ছোট গল্প- সুবোধ

Alternative Text
,
প্রকাশিত : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জিন্নিয়া সুলতানা:

রোজ রোজ অশান্তি আমার ভালো লাগে না।
কত দিন ভেবেছি সব কিছু ছেড়ে চলে যাবো।
কিন্তু এত অশান্তির পরেও মানুষটাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না।

কেউ কি ভেবেছিল কখনো?
সেই তেজী রুমকি মেয়েটা এমন হয়ে যাবে কখনো?
বিয়ের আগে কত সপ্ন দেখতাম আমি, আমার বরের টাকা পয়সা না থাকলেও একটা সুন্দর মন থাকবে।

কিন্তু আদিল!
ঠিক আমার বিপরীত একটা চরিত্র।
তার কাছে মনে হয়, ভাত কাপড় তো দিচ্ছি, আর কি চাই তোমার?

কিন্তু একটা মেয়ে কি শুধুই ভাত কাপড় এর জন্যে বিয়ে করে?
দিনের পর দিন নিজের কথা ভুলে গিয়ে নিজের মা বাবা ভাই বোন সংসারকে ছেড়ে এসে স্বামীর বাবা মা, সংসার সন্তান সব কিছু কে ভালো রাখার দায়িত্ব নেয়?
আমার মাথায় কিছুতেই কিছু আসেনা।
স্বামীরা কেন এটা বোঝেনা?
মেয়েরা সারা জীবন একটু ভালবাসা একটু সম্মান আর যত্নের কাঙ্গাল হয়ে থাকে।

শুধু যদি একটু আশ্রয় আর খাবার পরার জন্যে মেয়েদের এত কিছু করতে হয়, তাহলে তো আজকের মেয়েরা যারা নিজেই কাজ করে নিজেদের দায়িত্ব নিতে পারে তাদের স্বামীর সংসারের এত দায়িত্ব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন থাকবেনা।

আদিল আমার স্বামী,
বাইরে যা ইচ্ছে তাই করে ঘরে এলেও সাথে সাথেই আমি কারো সামনে কোনো কথা বলি না।
আমার মনে হয় এতে আমার নিজের যেমন অসম্মান বোধ হবে তেমনি আমার সন্তান রাফির উপর খারাপ প্রভাব পড়বে।

আমি আমার স্বামীর সাথে থাকি।আমার সন্তান, আদিলের মা বাবা সহ এখানে আমরা পাঁচ জন সদস্য।
আমি যখন কোনো অসঙ্গতি দেখলে আদিলকে আলাদা করে নিয়ে কিছু জানতে চাই, তখন তার কাছে সেটা খুব অপমানের মনে হয়।
সে আমাকে বলে উঠে, তুমি কি আমার বাবা মায়ের চেয়েও বড় হয়ে গেছো?
আমাকে আলাদা ভাবে নিয়ে এসে কথা বলছো।
ওরা যেখানে আমার চলাফেরা নিয়ে কোনো কথা বলেনা তোমার সাহস হয় কি করে আমাকে বসিয়ে জেরা করার, তোমার কাছে কি কৈফিয়ৎ দিতে হবে আমার?

আমার খুব অবাক লাগে।
বিয়ের সময় যেখানে প্রতিজ্ঞা করা হয়, আজ থেকে একজন আরেকজনের অংশ, স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক। একে অপরের সুখ দুঃখের অংশীদার। সেখানে একটা স্বামী তার স্ত্রীর সাথে এরকম ব্যবহার করতে পারে?

অফিস থেকে ফিরে আদিল একটা প্যাকেট খুলে রাখলো টেবিলের উপর।
আমি ভাবলাম রিফাতের মেয়ের জন্যে মনে হয় কোনো গিফট্ নিয়ে এসেছে।
রিফাত আদিলের বন্ধু।
কাল তার মেয়ের প্রথম জন্মদিন।

কিন্তু প্যাকেটে হাত দিয়ে আমি তো পুরাই অবাক।
এক প্যাকেট ভর্তি টাকা।
আমার জানা মতে আদিলের এমন কোনো ব্যবসা নেই যা থেকে এত টাকা একসাথে পেতে পারে।
আর অফিস?
অফিসের যে পোষ্টে কাজ করে তাতে তার কাছে এত টাকা থাকার প্রশ্নই আসে না।

রাতে রূমে এসে সে আমার মুখ দেখেই বুঝতে পারলো যে আমি জানতে চাচ্ছি সে এত টাকা কোথায় পেলো?
আদিল আমার দিকে একবার তাকিয়ে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললো,
– টাকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন শুনতে চাই না,আর বাবা মায়ের কানে যেন কথাটা না যায় কখনো।
তাহলে এর ফল নিশ্চয়ই ভালো হবে না।
আমাদের মাঝে আর কোনো কথা হলো না।

পরের দিন সন্ধ্যার পর,
আমি আদিলের পাশে রাফিকে কুলে নিয়ে বসে আছি
রিফাতের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে।

রিফাত তার নিজের বিয়ের আগে আদিলকে যে এটা সেটা বেশ বুদ্ধি শুদ্ধি দিত সেটা সবাই জানে।
রিফাতের কথা শুনে আদিল শুধু একবার নয় অনেক বার আমার সাথে ঝামেলা করেছে।

রিফাত আদিল কে বারবার বুঝাতে চেষ্টা করতো শিক্ষিত আর সুন্দরী গুণবতী হলেই হয় না, বউয়ের বাবার বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা থাকতে হয় বেশ ভালো।
তাতে সময়ে অসময়ে অর্থনৈতিক সাপোর্ট পাওয়া যায়।
সে হিসেবে আদিল আমাকে বিয়ে করে ঠকে গেছে। ভুল করে ফেলেছে। এমন ভুল সে কখনোই করতো না। হেন তেন কত কি!

