ছড়া নর্দমায় অবাধে ময়লা আবর্জনা ফেলা বন্ধের কি আমরা উদ্যোগ নিতে পারি না

প্রকাশিত : ১২ নভেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে

জাবেদ আহমদ: ইদানিং একটা বিষয় মনকে বড় পীড়া দিচ্ছে। মনকে বিষিয়ে তুলছে। প্রতিদিনই দেখছি এবং ভাবছি কী করা যায়। কিভাবে এসব থেকে উত্তরণ করা যায়। কিন্তু অবশেষে কিছুই করতে না পেরে মনটা আরও হতাশ হতে চলেছে। আমি কথা বলতে চাচ্ছি আমাদের সিলেট মহানগরীর ছড়া আর ড্রেনসমুহের কথা। বাসা বাড়ী আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হতে ময়লা আবর্জনা বস্তাবন্দী করে অবাধে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে এসব ছড়া আর ড্রেনে। প্রধান রাস্তার পাশ্ববর্তী ছড়ায় প্রকাশ্যে প্রতিদিন ফেলা হলেও তা বাঁধা দেয়ার কোন কর্তৃপক্ষ নেই। পাড়া মহল্লায় ছড়া সংলগ্ন বাসা বাড়ীর লোকজনের ছড়ায় ময়লা ফেলা যেন অধিকারেই পরিণত হয়েছে। অনেক বাসা বাড়ীর গার্ডওয়ালে ছড়ায় ময়লা ফেলার জন্য পকেট জানালাও স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। পলিথিন ব্যাগে বন্দী আবর্জনা বর্ষা মওসুমে ভেসে সুরমা নদীর দিকে চলে গেলেও শুস্ক মওসুমে ছড়ায়ই জমে থাকে। অথচ আমরা নগরবাসীর একটু দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন বা সচেতনতা পুরো দৃশ্যপটের চিত্র পাল্টে দিতে পারে। ছড়া, খাল বা নর্দমা আবার পুরনো চেহারায় ফিরে আসতে পারে। গোয়ালীছড়া, মালনীছড়া, হলদিছড়া, গাভিয়ার খাল, জল্লারখালসহ ছোট বড় ২৬টি ছড়া সিলেট নগরীর নানা পাড়া মহল্লার বুক চিরে সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে। এসবের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৬ কিলোমিটার। প্রধান ১৩টি ছড়ার দৈর্ঘ্য ৭৬ কিলোমিটার। নগরীর পানি নিস্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ছড়াগুলো। এসব ছড়ায় এভাবে ময়লা ফেলা অব্যাহত থাকলে অল্প বৃষ্টিতে বাসা বাড়ীতে পানি ওঠে নগরবাসীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে।
একদা সিলেট শহর দিয়ে প্রবাহমান ছড়াসমুহে লোকজন গোসল করত, বালু উত্তোলন করে ঘরবাড়ি বানাতো, অনেকে বালু বিক্রিও করতো। নৌকা চলাচল করতো এসব ছড়া দিয়ে। বর্ষা হলে মাছ শিকারীরা শিকার করতো এসব ছড়ায়। এসব মহল্লার প্রবীণদের কাছ থেকে শোনা কথা। হালজমানায় এসব এখন কিচ্ছা কাহিনী। এখনকার লোকজনের কাছে আগেকার সেই ছড়া ফিরেয়ে আনার চাহিদাও নেই। কালের বিবর্তনের নগর সভ্যতা বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিক অনেক কিছুর মতো ছড়াও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সংকোচিত হয়েছে এমনকি অনেক জায়গায় হারিয়ে গেছে ছড়া। বিগত ৫/৬ বছর ধরে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাড়াশি অভিযানে নগর দিয়ে প্রবাহমান বেশীরভাগ ছড়াই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার করা ছড়া স্থায়ীভাবে পাকা বাউন্ডারীর কাজও সিটি কর্পোরেশন নিজ অর্থায়নে করে দিচ্ছে। প্রতি বছরই শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ছড়ার গার্ডওয়াল নির্মাণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। যার ফলে সংকোচিত ছড়া পুরোপুরি পুরনো রূপে না হলেও যথেষ্ট প্রসস্ততা নিয়ে ছড়া সুরমা নদীর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। নগরবাসী এর সুফলও পেতে শুরু করেছে। বিগত বছরগুলোতে প্রবল বর্ষণেও ছড়া পাশ্ববর্তী মহল্লাগুলোতে জলাবদ্ধতার প্রকোপ কমতে শুরু করেছে। সরকার বা সিটি কর্পোরেশন শত সহ¯্র কোটি টাকা খরচ করে ছড়াগুলো উদ্ধার করলেও এসবের নিয়মিত পরিচর্যার দিকে কোন কারোরই কোন নজর নেই। নগরবাসীর নানাবিধ সেবা প্রদান করতে গিয়ে ব্যতিব্যস্ত সিটি কর্পোরেশন সব সময় নজর রাখা দুস্কর ও বটে।
আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফিসিয়াল প্রশিক্ষণে জুলাই ২০১৮ মাসে শ্রীলংকায় ৫দিন অবস্থান করেছিলাম। কলম্বো ও গল সিটি ঘুরে দেখেছি। শ্রীলংকা যাওয়া আসার পথে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর ও ভারতের চেন্নাই সফর করি। প্রতিটি শহরই আমাদের আকৃষ্ট করে পরিচ্ছন্নতার জন্য। রাস্তায় কোন ময়লা, পানির বোতল পড়ে থাকতে দেখিনি। অথচ দেশগুলোয় বিদেশী পর্যটক আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু নিয়ম মানার প্রতি মানুষের আগ্রহই শহরগুলোকে পরিচ্ছন্ন হিসাবে গড়ে ওঠতে সহায়তা করছে। নির্ধারিত ডাস্টবিন ছাড়া কাউকে কোথাও ময়লা ফেলতে দেখিনি। আমাদেরকেও গাইড আগেই জানিয়ে দিয়েছিল বিষয়টি। আমরাও ভিনদেশে গিয়ে এর ব্যত্যয় করতে সাহস করিনি। স্বল্পদিনে অবস্থান করে বুঝতে আমার কষ্ঠ হয়নি এসব নগরের গায়ে ‘পরিচ্ছন্ন সিটি’ তকমা লাগার মুল কৃতিত্ব নগর ব্যবহারকারীদের। নগরবাসী যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা না ফেলার কারণে নগরগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সিটি কর্তৃপক্ষকে বেগ পেতে হচ্ছে না।
শুধু সিটি কর্পোরেশনের দিকে না থাকিয়ে আমরাও একটু চেষ্টা করলে পারবো আমাদের আধ্যাত্মিক সিটি সিলেটকে পরিচ্ছন্ন রাখতে। সিলেটের অনেক লোকই থাকেন প্রবাসে। দেশে যারা থাকেন তাঁরাও মাঝে মধ্যে বেড়াতে যান এশিয়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। দেখে আসেন পরিচ্ছন্ন নগরগুলো। অথচ দেশে আসার পর আমরা আবার ফিরে যাই পুরনো রূপে। এখন থেকে আমরা যদি বাসা বাড়ী বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আবর্জনা যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট জায়াগায় ফেলতে আমাদের অধীনস্তদের তাগিদ দেই। বাড়ীর মালিকরা ভাড়াটিয়াগণকে ছড়া বা ড্রেনে ময়লা না ফেলে বাড়ির নির্ধারিত ময়লা রাখার জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করেন। পাড়া মহল্লার ক্লাব বা সমাজকল্যাণ সংগঠনসমুহ তাদের সমাজসেবা কার্যক্রমের অংশ হিসাবে ছড়া বা ড্রেনে ময়লা না ফেলতে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে পারেন। পাড়া মহল্লার বসবাসকারীদের নির্ধারিত ফি জায়গায় ময়লা রাখার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিতে পারেন। নির্ধারিত মাসিক ফি দিয়ে এসব ময়লা সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত জায়গায় পৌছানোর ব্যবস্থা নিতে পারেন। অনুরোধ অমান্য করে কেহ ছড়া নর্দমায় ময়লা ফেলা অব্যাহত রাখলে তার বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সিটি কর্পোরেশকে অবহিত করতে পারেন। এভাবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটকে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আরও পড়ুন