুকে তাঁর সামনে হাজির হলাম। বুঝলাম শাস্তির খড়গ থেকে এ যাত্রা রক্ষা নেই। অধ্যক্ষ কৃষ্ণকুমার পালচৌধুরী ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটা কবিতা আওড়ে বললেন, ‘মহৎ কবিদের সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে জানবে। লেখালেখি করছ, খুব ভালো কথা। কিন্তু পড়াশোনায় কখনও ফাঁকি দেবে না। এরপর আমার নামধাম, কোথায় থাকি, বাবা কী করেন, কতদিন ধরে লিখছি এসব জিজ্ঞেস করলেন।’
নিজের একটি কথা দিয়ে জামান মাহবুবের ‘ঝরণাতলার নির্জনে’র কথা শেষ করি। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সিলেট জেলা শাখার বিভিন্ন কর্মকান্ডে সিলেটের একজন শিশু সংগঠক হিসেবে জড়িত হবার সুযোগ আমারও হয়েছিলো। আমি বলবো প্রশাসক হিসেবে জামান মাহবুব ছিলেন অত্যন্ত সৎ, যোগ্য ও পক্ষপাতহীন ব্যক্তি। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় একদল লোক প্রগতির নামে প্রায় পুরো প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের দলের দখলে রাখতে চায়। তারা চায় প্রতিষ্ঠানটিতে থাকবে শুধু নিজেদের ঘরানার লোকের কতৃর্ত্ব—পদচারণা। সেই ধরনের লোকও সিলেটে শিশু একাডেমিতে ঘুর ঘুর করেছে, তারাও চেয়েছে কতৃর্ত্ব—পদচারণা। তবে তারা খুব একটা সফল হতে পারেনি। কারন জামান মাহবুবের দৃঢ়তা। প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও জামান মাহবুব দলকানা ছিলেন না। তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন সিলেট শিশু একাডেমিতে উপযুক্ত মানুষকে যথার্থ সম্মান দেখাতে। শতভাগ সফল না হলেও, তিনি সফল হয়েছেন, তার প্রমাণÑ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সিলেট: সংক্ষিপ্ত পরিচিতি’ লেখায় সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে সিলেটে একাডেমির সাথে নানাভাবে সম্পৃক্ত সবার কথা মুক্তভাবে উল্লেখ করেছেন। নানা রঙের নামগুলো পড়লেই বুঝা যায় নিরপেক্ষ—দায়িত্বশীল থাকার নিরন্তর প্রয়াস।’


  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

আরও পড়ুন

বানিয়াচঙ্গে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা

         মখলিছ মিয়া,বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) থেকে ॥...

করোনায় সিলেটবাসী যাদের হারালো

14        14Sharesসুনীল সিংহ : সারা বিশ্বের...

Play Roms Over the internet to Have Unlimited Entertaining

         Will you be interested in...

দেশের উন্নয়নের জন্য সরকারকে আবারও ক্ষমতায় আসার সুযোগ দিন

         সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ...