ঘুষ ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে ইসলামের বিধান

প্রকাশিত : ১২ নভেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

মো: আব্দুল মালিক: ইসলামের দৃষ্টিতে হাদিয়ার আদান প্রদান শুধু জায়েযই নয় বরং সুন্নত। কিন্তু ঘুষ নাজায়িয। হাদিয়ার দ্বারা পরস্পরের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালবাসা সৃষ্টি হয় আর ঘুষের কারণে তা নষ্ট হয়। হাদিয়া ও ঘুষের মধ্যে পার্থক্য হলো, হাদিয়ার মধ্যে দাতা ও গ্রহীতার অন্তরের পারস্পারিক মহব্বত ছাড়া পার্থিব কোন স্বার্থ হাসিল কিংবা কোনরূপ অবৈধ সুবিধা পাওয়ার আশা থাকে না। কিন্তু ঘুষের মধ্যে এ ধরনের আশা থাকে। দায়িত্বে নিয়োজিত কোন ব্যক্তিকে হাদিয়ার আকারে কোন কিছু প্রদান করাও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। ঘুষ খাওয়ার কু-অভ্যাস পৃথিবীতে প্রথম শুরু হয় ইয়াহুদী প-িৎদের থেকে। মহান আল্লাহ তাদের সেই ভক্ষণকে তিরস্কার করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তাদের (ইয়াহুদীদের) অনেককে তুমি দেখবে পাপাচারিতায়, সীমা লংঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে তৎপর। তারা যা করছে নিশ্চয় তা কত নিকৃষ্ট। (তাদের) রাব্বানীগণ ও প-িৎগণ তাদেরকে পাপ কথা বলতে এবং অবৈধ ভক্ষণে নিষেধ করে না, এরা যা করছে নিশ্চয় তা অতি নিকৃষ্ট’- (সুরা মায়িদা- ৬২-৬৩)। অন্যত্র পবিত্র কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, “আর তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। আর মানুষের ধনসম্পদের কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের ঘুষ দিও না”- (সূরা বাকারা ১৮৮)। এখানে বিচারক বলতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও বোঝাবে। অন্যত্র বলা হয়েছে, “হে বিশ^াসীগণ তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না”-সূরা নিসা ২৯। ঘুষের অনিবার্য পরিণতি হলো অন্তরে ভীতির সৃষ্টি হওয়া ও সৎ সাহস হারিয়ে যাওয়া। ঘুষখোর সর্বদা ভীতুমনে থাকে। মুখ খুলে সে কখনো সত্য কথা বলতে পারে না। মানবতার জন্য এটি মহা জঘন্য অপরাধ। হাদিসে আছে, হযরত আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, “যেই সম্প্রদায়ে সুদ প্রকাশ্যে চলে সে সম্প্রদায় দুর্ভিক্ষ কবলিত হয়। আর যেই সম্প্রদায়ে ঘুষ প্রকাশ্যে চলে সে সম্প্রদায় ভীতি কবলিত হয়”- (ইমাম আহমদ, মুনযিরী)। হাদিসে আরো আছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর আল্লাহ্র লা’নত- (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযা, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম হাকিম, মুনযিরী)। যার উপর আল্লাহর লানত তার পরিনতি জাহান্নাম ছাড়া আর কি হতে পারে ? ঘুষ দাতার ওপর ও আল্লাহর লানত কিন্তু ঘুষ দাতা দুই প্রকারের। যথা- (১) পার্থিব লাভের জন্য ঘুষ প্রদান (২) পার্থিব লাভ ছাড়া ঘুষ প্রদান। যেমন- পাসপোর্ট করার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় ফি প্রদানের পর সবকিছু ঠিক থাকা স্বত্তেও অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে দাতা নিতান্ত দায়ে পড়ে ঘুষ প্রদান করে থাকেন বিধায় আল্লাহ সুবহানাতালা দাতাকে বিশেষ বিবেচনায় হয়তো ক্ষমা দিতে পারেন। কারণ আল্লাহতালা সকলের অন্তরের কথা জানেন।
হযরত আবূ হুমায়দ সাঈদী (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, মহানবী (স) একবার আযদ গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে সাদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত করে পাঠান। লোকটির নাম ছিল ‘ইবনুল লুতবিয়্যা’। লোকটি কাজ শেষ করার পর প্রত্যাবর্তন করে বলল, “এ অংশ আপনাদের, আর এ অংশ আমাকে হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া হয়েছে।” কথাগুলো শুনে মহানবী (স) ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তারপর মহান আল্লাহ্র হাম্দ ও সানা পাঠের পর বললেন, আল্লাহ তা’আলা আমার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা পালনের জন্য আমি তোমাদের মধ্য থেকে কোন লোককে নিয়োজিত করি। অথচ তাদের কেউ কেউ ফিরে এসে বলে, এগুলো আপনাদের আর এগুলো আমাকে হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক নয়। কারণ যদি এমনই হতো তাহলে সে তার পিতৃগৃহ কিংবা বলেছেন, তার মাতৃগৃহে বসে থাকেনি কেন ? তখন দেখতে পেত যে, তাকে হাদিয়া দেওয়া হচ্ছে কি না। সেই মহান সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন, এ ক্ষেত্রে কেউ যদি কোন কিছু অবৈধ গ্রহন করে তবে সে তা নিজ ঘাড়ে বহণ করে কিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত হবে। বস্তুটি যদি উট হয়ে থাকে তাহলে সেটি তখন চীৎকার করতে থাকবে, যদি গরু হয় তাহলে হাম্বা হাম্বা ডাক দিতে থাকবে। তারপর নবীজী মুনাজাতের উদ্দেশ্যে হস্তদ্বয় এতখানি উঁচু করলেন যে, আমরা তার বগলের শুভ্রাংশ দেখতে পেয়েছি। তারপর বলতে থাকলেন, হে আল্লাহ! আমি কি পয়গাম পৌঁছাতে পেরেছি, হে আল্লাহ! আমি কি পয়গাম পৌঁছাতে পেরেছি ? –(বুখারী, মুসলিম)। আজকাল দেখা যায় অনেকে সরকারি চাকুরিতে থেকে নিয়মিত বেতন ভাতা নিয়ে অতিরিক্ত টেক্স-ভ্যাট আদায় করে, অনেকে মসজিদ মাদরাসার জন্য চাঁদা আদায় করে এক অংশ নিজে নেন, এক অংশ জমা দেন। যা মহানবী (স) এর হাদিস সমর্থন করে না।

