চায়ের আড্ডায় সিলেটের কবি ও কবিতা

প্রকাশিত : ১৬ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সরওয়ার ফারুকী: বন্দরবাজার, দু রিকশার চিপায় অপ্রত্যাশিতভাবেই কবি অনিন্দ্য আনিসের সাথে সাক্ষাৎ! মোলাকাতের হাতটা না-ছেড়েই কবি টেনে নিলেন সিটি রেস্টুরেন্ট-এ, চা পান না করে ছাড়াছাড়ি নাকি হারাম! আমি তো এমনিতেই চায়ের প্রেমে প্রিয়ার হাত ছাড়া লোক—তো ‘না’ কইমু ক্যান! যদিও এই শহরে চায়ের কাপে চায়ের গন্ধ নাই! প্রতিটি রেস্টুরেন্টেই চা বিক্রির নামে বিক্রি হয় কিছু বিষ। চায়ের জন্ম-ভূয়ে চা-হীন রেস্টুরেন্টের দুঃখে আমি হামেশাই পুড়ি।

অনিন্দ্য আনিস। রক্তে-মাংসে কবি। এই মানুষের মাথায় কাব্য ছাড়া আর কিছু নাই! আমার চোখে দেখা এ-ই একমাত্র মানুষ, যার দৈনন্দিন জিন্দেগির সবটাই যেনো কাব্যাশ্রিত।
বিস্কিট, আণ্ডা, ভাতের মাড় মিশ্রিত চা-হীন চায়ের কাপ আসার আগেই কবি ছুড়ে দিলেন ‘অর্ধেক রোদ্র অর্ধেক ছায়া’ কাব্যের প্রচ্ছদ প্রসঙ্গ!
মোবাইলের আলোকোজ্জ্বল স্ক্রিনে যে চিত্রাঙ্কন ভেসে ওঠল, তাতে সুস্পষ্টভাবেই বলে দিলুম ‘না, হয় নি। এ প্রচ্ছদ বদলে নেয়া উচিত!’
কবিও ভেতরে ভেতরে ছিলেন ‘না’ বলার পক্ষে!
তো, কি হতে পারে? কবির প্রশ্নে উল্টো পড়লাম ঠেলায়!
আমি কি আর প্রচ্ছদ শিল্পী? ও বিষয়ে আমি জ্ঞানশূন্য। তবে, নামকরণ থেকে যা আন্দাজে এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে, আপনি অন্ধকার ফ্রেমে একচিমটি স্বর্ণদানা ছুড়ে দিন! এতে যে চিত্র দাঁড়াবে, তাতে হয়তো খারাপ হবে না!
প্রচ্ছদশিল্পে ধারণা না রেখেও গুঁতোগুঁতি করতে পারার আনন্দে দুজনেই হেসে ওঠলাম খানিক!
কবি বললেন, আচ্ছা, আমার তো রিটায়ার্ডের সময় দুয়ারে! জীবনের সুদীর্ঘ সময় সিলেটে কাটিয়ে দিলাম। অবসর যাপনে আমার কলম ঘুরেফিরে সিলেটের পথে পথে, মুখে মুখে ঘুরবে। আধুনিক সিলেটি কবিদের প্রসঙ্গে আপনার অভিমতও জানতে চাই!
উত্তর যদিও ভেতরের দিক থেকে ছিল সহজ, কিন্তু বাইরের দিক থেকে অচিন্তনীয় ভারী—অথচ আমি অংশ নিলাম!
সিলেটের কাব্য-সাহিত্যে কার কারুকাজ আপনাকে টানে?—বলে প্রশ্নের সরলতা বাড়িয়ে দিলেন কবি।
আমি আলাপ এগিয়ে নিলাম!
দেখুন কবি। মুরব্বিদের আমি কোনো মানদণ্ডে দাঁড় করাবো না। তারা আমাদের গুরুজন, অন্য উচ্চতায় তাদের বাস। কবি কালাম আজাদ স্যার, কবি মুকুল চৌধুরীরা আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয়। তাদের জন্যে রয়েছে মহাকালের খড়্গ! সেখানেই তাঁদের মূল্যায়ন হবে। আমার বয়সের আশপাশে যাদের বাস, তাদের নিয়ে আমার মূল্যায়ন জানাতে পারি কবি।
কবির সহমতে আমার সাহস তরতরিয়ে ওঠলো।
বললাম, সিলেটের কোনো কবিই আলাদা কাব্যভাষা তৈরি করতে পারেন নি। দু’একজনের আলাদা শৈলী আছে, এর মধ্যে…….!
“নাম বলুন, নাম বলুন” বলে কবির অর্ডার বেজে উঠল খাড়া তর্জনীতে!
যদি বলি, তো একনাম্বারে আবদুল হক।
উনি কে? কবির প্রশ্ন।
আবদুল হককে চিনবেন না। মানুষের পৃথিবীতে, মানুষহীন জগতে তাঁর বাস! আমাদের কোলাহল, চিৎকার-চেচামেচিতে তার কোনো অংশগ্রহণ নাই। ও যদি কবিতা লিখে, সেটা কবিতাই। আমি জানি, আপনি তারে চিনেন না, তার সম্পর্কে জানেন না।
কবি বললেন, আপনি আমাকে চিনেন না! আমি তারে বের করবই!
করুন। আবদুল হকের কবিতায় আমি আলাদা শৈলী পাই, যা আমি নতুন দেখি, নতুন পড়ি। আরেকজন কবির ভাষাও শ্রুতিমধুর, ফয়সাল আইয়ূব, এখন জার্মান আছেন। তার কবিতায়ও পাঠ-বিরক্তি আসে না। একজনের শক্তিশালী কাব্যসত্ত্বা ছিল, কিন্তু অদ্ভুত অহঙ্কার তাকে মেরে ফেলছে বলেই আমার বিশ্বাস।
কবি উচ্চারণ করলেনঃ মুসা আল হাফিজ?
না। “তিনি তো ছোট পাঠকের বড় লেখক”!
আর যারা আছেন এই ছোট্ট শহরে, তারা সকলেই পাশাপাশি, জোরজবরদস্তিমূলক কবি! কবিতা যে রূহের সঞ্চালক, কবিতা যে উপোষী প্রাণের খোরাক, উৎসের সাথে বিচ্ছেদব্যথার বাঁশি—তা অনেকেই বোঝেন না। এ ব্যথায় আমি ব্যথিত—কবি।
আমার দুঃখানুভূতি কবির মর্ম স্পর্শ করল, তা তার নীরবতার ভাষাতেই পড়ে নিলাম।
উত্তরণের উপায়?
নাই কবি, নাই! কবিতা ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত ওষুধ না। কবিতার জন্যে যে হৃদয়ের দরকার, তার উপযোগী কোনো নগর আজ এ দেশে নেই। মেকি জিনিষের এতো প্রাচুর্য, মেকিত্বের প্রতি দুর্নিবার গণআকর্ষণ- তা ‘মৌলিক সৃষ্টি’ করতে দেয় না। এ নগরের ভুষণ্ডি ভূপালেরা কবি ও কবিতার মৃত্যুর জন্যে দায়ী। আমি আবদুল হকের নতুন কবিতা উদ্ধৃত করলাম, কবি দোলে ওঠলেন;

