চিরচেনা দৃশ্যের অপরূপ বর্ণনা ফেলে আসা দিনগুলো মো: মোহাম্মদ বদরুজ্জামান

প্রকাশিত : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০     আপডেট : ২ সপ্তাহ আগে
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক
মোহাম্মদ বদরুজ্জামান (জন্ম: বৈশাখ ১৩৩৮ বাংলা মৃত্যু: ১ মার্চ ২০১৬) সহকারী পোস্ট মাস্টার জেনারেল হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটের বিশ্বনাথ কলেজে ইংরেজির অধ্যাপনা করেন এবং প্রায় ১৬ বছর অধ্যাপনা জীবনের পুরো সময় শিক্ষাবোর্ডের ইংরেজির পরীক্ষক ছিলেন। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি ইংরেজিতে এম.এ. এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আগ্রহ এতোই প্রবল ছিলো, তার বয়স যখন ষাট তখন তিনি বাংলায় এম.এ. পরীক্ষা দেন। একটি পেপারে অকৃতকার্য হওয়ায় একাধিকবার পরীক্ষায় অংশ নেন।
মোহাম্মদ বদরুজ্জামান শিক্ষকতা জীবনের প্রায় পাশাপাশি সময়ে সিলেট জজ কোর্টে আইন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত সিলেট জেলা বার এসোসিয়েশনের নির্বাচনে বিপুল ভোটে কার্যকরী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সামাজিক সংগঠন ‘সাইক্লোন ‘ এর উপদেষ্টা ছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। মোহাম্মদ বদরুজ্জামান সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার শেরপুর গ্রামে ১৩৩৮ বাংলার বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মরহুম আব্দুল খালিক চৌধুরী ও মাতা মরহুমা মমজিদা খানম চৌধুরী।
মোহাম্মদ বদরুজ্জামান দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় ‘ফেলে আসা দিনগুলো মোর’ শিরোনামে তাঁর অতীত জীবনের কথা লেখতে শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য ‘সাহিত্যিক ও সাংবাদিক কল্যাণবর সেলিম আউয়াল দৈনিক সিলেটের ডাক-এ আমার ‘ চৌধুরী পদবী’ ইতিহাস নির্ভর নিবন্ধ ছাপিয়ে লেখালেখিতে আমার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। অনেক পাঠক ধন্যবাদ জানান। প্রায় ১০ দশ বৎসর পূর্বের ঘটনা। আমার জীবন এমন বৈচিত্রপূর্ণ বা আহামরি নয়। ফেলে আসা দিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, আনন্দ, বেদনা, সুন্দর-অসুন্দরের কথা লিখছি ‘ফেলে আসা দিনগুলো মোর’ শিরোনামে। এটিও সেলিম আউয়ালের পীড়াপীড়িতে এবং শিরোনামটি তারই দেয়া। সিলেটের ডাকে লেখাটি বের হবার পর অনেকে ফোন করেন, অনেক নতুন মানুষ বাসায় আসেন, পুরনো অনেকের সাথে অনেক বছর পর যোগাযোগ গড়ে উঠেছে ‘এইসব বিষয় ভীষণ ভালো লাগে। লেখতে অনুপ্রেরণা পাই।’ সিলেটের ডাক-এ বের হওয়া ‘ফেলে আসা দিনগুলো মোর’-এর প্রথমাংশ বই আকারে বের হয় জুন ২০১১। মোহাম্মদ বদরুজ্জামান-এর ‘কত অজানারে জানাইলে কত ঘরে দিলে ঠাঁই’ নামে তার আরেকটি স্মৃতিগ্রন্থ বের হয় ফেব্রুয়ারি ২০১২।
মোহাম্মদ বদরুজ্জামানের স্মৃতিকথায় তার দেখা গ্রামগুলোর চমৎকার বর্ণনা এসেছে। তার আঁকা গ্রামীণচিত্র একটু আলাদা আলাদা মনে হয়। আমাদের চিরচেনা গ্রাম, গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে এতো সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার লেখা পড়লে অনুভব করা যায়। তিনি লিখেছেন ‘আমুড়া গ্রামের প্রাকৃতিক দৃশ্য ছিল বড়ই মনোমুগ্ধকর। উত্তরে সুন্দিসাইল গ্রাম। ঐ গ্রামের উত্তরে বড় এক হাওর। হাওরের উত্তরে ফাজিলপুর গ্রাম। মধ্যে হাওরের জলরাশি থৈ থৈ করে বর্ষাকালে। ফাজিলপুর ও সুন্দিগ্রামের মধ্যখানে যেন ইংলিশ চ্যানেল। সুন্দিশাইল গ্রামের দক্ষিণে আমুড়া গ্রাম। এরপর একে একে দক্ষিণ দিকে ডামপাল, শিলঘাট, রায়গড়, নগর, কানিশাইল, ভাদেশ্বর। দামড়ি হাওর নামে বড় এক হাওর যা ফেঞ্চুগঞ্জ থানা শহরে গিয়ে মিশেছে। আমুড়াসহ সবগুলো গ্রামের সামনে হাওর এবং এর পূর্বে কুশিয়ারা নদী। সবগুলি গ্রামের পূর্বে হাওর এবং পশ্চিমে স্থল। বিশেষ করে বর্ষাকালে সৌন্দর্য ফুটে উঠে। বর্ষাকালে রাত্রিবেলা কুশিয়ারা নদী দিয়ে ছোট বড় জাহাজ ভৈরব থেকে শিলচর পর্যন্ত চলাচল করতো। এসব জাহাজের বাতির আলোয় বহুদূর পর্যন্ত আলোকিত হতো যার আলোকিত দৃশ্য অবর্ণণীয়। আরও সুন্দর লাগতো যখন গ্রামগুলির সামনের হাওর দিয়ে পাল তুলে বড় বড় নৌকা পণ্য নিয়ে ভৈরব, করিমগঞ্জ ও শিলচর যাতায়াত করতো।’
সেই সময়ে কিশোরচোখে দেখা ফেঞ্চুগঞ্জের একটি বর্ণনা দিয়েছেন মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ‘আমার বাড়ি গোলাপগঞ্জের শেরপুর। অজপাড়া গ্রাম। ফেঞ্চুগঞ্জ একটি প্রগতিশীল নগর। চতুর্দিকে প্রগতির ছাপ। এক মাইল লম্বা বাজার, কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণ পাড়ে। ঘাটে বড় বড় জাহাজ নোঙ্গর করা, রেললাইন বাজারের সংলগ্ন এসেছে। এখানে জাহাজ থেকে মালামাল গাড়িতে উঠছে। জাহাজ আসছে যাচ্ছে। রেলগাড়ি ঘন্টায় ঘন্টায় আসছে যাচ্ছে। আমি দুর্গা ও অপুর মত অবাক হয়ে দেখছি। রেলওয়ে ব্রীজ বা পুল থেকে পূর্বে ১ মাইল ডাক বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত। এক গলির বাজার। দেখতে সিলেট শহর থেকেও বড়। কারন সিলেট শহরে বাজারগুলো ছড়ানো কাজির বাজার, বন্দর বাজার, জিন্দাবাজার, মহাজনপট্টি, কালীঘাট ইত্যাদি। বড় বড় দোকান, বড় বড় মহাজন। মাড়োওয়ারী খুব দান্দ, বাঙালি রাধা মোহন, কৃষ্ণ চন্দ্র সরদার, ভূইয়া মহাজন, শিবনন্দনসহ আরও বহু মহাজন। তারা মাঝে মধ্যে বড় বড় দল এনে ‘যাত্রার’ আসর বসাতেন বা মাঝে মাঝে ফ্রি সার্কাসের ব্যবস্থা করতেন। স্কুল করাও ভাল লাগতো। মহানন্দে দিন কাটত। এ জীবন আমার আনন্দের জীবন; এ যেন ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে।’
মোহাম্মদ বদরুজ্জামানের প্রতিটি লেখায়ই মানুষের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি তার এক ভাগ্নের স্ত্রীর কথা লিখতে গিয়ে লিখেছেন ‘অধ্যাপক কামরুজ্জামানের স্ত্রী একজন কর্মজীবী মহিলা, হাউজিং এস্টেটের একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অধ্যক্ষা, একজন নিপুণ গৃহিণী। শরৎচন্দ্রের ‘পল্লী সমাজ’ উপন্যাসের ‘মাসীমা’র মত এবং ‘বড়দিদি’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মাধবী’র সাথে তুলনা করা যায়। এ দু’ চরিত্রের সাথে মিলালে দেখা যাবে ‘মামানি’ তাদের মত নম্র ভদ্র, অমায়িক এবং পরকে আপন করার ক্ষমতা আছে। তা হবে না কেন? প্রবাদ আছে ‘গাছেই ফলের পরিচয়।’ বদরপুর শিক্ষিত এলাকা। কুলাউড়া থাকতে দেখেছি রেলের অনেক অফিসার ছিলেন যেমন, স্টেশন মাস্টার, গার্ড, টিটি ইত্যাদি। মামানি’র পিতা মঈন উদ্দিন চৌধুরী বদরপুরের অধিবাসী। সিলেট এইডেড হাইস্কুলের হেড মাস্টার। মঈন উদ্দিন সাহেবের ভাতিজা মরহুম শহিদ শামসুদ্দিন এফআরসিএস ছিলেন সিলেট মেডিকেল হাসপাতালের সার্জারির অধ্যাপক। চমৎকার ভদ্র নম্র লোক। রোগীদের বন্ধু। রোগীদের সাথে প্রশাসক-এর মত ব্যবহার না করে নিজেকে তাদের সেবক মনে করতেন। ডাক্তার সাহেবকে আমি দেখেছি। অতি সুন্দর একজন মানুষ তার চেয়ে সুন্দর ছিল তাঁর কথাবার্তা এবং ভদ্র ব্যবহার। মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে হাসপাতালের ভিতরে পাকসেনাদের বুলেটে শহীদ হন।’
মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তাকে দরগাহ-ই-হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন গোরস্থানে দাফন করা হয়।
সেলিম আউয়াল
(লেখক,গবেষক, গল্পকার ও সাংবাদিক)


  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

আরও পড়ুন

উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করুন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট সিটি...

কোম্পানীগঞ্জে নব নির্বাচিত আ’লীগের নেতৃবৃন্দকে পাথর শ্রমিকদের সংবর্ধনা

         জাতীয় শ্রমিকলীগর অন্তর্ভূক্ত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা...

যুক্তরাষ্ট্রে করোনার কাছে হার মানলেন বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমদ

         যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশ সোসাইটির দুই...