ছাত্রাবাসে নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় অধ্যক্ষ ও হোস্টেল সুপারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ হাইকোর্টের

,
প্রকাশিত : ০৩ জুন, ২০২১     আপডেট : ১২ মাস আগে

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় অবহেলার কারণে কলেজ অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ ও হোস্টেল সুপার জীবন কৃষ্ণ আচার্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ রায় দেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার নওরোজ মোঃ রাসেল চৌধুরী বলেন, রায়ে অধ্যক্ষ ও হোস্টেল সুপারের অবহেলার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। রায় হাতে আসার পর ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদেশ দিয়েছেন আদালত। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে আসার পর বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানান আদালতে নিযুক্ত এ সরকারি কৌসুলি।

রিটকারী আইনজীবীদের মধ্যে সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন সিলেটের ডাককে জানান, রায়ে আদালত এম সি কলেজের ছাত্র সংগঠনসমূহেরও সমালোচনা করেছেন। আদালত রুল আংশিক অ্যাবসলিউট করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পেলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি জানান, মূলত এমসি কলেজ এলাকায় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা ও কলেজ হোস্টেলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় নববধূকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য এ রিট দাখিল করা হয়।

এমসি কলেজে তরুণী ধর্ষণের আলোচিত ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও দায় অনুসন্ধানে আদালতের আদেশে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘সিলেটের এমসি (মুরারি চাঁদ) কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের পেছনে মূলত হোস্টেল সুপার ও প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে ওই কলেজের অধ্যক্ষও কোনোভাবে ওই ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না।’
এর আগে গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেট নগরীর টিলাগড় এলাকা থেকে স্বামীসহ নববধূকে তুলে নিয়ে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের একদল কর্মীর বিরুদ্ধে। ওই তরুণীর স্বামী এ ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেন। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রাবাস দখল করে সংঘটিত এমন ঘটনায় সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। অন্যদিকে, গণধর্ষণের ওই ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর গত সেপ্টেম্বরে আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মিসবাহ উদ্দিন। পরবর্তীতে ঢাকাস্থ জালালাবাদ এসোসিয়েশন মামলায় পক্ষভূক্ত হয়। এসোসিয়েশনের পক্ষে এডভোকেট আব্দুল কাইয়ুম ও ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন শুনানীতে অংশ নেন।

শুনানি নিয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ আদেশ দেন। এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষের অবহেলা নিরূপণে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে দিয়ে তা অনুসন্ধান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২০ অক্টোবর ওই কমিটি আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ১১ মার্চ শুনানি শেষে আদালত বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। রুল আংশিক মঞ্জুর করে ওই নির্দেশসহ গতকাল বুধবার রায় দেওয়া হলো।

গণমাধ্যমের খবর নজরে আনা আইনজীবী মোহাম্মদ মিসবাহ উদ্দিন ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী আদালতে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া এই মামলায় ব্যাখ্যাদানকারী হিসেবে যুক্ত জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম ও ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিনও যুক্ত হন।

অনুসন্ধান কমিটি ও প্রতিবেদন: চার সদস্যের কমিটিতে ছিলেন সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ মো. বজলুর রহমান, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মমিনুন নেসা, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবুল কাশেম ও সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শারমিন সুলতানা।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় কলেজ বন্ধ থাকার পরও কয়েকজন ছাত্র ও প্রাক্তন ছাত্র হোস্টেলে অবস্থান করেন। একজন প্রাক্তন ছাত্র ৫ নম্বর ব্লকের হোস্টেল সুপারের বাসভবন দখল করে থাকেন। প্রাক্তন ওই ছাত্ররা অবৈধভাবে কলেজে হোস্টেলের সিট দখল করে থাকার কারণে এবং প্রাক্তন ছাত্র সাইফুর রহমান হোস্টেল সুপারের বাসভবন জোর করে দখল করে থাকার কারণেই তাঁরা কলেজ হোস্টেল এলাকায় গণধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করার সাহস পান। ফলে ঘটনার তারিখে হোস্টেল ক্যাম্পাসে ওই ঘটনার নেপথ্যে মূলত হোস্টেল সুপারদের তদারকির ঘাটতি ও দায়িত্বে অবহেলাই দায়ী। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে কলেজের অধ্যক্ষের ওপরও এ দায়ভার চলে আসে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাক্ষী, পরীক্ষা ও সামগ্রিক বক্তব্য পর্যালোচনা করে কমিটির সর্বসম্মত মতামত হলো, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের পেছনে মূলত হোস্টেলের বর্তমান তত্ত্বাবধায়কের , হোস্টেলের মূল গেটের ডে গার্ড, ৫ নম্বর ব্লকের ডে গার্ড ও নাইট গার্ড (নৈশপ্রহরী) এবং ৭ নম্বর ব্লকের ডে গার্ড ও নাইট গার্ডের দায়িত্বে অবহেলা ছিল।

এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য ১৫ দফা সুপারিশ করেছে চার সদস্যের ওই কমিটি। যেখানে কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতে হোস্টেলে আসন নিশ্চিত করতে হবে এবং অছাত্র বা প্রাক্তন ছাত্রদের হোস্টেলে বসবাস কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, একজন শিক্ষককে একাধিক হোস্টেলের দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে একক দায়িত্ব দিতে হবে, হোস্টেলের তত্বাবধায়কদের দায়দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, কলেজের হোস্টেলগুলোয় বহিরাগত প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, হোস্টেলের মূল গেটে এবং প্রতিটি ব্লকে পর্যাপ্তসংখ্যক ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ব্যবস্থা করতে হবে, হোস্টেলের যেসব স্থানে সীমানাপ্রাচীর নেই, সেসব স্থানে সুউচ্চ দেয়াল নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পুরো হোস্টেল এলাকায় প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় গত ৩ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের ৮ নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য। অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম রাজন মিয়াকে সরাসরি ধর্ষণে সম্পৃক্ত এবং রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুমকে ধর্ষণের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আসামীদের সবাই বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রবাসে স্বামীকে আটকে রেখে নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঘটনার রাতেই নির্যাতিতার স্বামী বাদী হয়ে এসএমপি শাহপরান থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও ৩ দিনের মধ্যে ৬ আসামিসহ সন্দেহভাজন আরও ২ জনকে গ্রেফতার করে করে র‌্যাব ও পুলিশ। সন্দেহভাজন দুই আসামী হলেন- আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম রাজন মিয়া। গ্রেফতারের পর তাদের প্রত্যেককে ৫ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে সকলেই দায় স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি বিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। মামলাটি সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য গ্রহণের অপেক্ষায় আছে বলে আদালতের পেশকার ছয়েফ উদ্দিন জানিয়েছেন।

একটি সূত্র জানায়, এম সি কলেজে দীর্ঘ ১৫/২০ বছর ধরে হোস্টেল সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো: জামাল উদ্দিন। গণধর্ষণের ঘটনার মাত্র এক মাস কলেজের একটি ব্লকের হোস্টেল সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জীবন কৃষ্ণ আচার্য।


আরও পড়ুন