কবি ও মহিষবৃন্দ
আবদুল হক

(উৎসর্গ: আল মাহমুদ)

মরে যাও বৃদ্ধ কবি কল্পনার ভুষণ্ডি ভূপাল!
হ্রদের সুনীল জলে নেমে গেছে মহিষের পাল—
কাদার মচ্ছব হচ্ছে শিঙের ঝপাতে ঝরছে কী সুন্দর দমবন্ধ ছন্দ-উপচার,
কী হবে কবিতা লিখে আর?

শূন্য শিমুলের ডালে যে-নিবেশে গেয়ে চলে রাতজাগা পাখি,
যেভাবে আখের রস চাপকলে নিঙড়ে নেয় নগরের সাকি—
তেমনি তোমাকে তুমি নিঃশেষে নিস্যন্দ করে কবি,
বইয়েছ কবিতার করুণ জাহ্নবী।

আল্লাহ এ ভুবনখানি গড়েছেন শক্তি আর ভালোবাসা দিয়ে,
বর্ণনার বর্ণালিতে তুমি তারে তুলেছ রাঙিয়ে।
তেলোয় আকাশ ঘুঁটে দু’চোখে মেখেছ তার নীল,
সত্তা আর শব্দ একসূত্রে গেঁথে টেনেছ আশ্চর্য অন্ত্যমিল।

তোমার কাব্যের ডালি আত্মোৎসৃষ্ট সাধনার ধন,
অন্ধ প্রেমিকের চোখে রূপবতী প্রিয়ার মতন।
আমাদের শিল্পদৃষ্টি মুদ্রার জলুসে গেছে পুড়ে,
লও কবি শেষ অর্ঘ্য দিয়েছি মাটিতে ঘর খুঁড়ে।

আমরা বিষয়ী লোক সবাই নগদ খ্যাতি-লাভ-ক্ষতি কষে করি জীবনযাপন,
কাব্যের উপমা-ছন্দে বানাই পণ্যের বিজ্ঞাপন।
কোথায় সময় আজ এর বেশি সূক্ষ্ম গূঢ় শিল্প-কল্পনার?
কী হবে কবিতা লিখে আর!

যখন লাজুক চাঁদ নতুন বৌয়ের মতো মেঘের ঘোমটা তুলে হাসে,
উড়সী পরীর দল মালতির ভেজা গন্ধ ছড়ায় বাতাসে—
মোষেরা জাবর কাটে লেজ নাড়ে আরামে ঝিমায়,
বোধশূন্য অন্ধকার রাত্রির খিমায়॥


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

প্রফেসর আলি আকবর খান ডলার স্যার আর নেই

         প্রফেসর আলি আকবর খান ডলার...

এসএমপি কমিশনারের কাছে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট মেট্রোপলিটন...