চাঁদাবাজি: চাঁদাবাজিসহ যে কোন যুলম ইসলামে নিষেধ। ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও সম্মতির ভিত্তিতে যে চাঁদা প্রদান করে সেটি ছাড়া অন্য কোন চাঁদা হালাল নয়। কারো কাছ থেকে তার মনের পরিচ্ছন্ন সন্তষ্টিবিহীন কোন চাঁদা আদায় করা নাজায়েয। এমনকি কোন মসজিদ কিংবা মাদ্রাসা কিংবা ধর্মীয় কাজের জন্য হলেও নাজায়িয। হাদিসে আছে; হযরত আবূ হুররা আর রুককাশী (রা) নিজ চাচা সূত্রে বর্ণনা করেছেন- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, সাবধান! তোমরা কেউ কারো উপর যুলুম করবে না। সাবধান! কারো সম্পদ তার অন্তরের সন্তষ্টি ব্যতীত কারো জন্য হালাল নয়। (মিশকাত, বায়হাকী)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, তুমি মজলুমের বদ্ দু’আকে ভয় কর। কারণ এই বদ্দু’আ আর আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মাঝখানে কোন আড়াল নেই- (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, মুনযিরী)। আজকাল প্রায়ই দেখা যায় মসজিদ মাদরাসার জন্য, খতম তারাবির জন্য বা অন্য যেকোনো ভাল কাজের জন্য দূর্বলদের উপর সবলরা চাপ প্রয়োগ করে চাঁদা আদায় করে থাকেন। যাহা মহানবী (স) এর শিক্ষা নয়।

ইসলামে শিরকের পর সবচেয়ে কঠিন গুনাহর কাজ হচ্ছে অন্যের সম্পদ আতœসাৎ করা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কোরআন শরীফের বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন- “শিরককারীকে তিনি ক্ষমা করবেন না” আর অন্যের হক এর ব্যপারে বলছেন, ‘যার হক সে মাফ না করে দিলে আমি তা মাফ করতে পারি না’। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা যা মাফ করতে পারেন না তা যে কত বড় গুনাহর কাজ সহজেই অনুমেয়। অথচ অনেকেই উপরোক্ত উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে শেষ জীবনে মক্কা- মদিনায় গিয়ে বার বার হজ্জ¦-ওমরা করেন, পীর আউলিয়ার মাজারে যান, বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগী ও দান খয়রাত করেন, তাওবা ইস্তেগফার পড়েন এই আশায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে যে পাপ করেছেন তা থেকে মাফ পাওয়ার জন্য। আসলে কী এ পদ্ধতিতে মাফ পাওয়া যায় বা যাবে ? কুরআন ও হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ি পাওয়া যাবে না। কারণ হাদিসে আছে, “যে ব্যক্তির খাদ্য, বস্ত্র ও পানীয় হারাম উপায়ে অর্জিত, তার দোয়া আল্লাহ পাক কবুল করেন না।” একমাত্র পথ যার মাল বা যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সে যদি মাফ করে দেয়। আর এই মাফ নিতে হবে দুনিয়া থেকে। কারণ শেষ বিচারের দিন সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। সে দিন পিতা মাতা সন্তানকে, সন্তান পিতা মাতাকে, ভাই বোনকে, বোন ভাইকে, স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে চিনবে না। কেউ কাউকে ক্ষমা করবে না, ক্ষমা করার প্রশ্নই উঠে না। অথচ আমরা এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন। ইসলামের পরিভাষায় যাহা ঘুষ আধুনিককালে আমরা তার নাম দিয়েছি স্পীড মানি, বখশিশ ইত্যাদি। দায়িত্বশীল ব্যক্তি যে নামে যে সুরতে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করুন না কেন (সেটা সেবাও হতে পারে) তাই ঘুষ। আর ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত খাদ্য, বস্ত্র, পানীয় ধারা পরিপুষ্ট শরীর দিয়ে যে কোন ইবাদতই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। দেহের খাদ্য হালাল না হলে আত্মা বা রুহের খাদ্যের কোন মূল্য নেই। ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত হচ্ছে হালাল ভক্ষণ।

অতএব যারা বখশিশ বা ভালো কাজের জন্য অপেক্ষাকৃত চাপ প্রয়োগ করে চাঁদা আদায় করেন তাদের এ ব্যাপারে আরো সচেতন হতে ইসলাম নির্দেশ করে।

 

আরও পড়ুন