দুই ঘণ্টা হলো বসে আছি, কিন্তু রিফাতের বউ এর কোনো দেখা নাই।
সে নাকি পার্লারে সাজগোজ করতে গেছে।
এদিকে বাচ্চা মেয়ে মাকে দেখতে না পেয়ে কান্না কাটি করে ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিছুক্ষণ পর পর রিফাত সামনে এসে মেকি হাসি দিয়ে বলছে, ভাবী কষ্ট হচ্ছে না তো?
একটু বসেন,বাচ্চার মা আসলেই অনুষ্ঠান শুরু করে দেবো।
আমরা বসে বসে দেখছি বেচারা অন্য মেহমানদের সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে।

আরো ঘণ্টা খানিক পর রিফাতের বউ আসলো।
আমার সাথে পরিচিত হয়ে সোজা তার রুমে চলে গেল।
কিন্তু ঘর ভর্তি মেহমান রেখে পার্লারে গিয়ে দেরী করে ফিরে আসাতে রিফাত তার বউ কে ধমক দিয়ে বসলো।
কিন্তু এর পরের ঘটনার জন্যে মনে হয় সে প্রস্তুত ছিল না।

রিফাতের বউ ইলা সবার সামনে মেয়ের ড্রেস রিফাতের উপর ছুড়ে মেরে বললো, ‘আমার বাবার টাকায় সব কিছু করছি, ছোট লোকের মতন এভাবে চিল্লাচ্ছো কেন তুমি?
আমার যা খুশি করবো।’

এসব শুনে রিফাত যতটা না লজ্জা পেয়েছে তার চেয়ে বেশি মনে হয় আদিল লজ্জা পেলো।
সে আমার দিকে তাঁকিয়ে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিয়ে চুপ করে বসে থাকলো।

স্বামী স্ত্রী দুজন রাগারাগি করে ঘুমন্ত অবস্থায় মেয়েকে দিয়ে কেক কাটালো কিন্তু আবার ঝামেলা শুরু হলো যখন সবাইকে খাবার টেবিলে ডাকা হলো।

রিফাত চাইছে বয়স্ক সবাইকে আগে খাবার দিয়ে দিতে যাতে রাতের বেলা বাড়ি ফিরতে তাদের সমস্যা না হয় কিন্তু ইলা এসে বললো তার বাবার বাড়ির সবাইকে আগে খাবার দিতে হবে।
রিফাত কোনো কথা না বলে অন্য মহিলাদের ডাকতে চলে গেল।
ইলা ঠিক তখনই খাবার প্লেট ছুড়ে মারলো নিচে।
‘ছোটলোক, তোকে বলেছি আমার বোনদের আগে খাবার দিতে কথা কি কানে যায় না?’- ইলার চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে।

আদিল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো,
হঠাৎ করেই রিফাতকে ডেকে বললো, ‘বন্ধু মায়ের শরীরটা বেশ খারাপ করেছে,আমাদের এখনই যেতে হবে। বাসা থেকে কল এসেছে।’
অথচ আসার সময় তো মা ভালোই ছিলেন।
এমনকি কোনো ফোন কলে ও তাকে কথা বলতে দেখলাম না আমি।
তবে এটা বুঝতে আমার সমস্যা হয় নি হঠাৎ আদিল কেন এমন করছে।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি।
গাড়ি পেলে বাসায় চলে যাবো।
হঠাৎ আদিল পাশে এসে এক হাতে আমার একটা হাত ধরলো অন্য হাতে ঘুমন্ত রাফিকে জড়িয়ে রেখেছে, আমি তার দিকে তাঁকিয়ে দেখলাম তার চোখে জল টলমল করছে।
আমি আর কিছু বলিনি তাকে।
আকাশের দিকে তাঁকিয়ে দেখলাম অনেক তারা দেখা যাচ্ছে আকাশে।
আমি মনে মনে ভাবছি।
এই রাত যদি কোনো দিন শেষ না হয় তবুও মনে হয় জীবন নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেয়া যাবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

গণধর্ষণের পর মা-ছেলে হত্যা : ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ গ্রেফতার

         সিলেটের ওসমানীনগরে গণধর্ষণের পর শিশু...

খাঁরপাড়া জামে মসজিদে জীবানুনাশক টানেল স্থাপন : একেএস ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু

6        6Sharesএকেএস ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় খাঁরপাড়া...

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

          ডাঃ মোঃ নিজাম উদ্দিন...